প্রযুক্তি জগতে নারীর সফলতা

আমানুর রহমান

প্রযুক্তি জগতে নারীর সফলতা

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও ডিজিটাল রূপান্তরের অন্যতম অংশীদার আজ নারীরা। গতানুগতিক পেশার সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে প্রযুক্তির বিশাল দুনিয়ায় তারা আজ নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। ফ্রিল্যান্সিং ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নারীদের এই সরব উপস্থিতি এখন কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, বরং তা আত্মপরিচয় নির্মাণ ও স্বাবলম্বী হওয়ার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তবে সফলতার এই পথ তাদের জন্য কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। মার্কেটপ্লেসের তীব্র প্রতিযোগিতা, নিত্যনতুন প্রযুক্তি আয়ত্ত করার চ্যালেঞ্জ এবং পারিবারিক ও পেশাগত জীবনের ভারসাম্য রক্ষার মতো কঠিন সংগ্রাম প্রতিনিয়ত তাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে। সব বাধা পেরিয়ে মেধা, ধৈর্য ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে ডিজিটাল দুনিয়ায় নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়া এমনই কয়েকজন নারী ফ্রিল্যান্সারের গল্প তুলে ধরেছেন আমানুর রহমান

সানজিদা আক্তার
সানজিদা আক্তার

বিজ্ঞাপন

উদ্যমী সানজিদা

২০২৪ সালে ফ্রিল্যান্সিং জগতে পা রাখা সানজিদা আক্তার বর্তমানে ‘ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড’-এ ডিজিটাল মার্কেটিং প্রশিক্ষক হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছেন। ক্যারিয়ারের শুরুতে মার্কেটপ্লেসে কাজ পাওয়া এবং ক্লায়েন্টের আস্থা অর্জন করা তার জন্য বেশ কঠিন ছিল। এর পাশাপাশি এসইও ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের নিত্যনতুন ট্রেন্ডের সঙ্গে নিজেকে হালনাগাদ রাখা এবং কাজের মান বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ তো ছিলই। তবে হতাশ না হয়ে প্রতিটি ব্যর্থতাকেই তিনি নতুন কিছু শেখার সুযোগ হিসেবে নিয়েছেন।

অদম্য ধৈর্য আর নিরলস পরিশ্রমে ফাইভার, ফ্রিল্যান্সার ডটকম ও সরাসরি ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কাজ করে তিনি এসইও, লোকাল এসইও, ব্যাকলিংক বিল্ডিং এবং ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। এক মাসে সর্বোচ্চ ৫০০ মার্কিন ডলার আয়ের রেকর্ড গড়া সানজিদা বর্তমানে গড়ে ৩০-৩৫ হাজার টাকা আয় করছেন। তবে তার কাছে আয়ের অঙ্কের চেয়ে নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে একটি স্থায়ী ক্যারিয়ার গড়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রশিক্ষক হিসেবে তিনি নতুনদেরও পথ দেখাচ্ছেন। নবীন নারী ফ্রিল্যান্সারদের উদ্দেশে সানজিদার অনুপ্রেরণামূলক বার্তা—শুরুতেই বড় আয়ের চিন্তা না করে নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে ভালো দক্ষতা অর্জন করা উচিত। পরিবারের দায়িত্ব সামলেও নারীরা যদি ধৈর্য, সততা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়নে সময় দেন, তবে ছোট কাজ দিয়ে শুরু করেও ঘরে বসে সম্মানজনক ক্যারিয়ার ও স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলা সম্ভব।

শ্যামলী আক্তার
শ্যামলী আক্তার

অদম্য শ্যামলী

২০০৭ সালে এসএসসি পাসের পর কেবল জীবিকার তাগিদে ঢাকায় এসে পোশাকশিল্পে কাজ শুরু করেছিলেন শ্যামলী আক্তার। তবে স্বপ্ন আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি তাকে সেখানে আটকে রাখেনি। কাজের ফাঁকেই তিনি সন্ধান পান একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণকেন্দ্রের। সেখানে ভর্তি হয়ে মাত্র দেড় মাস ক্লাস করার পর নিজের অসামান্য যোগ্যতায় ওই প্রতিষ্ঠানেই প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান তিনি। এই একটি ঘটনাই তার জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেয়।

একদিকে নিজে শেখা, অন্যদিকে অন্যকে শেখানোর এক নিরলস প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করতে থাকেন তিনি। বেসিক কম্পিউটার থেকে শুরু করে ক্রমান্বয়ে গ্রাফিক ডিজাইন, ইউআই-ইউএক্স ডিজাইন, মোশন গ্রাফিকস, টু-ডি ও থ্রি-ডি অ্যানিমেশন, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তি খাতে অনন্য দক্ষতা অর্জন করেন শ্যামলী। এই নিরবচ্ছিন্ন মেধা ও পরিশ্রমের ফলে আইডিবি, কোডার্সট্রাস্ট বাংলাদেশ এবং ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের মতো দেশের স্বনামধন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার পেশাগত সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। পাশাপাশি তিনি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) থেকে সম্মানজনক দক্ষতার সনদও অর্জন করেন। জীবনের সেই কঠিন সংগ্রামের পথ পেরিয়ে আজ তিনি ‘দ্য এভারেস্ট’-এ আইটি কনসালট্যান্ট হিসেবে কর্মরত। বর্তমানে তার মাসিক আয় এক লাখ টাকার বেশি এবং আইটি খাত থেকে মোট আয় এরই মধ্যে ৫৭ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। একসময়কার সাধারণ পোশাককর্মী থেকে সফল আইটি বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠা এই নারী আজ দেশের অসংখ্য মানুষের কাছে উজ্জ্বল অনুপ্রেরণার নাম। সাধারণ মানুষের এই স্বীকৃতি, ভালোবাসা ও সম্মানই তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

হাফসা আক্তার
হাফসা আক্তার

স্বাবলম্বী হাফসা

কেবল ‘গৃহিণী’ পরিচয়ে আবদ্ধ না থেকে নিজের একটি স্বতন্ত্র পেশাগত আত্মপরিচয় গড়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকেই হাফসা আক্তারের ফ্রিল্যান্সিং জগতে পথচলা শুরু। ২০১৬ সালের দিকে অনলাইনে পোশাকের ব্যবসা দিয়ে শুরু করলেও অংশীদারের প্রতারণার শিকার হয়ে তিনি বুঝতে পারেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারিগরি দিকগুলো নিজেরই আয়ত্ত করা প্রয়োজন। সেই জেদ থেকেই সরকারি একটি প্রশিক্ষণ প্রকল্পের মাধ্যমে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের দুনিয়ায় প্রবেশ করেন তিনি।

শুরুতে ফাইভারের মতো মার্কেটপ্লেসে রাতের পর রাত জেগে কাজের জন্য অপেক্ষা করা, কিংবা শারীরিক অসুস্থতার মতো নানা ধরনের প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজ তিনি নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। প্রথম আয়ের ১১০ ডলারের সেই তৃপ্তি আজ রূপান্তরিত হয়েছে মাসে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা উপার্জনের সাফল্যে। বর্তমানে তিনি মার্কেটপ্লেসের গণ্ডি পেরিয়ে দেশি ক্লায়েন্ট থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির ক্লায়েন্টদের ফেসবুক বিজনেস পেজ বিল্ডিং, এসইও এবং অ্যাড ক্যাম্পেইন পরিচালনার মতো বহুমুখী কাজ করছেন। পোশাকের ব্র্যান্ড থেকে শুরু করে চিকিৎসাসেবা, ল’ ফার্ম কিংবা মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক নানা পেজ—সবখানেই তার সফল পদচারণা। পরিবার ও সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার পাশাপাশি ঘরে বসেই ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে তিনি যে স্বাধীনতা উপভোগ করছেন, তা অন্য নারীদের জন্যও অনন্য অনুপ্রেরণা। তার মতে, শুধু ঘরে বসে আয়ের স্বপ্ন না দেখে আগে যথাযথ দক্ষতা অর্জন করতে হবে। ভয় জয় করে ছোট পরিসরে হলেও কাজ শুরু করলে, তা একসময় কাঙ্ক্ষিত পেশাগত পরিচয় এনে দেবেই।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...