প্রবাদ আছে—স্বাস্থ্যই সম্পদ। আর এই সম্পদ ধরে রাখতে আমাদের সুষম স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গ্রহণ করা উচিত। সুষম খাদ্যাভ্যাসের অর্থ হলো সঠিক অনুপাতে বিভিন্ন ধরনের খাবার খাওয়া, যেটি শরীরের প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি সরবরাহ করবে। আমাদের দৈনন্দিন পুষ্টির চাহিদা পূরণের জন্য সঠিক পরিমাণে সঠিক ধরনের খাবার খাওয়া প্রয়োজন। কেননা একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস সব ধরনের অপুষ্টির পাশাপাশি বিভিন্ন অসংক্রমণ রোগ এবং রোগপ্রতিরোধে সাহায্য করে থাকে। আর স্বাস্থ্যকর সুষম খাদ্যের জন্য ছয়টি প্রধান খাদ্যগোষ্ঠী থেকে বিভিন্ন ধরনের খাবার বেছে নিতে হবে।
কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট : কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা শরীরের প্রাথমিক শক্তির উৎস। খাদ্যতালিকায় কার্বোহাইড্রেটের উৎস হিসেবে জটিল শর্করাকে বেছে নেওয়া উচিত। স্বাস্থ্যকর খাবারের কথা ভাবলে বেশির ভাগ মানুষ জানেন যে ফল এবং শাকসবজি ভিটামিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ফাইবারে ভরপুর। কিন্তু অনেকেই জানেন না আস্ত শস্যও এই উপকারী যৌগগুলো আছে। পরিশোধিত শস্যের পরিবর্তে আস্ত শস্য খাওয়ার চেষ্টা করুন। কারণ আস্ত শস্য দানায় ভিটামিন ই, সেলেনিয়াম এবং ফাইটিক অ্যাসিডের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও দ্রবণীয় ফাইবার রয়েছে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণ, কোলেস্টেরল কমাতে, হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে ডায়াবেটিস এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি কমে বলে প্রমাণিত। এ জন্য খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন সাদা চালের পরিবর্তে ব্রাউন চাল, ব্রাউন আটা, ওটস, ব্রাউন চিড়া, খই, কুইনোয়া, কাউন ইত্যাদি। মনে রাখা উচিত, সব শস্যই আস্ত শস্য হিসেবে আসে কিন্তু মিলিং প্রসেসিংয়ে পর যদি বেশি পরিশোধিত হয়, তাহলে সেটা আস্ত শস্যের গুণাগুণ হারিয়ে ফেলে। প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক ক্যালরির ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ শর্করা থেকে আসা উচিত। ১০ বছরের বেশি বয়সিদের সবারই প্রতিদিন খাবারে কমপক্ষে ২৫ গ্রাম ফাইবার বা আঁশজাতীয় খাবার রাখা উচিত। আর ১০ বছরের কমবয়সি শিশুদের ১৫ থেকে ২১ গ্রাম ফাইবার বা আঁশজাতীয় খাবার রাখা উচিত।
প্রোটিন : প্রোটিন আপনার শরীরের প্রায় সবকিছুরেই ভিত্তি। এটি শরীরের টিস্যু তৈরি এবং মেরামত করতে সাহায্য করে। এছাড়া পেশি, হাড়, অঙ্গ, ত্বক এবং নখ সুস্থ রাখতে প্রোটিনের প্রয়োজন। প্রোটিনযুক্ত খাবারগুলোয় আয়রন, ভিটাবিন বি এবং জিংকের মতো ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থ থাকে। প্রোটিনযুক্ত খাদ্যের উৎস হলো ডিম, দুধ, মাছ, মাংস, সয়া, পনির, টোফু, বাদাম, মটরশুঁটি ইত্যাদি। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অবশ্যই চর্বিহীন মাংস বেছে নিন। সবসময় তাজা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খান এবং বেশি করে মাছ খাওয়ার অভ্যাস করুন, তার মধ্যে তৈলাক্ত মাছ সপ্তাহে দুদিন খাওয়ার চেষ্টা করুন। ছোট মাছ এ ক্যালসিয়াম এবং প্রোটিন থাকে আর তৈলাক্ত মাছে ওমেগা-থ্রি আছে, যা মস্তিষ্ক বিকাশে, শরীরের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া বিভিন্ন প্রকার ডাল, মটরশুঁটি ও শিম খান। এগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই চর্বির পরিমাণ কম এবং ফাইবার, প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ আছে। আরো খেতে হবে বিভিন্ন ধরনের বাদাম ও বীজ। এগুলোতে ভালো ভিটামিন, মিনারেলস আছে। তবে চর্বির পরিমাণও থাকে বেশি। তাই পরিমিত পরিমাণে খেতে হবে।
বয়স অনুযায়ী প্রোটিনের চাহিদা কতটুকু : বয়স, ওজন এবং শারীরিক পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করে প্রোটিন বা আমিষজাতীয় খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। বয়স অনুযায়ী এক থেকে তিন বছর প্রতি কেজি ওজনের জন্য ১ দশমিক ২ গ্রাম, ৪ থেকে ৬ বছর দৈনিক ১ গ্রাম, কিশোর-কিশোরী (১৪ থেকে ১৮ বছর) ছেলেদের ৫২ গ্রাম আর মেয়েদের ৪৬ গ্রাম, প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক প্রোটিনের প্রয়োজন শরীরের প্রতি কেজি ওজন অনুযায়ী ০.৮ গ্রাম। অর্থাৎ ব্যক্তির ওজন ৭০ কেজি হলে দিনে ৫৫ থেকে ৫৬ গ্রাম যথেষ্ট। বয়স্কদের ক্ষেত্রে শরীরের প্রতি কেজিতে ১ থেকে ১ দশমিক ২ গ্রাম প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যকর তেল ও চর্বি : তেল এমন একটি উপাদান, যা আমাদের দৈনন্দিন খাবারে বেশির ভাগ অংশেই থাকে। তাই তেলে কী কী আছে, তা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। সব রান্নার তেলে চর্বি থাকে এবং সাধারণত স্যাচুরেটেড এবং আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের মিশ্রণ থাকে। স্বাস্থ্যকর আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের মধ্যে রয়েছে পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট, মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট। অস্বাস্থ্যকর তেলগুলোয় ট্রান্সফ্যাট এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকে। এ জন্য স্বাস্থ্যকর তেল নির্বাচন করা উচিত। পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট দুটি প্রধান ধরনের। একটি ওমেগা-থ্রি এবং অপরটি ওমেগা-৬। এগুলো মস্তিষ্কের কার্যকারিতা এবং কোষের বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ওমেগা থ্রি ফ্যাট হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। এটি ধমনিতে রক্ত জমাট বাঁধা-কমাতে, ধমনি শক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করতে, রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। চর্বিযুক্ত মাছগুলো যেমন ইলিশ, পাঙাশ, রুই, আখরোট ক্যানোলা-তেল ইত্যাদি ওমেগা-থ্রি রয়েছে। ওমেগা-৬ ফ্যাট মোট কোলেস্টেরল কমিয়ে হৃদকে সুস্থ রাখে। এছাড়া খারাপ কোলেস্টেরল এলডিএলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। ওমেগা-৬ খাদ্যের উৎস হলো উদ্ভিজ্জ তেল যেমন ভুট্টার তেল, সয়াবিন তেল, সূর্যমুখী তেল, সরিষার তেল, তিলের তেল, অ্যাভোকাডো তেল ইত্যাদি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দৈনিক ৪ চামচ তেলের বেশি না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে তেলের পরিমাণ : একজন সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে প্রতিদিন তেলের পরিমাণ ৩ থেকে ৪ চা চামচের বেশি হওয়া উচিত নয়—অর্থাৎ দিনে প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিলি লিটার তেলই যথেষ্ট। সে হিসেবে একজন সুস্থ মানুষের জন্য সপ্তাহে ১০৫ থেকে ১৪০ মিলি লিটার এবং মাসে ৫০০ থেকে ৬০০ মিলি লিটার তেল নিরাপদ। চারজন পরিবারের ক্ষেত্রে মাসে দুই লিটারের বেশি তেল ব্যবহার না করাই ভালো। আর শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে একটু বেশি হতে পারে। আরো জানতে হবে স্যাচুরেটেড ফ্যাট সম্পর্কে। এটি অতিরিক্ত গ্রহণ করলে রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। পুরুষদের গড়ে দৈনিক ৩০ গ্রামের বেশি স্যাচুরেটেড ফ্যাট খাওয়া উচিত নয়। আর নারীদের ২০ গ্রামের বেশি নয়। শিশুদের আরো কম। স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবার হলো চর্বিযুক্ত মাংস, মাখন, সসেজ, ক্রিম, কেক, বিস্কুট, হার্ড পনির ইত্যাদি।
ফল ও শাকসবজি : ফল ও শাকসবজি ফাইবার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, মিনারেলস রয়েছে ভালো। ১০ বছরের বেশি বয়সিদের প্রতিদিন কমপক্ষে ৪০০ গ্রাম ফল ও শাকসবজি গ্রহণ করা উচিত। আর ১০ বছরের কম বয়সিদের ২৫০ থেকে ৩৫০ গ্রাম ফল ও শাকসবজি রাখা উচিত। কারণ ফল ও শাকসবজির বিভিন্ন রঙের রঞ্জক পদার্থ রয়েছে, যা এগুলো হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক ও ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। এ জন্য খাবারে ৮০ গ্রাম তাজা, হিমায়িত, টিনজাত ফল ও ৩০ গ্রাম শুকনো গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি ১৫০ মিলি গ্রামের ফলের রস বা স্মুদি দিনে এক গ্লাস গ্রহণ করতে পারেন। ফলের রসে ফাইবার কম থাকে এবং চিনিযুক্ত খেলে দাঁতের ক্ষতি করতে পারে। তাই অতিরিক্ত ফলের রসের পরিবর্তে আস্ত ফল খাবেন।
পানি : খাদ্য পরিপাক, পরিশোষণ, পরিবহন, বর্জ্য পদার্থ দূরীকরণ এবং দৈহিক তাপমাত্রার ভারসাম্য রক্ষায় পানি জরুরি। এতসব মৌলিক ক্রিয়া সম্পাদনের কারণেই পানির অপর নাম জীবন বলা হয়। মানবদেহের মোট ওজনের ৭০ শতাংশ পানি। আবহাওয়া, কাজের ধরন, বয়স, ওজন ইত্যাদির ভিন্নতায় পানির দৈনিক চাহিদা ভিন্ন ভিন্ন হয়।
পানি পানের হিসাব : জাতীয় খাদ্যগ্রহণ নির্দেশিকা ২০২০ অনুযায়ী একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের প্রতিদিন দেড় থেকে সাড়ে ৩ লিটার, অর্থাৎ প্রায় ৬ থেকে ১৪ গ্লাস নিরাপদ পানি পান করা প্রয়োজন। প্রতি কেজি দৈহিক ওজনের জন্য গড়ে ৪০ মিলিলিটার পানি গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, একজন ৬০ কেজি ওজনের ব্যক্তির দৈনিক পানির চাহিদা হবে—৬০×৪০=২৪০০ মিলি লিটার বা ২ দশমিক ৪ লিটার।
মনে রাখতে হবে, গর্ভবতী নারী, স্তন্যদানকারী মা, খেলোয়াড় এবং অধিক শারীরিক পরিশ্রম করেন—এমন ব্যক্তিদের পানির চাহিদা তুলনামূলক বেশি হয়। আবার কিডনির জটিলতা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পানির পরিমাণ কম হতে পারে। খাওয়ার সময় অতিরিক্ত পানি পান করা ভালো নয়। সাধারণত খাওয়ার ১৫ থেকে ৩০ মিনিট আগে বা পরে পানি পান করা উত্তম। একবারে অতিরিক্ত পানি না খাওয়াই ভালো, কারণ এতে শরীরের কোষে পানি ও লবণের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
লেখক : পুষ্টিবিদ, রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল
অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

