সাম্য ও জনকল্যাণের কালজয়ী মডেল

খলিফা ওমর (রা.)-এর অর্থব্যবস্থা ও সংস্কার

কাজী যুবাইদা তোহফা

খলিফা ওমর (রা.)-এর অর্থব্যবস্থা ও সংস্কার
মুসলিমদের বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ের স্মৃতিবাহী ঐতিহাসিক ‘ওমর ইবনুল খাত্তাব ময়দান’

পর্ব-১

মানবসভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যেকোনো বড় সাম্রাজ্যের উত্থানের পেছনে থাকে সামরিক পরাক্রম। আর তার দীর্ঘস্থায়িত্বের আসল রহস্য লুকিয়ে থাকে একটি সুসংহত অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর। সাত শতকে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনকাল ছিল বৈশ্বিক ইতিহাসে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অনন্য জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকাল। কোরআন ও সুন্নাহর মৌলিক দর্শন ও নীতির ওপর ভিত্তি করে তিনি যে অর্থনৈতিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছিলেন, তা সমকালীন রোমান বা পারস্য সাম্রাজ্য তো বটেই, আধুনিক অর্থনৈতিক চিন্তায়ও তার ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতিমালা গভীর গবেষণার বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। এই অর্থব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল সম্পদকে শুধু ধনীদের মধ্যে আবর্তিত হতে না দিয়ে সমাজের প্রান্তিক স্তরে পৌঁছে দেওয়া এবং রাষ্ট্রে কঠোর প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

বিজ্ঞাপন

খলিফা উমর (রা.)-এর প্রবর্তিত এই বৈপ্লবিক অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল গভীরতা অনুধাবন করতে হলে তার পূর্ববর্তী শাসনকালের বাস্তব পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাষ্ট্র পরিচালনার পেছনে কোনো স্থায়ী বা প্রাতিষ্ঠানিক আমলাতন্ত্র গড়ে ওঠেনি। তখন পর্যন্ত রাষ্ট্রে সুনির্দিষ্ট কোনো কর কাঠামো, জাতীয় বাজেট কিংবা স্থায়ী অর্থনৈতিক নীতিমালার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কারণ, খেলাফতের ভৌগোলিক পরিধি তখন প্রধানত আরবের মরুভূমির মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং রাজস্বের আকারও ছিল তুলনামূলক ছোট। কিন্তু উমর (রা.) যখন খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন, তখন পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের বিজয়ের মাধ্যমে খেলাফত রাষ্ট্রের সীমানা বিশাল রূপ ধারণ করে। কোটি কোটি দিরহামের রাজস্ব এবং লাখ লাখ নতুন অনারব নাগরিকের অন্তর্ভুক্তির ফলে আগের সেই অনানুষ্ঠানিক ও সাময়িক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। দূরদর্শী খলিফা উমর (রা.) অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, একটি বিশাল আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রকে শুধু সামরিক পরাক্রমের জোরে টিকিয়ে রাখা যাবে না, যদি না তার পেছনে একটি সুশৃঙ্খল, স্থায়ী এবং সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামো থাকে। ঠিক এই প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই তিনি প্রথাগত আরবীয় সাময়িক রাজস্ব বণ্টন পদ্ধতি থেকে বের হয়ে এসে রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ আধুনিক ও নিয়মতান্ত্রিক রূপ দেওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

বাইতুল মালের প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিকায়ন

ইসলামের শুরুর যুগে রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা ‘বাইতুল মালে’র কোনো স্থায়ী অবয়ব ছিল না; রাজস্ব এলে তাৎক্ষণিকভাবে বণ্টন করে দেওয়া হতো। বাহরাইন থেকে আসা ৮ লাখ দিরহামের বিশাল রাজস্বও মহানবী (সা.) এক বৈঠকে সর্বসাধারণের মধ্যে বিতরণ করেছিলেন। কিন্তু খেলাফত রাষ্ট্রের পরিধি বৃহৎ পরিসরে বৃদ্ধি পাওয়ায় খলিফা উমর স্থায়ী ও সুসংহত কেন্দ্রীয় বাইতুল মাল ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। মদিনায় কেন্দ্রীয় সুবৃহৎ কোষাগার ভবন নির্মাণের পাশাপাশি প্রতিটি বিজিত প্রদেশে এর শাখা বিস্তৃত করা হয় এবং সুরক্ষায় সার্বক্ষণিক পাহারাদার নিযুক্ত করা হয়। কর আদায়ের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক করতে তিনি ‘সাহেবুল খারাজ’ বা কর সংগ্রাহক এবং কোষাগার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ‘সাহিবে বাইতুল মাল’ বা কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের মতো সম্পূর্ণ নতুন প্রশাসনিক পদের সৃষ্টি করেন। বাহরাইন থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আসার পর উমর (রা.) সাহাবিদের নিয়ে পরামর্শ সভায় বসেন এবং ওয়ালিদ ইবনুল মুগিরার প্রস্তাব অনুযায়ী পারস্য ও রোমানদের আদলে হিসাব সংরক্ষণের স্থায়ী দপ্তর চালু করেন। এই নতুন কেন্দ্রীয় কোষাগারের প্রধান কোষাধ্যক্ষ বা ‘সাহেবে বাইতুল মাল’ হিসেবে তিনি প্রখ্যাত আমানতদার সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আরকাম (রা.)-কে নিযুক্ত করেন।

দেওয়ান ব্যবস্থা ও নিয়মতান্ত্রিক আদমশুমারি

প্রশাসনিক দূরদর্শিতার আলোকেই খলিফা উমর (রা.) আরবে প্রথম সুশৃঙ্খল আমলাতান্ত্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনা হিসেবে ‘দেওয়ান’ বা রাষ্ট্রীয় রেজিস্ট্রি বিভাগ গঠন করেন। এই ব্যবস্থার নিখুঁত বাস্তবায়নে তিনি খেলাফত রাষ্ট্রে প্রথম নিয়মতান্ত্রিক আদমশুমারির ব্যবস্থা করেন। নাগরিকদের সংখ্যা ও প্রকৃত আর্থিক অবস্থা তালিকাভুক্ত করার পর তিনি বীরত্ব ও ইসলামের ত্যাগের তারতম্য অনুযায়ী ভাতার বৈজ্ঞানিক স্তরবিন্যাস করেন। তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যেকের জন্য বার্ষিক ৫ হাজার দিরহাম, ওহুদ যুদ্ধের শহীদদের পরিবার ও হাবশায় হিজরতকারীদের জন্য ৪ হাজার দিরহাম এবং তরুণদের জন্য ২ হাজার দিরহাম করে নিয়মিত বৃত্তির ব্যবস্থা করেন। এই ব্যবস্থার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের আর্থিক অধিকার নিশ্চিত করা। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনে সাদের ‘আত-তবাকাতুল কুবরা’ গ্রন্থের ৩৬০৫ নম্বর বর্ণনা অনুযায়ী, খলিফা উমর ঘোষণা করেছিলেন, ‘(আমি প্রদান করি কিংবা না-ই বা করি) পৃথিবীর সব স্বাধীন মুসলিমের রাষ্ট্রীয় সম্পদে অধিকার রয়েছে। আর আমি যদি বেঁচে থাকি, তবে অবশ্যই ইয়েমেনের মেষপালকের কাছেও তার প্রাপ্য অধিকার পৌঁছে যাবে তার মুখ লাল হওয়ার আগেই (নিজের হকের জন্য কষ্ট করে দাবি করার আগেই)।’ এই দেওয়ানব্যবস্থা ও ভাতা নির্ধারণের শুরুর সময়ে খলিফা উমর (রা.) আরবের বংশ তালিকা ও বীরত্ব অনুযায়ী নির্ভুল তালিকা প্রস্তুত করার জন্য আকিল ইবনে আবু তালেব, মাখরামাহ ইবনে নাওফাল এবং জুবাইর ইবনে মুতইমকে দায়িত্ব দেন। তালিকা প্রস্তুতের পর ভাতা বণ্টনের ক্ষেত্রে তিনি নিজের পরিবার বা গোত্রকে নয়, বরং ইসলামের প্রথম যুগের ত্যাগকে অগ্রাধিকার দিয়ে সর্বপ্রথম মহানবী (সা.)-এর পরিবার এবং বদরি সাহাবিদের নাম রাষ্ট্রীয় খাতায় সবার ওপরে তালিকাভুক্ত করেন।

নিয়মিত সামরিক বাহিনী গঠন ও আর্থিক নিরাপত্তা

উমর (রা.)-এর আগে খেলাফতে নিয়মিত কোনো বেতনভুক্ত সামরিক বাহিনীর অস্তিত্ব ছিল না। তিনি খেলাফতের ইতিহাসে প্রথম নিয়মিত বেতনভুক্ত ও সুশৃঙ্খল সামরিক বাহিনী গঠন করেন। পদাতিক, অশ্বারোহী ও তীরন্দাজদের বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করে তাদের নাম রাষ্ট্রীয় রেজিস্ট্রি বা দেওয়ানে তালিকাভুক্ত করা হয় এবং বাইতুল মাল থেকে নিয়মিত বেতন ও উন্নতমানের পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করা হয়।

যুদ্ধের ময়দানে থাকা সেনাদের পরিবার-পরিজনের সার্বিক অর্থনৈতিক দায়িত্ব খলিফা নিজে তদারকি করতেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের নিয়মিত বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বৈপ্লবিক ব্যবস্থা করেছিলেন। সৈন্যদের পারিবারিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে খলিফা উমরের এই নীতি শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এর পেছনে ছিল স্পর্শকাতর ঐতিহাসিক ঘটনা।

এক রাতে খলিফা উমর মদিনার অলিগলিতে সাধারণ প্রজাদের অবস্থা তদারকি করছিলেন। সে সময় একটি বাড়ি থেকে এক নারীর কণ্ঠে গভীর বিরহ ও আকুলতার কবিতা শুনতে পান, যার স্বামী দীর্ঘ সময় ধরে খিলাফতের সীমান্ত রক্ষায় যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়োজিত ছিলেন। এ ঘটনা খলিফার মনকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। পরদিন সকালেই তিনি উম্মুল মুমিনিন হাফসা (রা.)-এর কাছে গিয়ে জানতে চান, একজন বিবাহিত নারী তার স্বামী ছাড়া সর্বোচ্চ কতদিন ধৈর্য ধরে থাকতে পারে? উত্তরে তিনি জানান, এই সময়সীমা সর্বোচ্চ চার মাস।

এ ঘটনার ওপর ভিত্তি করেই খলিফা উমর (রা.) তৎক্ষণাৎ একটি ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করেন—কোনো বিবাহিত সৈনিককে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে চার মাসের বেশি সময় পরিবার থেকে দূরে যুদ্ধক্ষেত্রে রাখা যাবে না। একই সঙ্গে তিনি আইন করেন, যুদ্ধকালীন এই চার মাস সৈন্যদের পরিবারের যাবতীয় ভরণপোষণ ও অর্থনৈতিক ব্যয়ভার রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বাইতুল মাল থেকে সুনিশ্চিত করা হবে।

খলিফা নিজে রাতের আঁধারে যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সৈন্যদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাদ্যসামগ্রী ও নগদ অর্থ পৌঁছে দিতেন এবং দূরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা সৈন্যদের চিঠিপত্র নিজে বহন করে তাদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতেন।

এই নিয়মতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ফলেই খেলাফত রাষ্ট্রে সৈন্যদের বীরত্ব এবং তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা অভূতপূর্ব এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।

নবজাতকের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা

উমর (রা.)-এর অর্থব্যবস্থায় ‘শাসক’ পদের চেয়ে নিজেকে জনগণের ‘পাহারাদার’ ভাবা খলিফা মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে ছিলেন আপসহীন। মদিনার এক অসহায় মায়ের কষ্ট দেখে তিনি নীতি পরিবর্তন করে রাষ্ট্রের প্রতিটি নবজাতক শিশুর জন্যই মায়ের বুকের দুধপানের সময় থেকেই নিয়মিত রাষ্ট্রীয় ভাতার নিয়ম চালু করেন। এই মানবিক রাষ্ট্রদর্শনের পেছনে মদিনার উপকণ্ঠে ঘটে যাওয়া এক স্পর্শকাতর বাস্তব চিত্র বিদ্যমান। এক গভীর রাতে খলিফা উমর এবং আবদুর রহমান ইবনে আওফ যখন মদিনার বাইরে তাঁবু খাটিয়ে থাকা এক কাফেলার নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিলেন, তখন দূর থেকে একটি শিশুর কান্নার আওয়াজ খলিফার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি ঘরের দরজায় গিয়ে মাকে সান্ত্বনা দিতে বললেও দীর্ঘক্ষণ পর আবার কান্নার তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় খলিফা নিজে গিয়ে এর কারণ অনুসন্ধান করেন। খলিফাকে চিনতে না পেরে সেই দুঃখী মা অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানান, খলিফা শুধু দুধ ছাড়ানো শিশুদের জন্য রাষ্ট্রীয় ভাতার ঘোষণা দিয়েছেন; তাই পেটের দায়ে তিনি জোরপূর্বক তার এই দুগ্ধপোষ্য শিশুকে মায়ের বুক থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করছেন, যাতে দ্রুত সরকারি সাহায্য পাওয়া যায়।

অসহায় মায়ের এই নিদারুণ স্বীকারোক্তি খলিফার বিবেককে প্রচণ্ড নাড়া দেয় এবং অনুশোচনায় জর্জরিত হয়ে তিনি ফজরের নামাজে এতটাই কান্না করছিলেন যে মুসল্লিদের পক্ষে তার কিরাত বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছিল। মোনাজাত শেষে তিনি বিলাপ করে বলতে থাকেন যে উমরের ভুলের কারণে আজ কত নিষ্পাপ শিশু কষ্টের শিকার হয়েছে। এ ঘটনার পরদিনই খেলাফতে জরুরি ফরমান জারি করা হয়, এখন থেকে কোনো শিশুকে জোর করে দুধ ছাড়াতে হবে না, বরং প্রতিটি নবজাতক পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার মুহূর্ত থেকেই বাইতুল মালের নিবন্ধিত নাগরিক হিসেবে স্থায়ী ভাতার অধিকার লাভ করবে।

স্বজনপ্রীতি রোধ ও মিতব্যয়িতার আদর্শ

দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি রোধে সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। কোনো গভর্নর বা সরকারি কর্মকর্তা নিযুক্ত হওয়ার আগে সম্পদের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেওয়া হতো এবং দায়িত্ব ছাড়ার সময় অতিরিক্ত বা অবৈধ কোনো সম্পদ পাওয়া গেলে বাজেয়াপ্ত করা হতো। আর এই জবাবদিহির সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিলেন খলিফা নিজে, যিনি বাইতুল মাল থেকে সাধারণ একজন নাগরিকের সমপরিমাণ সর্বনিম্ন ভাতা গ্রহণ করতেন। অগণিত তালি দেওয়া সাধারণ পোশাক পরে বিশ্ব কাঁপানো এই রাষ্ট্রনায়ক প্রমাণ করেছিলেন, শাসকের ভোগবিলাস নয়, বরং মিতব্যয়িতাই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি। এই কঠোর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও মিতব্যয়িতার নীতিটি খলিফা শুধু মুখে বলেননি, বরং তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিজের পরিবার কিংবা রাষ্ট্রের প্রভাবশালী সেনাপতিদের প্রতিও কোনো ছাড় দেননি। খেলাফতের অন্যতম সফল ও প্রভাবশালী গভর্নর আমর ইবনুল আস যখন মিসরের দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন তার ব্যক্তিগত সম্পদে আকস্মিক প্রবৃদ্ধি লক্ষ করে খলিফা উমর (রা.) তৎক্ষণাৎ হিসাব তলব করেন। গভর্নর তার এই অতিরিক্ত সম্পদকে বৈধ ব্যবসা ও ব্যক্তিগত উপার্জনের ফসল বলে দাবি করলেও, খলিফা তার নীতিতে অটল থাকেন এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের প্রভাব খাটিয়ে অতিরিক্ত উপার্জনের আশঙ্কার কারণে গভর্নরের সেই বর্ধিত সম্পদের অর্ধেক অংশ রাষ্ট্রীয় ফরমান বলে বাইতুল মালে বাজেয়াপ্ত করেন। এমনকি নিজের প্রিয় পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) রাষ্ট্রীয় চারণভূমি ব্যবহার করে চড়া দামে উট বিক্রি করে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করলে, খলিফা সরকারি চারণভূমির অনৈতিক সুবিধার কারণে পুত্রের সেই লভ্যাংশের পুরোটা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করে দেন। নিজের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রপ্রধানের এমন নজিরবিহীন ও আপসহীন অর্থনৈতিক জবাবদিহি সমগ্র খিলাফতে দুর্নীতি এবং স্বজনপ্রীতির পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দিয়েছিল।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন