বর্তমান বিশ্ব যেমন দ্রুত ডিজিটাল প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে, ঠিক তেমনি কম্পিউটার আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আজকে আমরা এমন এক কম্পিউটারের কথা জানব, যা বর্তমানে প্রচলিত কম্পিউটার থেকে অনেক দ্রুত কাজ করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা, সাইবার নিরাপত্তা, মহাকাশ গবেষণা—সব ক্ষেত্রেই শক্তিশালী কম্পিউটিং দ্বারা পরিচালিত।
কোয়ান্টাম কম্পিউটিং কী
কোয়ান্টাম কম্পিউটিং হলো এমন এক ধরনের কম্পিউটিং প্রযুক্তি, যা কোয়ান্টাম মেকানিকসের নীতির ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। এর মূল ভিত্তি হলো উপপরমাণবিক কণার আচরণ। কোয়ান্টাম তত্ত্বের ভিত্তি স্থাপন করেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাংক (Max Planck), পরে আলবার্ট আইনস্টাইন(Albert Einstein) ও অন্য বিজ্ঞানীরা এই তত্ত্বকে সমৃদ্ধ করেন।
প্রচলিত কম্পিউটার বনাম কোয়ান্টাম কম্পিউটার
কোয়ান্টাম কম্পিউটিং মূলত চারটি প্রধান নীতির ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। যেমন—
সুপারপজিশন
সুপারপজিশন পদার্থের তরঙ্গের মতো। সুপারপজিশনে কিউবিটগুলো জটিল ও বহুমাত্রিক গঠন তৈরি করতে পারে। সুপারপজিশনে অনেকগুলো কোয়ান্টাম অবস্থা সম্মিলিত হয়ে নতুন কোয়ান্টাম অবস্থা তৈরি করে। আবার কোনো কোয়ান্টাম অবস্থা ভেঙে অনেকগুলো স্বতন্ত্র অবস্থার তৈরি করতে পারে। এভাবেই সুপারপজিশন অবস্থায় লাখ লাখ প্রসেস কয়েক সেকেন্ডেই করে ফেলা সম্ভব।
এনট্যাঙ্গেলমেন্ট
এটি হলো কিউবিটগুলোর একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করার ক্ষমতা। কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট ঘটে যখন একটি কিউবিট কোনো বিটের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত থাকে যে একটি বিটের তথ্য পেলেই অন্য বিট সম্পর্কে জানা যায়। ফলে কোয়ান্টাম প্রসেসর একটি বিটের ওপর নির্ভর করেই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
ডিকোহেরেন্স
ডিকোহেরেন্স হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে কোনো সিস্টেম কোয়ান্টাম অবস্থা থেকে নন-কোয়ান্টাম অবস্থায় ভেঙে পড়ে। কখনো কখনো এটি ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয় ডিকোহেরেন্স পরিমাপ করতে। আবার কখনো কখনো পরিবেশের বিভিন্ন কারণে এমনটি হতে পারে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরিতে অনেক বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো কিউবিটগুলোকে বাহ্যিক পরিবেশ থেকে রক্ষা করতে পারে—এমন একটি কাঠামো নির্মাণ করা।
ইন্টারফারেন্স
ভুল উত্তরগুলোকে বাতিল করে সঠিক উত্তরটির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
কীভাবে কাজ করে
কোয়ান্টাম কম্পিউটার সাধারণত অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় (প্রায় শূন্য কেলভিনের কাছাকাছি) পরিচালিত হয়। সুপার কন্ডাক্টিং সার্কিট বা আয়ন ট্র্যাপ প্রযুক্তি ব্যবহার করে কিউবিট তৈরি করা হয়। প্রচলিত কম্পিউটারের প্রসেসরে বিট দিয়ে তৈরি একটি সারি থাকে। বিটগুলো শুধু শূন্য বা এক হতে পারে। তাই এই বিটগুলোকে বাইনারি বিটও বলা হয়ে থাকে। প্রচলিত কম্পিউটার যেখানে ডেটা প্রসেসিং করার জন্য বাইনারি বিট ব্যবহার করে, সেখানে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং সম্পূর্ণ নতুন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়, যাকে কোয়ান্টাম বিট বা সংক্ষেপে কিউবিট বলে। কিউবিট ব্যবহার করে প্যারালাল কম্পিউটিং করা সম্ভব; অর্থাৎ একই সঙ্গে শূন্য এবং এক উভয় বিটে কাজ করা সম্ভব। একটা উদাহরণ দেখা যাক। মনে করি, কেউ একজন একটি গোলকধাঁধার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যক্তিকে এই গোলকধাঁধার সমাধান করতে হবে। প্রচলিত কম্পিউটার সমস্যাটি সমাধানের জন্য সম্ভাব্য সব রাস্তা খুঁজে বের করবে। এ ক্ষেত্রে, প্রতিবার নতুন পথ খুঁজে বের করতে ও বন্ধ রাস্তাগুলোর তথ্য মনে রাখতে প্রচলিত কম্পিউটার বিট ব্যবহার করবে। অন্যদিকে, কোয়ান্টাম কম্পিউটার গোলকধাঁধাটিকে পাখির চোখ দিয়ে দেখবে। ফলে একসঙ্গে অনেকগুলো পথ খুঁজে বের করে, সঠিক পথটি অনেক দ্রুত ও নির্ভুলভাবে নির্বাচন করতে পারে। এখন একটু ভাবুন তো, প্রতিটি পথ ঘুরে ঘুরে সঠিক পথ বের করার চেয়ে পাখির চোখে দেখে গোলকধাঁধাটিকে সমাধান করতে কত কম সময় লাগবে!!
বর্তমানে বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কোয়ান্টাম কম্পিউটিং গবেষণায় বিনিয়োগ করছে, যেমন—
- IBM
- Microsoft
- Intel
বিশেষ করে, Google ২০১৯ সালে ‘Quantum Supremacy’ অর্জনের দাবি করে, যেখানে তাদের কোয়ান্টাম প্রসেসর প্রচলিত সুপার কম্পিউটারের চেয়ে দ্রুত নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধান করে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

