প্রতিরক্ষা অবহেলায় স্বাধীনতা বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকি

প্রতিরক্ষা অবহেলায় স্বাধীনতা বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকি

আমাদের দেশে কিছু মানুষ নিয়মিতভাবে জাতীয় প্রতিরক্ষা, সশস্ত্র বাহিনী এবং সামরিক আধুনিকায়নের বিরুদ্ধে কথা বলেন। কেউ অজ্ঞতার কারণে এসব বলেন; আবার কেউ জেনে বা না জেনে এমন কিছু মহলের বয়ান প্রচার করেন, যারা বাংলাদেশকে কৌশলগতভাবে সক্ষম ও সামরিক ক্ষেত্রে আত্মনির্ভর দেখতে চায় না। উদ্দেশ্য যা-ই হোক, এ ধরনের বক্তব্য জনগণের জাতীয় নিরাপত্তাবোধকে দুর্বল করে এবং শেষ পর্যন্ত দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে। তারা প্রশ্ন করেন—‘কে আমাদের আক্রমণ করবে?’, ‘আধুনিক যুদ্ধবিমান কেন প্রয়োজন?’ অথবা ‘দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাত থাকতে প্রতিরক্ষায় অর্থ ব্যয় করা হবে কেন?’ এ প্রশ্নগুলো আপাতদৃষ্টিতে আকর্ষণীয় মনে হলেও এর ভিত্তি অত্যন্ত বিপজ্জনক। কোনো স্বাধীন দেশই নিশ্চিত করে বলতে পারে না যে, তাকে কখনো আগ্রাসন, রাজনৈতিক বা সামরিক চাপ, সীমান্ত লঙ্ঘন, সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ, সাইবার আক্রমণ, সন্ত্রাসবাদ, কিংবা আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার মুখোমুখি হতে হবে না। বাংলাদেশ শান্তি চাইলেও শুধু সদিচ্ছা দিয়ে শান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

কোনো দেশ যুদ্ধ করতে চায় বলেই সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলে না। বরং অন্য কেউ যাতে তার ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার সাহস না পায়, সেজন্যই বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অর্জন করে। সামরিক শক্তির প্রধান উদ্দেশ্য হলো প্রতিরোধ—সম্ভাব্য আগ্রাসনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক মূল্য এত বেশি করে তোলা, যাতে প্রতিপক্ষ সেই পথ থেকে সরে আসে। একটি সক্ষম প্রতিরক্ষা বাহিনী জাতীয় সম্পদ রক্ষা করে, কূটনীতিকে শক্তিশালী করে এবং সংকটের সময় সরকারকে বিভিন্ন বিকল্প দেয়। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, প্রতিরক্ষায় অপ্রস্তুত থাকার পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারে। কূটনৈতিক আশ্বাস থাকা সত্ত্বেও ১৯৩৯ সালে পোল্যান্ড আক্রান্ত হয়েছিল। ১৯৯০ সালে ইরাক কয়েক দিনের মধ্যেই কুয়েত দখল করে নিয়েছিল। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ দেখিয়েছে যে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সীমান্ত, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সমুদ্রবন্দর, সেতু, যোগাযোগব্যবস্থা ও জনবসতি আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা স্তরভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, বিকেন্দ্রীভূত রসদব্যবস্থা, সুরক্ষিত অবকাঠামো এবং দেশীয় অস্ত্র উৎপাদনের গুরুত্বও তুলে ধরেছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাস আরো শক্তিশালী শিক্ষা দেয়। শুধু বক্তৃতা ও প্রস্তাবের মাধ্যমে আমাদের দেশের জন্ম হয়নি। ১৯৭১ সালে একটি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ এবং জনগণের অসীম আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। রাজনৈতিক বৈধতা, কূটনীতি ও জনসমর্থন অপরিহার্য ছিল; কিন্তু জনগণের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহৃত হলে সশস্ত্র প্রতিরোধ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। যে জাতি এই শিক্ষা ভুলে যায়, সে জাতি ইতিহাসের ভুল পুনরাবৃত্তির ঝুঁকিতে পড়ে।

সিঙ্গাপুর আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এটি মাত্র প্রায় ৭৪৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের একটি ছোট দ্বীপরাষ্ট্র, যার জনসংখ্যা ২০২৫ সালে ছিল প্রায় ৬১ লাখ ১০ হাজার। তা সত্ত্বেও দেশটি কখনো মনে করেনি যে ছোট আয়তন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কিংবা শান্তিপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি তার প্রতিরক্ষার প্রয়োজনীয়তা দূর করে দিয়েছে। ১৯৬৫ সালে স্বাধীনতার সময় সিঙ্গাপুরের মাত্র দুটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন ছিল, যেখানে প্রায় ৫০ জন কর্মকর্তা ও এক হাজার সৈনিক কর্মরত ছিলেন। দেশটির ছিল মাত্র দুটি জাহাজ; কোনো বিমান বাহিনীই ছিল না। নিজেদের অসহায় অবস্থা উপলব্ধি করে সিঙ্গাপুরের নেতারা প্রায় শূন্য থেকে সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলেন এবং ১৯৬৭ সালে বাধ্যতামূলক জাতীয় সেবা চালু করেন।

বর্তমানে সিঙ্গাপুরের একটি প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সামরিক বাহিনী রয়েছে। দেশটির বিমান বাহিনী এফ-১৫এসজি ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমান পরিচালনা করছে এবং আটটি এফ-৩৫এ ও বারোটি এফ-৩৫বি স্টেলথ যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিঙ্গাপুরের প্রতিরক্ষা ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় তিন শতাংশের মধ্যে রয়েছে, যা জাতীয় প্রতিরক্ষার প্রতি দেশটির ধারাবাহিক অঙ্গীকারের প্রমাণ। সিঙ্গাপুরের প্রতিরক্ষা নীতি দুটি পরস্পর-সম্পূরক স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত—প্রতিরোধ ও কূটনীতি। দেশটির সরকার মনে করে, বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে এবং একটি ছোট রাষ্ট্রকে নিজ স্বার্থে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার রাজনৈতিক সুযোগ দেয়। সিঙ্গাপুর সামরিক প্রস্তুতিকে বেসামরিক অবকাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত করেছে। দেশটির ৫৯টি ভূগর্ভস্থ এমআরটি স্টেশনকে এমনভাবে শক্তিশালী করা হয়েছে, যাতে যুদ্ধ চলাকালে সেগুলো জনসাধারণের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়। আকার অনুযায়ী প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৩ হাজার থেকে ১৯ হাজার মানুষ অবস্থান করতে পারে। আবাসিক ভবন, বিদ্যালয়, কমিউনিটি সেন্টার এবং নির্বাচিত সরকারি স্থাপনাতেও আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। দেশটি বিকল্প রানওয়ের ব্যবস্থাও করেছে। লিম চু কাং রোডের ২ দশমিক ৫ কিলোমিটার অংশকে প্রয়োজনে কার্যকর রানওয়েতে রূপান্তর করা যায়। ২০১৬ সালের ‘এক্সারসাইজ টরেন্ট’-এর সময় প্রায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সড়কটি রানওয়েতে রূপান্তর করে সেখান থেকে এফ-১৫এসজি ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের উড্ডয়ন ও অবতরণ করানো হয়। এ ধরনের প্রথম মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। যুদ্ধের শুরুতেই বিমানঘাঁটি ও রানওয়ে প্রধান লক্ষ্যবস্তু হতে পারে—এই বাস্তবতা বিবেচনায় সিঙ্গাপুর তার যুদ্ধবিমানকে বিকল্প স্থান থেকে পরিচালনার ব্যবস্থা করেছে।

