আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

স্বাবলম্বী সিগমা

ওমর শাহেদ

স্বাবলম্বী সিগমা

স্বল্প পুঁজি নিয়ে সিগমা সাদিক কীভাবে ব্যবসা গড়ে তুললেন? ইচ্ছাশক্তি ও স্বামী-সন্তানের সাহায্য তাকে মানসিক শক্তি জুগিয়েছে, তার ব্যবসাকে বড় করেছে এবং তাকে শক্ত ভিতে দাঁড় করিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সিগমা সাদিক একটি ইনকাম ট্যাক্স কনসালটেন্সি ফার্মে চাকরি করতেন। ছোট সন্তানটি হওয়ার পর চাকরি ছেড়ে দিলেন। এর পরই পোস্ট-প্রেগন্যান্সি ডিপ্রেশন তাকে ঘিরে ধরে। এরপর নিজের মনটাকে ভালো করার জন্য কোনো না কোনোকিছু করার চেষ্টা করতেন। বান্ধবীর সহযোগিতা ও উৎসাহে তিনি ফ্রোজেন ফুডের ব্যবসা শুরু করলেন।

ফ্রোজেন রুটি ও পরোটা নিয়েই নিজের ব্যবসাটি করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন সিগমা’স কিচেনের স্বত্বাধিকারী। এরপর ফ্রোজেন স্ন্যাকস ও নানা ধরনের আচারের ব্যবসা করবেন বলে ঠিক করলেন। এর পেছনের কারণটি হলো—অনেক কর্মজীবী নারী ও পুরুষ আছেন, যারা সময়ের অভাবে স্বাস্থ্যকর খাবার বাসায় তৈরি করতে পারেন না। ফলে তারা জাঙ্ক ফুডের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে যান। অসুস্থ বয়স্ক ডায়াবেটিক রোগীরা প্রয়োজনবোধে রুটি খান। আবার যারা ডায়েট করেন, তাদেরও রুটি বা পরোটা ছাড়া চলে না। ফলে অথনৈতিক দিকের চেয়েও সামাজিক দিকের প্রতি বেশি খেয়াল রেখে স্বাস্থ্য ও পরিবেশসম্মত খাবার তৈরির দিকে তিনি ঝুঁকে পড়লেন। আস্তে আস্তে বিস্তৃত হতে হতে হোমমেড ফুডও তিনি তৈরি করছেন।

তবে সমস্যা হলো ডেলিভারিতে। ডেলিভারি ম্যান প্রতি কিলোমিটার হিসেবে পার্সেল নেন। ফলে পণ্যের চেয়ে ডেলিভারি চার্জ বেশি হয়। ফলে তিনি একসময় ঠিক করলেন, একটি নির্দিষ্ট ডেলিভারি চার্জ রাখবেন, যাতে কাস্টমারের ওপর প্রেশার না পড়ে, তার বাড়তি কষ্ট না হয়। প্রথম দিকে তার স্বামী এ কাজে তাকে প্রচুর সাহায্য করেছেন। তিনি অফিস শেষ করে পার্সেল ডেলিভারি দিতেন। এখনো মাঝেমধ্যে সিগমা ভাবেন, আমি এত দূর আসতে পারতাম না, যদি না হাজব্যান্ডের সাহায্য পেতাম।

এখন তিনি ডেলিভারি এজেন্সির মাধ্যমে ডেলিভারি দেন। বেশ ভালো সার্ভিস পাচ্ছেন। তারপরও তাকে প্রতিদিন ব্যবসার পেছনে পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা সময় দিতে হয়। ঘর-বাচ্চা সামলে তিনি একা কাজ করেন; তারপরও মোটামুটি ভালো উপার্জন হয়। তবে তিনি যেভাবে চাচ্ছেন, সেভাবে এখনো ব্যবসাটিকে বড় করতে পারছেন না। ব্যবসা মানেই লেগে থাকা। এক দিনে তো আর ব্যবসা বড় হয় না। হোঁচট খেয়ে দাঁড়িয়েছেন, আবার পড়ে গেছেন। শারীরিক অসুস্থতাও ছিল। তবুও নিজের ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে স্বামী-সন্তানের সাহায্য নিয়ে তিনি ব্যবসাকে বড় করেছেন এবং শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছেন।

এখন ব্যবসার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ডেলিভারি এজেন্সি। হোমমেড ফুড নিয়ে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি এজেন্সি আছে। এগুলো বাদেও রাইডারদের প্রতারণার কারণে অনেক এজেন্সি বন্ধ করা হয়েছে। আর যেসব এজেন্সি আছে, তারা ডেলিভারি চার্জ অনেক বেশি নেয়। সিগমার বক্তব্য—তাদের উচিত ফিক্সড ডেলিভারি চার্জ নির্ধারণ করা। ফ্রোজেন আইটেম এমনিতেই দু-তিন কেজির নিচে হয় না বলে তিনি জানালেন। কোনো এজেন্সি যদি নিয়ম করে এক কেজির পর প্রতি কেজিতে চার্জ নেয়, তাহলে একজন উদ্যোক্তার কঠোর পরিশ্রমের পর হাতে আর কী থাকে?

সিগমা সাদিককে এই ব্যবসায় সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেন তার স্বামী। তিনি সবসময় ছায়ার মতো স্ত্রীর পাশে আছেন। আর সবার আগে তাকে সাহায্য করেছেন বিদ্যালয়ের বান্ধবী অ্যাডভোকেট জারিন সুলতানা শৈলী। ব্যবসায় কোনটা করলে ভালো হবে, কোনটা করলে খারাপ হবে—এসব নিয়ে প্রায়ই স্বামীর সঙ্গে আলোচনা হয়। আসলে ঘরের মানুষ সমর্থন না জোগালে কোনো মেয়েই কোনো কাজে উন্নতি করতে পারে না। সফল নারীদের পেছনে তাদের স্বামীদের ভূমিকা অনেক।

তার বিদ্যালয়ের এক বান্ধবী হঠাৎ একদিন ফোন করে বলেন, তার মা কিডনি ইনস্টিটিউটে ভর্তি আছেন, তার জন্য প্রতিদিন খাবার দিতে হবে। আন্টিকে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তার জন্য সিগমার খুব খারাপ লাগল। টানা ১৫ দিন তার কাছ থেকে খাবার নিয়েছেন তারা। বাইরের খাবার খেতে খেতে তার জন্ডিস হয়ে গিয়েছিল। সিগমার খাবার সেক্ষেত্রে কিছুটা হলেও মুখে দিতে পারতেন। তার বাসার সামনেই ছিল হাসপাতাল, অথচ সময়ের অভাবে যেতে পারেননি।

এখন তার ক্রেতারা হলেন ছোট বাচ্চাদের মায়েরা, ডায়াবেটিক রোগী ও ব্যাচেলর। সব রকমের মানুষই আসলে তার কাছ থেকে পণ্য কিনে থাকেন। তারা ফেসবুক ও হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমে তার পেজে কল করে অর্ডার করেন। তার নিজেরও ব্যস্ততা আছে অনেক। তিনি দুটি বাচ্চার মা। বাচ্চাদের অনেক সময় দিতে হয়। ফলে সঠিক সময়ে পণ্য ডেলিভারি দিতে তাকে অনেক বেগ পেতে হয়। তবে তার সন্তানরা খুব ভালো। কাজের সময় বড় সন্তান ছোটটিকে সামলায়, যাতে মা সুন্দরভাবে তার কাজটি করতে পারেন।

তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো সিগমা’স কিচেনকে বড় পরিসরে সাজানো। এখানে আরো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। তার খাবার সরবরাহের মাধ্যমে আরো অনেক বেশি মানুষের উপকার করা। আর খেয়ে কেউ যেন বলতে না পারে—‘এটা দোকানের খাবারের মতো খাবার।’ সবার মুখে যেন থাকে—‘মায়ের হাতের রান্না খেলাম। ঘরে তৈরি রুটি-পরোটা খেলাম।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন