‘যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রামে মিছিলের সামনেই থাকতে হয়। মিছিলের সামনে না থাকলে আন্দোলনের স্বাদ বোঝা যায় না। তাই আমি প্রত্যেক মিছিলের সামনেই থাকতে পছন্দ করি।’ শহীদ হওয়ার আগে বাবার কাছে এভাবেই নিজের অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পাবনায় শহীদ হওয়া শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম জাহিদ। ৪ আগস্ট আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের গুলিতে শহীদ হন তিনি।
পাবনা সদর উপজেলার চর বলরামপুর গ্রামের দুলাল উদ্দিন মাস্টার ও আফিয়া খাতুন দম্পতির সন্তান জাহিদুল ইসলাম। পাবনা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ইলেকট্রনিকস বিভাগের ষষ্ঠ সেমিস্টারের ছাত্র ছিলেন তিনি। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন জাহিদ। তার বাবা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, মা গৃহিণী।
ছেলেকে হারিয়ে অনেকটাই বাকরুদ্ধ জাহিদের বাবা-মা। সন্তান হারানোর শূন্যতা মানতে পারছেন না তিনি। গত ৪ আগস্ট ছাত্র আন্দোলনে যান জাহিদসহ তারা তিন ভাই। দুই ভাই সুস্থভাবে বাড়ি ফিরলেও, জাহিদ ফিরলেন নিথর দেহে। তিন ভাইয়ের আড্ডা, দৌড়া-দৌড়িতে মুখর বাড়িটায় এখন সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে।
জাহিদের বাবা দুলাল উদ্দিন মাস্টার বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে জাহিদকে কলেজে যাওয়ার ভাড়া ও খাওয়ার খরচের টাকা দিয়ে যাই। ওই দিন পলিটেকনিকে যাওয়ার সময় জাহিদ বলে, আব্বু টাকা দিয়ে গেলেন না।’ তখন বললাম, ‘দেখ ড্রয়ারে আছে, নিয়ে যাও।’—এটাই ছিল তার সঙ্গে আমার শেষ কথা। বলছিলাম যেখানেই যাও, দেখে শুনে যাও, সাবধানে থেকো।’
দুলাল উদ্দিন আরও বলেন, ‘আমার ছেলে জাহিদ সব সময় মিছিলের সামনে থাকত। ফেসবুকের ভিডিওতে দেখতাম সেটা। বলতাম, বাবা মিছিলের আগে থাকো কেন? যদি পুলিশের গুলি লাগে?’ তখন জাহিদ বলত, ‘বাবা যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রামে মিছিলের সামনেই থাকতে হয়। তা ছাড়া এটার স্বাদ বা মজা বুঝা যায় না।’ তিনি বলেন, ‘জাহিদ আন্দোলনের শুরু থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে।
মেসেঞ্জার-হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ করে সবাইকে আন্দোলনের জন্য সংগঠিত করেছে। আমার ছেলে শহীদ হয়েছে তাতে দুঃখ নেই। দেশতো স্বাধীন হয়েছে, এটাই আলহামদুলিল্লাহ। দেশের মানুষ এখন স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছে। শহীদদের রক্ত যাতে বৃথা না যায় সেদিকে যেন সরকার দৃষ্টি রাখে।’
জাহিদের মা আফিয়া আক্তার বলেন, ‘ওই দিন দুপুরের পর মোবাইলে ওই ঘটনা (ছাত্র আন্দোলনের ভিডিও) দেখে বাড়ির সবাই এদিক-ওদিক গিয়ে কাঁদে। তখনই বুঝতে পারি আন্দোলনে যাওয়া তিন ছেলের মধ্যে একজনের কিছু হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ছেলে নেই তা কী হয়েছে, দেশের মানুষ যে শান্তিতে আছে, খোলামেলাভাবে কথা বলছে, বুকভরে শ্বাস নিতে পারছে— এটাই বড় পাওয়া।’ আফিয়া আক্তার আরও বলেন, ‘আমার ছেলে ছোটবেলা থেকেই ধার্মিক ছিল।
নামাজ-কালাম থেকে শুরু করে এলাকার কেউ মারা গেলে সবার আগে ছুটে যেত। এলাকার শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করত। ছাত্রদের ডেকে নামাজে নিয়ে যেত। ইসলামের বিষয়ে শিক্ষা দিত। কোনো সময় বাজে আড্ডায় যেত না। আল্লাহ যেন আমার ছেলেকে শান্তিতে রাখেন এই দোয়া করি।’
জাহিদের বড় ভাই তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘যখন সমাবেশে গুলিবর্ষণ শুরু হয় তখন আমি জাহিদের কাছ থেকে ২-৩ মিটার দূরে ছিলাম। হুড়োহুড়িতে প্রথমে বুঝতে পারিনি। কিছু সময় পর জানতে পারি আমার ভাই জাহিদের গুলি লেগেছে এবং সে হাসপাতালে মারা গেছে। পড়াশোনা শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার কথা ছিল জাহিদের।’
৪ আগস্ট বেলা সোয়া ১১টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ছাত্র-জনতা বিক্ষোভে নামেন। পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের প্রধান ফটক থেকে তারা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে জেলাশহরের ট্রাফিক মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে দুই শিক্ষার্থীসহ তিনজন নিহত ও অন্তত ২৫ জন গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনায় আহত হন শতাধিক শিক্ষার্থী।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

