মেধাবী এক ছাত্রী জারিন মাহজাবিন খেয়া। তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছেন। এবারের এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ।
মেয়েটি খুব চুপচাপ, শান্ত স্বভাবের। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জয় করেছেন গোল্ডেন জিপিএ। ১৩০০ নম্বরের মধ্যে পেয়েছেন ১২০৭। প্রতিদিনই লেখাপড়া করেছেন। পড়ার সময়ই ঠিক করতেন—‘এতক্ষণ লেখাপড়া করব, এই বিষয়ের পেছনে এতক্ষণ সময় দেব।’ মোটামুটি সারাক্ষণ পড়ার টেবিলেই থাকতেন। তাদের সবুজ বিদ্যাপীঠ স্কুল অ্যান্ড কলেজে মেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ফল করেছেন। সম্মিলিত মেধাতালিকায় তৃতীয় হয়েছেন।
তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকে প্রতি ক্লাসেই প্রথম হয়ে আসছেন তিনি। জারিন মাহজাবিন খেয়া জানালেন, প্রথম হওয়ার জন্য চেষ্টা থাকতে হয়। একবার পেছনে চলে গেলে মানুষ অনেক রকম কথা বলে। সেগুলো শুনতে মোটেও ভালো লাগে না। বিদ্যালয়ের ওপর কোনো ধরনের বাজে ধারণা নেই তার। তিনি বলেন, আমার কখনো মনে হয়নি—আরো ভালো স্কুলে পড়তে হবে।
খেয়ার লেখাপড়ায় সবচেয়ে সাহায্য করেছেন মা। খেয়া বলেন, ছোটবেলায় আম্মু সবচেয়ে বেশি সাহায্য করতেন পড়ালেখায়। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত নোট করে দিয়েছেন। মা জাহানারা খাতুন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত মোটামুটিভাবে নিজে পড়িয়েছেন। ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় করোনাভাইরাস আক্রমণ করেছে। তখন তার পড়ালেখার গতি ছিল না। পড়ালেখার চাপ ছিল না। করোনার প্রভাব অষ্টম শ্রেণিতেও ছিল। হাতের লেখার গতি ছিল না। গতি কমে গিয়েছিল। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় গতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন।
লেখাপড়ার চাপ ছিল বেশি দশম শ্রেণিতে। বিদ্যালয়ে ক্লাস হতো, কোচিং হতো। তিনি আলাদা করে প্রাইভেট পড়তে যেতেন স্যারদের কাছে। গণিতের জন্য তার বাবা মশিয়ার রহমানের কাছে পড়তে যেতেন। তিনি গণিতের খুব ভালো শিক্ষক। খেয়া জানালেন, গণিতে কোনো সমস্যা হলে বাবাকে জিজ্ঞাসা করতেন। তাকে গাইড করার ক্ষেত্রে বাবার অবদান বেশি। কোনটা পড়লে ভালো হবে, কীভাবে পড়লে ভালো হয়—এসব পরামর্শ বাবাই দিয়েছেন।
বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাকে ক্লাসে ও ক্লাসের বাইরে যথার্থ অনুপ্রেরণা জোগাতেন এবং তিনি অনেক ভালো করবেন বলে আশা করতেন। তার কাছে সবারই অনেক প্রত্যাশা ছিল। এই প্রসঙ্গে খেয়ার বাবা বলেছেন, তার শিক্ষকরা তাকে সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন; বলতেন, এই নামের মেয়েরা অনেক ভালো করে।
তাকে তারা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে তৈরি করেছেন। তিনি সাধারণত তার বিদ্যালয়ে যেতেন না। তার মা-ই দেখাশোনা করতেন। যেকোনো ছাত্রীর জন্য প্রেরণা খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। নিজে সবসময় অনুভব করতেন—‘আমাকে প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে, সেই জায়গায় যেতে হবে।’
এসএসসি পরীক্ষার আগে খেয়ার ধারণা ছিল তিনি হয়তো ১২০০ নম্বর পাবেন। তাদের সিট পড়েছিল শেখদি মোল্লা স্কুল অ্যান্ড কলেজে। এই পরীক্ষার আগে, এমনকি অন্যান্য শ্রেণিতেও প্রতিদিন নিয়ম করে নিজের পড়া পড়েছেন খেয়া। নবম-দশম শ্রেণিতে কোচিং ও প্রাইভেট পড়ে সন্ধ্যা ৭টা কি ৮টা বাজলেও পড়তে বসেছেন তিনি। ইংরেজি বিষয়টি বাইরে পড়তে হয়েছে তাকে। তবে টেস্ট পরীক্ষার পর আর পড়েননি কারো কাছে। নিজে লেখাপড়া করেছেন। এর আগে বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষকদের কাছে আলাদাভাবে পড়েছেন। নবম শ্রেণিতে পদার্থ ও রসায়ন বিজ্ঞান নূর আলম স্যারের কাছে পড়েছেন।
বাবা-মা খেয়ার জীবনে বিরাট প্রেরণা। কোনো কারণে কোনো শ্রেণিতে নম্বর কম পেলে বা পরীক্ষায় একটু খারাপ করলে মা-বাবা উৎসাহ দিয়েছেন—‘তুমি আরো ভালো করবে, তোমার আরো ভালো করার সম্ভাবনা আছে।’ ফলে পড়ালেখার পেছনে আরো শ্রম দিয়েছেন তিনি, নব উদ্যোমে পড়ালেখা চালিয়ে গিয়েছেন।
খেয়ার বাবা জানালেন, ‘প্রতিটি সন্তানকে নিয়ে মা-বাবার স্বপ্ন তো থাকেই। আবার আমি তো চাপিয়ে দিয়ে পারব না। আমরা আমাদের সন্তানদের ওপর কোনোকিছু চাপিয়ে দিতে চাই না। আমরা কেবল জানাতে পারি বা গাইড লাইন দিতে পারি—এভাবে জীবন গড়তে হয়। কোনটা ভালো, কীভাবে ভালো করা যাবে, সেটি বলতে পারি; ভুল করলে ধরিয়ে দিতে পারি। কিন্তু তার জীবন তো তাকেই গড়ে তুলতে হবে।’
ছোটবেলা থেকেই খেয়া পরীক্ষার আগের দিনগুলোয় পড়ালেখার মধ্যে বেশি থাকতেন। এসএসসি পরীক্ষায়ও তার কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। অনেকে আছেন সারারাত পড়ালেখা করেন। খেয়া চেষ্টা করতেন তাড়াতাড়ি পড়া শেষ করতে। তারপরও স্বীকার করলেন, প্রিটেস্ট ও টেস্টের দিনগুলোয় বা এরপর রাতে ঘুমাতে একটু দেরি হতো। রাত ১টা বা ২টা পর্যন্ত পড়তে হয়েছে।
খেয়ার বাবা একজন শিক্ষক। তিনি জানালেন, ‘শিক্ষকরা অন্যের ছেলেমেয়ে কীভাবে ভালো করবে, সেই চেষ্টা করেন; কিন্তু নিজের ছেলেমেয়ের পুরো দায়িত্ব নিতে পারেন না। তাদের এই দায়িত্ব সৃষ্টিকর্তাই নেন। আমার মেয়ে আমার কাছে গণিত পড়ত। ব্যাচে বান্ধবীদের সঙ্গে পড়েছে।’
তিনি বাসায় গণিত বাবার কাছে পড়েছেন অবসর সময়ে। এবারের এসএসসিতে গণিতে তিনি ৯১ নম্বর পেয়েছেন। আরো ভালো করার আশা ছিল তার; বললেন, ‘এসএসসি পরীক্ষার একটি চাপ থাকে। জানা বিষয়ও উল্টোপাল্টা হয়ে যায়। ফলে আরো বেশি নম্বর তোলা সম্ভব হয়নি। আমার কিছু জানা বিষয় ভুল হয়ে গেছে। প্রশ্ন সহজ ছিল, পরীক্ষাও ভালো হয়েছে। আরো ১৫-২০ নম্বর বেশি পেতে পারতাম। নার্ভাসনেসের কারণে সেটি হয়নি।’
পরীক্ষার সময় খেয়ার কোনো অসুখ-বিসুখ হয়নি। একবারই ক্লাস ফোরের সেকেন্ড টার্ম পরীক্ষার সময় জ্বর হয়েছে। সেবার ফলাফলে পঞ্চম হয়েছেন। কিন্তু বার্ষিক পরীক্ষার সময় পড়ালেখা-অন্তঃপ্রাণ মেয়েটি আবার সম্মিলিত মেধা তালিকায় প্রথম হয়েছেন। তিনি তাদের বিদ্যালয়ে তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সম্মিলিত মেধা তালিকায় প্রথম। বিদ্যালয় থেকে ফিরে গোছল করে ভাত খেয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত পড়েছেন। আবার বিশ্রাম নিয়ে রাত ১২টা পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন।
তিনি ভর্তি হবেন হয়তো বাবার যাত্রাবাড়ীর মেট্রোপলিটন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। হলিক্রসেও ভর্তি পরীক্ষা দেবেন। আরো ভালো কলেজে পড়ার বিষয়ে বললেন, ভালো কলেজ দূরে হয়ে যাবে। কলেজে আসতে-যেতে ক্লান্ত হয়ে যাবেন। নিজের পড়ার পেছনে সময় দিতে পারবেন না। বাবার কলেজ বাসার কাছে, আর প্রতিষ্ঠানটিও তার বলে সেখানে যত্ন নিয়ে তাকে দেখা হবে। খেয়া জানালেন, একজন ছাত্র বা ছাত্রী যত পড়ালেখা করবে, সে তত ভালো করবে। পড়ালেখা নিজের কাছে। তিনি ভবিষ্যতে ইঞ্জিনিয়ারিং কোনো বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে আগ্রহী।
অবসরে খেয়া গল্পের বই পড়েন। এখন পর্যন্ত হুমায়ূন আহমেদের বই বেশি পড়েছেন। তার আরেকজন প্রিয় লেখক সমরেশ মজুমদার। গানও শিখেছেন তিনি বাবার মেট্রোপলিটনের গানের শিক্ষক মোকসুমুল হক নিশাদের কাছে। তবে করোনার পর থেকে গান শেখা বন্ধ হয়ে গেছে, তার পরও বাসায় গান নিয়ে বসতেন। নবম শ্রেণিতে ওঠার পর থেকে পড়ালেখার চাপে গান আর চর্চা করা সম্ভব হয়নি। ইউটিউব দেখে দেখে ছবি আঁকা শিখেছেন। খুব ভালো ছবি আঁকেন খেয়া।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

