বিচার বিভাগে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন অনেকেরই থাকে, কিন্তু প্রথমবারেই সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সহজ কথা নয়। ১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় প্রথমবারেই সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন এস এম বাকিবিল্লাহ। বগুড়া জিলা স্কুল ও সরকারি আজিজুল হক কলেজের এই কৃতী শিক্ষার্থীর পথচলাটা ছিল চড়াই-উতরাইয়ে ভরা। তার সফলতার গল্প নিয়েই আজকের আয়োজন।
জুডিশিয়ারিতে আসার প্রেরণা
বাকিবিল্লাহর বিচারক হওয়ার স্বপ্নবীজ রোপিত হয়েছিল ছোটবেলায়। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে দাদাকে হারান তিনি। বড় হয়ে মানুষের মুখে মুখে শুনেছেন তার দাদার বিচক্ষণতা ও ন্যায়পরায়ণতার কথা। গ্রাম্য সালিশে দাদার সেই ইনসাফপূর্ণ বিচারকাজ তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। দাদাকে দেওয়া সেই অদৃশ্য প্রতিশ্রুতি এবং তার লেগাসি টিকিয়ে রাখার স্বপ্ন থেকেই তিনি জুডিশিয়ারিকে নিজের পেশা হিসেবে বেছে নেন। এছাড়া গৌরাঙ্গ দেবনাথ স্যারের সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প তার কাছে ছিল নিয়মিত প্রেরণার উৎস। পরপর দুবার ব্যর্থ হওয়ার পর শুধু কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে শীর্ষস্থান অর্জনের সেই জীবনসংগ্রাম তাকে কঠিন সময়েও সামনে এগিয়ে যেতে শক্তি জুগিয়েছে।
প্রস্তুতির শুরুটা যেমন ছিল
বাকিবিল্লাহর শুরুটা ছিল অপ্রত্যাশিত। তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি ফটোগ্রাফি করতেন। সার্কুলার প্রকাশের এক মাস পর ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র ভাই সিভিল জজ জিয়ার বিয়ের ফটোগ্রাফিতে গেলে আরেক সিভিল জজ তারেক পরীক্ষা ফেলে আসার জন্য শাসন করেন এবং পরীক্ষা রেখে ফটোগ্রাফি করতে আসার কারণ জানতে চান। অথচ তখন দেড় মাসও বাকি নেই, সিলেবাসই অজানা তার। সেই শাসনই তাকে জাগিয়ে তোলে। সেই জজ তাকে কিছু সাজেশন পাঠান—কোন সেকশন পড়তে হবে।
প্রিলি প্রস্তুতি
প্রিলির মাত্র ৪০-৪৫ দিন আগে শূন্য থেকে প্রস্তুতি শুরু করেন তিনি। সেই সময় পড়া গুছিয়ে নিতে সাহায্য করেন আরেক সিনিয়র ভাই তাজুল ইসলাম, যিনি সদ্য সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। এরপর সহায়ক বই, বিগত প্রশ্ন ও গুরুত্বপূর্ণ টপিক ধরে এগিয়ে যান। তবে তিনি বলেন, ‘সময় থাকলে বেয়ার অ্যাক্টের বিকল্প নেই।’
রিটেন প্রস্তুতি
লিখিত পরীক্ষার লড়াইয়ে বাকিবিল্লাহ সম্পূর্ণ বেয়ার অ্যাক্টভিত্তিক পড়াশোনায় মনোসংযোগ করেছিলেন, তবে ছোট একটি বদভ্যাস তাকে বেশ বিপদে ফেলেছিল। তিনি কোনো সংক্ষিপ্ত নোট তৈরি করেননি। যার ফলে পরীক্ষার আগের মুহূর্তে মাত্র ৫-৭ ঘণ্টায় তিন-চারটি বিশাল সাবজেক্ট রিভিশন দিতে গিয়ে তাকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। এর ওপর যুক্ত হয়েছিল তার দীর্ঘদিনের অঙ্কের প্রতি অনীহা; যেখানে অন্যরা ৯-১০টি অঙ্ক সমাধান করলেও তিনি মাত্র ৫টি অঙ্ক করেছিলেন। সবচেয়ে বড় নাটকীয়তা তৈরি হয় আইনের প্রথম পরীক্ষা, তথা সিভিলে, যেখানে হুট করে অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে তাকে প্রায় ৩০ মার্ক ফাঁকা রেখেই খাতা জমা দিতে হয়। খাতা জমা দিয়ে তিনি সফলতার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন, কিন্তু সব প্রতিকূলতা আর ঘাটতি পেরিয়ে সৃষ্টিকর্তার অসীম করুণায় তিনি চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে নেন।
ভাইভা প্রস্তুতি
লিখিত ও অন্যান্য ধাপ পেরিয়ে যখন ভাইভার পালা, তখন বাজারে নতুন আসা ‘ভাইভা বুস্টার’ বইটি তার প্রস্তুতিকে দারুণভাবে শানিত করে। বইটির মাধ্যমে তিনি রিয়েল ভাইভা এক্সপেরিয়েন্স তথা বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন, যা তার অভ্যন্তরীণ ভয় কাটিয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করেছিল।
নতুনদের উদ্দেশে তার পরামর্শ
বাকিবিল্লাহ বলেন, ‘ধারাবাহিকতা বজায় রাখাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তুতির একটা পর্যায়ে এসে হতাশা আসবে, পড়াশোনার চাপ অসহ্য মনে হবে, কখনো কষ্ট হবে, এমনকি কান্নাও পেতে পারে। কিন্তু এসবের পরও থেমে গেলে চলবে না; দাঁতে দাঁত চেপে নিজের লক্ষ্যের দিকে লেগে থাকতে হবে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট রুটিন মেনে স্টপওয়াচ ধরে অন্তত ৮-১০ ঘণ্টা মনোযোগ দিয়ে পড়ার চেষ্টা করতে হবে। শুধু দীর্ঘ সময় বইয়ের সামনে বসে থাকলেই হবে না, কার্যকর পড়াশোনা নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন শেষ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এভাবে নিয়মিত পরিশ্রম করতে পারলে দেখবেন, এক-দুই মাসের মধ্যেই আপনার সিলেবাসের অধিকাংশ পড়াশোনা শেষ হয়ে গেছে এবং নিজের প্রস্তুতির ওপর আত্মবিশ্বাসও তৈরি হয়েছে। তাই সাময়িক হতাশা, ক্লান্তি কিংবা ব্যর্থতাকে ভয় না পেয়ে নিজের কাজটুকু নিষ্ঠার সঙ্গে করে যেতে হবে। পরিশ্রম ও প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই; বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

