বোবায় ধরা স্লিপ প্যারালাইসিস

ডা. নুসরাত শোয়েব

বোবায় ধরা স্লিপ প্যারালাইসিস

রাতের গভীর ঘুমে হঠাৎ মনে হলো ঘুম ভেঙে গেছে। চারপাশ বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু শরীর নড়ছে না। কথা বলতে চাইছেন—কিন্তু শব্দ বের হচ্ছে না। বুকের উপর যেন কেউ বসে আছে। অনেকেই এটিকে ‘ভূতের চাপা’ বলে মনে করেন। বাস্তবে এটি একটি বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যাত স্লিপ প্যারালাইসিস (Sleep Paralysis)।

স্লিপ প্যারালাইসিস কী

বিজ্ঞাপন

স্লিপ প্যারালাইসিস হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে মানুষ ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থায় সচেতন থাকে, কিন্তু সাময়িকভাবে শরীর নাড়াতে বা কথা বলতে পারে না। এটি সাধারণত দুই সময় ঘটে—

* ঘুমাতে যাওয়ার সময় (Hypnagogic sleep paralysis)।

* ঘুম থেকে জাগার সময় (Hypnopompic sleep paralysis)।

এটি কয়েক সেকেন্ড থেকে ১-২ মিনিট স্থায়ী হয় এবং পরে স্বাভাবিকভাবে চলে যায়।

কেন হয়

ঘুমের Rapid Eye Movement (REM) পর্যায়ে আমরা স্বপ্ন দেখি। এ সময় মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই শরীরের পেশিকে শিথিল বা সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় রাখে, যাতে স্বপ্ন অনুযায়ী শরীর নড়াচড়া না করে। কখনো কখনো মস্তিষ্ক জেগে যায়, কিন্তু শরীরের পেশি এখনো REM অবস্থায় থাকে, তখনই স্লিপ প্যারালাইসিস ঘটে।

প্রধান লক্ষণ

* ঘুম ভাঙলেও শরীর নাড়াতে না পারা।

* কথা বলতে অক্ষমতা।

* বুকের ওপর চাপ অনুভব।

* শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে মনে হওয়া।

* ঘরে কারো উপস্থিতি অনুভব।

* ভয়ংকর দৃশ্য বা শব্দের হ্যালুসিনেশন।

অনেক রোগী মনে করেন কেউ তাকে চেপে ধরেছে বা আক্রমণ করছে।

কারা বেশি আক্রান্ত হন

* অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাস।

* রাত জাগা।

* মানসিক চাপ ও উদ্বেগ।

* শিক্ষার্থী ও তরুণ বয়সি মানুষ।

* শিফট ডিউটি কর্মী।

* অতিরিক্ত মোবাইল বা স্ক্রিন ব্যবহারকারী।

* Narcolepsy রোগীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

* জীবনের কোনো না কোনো সময়ে প্রায় ২০-৩০ শতাংশ মানুষ অন্তত একবার এটি অনুভব করেন।

রোগ নির্ণয় (Diagnosis)

* সাধারণত রোগীর ইতিহাস শুনেই রোগ নির্ণয় করা যায়।

চিকিৎসক যেসব বিষয় মূল্যায়ন করেন—

* ঘুমের ধরন।

* ঘটনার সময় ও ফ্রিকোয়েন্সি।

* মানসিক চাপ।

* অন্যান্য ঘুমের রোগ আছে কি না।

চিকিৎসা

ভয়ের বিষয় হলো—স্লিপ প্যারালাইসিস মারণ রোগ নয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওষুধ প্রয়োজন হয় না।

১. জীবনযাত্রার পরিবর্তন (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)

* প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো।

* ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করা।

* চিত হয়ে না ঘুমানো (side position ভালো)।

* শোবার আগে মোবাইল/স্ক্রিন কমানো।

* ক্যাফেইন ও রাত জাগা কমানো।

* মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ।

২. এপিসোড চলাকালে কী করবেনÑ

* ভয় না পাওয়া।

* ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়া।

* চোখ বা আঙুল নড়ানোর চেষ্টা করা।

* মনে রাখা—এটি সাময়িক|

৩. ওষুধ চিকিৎসা (প্রয়োজনে)

যদি বারবার হয় বা দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা তৈরি করে—

* ঘুম বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন।

* কিছু ক্ষেত্রে antidepressant বা REM suppressing medicine দেওয়া হয়।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন

* সপ্তাহে বারবার হলে।

* দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব থাকলে।

* হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়া (narcolepsy সন্দেহ)।

* তীব্র উদ্বেগ বা প্যানিক তৈরি হলে।

সমাজে ভুল ধারণা

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় এটি দীর্ঘদিন ধরে—

* ভূতের চাপা।

* অশরীরীর আক্রমণ।

* জিনের চাপ বলে মনে করা হয়।

* চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি সম্পূর্ণ নিউরোলজিক্যাল ও স্লিপ-ফিজিওলজিক ঘটনা, কোনো অতিপ্রাকৃত বিষয় নয়।

গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

স্লিপ প্যারালাইসিস ভয়ংকর অনুভূতি তৈরি করলেও এটি সাধারণত ক্ষতিকর নয়। সচেতনতা, নিয়মিত ঘুম এবং মানসিক প্রশান্তিই এর প্রধান প্রতিকার।

ঘুমের যত্ন নিন—মস্তিষ্ক সুস্থ রাখুন।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক

হলি ফ্যামিলি মেডিকেল কলেজ, ঢাকা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন