আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বিশ্ব নারী দিবসে নারী শিক্ষার্থীদের চাওয়া

মোফাজ্জল হোসেন

বিশ্ব নারী দিবসে নারী শিক্ষার্থীদের চাওয়া

একজন নারী, একজন মা, গড়েছেন সংসার; গর্ভে ধারণ করেছেন সন্তান, আগলে রেখেছেন সেই সন্তানকে জান-প্রাণ দিয়ে, নিজের আরাম-আয়েশ বিসর্জন করে। তবে সেই মায়ের জাত নারী আজো অবহেলিত। আজ নারীর বস্ত্রহরণ করে নিচ্ছে, সতীত্বে কলঙ্কের ছাপ দিচ্ছে কিছু অবিকল মানুষরূপী পশু। নারীরা আজ ভুগছে নিরাপত্তাহীনতায় ও অধিকারহীনতায়। অথচ নারী-পুরুষ একে অপরের প্রতিযোগী নয়, সহযোগী। তাই তো কবি কাজী নজরুলের ভাষ্যে—‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’

নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি

বিজ্ঞাপন

‘নারী’ একটি শব্দ, যা শক্তি, সংগ্রাম ও ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি। প্রতিবছর সারা বিশ্বে নারীর সম-অধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং কাজের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য ৮ মার্চ নারী দিবস হিসেবে পালন করা হয়। নারী দিবস শুধু এক দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, তা সব সময়ের জন্য । সারা বিশ্বে বিভিন্ন স্থানে নারীরা আজ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। প্রতিদিন নারীরা শারীরিক, মানসিক ও যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ কেউ রেহাই পাচ্ছে না এসব নিগ্রহ থেকে। প্রতিদিন কোনো না কোনো শিশু, কিশোরী, নারী কিংবা বৃদ্ধা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এমনকি রাস্তাঘাটে, বাসে, ট্রেনে কিংবা বাড়িতে পর্যন্ত যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। বেশিরভাগ সময় ধর্ষকদের কোনো বিচার হয় না, কিংবা তা থাকে জেল-জরিমানা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। অধিকাংশ নারী সম্মানের ভয়ে অভিযোগও করতে পারে না। তাই নারী দিবস কেবল বিশেষ কোনো দিনে উদ্‌যাপনের বিষয় নয়। নারী দিবসের প্রকৃত লক্ষ্য তখনই অর্জিত হবে, যখন সব ক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

নুসরাত জাহান বৈশাখী

শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ

নারীর অবদান

আজকের নারীর অবস্থান শুধু গৃহকোণে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, ক্রীড়া, সাহিত্য—প্রতিটি ক্ষেত্রে যেমন রয়েছে নারীর অবদান, তেমনি তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দেশ ও জাতিকে। নারীদেরও রয়েছে স্বপ্ন, আছে আশা-আকাঙ্ক্ষা। তবে আজ এই আধুনিক কালেও কি আমরা নারীদের সঠিক মূল্যায়ন করছি? নারীদের প্রাপ্য স্বাধীনতা দিতে পেরেছি কতটুকু? ইতিহাসের পাতা উল্টালে আজও চোখে পড়ে বেগম রোকেয়ার কলমের লড়াই, যিনি নারীর শিক্ষার পক্ষে সোচ্চার হয়ে সমাজের অন্ধকার ভেদ করেছিলেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মালালা ইউসুফজাই প্রমাণ করেছেন, একজন কিশোরীও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিশ্বকে নাড়া দিতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেখানে পোশাকশিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে কাজ করা তরুণী সবাই মিলে উন্নয়নের হাল ধরছেন, সেখানে আমরা তাদের নিরাপত্তা দিতে পেরেছি কতটুকু; দিতে পেরেছি কতটা সুযোগ নির্ভয়ে এগিয়ে যাওয়ার? নারী দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সমাজের অগ্রগতি কখনোই একপক্ষীয় হতে পারে না, প্রয়োজন নারী ও পুরুষের সমান অংশগ্রহণ। আমাদের উচিত তাদের জন্য ভরসার পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে প্রতিটি বাধা পেরিয়ে তারা নিজেদের স্বপ্নজয়ের অদম্য সেনানী হয়ে উঠতে পারে।

শাহানুর আক্তার সেতু

কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

ন্যায়বিচার প্রাপ্তি হোক নারীর অধিকার

আমাদের দেশে ধর্ষণের বিচার হলো ধর্ষিতাকে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হবে। অথচ আমরা কি জানি—আইনত ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড—এটা হয়তো দেশের অনেক মানুষ জানেও না। আর জানলেও আইন কার্যকর না থাকায় বেড়েই চলেছে ধর্ষণ। নারীর প্রতি সহিংসতার চরম রূপটি কেবল ধর্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং অপরাধ আড়াল করতে ভুক্তভোগীকে হত্যা করার ঘটনা এখন এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। যেখানে ধর্ষণের বিচার হয় না, সেখানে নারী নির্যাতন, সাইবার বুলিং ও যৌন হয়রানির বিচার পাওয়া তো বিলাসিতা। নারীর ওপর নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার ন্যায়বিচার দাবি করা যেন কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ জানানো আর রাজপথে বিক্ষোভ প্রদর্শনের মধ্যেই সীমিত হয়ে আছে। বিচারহীনতা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, সমাজে নারীরা নির্যাতিত হয়ে কারো কাছে বলার সাহস পায় না। ধর্ষণকারীর চেয়েও সমাজে বেশি অপমান, অবহেলা আর লাঞ্ছনার শিকার হয় ধর্ষিতা নিজে। বিচারহীনতায় নারীর নীরব আর্তনাদ দেখার কেউ নেই। নির্যাতিত নারীর আর্তনাদ আর চারদেয়ালে বন্দি রাখা যাবে না, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে। নারী দিবস পালন কেবল সভা সেমিনারে সীমাবদ্ধ না রেখে নারী হত্যা, ধর্ষণ আর নির্যাতনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ন্যায়বিচারের মাধ্যমে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক নারী দিবসের অন্যতম লক্ষ্য।

নুসরাত সুলতানা

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আত্মমর্যাদার অভিযাত্রা : কিছু না বলা গল্প

নারীকে আমরা প্রায়ই শুধু কন্যা, স্ত্রী বা মায়ের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করি; কিন্তু তার প্রকৃত শক্তি, চিন্তা, স্বপ্ন ও সক্ষমতা সমাজের যেকোনো বাধাকে অতিক্রম করতে পারে। পেশাগত ক্ষেত্রেও কিছু স্থান এখনো নারীর জন্য কঠিন বলা হয়, যা মূলত পুরোনো সামাজিক ধারণার প্রতিফলন। প্রকৃত বাস্তবতা হলো, সমান সুযোগ পেলে নারীরা প্রতিটি ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিতে সক্ষম।

নারী দিবস কেবল শুভেচ্ছার দিন নয়; এটি আত্মপরিচয়, অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নকে সামনে আনার দিন। নারীর মূল্যায়ন করুণা, সৌন্দর্য বা বিয়ের অবস্থানের মাধ্যমে নয়, তার মেধা, পরিশ্রম এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার মাধ্যমে হওয়া উচিত। যে নারী প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যায়, সে শুধু নিজের পথ তৈরি করে না, বরং সমাজের জন্যও নতুন দিশা দেখায়। তাই নারী দিবসের মূল বার্তা হলো—নারীকে কেবল বাহ্যিক দৃষ্টিতে বিচার না করে শুনে, বুঝে ও বিশ্বাস করে তার জীবন, স্বপ্ন এবং আশাকে স্বীকৃতি দেওয়া। আমাদের উচিত তাকে সমান সুযোগ দেওয়া, তার পরিশ্রম ও সিদ্ধান্তকে সম্মান করা, আর তার সম্ভাবনাকে ঠিকমতো ছুঁয়ে নেওয়ার জায়গা তৈরি করে দেওয়া।

সীমা পারভীন

কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

নিরাপত্তা নিশ্চিত অনুগ্রহ নয়, মৌলিক অধিকার

আন্তর্জাতিক নারী দিবস এলেই দিনটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে নারীদের প্রতি শুভেচ্ছা বার্তা ও সম্মানের বাণী। কিন্তু নীরবতার আড়ালে থেকে যায় অনেক নারীর অব্যক্ত কথা। কারণ প্রতিবাদ করার মানেই ‘বেশি কথা বলা’ তকমা। স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝে চলে নারীদের লড়াই। নারীরা উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের সাফল্যের স্বপ্ন দেখেন । কিন্তু সামাজিক বাধা, নিরাপত্তাহীনতা ও বৈষম্য তাদের পথকে রুদ্ধ করে দেয়। নানা সময় নারীদের বৈষম্যের শিকার হতে হয়, যেমন কর্মক্ষেত্রে সমান পরিশ্রম করার পরেও মজুরির ভিন্নতা, পরিবারে মেয়ে বলে অবহেলার শিকার হওয়া এবং সংসারে অদৃশ্য শ্রম। সন্তান লালন-পালন, বয়স্কদের সেবা, গৃহস্থালির যাবতীয় কাজ—সবকিছুই যেন তার স্বাভাবিক কর্তব্য! এই কর্তব্যের স্বীকৃতি না থাকলেও থাকে প্রত্যাশার চাপ।

নারীরা এখন শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু করে হাসপাতাল, গণমাধ্যম, ব্যাংক কিংবা উদ্যোক্তা হিসেবে করপোরেট জগতেও নিজেদের অপরিহার্যতা প্রমাণ করে চলেছে। কিন্তু অনেক সময় নারী কর্মীদের দক্ষতা নয়, তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, যেমন—‘বিয়ে হলে চাকরি করবে কি না’, ‘সন্তান হলে কাজ সামলাতে পারবেন কিনা?’ এমন প্রশ্ন পুরুষ সহকর্মীদের ক্ষেত্রে সাধারণত ওঠে না। নারীদের তাদের যোগ্যতা ও পরিশ্রম দিয়ে মূল্যায়ন করা হোক, ব্যক্তিগত পরিচয়ে নয়।

নারীদের নিরাপত্তা কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি মৌলিক অধিকার। নারীরা সহানুভূতি নয়, করুণা নয়, অধিকার চায়। বদলে যাক মানসিকতা, আসুক বাস্তব সমতা। নারীর অব্যক্ত কথাগুলো শোনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ার পথ।

লিমা আক্তার

গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

ডিজিটাল পৃথিবীতে নারীর নিরাপত্তা : স্বপ্ন না অধিকার

সম্প্রতি লক্ষ করা যাচ্ছে, প্রযুক্তির ব্যবহার যত আধুনিক হচ্ছে, নারীর নিরাপত্তা তত হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। যেমন কোনো নারী যদি পরিচিত মুখ হয়, কিংবা রাজনৈতিক কোনো দলের সঙ্গে জড়িত হয়, সেক্ষেত্রে তাকে নানাভাবে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হতে হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন মানুষের হাতের মুঠোয় এমনভাবে চলে আসছে, যেক্ষেত্রে কেউ ইচ্ছা করলেই এখন এটির অপব্যবহার করতে পারে। আর এই অপব্যবহারের সুযোগেই একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী নারীর দুর্বল জায়গাগুলোয় আঘাত করতে পারছে। এর ফলস্বরূপ দেখতে পাই, কোনো নারী এখন সম্মুখসারিতে যেতে চায় না, পরিচিত হতে চায় না, কিংবা রাজনীতি-সচেতন হলেও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হতে চায় না। নারী তার সাহসিকতার জন্য যেতে চাইলেও পরিবারের কাছে বাধার সম্মুখীন হয়। দিনশেষে এ ধরনের হেনস্তা শুধু ব্যক্তিজীবনের ওপর প্রভাব ফেলে না, পরিবারের ওপরও ফেলে। কিন্তু আমরা এই জিনিসগুলো নিয়ে খুব কম কথা বলি, খুব বেশি সচেতনতা দেখাই না। তার পেছনে আমি দুটি কারণ দেখি; তা হলো—‘আমার সঙ্গে তো হচ্ছে না, কাজেই আমি চুপ থাকি এবং আমি একা কথা বলে কী এমন পরিবর্তন করতে পারব?’ তাই আমাদের এই জায়গাগুলো নিয়ে কাজ করা উচিত। নারী দিবসে এটুকুই প্রত্যাশা রাখব—শুধু একটি দিবসই উদ্‌যাপন না করে প্রতিনিয়ত নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক। এটা নিছক কোনো স্বপ্ন নয়, একজন নারীর মৌলিক অধিকার।

খাদিজা আফরিন মিতু

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন