চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই গর্ভপাতের ওষুধ সেবনে ঝুঁকি

এমরানা আহমেদ

চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই গর্ভপাতের ওষুধ সেবনে ঝুঁকি

রাজধানীর লালমাটিয়ার বাসিন্দা শারমিন জামান (ছদ্মনাম)। স্বামী জামান ইকবাল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। এ দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে বড়টির বয়স ১২ বছর, মেজোটির ৯ আর ছোটটির বয়স পাঁচ বছর।

হঠাৎ অনিচ্ছাকৃতভাবে গর্ভে সন্তান এলে স্বামীকে না জানিয়ে গোপনে গর্ভপাত করানোর সিদ্ধান্ত নেন শারমিন। প্রতিবেশী এক ভাবির পরামর্শে পাড়ার দোকান থেকে সন্তান নষ্ট করার ওষুধ কিনে খান তিনি। এর দুই ঘণ্টা পর পেটে ব্যথা শুরু হয়। রাত যত গভীয় হয়, ব্যথা তত বাড়তে থাকে। ভোর হতেই শুরু হয় রক্তপাত। কিছুতেই রক্তপাত বন্ধ না হওয়ায় এক ডাক্তার আত্মীয়ের সহযোগিতায় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি) হাসপাতালে ভর্তি হন। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় চিকিৎসকরা তার অপারেশন করতে বাধ্য হন। ঘটনাটি গত বছরের ১৮ ডিসেম্বরের। চিকিৎসকদের সঠিক চিকিৎসায় এ যাত্রায় বেঁচে যান ৩৮ বছর বয়সি শারমিন জামান।

বিজ্ঞাপন

শারমিনের আত্মীয় স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ (গাইনি) ফারজানা চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, তিনি সাইটোমিস নামের যে ওষুধ খেয়েছিলেন, তার শ্রেণিগত (জেনেরিক) নাম মিসোপ্রোস্টল। ওষুধটি তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই কিনেছিলেন, যা ঠিক হয়নি। প্রচুর রক্ত গেছে। সঠিক সময় সঠিক চিকিৎসা না পেলে তার মৃত্যুও হতে পারত।

এই চিকিৎসক বলেন, ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই অনেক নারী হরহামেশা ফার্মেসি থেকে মিসোটল, আই-পিল, পোস্টিনর-২, এমএম কিট, সাইটোমিস কিটÑএ ধরনের অনেক ওষুধ কিনছেন এবং ভুলভাবে ব্যবহার করছেন।

ওষুধগুলো সম্পর্কে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি) হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রেজাউল করিম বলেন, এ ওষুধগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে, জীবনেরও ঝুঁকি আছে। তাই ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া এ ওষুধ বিক্রি করা কোনোভাবেই উচিত নয়।

ফার্মেসিগুলোয় হরহামেশা এমআরের ওষুধও বিক্রি হচ্ছে। এর কারণে অনেক মাতৃমৃত্যু হচ্ছে। মিসোপ্রোস্টল জরায়ু সংকুচিত করে। সে কারণে এ ওষুধ প্রসব বেদনা তুলতে সাহায্য করে। আবার নির্দিষ্ট মাত্রায় এ ওষুধ প্রয়োগ করলে জরায়ু বেশি সংকুচিত হয়ে প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়। তারা দুটি কাজেই এ ওষুধ ব্যবহার করছেন।

এই চিকিৎসক আরো বলেন, শহরের গলি, বস্তি এমনকি গ্রামের ওষুধের দোকানেও মিসোপ্রোস্টল মুড়িমুড়কির মতো বিক্রি হচ্ছে। নারীরা না জেনেবুঝেই ওষুধগুলো খাচ্ছেন। অসম্পূর্ণ গর্ভপাত বা গর্ভপাতজনিত জটিলতা নিয়ে নিয়মিত পিজি হাসপাতালে আসছেন অনেক রোগী। ব্যক্তিগত চেম্বারেও নিয়মিত রোগী পান তিনি।

এই চিকিৎসকের মতে, গর্ভধারণসহ বিভিন্ন কারণে নারীর মাসিক বন্ধ হতে পারে। মাসিক নিয়মিতকরণের জন্য গর্ভ নষ্ট করলে তা আসলে গর্ভপাতই।

ফার্মগেট এলাকার একটি ওষুধের দোকানদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার দেশকে বলেন, বর্তমানে পাকিস্তান থেকে অবৈধভাবে আসা গাইনোকোসিড ও পোস্টিনর-২ ওষুধ দুটি জরুরি জন্মবিরতিকরণ পিল, যা অরক্ষিত যৌন মিলনের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে খেলে গর্ভধারণ প্রতিরোধে সাহায্য করে। এটি একটি জরুরি সমাধান, যা প্রথম ট্যাবলেট খাওয়ার ১২ ঘণ্টা পর দ্বিতীয়টি খেতে হয় বা দুটি একসঙ্গেও খাওয়া যায়। এ নিয়মের ব্যত্যয় হলে নারীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। নিয়ম না মেনে বাচ্চা নষ্ট করার এ ওষুধগুলো ছোট-বড় ফার্মেসিতে অহরহ বিক্রি হচ্ছে।

আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি বলেন, বর্তমানে উঠতি বয়সি কিশোরীরাই এ ওষুধগুলোর বড় ক্রেতা। এছাড়া বাজারে পাওয়া এমএম কিট, সাইটোমিস কিট ওষুধও চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া বিভিন্ন বয়সি নারী হরহামেশা কিনছেন বলেও জানান তিনি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ডিএমসিএইচ) পরিচালকের দপ্তরের দেওয়া তথ্য বলছে, গত বছরের শেষ ছয় মাসে স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগে প্রায় এক হাজার নারী এসেছিলেন গর্ভপাতজনিত জটিলতা নিয়ে। তবে জটিলতার কারণ মিসোপ্রোস্টল কি না, সে তথ্য নেই।

রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকার ফার্মেসি ঘুরে দেখা গেছে, ওটিসি তালিকার বাইরেও প্রেসক্রিপশন ছাড়া হরহামেশা বিক্রি হচ্ছে ওষুধ। ওটিসি তালিকার বাইরে ওষুধ কিনতে গেলে প্রেসক্রিপশন নেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা মানছেন না ক্রেতা-বিক্রেতা কেউই।

রোগ নিরাময়ে ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ। তাই ওষুধ ক্রয় ও গ্রহণে রয়েছে সুনির্দিষ্ট নীতিমালাও। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর, ওটিসি বা ওভার দ্য কাউন্টার তালিকাভুক্ত ওষুধ বিক্রিতে কোনো প্রেসক্রিপশনের বাধ্যবাধকতা না রাখলেও বাকি ওষুধ বিক্রিতে প্রেসক্রিপশন জরুরি করেছে। আর যারা ওষুধ বিক্রি করবেন, তাদেরও সার্টিফিকেট ও দোকান লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করেছে অধিদপ্তর। কিন্তু কতটা মানা হচ্ছে এসব নিয়ম বা আইন? দেশে রেজিস্টার্ড ফার্মেসির সংখ্যা যা আছে তার চেয়ে অনেক বেশি আছে অনুনোমোদিত ফার্মেসি। এ অবস্থায় পরে চিকিৎসকদের কাছে গেলে রোগের উপসর্গ অনুযায়ী ট্রিটমেন্ট করতে অসুবিধা হয়। তাই স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে মানুষকে বাঁচাতে ফার্মেসিগুলোকে আইনের আওতায় এনে সঠিক ব্যবস্থাপনায় ফিরিয়ে আনার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডিএমসিএইচের আইরিন বিনতে সাত্তার বলেন, আমার কাছে শতকরা ছয় থেকে আটজন আসেন ওষুধ খেয়ে বিপদে পড়ে। এদের একটি বড় অংশই কিশোরী। এই চিকিৎসক বলেছেন, সঠিক মাত্রায় নিয়ম মেনে ওষুধ না খেলে ভ্রূণের কিছু অংশ জরায়ুতে থেকে যায়। ফলে হঠাৎ অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে অনিয়মিতভাবে দুই-আড়াই মাস ধরে চলতে পারে। কয়েকবার এমন হলে গর্ভধারণের ক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে। অনেক সময় ভ্রূণ জরায়ুতে না থেকে গর্ভনালিতে থাকে। মা যদি প্রস্রাব পরীক্ষা করিয়ে গর্ভপাতের জন্য দোকান থেকে কিনে ওষুধ খান, তাতে কাজ হবে না। ভ্রূণ বড় হতে থাকবে। গর্ভনালি ফেটে মৃত্যুও হতে পারে।

আইরিন বিনতে সাত্তার বলেন, অল্প বয়সি অনেক ভুক্তভোগী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারই করেন না। তারা গর্ভধারণের পর এমআর অথবা গর্ভপাত করান। এমএম কিট বা মিসোপ্রোস্টল সেবনকেই তারা জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি হিসেবে নেন। চিকিৎসক আইরিনের সুপারিশ, পরিবার পরিকল্পনা সেবাকে সহজলভ্য করতে হবে। অন্যদিকে সরকারি কর্মসূচিতে এমএম কিট কেনা বাড়াতে হবে। দেশে এখন বছরে প্রায় ১০ লাখ এমএম কিটের চাহিদা আছে। চাহিদার অনুপাতে এখন তা খুবই কম।

১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি (ধারা ৯১) অনুযায়ী, কেবল মায়ের জীবন বাঁচানোর প্রয়োজন ছাড়া বাংলাদেশে গর্ভপাত অবৈধ। অন্যদিকে দেশে মাসিক নিয়মিতকরণ বৈধ। এমআর জরায়ু পরিষ্কার করে। এভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত ভ্রূণও বেরিয়ে যেতে পারে। জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে ১৯৭৯ সাল থেকে এমআর অন্তর্ভুক্ত আছে।

সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সর্বশেষ তালিকা বলছে, দেশে ২১টি কোম্পানি মিসোপ্রোস্টল বানায়। বাজারে চলে এমন ব্র্যান্ডগুলো হলোÑমিসোটল, সাইটোমিস, আইসোভেন্ট, মিসোপা এবং জি-মিসোপ্রোস্টল। প্রসব এবং মাসিক নিয়মিতকরণের জন্য (এমআর) ওষুধটির ব্যবহার বৈধ। তবে তা উপযুক্ত স্বাস্থ্যকর্মী বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে। প্রজনন বয়সি কোনো নারীর মাসিক বন্ধ হওয়ার ছয় সপ্তাহ পর থেকে ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত তিনি আইনত এমআর করাতে পারেন। আগে যন্ত্র দিয়ে জরায়ু পরিষ্কার করে এমআর করা হতো। ২০১৩ সাল থেকে ওষুধও ব্যবহার হচ্ছে।

দেশে গর্ভপাত অবৈধ হওয়ায় সরকার গর্ভপাতের কোনো পদ্ধতি বা নির্দেশনা দেয় না। এমআরের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি সম্পর্কে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর পরিপত্র জারি করেছে। পরিপত্র অনুযায়ী, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক এমআর করাবেন। তবে ১০ সপ্তাহের মধ্যে হলে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীও এমআর করাতে পারবেন।

ওষুধ দিয়ে এমআর করাতে হলে সেটা করাতে হবে ৯ সপ্তাহের মধ্যে। ওষুধ বলতে পর্যায়ক্রমে মিফেপ্রিস্টন ও মিসোপ্রোস্টলÑএ দুই ধরনের ওষুধ কীভাবে ও কোন মাত্রায় সেবন করতে হবে, পরিপত্রে তা বর্ণনা করা আছে। এমএম কিট নামে দুই ওষুধের একটি প্যাকেট আছে। সরকার এটা বেসরকারি ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে কেনে।

নারী সংগঠন নারীপক্ষ ২০২০ সালে গর্ভপাত নিয়ে একটি গবেষণা করে। সেখানে উদ্ধৃত ২০১৪ সালের একটি হিসাবে দেখা যায়, সে বছর আড়াই লাখের বেশি নারীর গর্ভপাতজনিত চিকিৎসা লেগেছে। এদের প্রায় অর্ধেকের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েছিল আর এর কারণ ছিল মিসোপ্রোস্টলের ভুল ব্যবহার।

মিসোপ্রোস্টল এক সময় অম্বল বা অ্যাসিডিটির চিকিৎসায় ব্যবহার করা হতো। ২০১৩ সালে সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর প্রসবসংক্রান্ত ব্যবহারের উপযুক্ত মাত্রায় মিসোপ্রোস্টল বড়ি উৎপাদনের অনুমোদন দেয়। মাসিক নিয়মিতকরণ তথা এমআর বা মিনস্ট্রুয়াল রেগুলেশনের (প্রারম্ভিক গর্ভপাতসহ) জন্যও ওষুধটির ব্যবহার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগে গর্ভপাতের উপযোগী মিসোপ্রোস্টল অবৈধভাবে ভারত ও পাকিস্তান থেকে আসত। দেশে উৎপাদনের পর এর ব্যবহার ব্যাপক হয়।

ওষুধ দোকানিদের সংগঠন বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মিসোপ্রোস্টল বিক্রির কড়াকড়ির কোনো বিধিনিষেধ তারা পাননি। ওষুধ বিক্রিতে অনিয়মের নজরদারি করা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কাজ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন