শাপলা শহীদদের পাশে শাপলা স্মৃতি সংসদ

224
ওয়ালিউল্লাহ সিরাজ

শাপলা শহীদদের পাশে শাপলা স্মৃতি সংসদ

ভয়াল একদিনের স্মৃতি বয়ে আনে ৫ মে। ২০১৩ সালের এই দিনে রাজধানীর শাপলা চত্বরে ঘটে যায় সীমাহীন বেদনাদায়ক ঘটনা, যার রেশ এখনো রয়ে গেছে বহু পরিবারের জীবনে। সময়ের স্রোতে অনেক কিছু চাপা পড়ে গেলেও সেই দিনের হারানো মানুষের স্মৃতি আজও বয়ে বেড়াচ্ছে তাদের স্বজনেরা। এই প্রেক্ষাপটে ‘শাপলা স্মৃতি সংসদ’ হয়ে উঠেছে শহীদ পরিবারগুলোর নীরব সহযোগী।

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের কারণে ওই দিনের ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ সম্ভব হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ‘শাপলা স্মৃতি সংসদ’ শহীদদের তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং জনপরিসরে উপস্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। শুধু তথ্য সংগ্রহেই থেমে নেই। শহীদ পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোকে নিজেদের দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

এছাড়া যারা শাপলা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন, ২০২৫ সালে তাদের বিশেষ সম্মাননা দিয়েছে সংগঠনটি। ২০১৩ সালের শাপলা গণহত্যার বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন, হতাহতদের চিকিৎসাসেবা, আইনি সহায়তা ও মানবাধিকার নিয়ে সোচ্চার ভূমিকা রাখার জন্য প্রতিষ্ঠান ক্যাটাগরিতে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয় আলজাজিরা, দৈনিক আমার দেশ, দিগন্ত টেলিভিশন, ইসলামিক টেলিভিশন, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল, মানবাধিকার সংগঠন অধিকার ও হেফাজতে ইসলাম ঢাকা মহানগরকে (২০১৩ সালের কমিটি)। এছাড়া গণমাধ্যম, আইন ও মানবাধিকার, চিকিৎসাসেবা, সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং পুনর্বাসন সহায়তা খাতে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২১ জনকে ব্যক্তি পর্যায়ে সম্মাননা ও ক্রেস্ট দেওয়া হয়।

সংগঠনটির উদ্যোগে ইতোমধ্যে বহু পরিবার আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। প্রথম ধাপে ৭০টি পরিবারকে এককালীন নগদ অর্থ ও ঈদসামগ্রী দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ধাপে আরো ৫০টি পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হয়। বর্তমানে ১৫টি পরিবার নিয়মিত ভাতার আওতায় রয়েছে। এই সহায়তা অনেক পরিবারের জন্য নতুন করে বাঁচার আশার আলো হয়ে এসেছে।

শহীদ হারুন খানের স্ত্রী ডলি বলেন, তার স্বামীর স্বপ্ন ছিল সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত করা। আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে সেই স্বপ্ন হারিয়ে যাচ্ছিল। শাপলা স্মৃতি সংসদের সহায়তায় সেই স্বপ্ন বেঁচে আছে। আশা করি, আমার স্বামীর স্বপ্ন পূরণ হবে ইনশাআল্লাহ।

শহীদ মুহসিনুল হক নান্নুর মেয়ে উম্মে সুমাইয়া জানান, ‘আমাদের পরিবারে এখনো উপার্জনের কেউ নেই। আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ। আমরা শুধু শাপলা স্মৃতি সংসদ থেকে এককালীন কিছু সহায়তা পেয়েছি।’

শুধু আর্থিক সহায়তাই নয়, শাপলার ইতিহাস সংরক্ষণেও কাজ করছে সংগঠনটি। ২৪ মে ২০২৫ রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বর্ণাঢ্য এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য নিয়ে শহীদনামা নামের স্মারক প্রকাশ করা হয়। এ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। প্রথমবারের মতো শহীদদের একটি প্রামাণ্য চিত্র জাতির সামনে পেশ করা হয়।

শাপলা গার্ডিয়ান ফোরাম

তথ্য সংগ্রহ ও স্মারক প্রকাশের পর গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল শহীদ পরিবারের পুনর্বাসন। সেই লক্ষ্যে গঠন করা হয় শাপলা গার্ডিয়ান ফোরাম। ফোরামটি শাপলা স্মৃতি সংসদের মাধ্যমে শহীদ পরিবারকে নিয়মিত ভাতা দিয়ে থাকেন। একটি নিয়মিত সহায়তা ও যোগাযোগের কাঠামো তৈরি করা হয়।

ভবিষ্যতের উদ্যোগ

শাপলা স্মৃতি সংসদ শহীদদের নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কাজ করে যেতে চায়। শহীদদের অধিকার সম্পূর্ণরূপে আদায় করতে চায়। গান, কবিতা গবেষণাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে শহীদদের বাঁচিয়ে রাখতে চায়।

শাপলা স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ কামাল উদ্দীন বলেন, শাপলা গণহত্যার শহীদ পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, আমাদের নৈতিক ও জাতীয় দায়িত্বও। আমরা চেষ্টা করছি একটি টেকসই সহায়তা কাঠামো গড়ে তুলতে, যাতে পরিবারগুলো দীর্ঘ মেয়াদে উপকৃত হয়। একই সঙ্গে তাদের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে তুলে ধরাও আমাদের অঙ্গীকার।

এ প্রেক্ষাপটে চলতি মাসে শাপলা স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে ‘শাপলা স্মৃতি প্রতিযোগিতা’ আয়োজন করা হয়, যা ইতোমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এর পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান আগামী ৮ মে জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে হবে। একই অনুষ্ঠানে ৫ মের ঘটনা নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন এবং শহীদদের জীবনীভিত্তিক সমৃদ্ধ স্মারক শহীদনামার নতুন সংস্করণের মোড়ক উন্মোচন করা হবে।

শাপলা স্মৃতি সংসদের চেয়ারম্যান মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড শুধু একটি ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মোড় ঘোরানো অধ্যায়। এ ঘটনার মধ্য দিয়েই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মানুষের চেতনা নতুনভাবে জাগ্রত হয়েছে এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষা দৃঢ় ভিত্তি পেয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, আগামীর সমৃদ্ধ ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে হলে শাপলার সেই চেতনাকে ধারণ করা অপরিহার্য।

তিনি আরো বলেন, শাপলা স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে আমরা ইতোমধ্যে শহীদদের তথ্যভিত্তিক স্মারক ‘শহীদনামা’ প্রকাশ করেছি। এটি ইতিহাস সংরক্ষণের একটি প্রাথমিক ধাপ। শিগগিরই এর একটি জীবনীভিত্তিক সমৃদ্ধ সংস্করণ প্রকাশ করা হবে, যেখানে শহীদদের জীবন, সংগ্রাম ও ত্যাগ আরো বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা হবে। আমাদের লক্ষ্য শুধু স্মরণে সীমাবদ্ধ নয়, আমরা এই গণহত্যার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আদায়, সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিতকরণ এবং শহীদ পরিবারগুলোর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে যাব। শাপলা স্মৃতি সংসদ ভবিষ্যতেও এই দায়িত্ব পালন করে যাবে ইনশাআল্লাহ!

শাপলা স্মৃতি সংসদের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘পরিচালক পর্ষদ’। সাত সদস্যের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মাওলানা মামুনুল হক। অন্যরা হলেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মাওলানা মুসা আল হাফিজ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন, মাওলানা মোর্তজা হাসান ফয়জী মাসুম, মাওলানা আলী হাসান তৈয়ব ও মাওলানা আবুল হাসানাত জালালী।

কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি মাওলানা আবুল হাসানাত জালালী এবং সাধারণ সম্পাদক মাওলানা কামাল উদ্দীন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন