তালেবান আর নারী—যেন একে অপরের শত্রু। ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট ছিল আফগানিস্তানে অন্ধকার যুগের শুরু। দখলদারিত্ব ছেড়ে সেদিন মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনী চলে যায়। রাজধানী কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয় তালেবান। ফলে নারীর স্বাধীনতার সূর্যও ডুবতে থাকে। ঘরের বাইরে তাদের সব ধরনের কাজ নিষিদ্ধ করা হয়।
একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও সবশেষ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়। এরপরও সবকিছু মোটামুটি ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু গত বছর থেকে নারীর স্বাস্থ্যসেবাও সংকুচিত হতে থাকে। ভয়ের কারণে অনেক নারী ঘর থেকেই বের হতে পারেন না। নিতান্ত সাহস নিয়ে যারা বের হন, তাদের অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়। অনেক সময় মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিয়ে তাদের ক্লিনিকে যেতে হয়। সেখান থেকে হতাশ হয়েই তাদের ফিরতে হচ্ছে। কেবল নারী হওয়ার কারণে তাদের চিকিৎসা মিলছে না। কিছু প্রদেশে পুরুষ চিকিৎসকের কাছে নারী রোগীর চিকিৎসা নিষিদ্ধ। কিন্তু নারী স্বাস্থ্যকর্মী? সেই সংখ্যা কমছে।
আরেকটি কথা জানিয়ে রাখি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তালেবান কর্তৃপক্ষ নারীদের মেডিসিন ও ধাত্রীবিদ্যা পড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফলে নারীদের চিকিৎসক হওয়ার সুযোগটিও বন্ধ হয়ে গেছে। চিকিৎসা সংকটের ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে নারীদের ওপর। অধিকাংশ নারী নিজের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এ দায়িত্ব চলে গেছে পুরুষ অভিভাবকের হাতে। তারা আগের তুলনায় কম সুস্থ; কম আয়ু নিয়ে বেঁচে আছেন। বাল্যবিয়ে বেড়েছে। ফলে মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকিও বেড়ে চলেছে। ঘরে বন্দি থাকায় তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। শারীরিক ব্যায়াম, সামাজিক যোগাযোগ ও মানসিক সহায়তার অভাবে তাদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা ও নিরাশা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। মারাত্মক আর্থিক সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছেন তারা। ফলে তারা নিজের স্বাস্থ্যের চেয়ে সন্তান ও পরিবারের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
তালেবান শাসন শুরুর আগেও সংকটে ছিলেন আফগান নারীরা। দারিদ্র্য, কড়া লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক রীতি ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে প্রায় ৩০ শতাংশ মেয়ে কখনোই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না। অর্থনৈতিক সংকটে অনেক পরিবার ছেলেমেয়ে উভয়কেই স্কুল থেকে নিয়ে আয়-রোজগারে নামায়। মেয়েশিশুকে বিয়ে দিতে পারলেই যেন অভিভাবকদের মুক্তিÑএই ধারণা প্রকট। দিন দিন এই ধারণা আরো বাড়ছে। তবে কিছু অনানুষ্ঠানিক বা অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু আছে; কিন্তু সেটা নিতান্তই হাতেগোনা। খুব অল্পসংখ্যক মেয়ের কাছে পৌঁছায় এ সুযোগ। কিন্তু এই অনলাইন শিক্ষার কোনো সনদ নেই। ফলে এটা পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার বিকল্প নয়। এ অনলাইন শিক্ষা উচ্চশিক্ষা বা চাকরির সুযোগও তৈরি করে না। আফগান নারীদের নিয়ে জরিপ কী বলছে? ৭৮ শতাংশ তরুণ নারী শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণÑকোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নন। এই সংখ্যা তরুণ পুরুষদের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি। এ বছর কিশোরী মাতৃত্ব ৪৫ শতাংশ এবং মাতৃমৃত্যুর হার ৫০ শতাংশের বেশি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা বন্ধ রাখায় প্রতিবছর জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারাচ্ছে আফগানিস্তান। এটি কেবল স্কুল বন্ধ থাকা নয়Ñএটি হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ, জীবিকা ও দারিদ্র্যের চক্রে আটকে পড়া সমাজের গল্প।
আফগানিস্তানে শ্রমবাজারভিত্তিক লিঙ্গবৈষম্য প্রকট। ২৫ শতাংশ নারী কাজ করছেন বা কাজ খুঁজছেন। এই দৌড়ে পুরুষের সংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশ। সরকারি চাকরি, দেশি-বিদেশি এনজিও এবং বিউটি সেলুনের মতো খাতে নারীদের কাজ নিষিদ্ধ করেছে তালেবান। অথচ এগুলো একসময় নারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থানের খাত ছিল। বর্তমানে যেসব নারী কাজ করছেন, তাদের বেশিরভাগই অনানুষ্ঠানিক খাতে কম আয়ের ও অনিশ্চিত কাজে বাধ্য হচ্ছেন। নারী এনজিওকর্মীদের নিষিদ্ধ করেছে তালেবান। তাদের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্প নথিতে ‘নারী’ শব্দের বদলে ‘পুরুষ’ শব্দ ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয়েছে। ফলে বহু নারী সংগঠন বন্ধ হয়ে গেছে। আবার অনেক সংগঠনের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে।
বর্তমানে আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে নারীদের স্থান নেই। ২০২০ সালে সংসদের ২৫ শতাংশের বেশি আসনে নারী ছিলেন। তারা প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারতেন। কিন্তু তালেবান মন্ত্রিসভায় একজন নারীও নেই। তবে কিছু নারী অনানুষ্ঠানিকভাবে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নিজেদের কমিউনিটি ও সংগঠনের পক্ষে কথা বলছেন। এটি সমান প্রতিনিধিত্বের বিকল্প নয়।
রাষ্ট্রের কোথাও নারী নেতৃত্বের দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই। টেলিভিশন বা সরকারি অনুষ্ঠানে নারী নেই। ফলে মেয়েদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা যাচ্ছে—‘নেতৃত্ব তোমাদের জন্য নয়।’
জাতিসংঘ নারী সংস্থার তথ্য বলছে, নিজেদের পরিবারে সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখার সক্ষমতা আছে বলে মনে করেনÑএমন নারী ৬০ শতাংশ কমে গেছে। লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার তথ্য ভয়াবহ। ২০১৮ সালে প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে একজন এক বছরে স্বামী বা সঙ্গীর কাছ থেকে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন। ২০২১ সালের পর থেকে পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে। অনেক এলাকায় নারীদের ঘরের বাইরে যেতে হলে পুরুষ অভিভাবক সঙ্গে থাকতে হয়। এই নিয়ম অল্প দূরত্বের জন্যও প্রযোজ্য। ফলে বিধবা বা পুরুষ আত্মীয়হীন নারীদের খাদ্য বা চিকিৎসার জন্য বের হওয়াটাই বিপজ্জনক। তা-ই বলে কি নারীরা থেমে যাবেন? মোটেই না। নারীরা থেমে নেই। তারা পথ খুঁজে নিচ্ছেন। তারা এখনো ব্যবসা করছেন। মানবিক সহায়তা কার্যক্রম, এমনকি সাংবাদিকতাও করছেন। কিন্তু মেয়েরা যদি ডাক্তার না হতে পারেন, কিংবা পুরুষ ডাক্তারদের কাছে চিকিৎসা না পান, তাহলে কী হবে? তারা কি বিনা চিকিৎসায় মারা যাবেনÑএই প্রশ্ন বারবার সামনে চলে আসছে?
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