বিশ্বের আরো অনেক দেশ একই নীতি অনুসরণ করে। সুইজারল্যান্ডে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার সরকারি ও বেসরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৯০ লাখ মানুষের স্থান রয়েছে, যা নীতিগতভাবে পুরো জনসংখ্যাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আরেকটি তুলনামূলকভাবে ছোট রাষ্ট্র ফিনল্যান্ডে প্রায় ৫০ হাজার ৫০০টি বেসামরিক প্রতিরক্ষা আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে, যেখানে প্রায় ৪৮ লাখ মানুষ আশ্রয় নিতে পারে। এসব প্রস্তুতির অর্থ এই নয় যে সুইজারল্যান্ড বা ফিনল্যান্ড যুদ্ধ চায়; বরং দায়িত্বশীল সরকার সংকট শুরু হওয়ার আগেই জনগণকে রক্ষার ব্যবস্থা করে। সুইডেন ‘সামগ্রিক প্রতিরক্ষা’ বা ‘টোটাল ডিফেন্স’ ধারণা অনুসরণ করে। এতে সামরিক প্রতিরক্ষার সঙ্গে বেসামরিক প্রস্তুতিকে সমন্বিত করা হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিক—সবারই জরুরি অবস্থা ও যুদ্ধকালে দায়িত্ব রয়েছে। দেশটি সামরিক জনবল ও প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষার প্রয়োজনে ব্যবহারযোগ্য পরিবহন অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করছে। এসব দেশের ভূগোল, রাজনীতি ও কৌশলগত পরিবেশ আলাদা হলেও তাদের উপলব্ধি অভিন্ন—জাতীয় প্রতিরক্ষা শুধু সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব নয়। এর সঙ্গে রাষ্ট্র, অর্থনীতি, অবকাঠামো ও জনগণের প্রস্তুতি যুক্ত। প্রতিরক্ষা বলতে শুধু ট্যাংক, জাহাজ ও যুদ্ধবিমান বোঝায় না; খাদ্য, জ্বালানি, ওষুধ, যোগাযোগ, সাইবার নিরাপত্তা, পরিবহন, শিল্প-উৎপাদন এবং জনগণের মানসিক দৃঢ়তাও এর অপরিহার্য অংশ।

বাংলাদেশকে এসব উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিতে হবে। আমাদের জনসংখ্যা ১৭ কোটির বেশি, বিস্তৃত স্থলসীমান্ত রয়েছে এবং বঙ্গোপসাগরে রয়েছে বিশাল সামুদ্রিক এলাকা ও একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল। দেশের সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, শিল্পকারখানা, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, যোগাযোগব্যবস্থা, সমুদ্রসম্পদ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করা অপরিহার্য। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করলেও একই সঙ্গে কৌশলগত প্রতিযোগিতা ও বৈদেশিক চাপের ঝুঁকিও তৈরি করে। তাই সামরিক আধুনিকায়নকে কোনো দলীয় বিষয় নয়, স্থায়ী জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশের প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী; আধুনিক যুদ্ধবিমান; স্তরভিত্তিক আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা; দূরপাল্লা ও নিচু উচ্চতার নজরদারি রাডার; সশস্ত্র ও নজরদারি ড্রোন; ইলেকট্রনিক ও সাইবার যুদ্ধক্ষমতা; নিখুঁত আঘাত হানতে সক্ষম অস্ত্র; নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা এবং সুরক্ষিত কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল স্থাপনা।

তবে শুধু সরঞ্জাম কেনাই আধুনিকায়ন নয়। এর জন্য প্রশিক্ষিত জনবল, পর্যাপ্ত গোলাবারুদ, খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা, সিমুলেটর, বাস্তবসম্মত মহড়া এবং প্রতিটি সরঞ্জামের পূর্ণ আয়ুষ্কালের ব্যয় বহনের মতো টেকসই বাজেট দরকার। ইঞ্জিন বা যন্ত্রাংশের অভাবে মাটিতে পড়ে থাকা ব্যয়বহুল যুদ্ধবিমান কোনো প্রতিরোধক্ষমতা সৃষ্টি করে না। সমন্বিত রাডার ও কমান্ড নেটওয়ার্ক ছাড়া ক্ষেপণাস্ত্রও কার্যকর আকাশ প্রতিরক্ষাবলয় গড়তে পারে না। বাংলাদেশের নির্বাচিত মহাসড়কগুলো জরুরি পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিমান পরিচালনার উপযোগী করা যেতে পারে। নতুন এক্সপ্রেসওয়েতে প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব হলে মজবুত ও সোজা অংশ, অপসারণযোগ্য বিভাজক এবং বাধামুক্ত প্রবেশপথ রাখা উচিত। একই সঙ্গে সুরক্ষিত বিমান-আশ্রয়কেন্দ্র, বিকেন্দ্রীভূত জ্বালানি ও গোলাবারুদের মজুত, বিকল্প কমান্ড সেন্টার এবং দ্রুত রানওয়ে মেরামতকারী ইউনিট গড়ে তুলতে হবে। মেট্রোরেল স্টেশন, ভূগর্ভস্থ পার্কিং ও বড় সরকারি ভবনকে বেসামরিক আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনাও পরীক্ষা করা দরকার। দেশে জরুরি সতর্কীকরণব্যবস্থা, স্থানান্তর পরিকল্পনা, প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ, অগ্নিনির্বাপণ সক্ষমতা এবং নিয়মিত জাতীয় প্রস্তুতি মহড়া থাকা উচিত। এ ধরনের ব্যবস্থা শুধু যুদ্ধ নয়, ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, শিল্প দুর্ঘটনা ও অন্যান্য দুর্যোগেও জনগণকে রক্ষা করবে।

দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে গোলাবারুদ, ড্রোন, যোগাযোগ সরঞ্জাম, নজরদারি ব্যবস্থা এবং নির্বাচিত সামরিক উপাদান তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। আমদানি করা সরঞ্জাম যাতে পুরোপুরি বিদেশি প্রযুক্তিবিদ ও বিদেশের কারখানার ওপর নির্ভরশীল না থাকে, সেজন্য দেশে মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও ওভারহল সুবিধা সম্প্রসারণ করা জরুরি। বড় প্রতিরক্ষা চুক্তিতে প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্থানীয় প্রশিক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং দীর্ঘমেয়াদি রসদ-সহায়তা অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। প্রতিরক্ষা ব্যয়ে স্বচ্ছতা, পেশাগত মূল্যায়ন এবং কার্যকর নিরীক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। সামরিক আধুনিকায়নের সমর্থন মানে অপচয়, দুর্নীতি বা অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটাকে সমর্থন করা নয়। প্রতিটি ক্রয় বাস্তবসম্মত হুমকি বিশ্লেষণ, সামরিক প্রয়োজন ও পূর্ণ জীবনচক্রের ব্যয়ের ভিত্তিতে হতে হবে।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উন্নয়ন ও প্রতিরক্ষা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। একটি দেশে বিদ্যালয়, হাসপাতাল, সড়ক ও শিল্পকারখানা প্রয়োজন; একই সঙ্গে সেগুলো রক্ষা করার সামর্থ্যও প্রয়োজন। সিঙ্গাপুর, ফিনল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড ও সুইডেন প্রতিরক্ষাকে অবহেলা করে সমৃদ্ধ হয়নি; তারা অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামরিক সক্ষমতা এবং বেসামরিক প্রস্তুতি একসঙ্গে গড়ে তুলেছে। নাগরিকদের অবশ্যই প্রতিরক্ষানীতি ও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার রয়েছে। গঠনমূলক সমালোচনা প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে। কিন্তু সশস্ত্র বাহিনীকে অযথা বিদ্রুপ করা কিংবা জাতীয় প্রস্তুতি দুর্বল করার উদ্দেশ্যে প্রচারিত বয়ান অন্ধভাবে অনুসরণ করা কোনো দেশপ্রেমিক কাজ নয়। বাংলাদেশ সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়—এই নীতিতে বিশ্বাস করে। কিন্তু বন্ধুত্ব প্রস্তুতির বিকল্প নয় এবং আশা কোনো প্রতিরক্ষা কৌশল হতে পারে না। শান্তি ও শক্তির মধ্যে আমাদের একটিকে বেছে নিতে হবে না; বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধক্ষমতাই দীর্ঘস্থায়ী শান্তির অন্যতম ভিত্তি। যে জাতি নিজের প্রতিরক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেয় না, সে জাতি একদিন নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের স্বাধীনতাও হারাতে পারে। বাংলাদেশকে শান্তিপ্রিয় কিন্তু প্রস্তুত, বন্ধুত্বপূর্ণ কিন্তু আত্মসমর্পণহীন, সমৃদ্ধ কিন্তু সুরক্ষিত এবং সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সর্বদা সক্ষম থাকতে হবে।

hrmrokan@hotmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন