হাসিনার পলায়নের ব্রেকিং দিয়ে সুরা যত মুখস্থ ছিল সব পড়েছি

হাসিনার পলায়নের ব্রেকিং দিয়ে সুরা যত মুখস্থ ছিল সব পড়েছি

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই কেবল একটি মাস নয়; এটি এক অবিনাশী অধ্যায়ের নাম, বাঙালির রক্ত দিয়ে লেখা দ্বিতীয় স্বাধীনতার মহাকাব্য। সে মহাকাব্যের রচয়িতাদের সঙ্গে যেসব সাংবাদিক যুক্ত ছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। সে সময় তিনি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির বাংলাদেশের ব্যুারো চিফ ছিলেন। আন্দোলনের খবর প্রচারের জন্য তাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন সে সময়ের তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত। আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে আসে জুলাইয়ের সেই উত্তাল ইন্টারনেটবিহীন দিনগুলোতে তার কাজের ধরন, চ্যালেঞ্জ আর ভীতিকর অভিজ্ঞতার কথা। তিনি জানান, ৫ আগস্ট বিজয়ের খবর জীবন আর ক্যারিয়ারের ঝুঁকি নিয়ে ব্রেক করার সেই গল্প, হাসিনার পালানোর খবর। এর পাশাপাশি এই আলাপচারিতায় অংশ নেন আমার দেশ-এর যুগ্ম সম্পাদক এম আবদুল্লাহ

বিজ্ঞাপন

ফ্যাসিবাদী শাসনের ২৭ মামলা মাথায় নিয়ে কী করে জুলাইয়ে মাঠে সক্রিয় ছিলেন এবং খবরের পেছনে ছুটেছেন—শুনিয়েছেন সেসব কথা। নিচে এই আলাপচারিতার বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন : জুলাই ব্যাপক ও বৃহত্তর একটি আন্দোলন। ওই সময় বার্তা সংস্থা এএফপির পক্ষ থেকে আপনাদের ভূমিকা কেমন ছিল?

শফিকুল আলম : ৫ জুন হাইকোর্টের রায়ের পর থেকেই আমরা ধারণা করেছিলাম আন্দোলন নতুন করে দানা বাঁধতে পারে। শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যকেন্দ্রিক ছোট ছোট প্রতিবাদ সভা হচ্ছিল এবং ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনের নেতারা কিছুটা দ্বিধাবিভক্ত ছিলেন। আক্তার, নাহিদ, আকরামরা প্রতিবাদ করছিলেন। তবে তা বেশ ছোট পরিসরে। আমি এদের চিনতাম; কারণ তাদের অনেকেই আমার অফিসে আসতেন, ২০১৮-এর আন্দোলনের সময় থেকেই। তাদের যখন টর্চার করা হয়, তখন আমি তাদের নিয়ে নিউজ করি। তাদের ভয়েসটা ইন্টারন্যাশনাল প্রেস অনেক সময় কাভার করতে চাইত না। আপনি লোকাল প্রেসে (স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে) দোসর খোঁজেন, ইন্টারন্যাশনাল প্রেসেও কিন্তু অনেক দোসর আছে। তারা বাইরের সংবাদমাধ্যমকে বোঝাতে চায় যে, এখানে কিছু হচ্ছে না। এই সরকার অনেক পপুলার। আন্দোলনটা দানা বাঁধতে শুরু করে জুলাইয়ের প্রথম দিকে। যখন ‘বাংলা ব্লকেড’ ঘোষণা করা হলো।

আমি তখন এএফপির ব্যুরো চিফ। এএফপি হচ্ছে বিশ্বের প্রধান তিনটি সংবাদ সংস্থার একটি। আমরা এটা কাভার করতে শুরু করলাম সেদিন, যখন রাজু ভাস্কর্য থেকে ওরা মিছিল নিয়ে শাহবাগ দখল করল, তখন থেকে আন্দোলন গতি পায়। এটা ছিল ৭ বা ৮ জুলাই।

আমি অবাক হয়েছিলাম, যখন দেখলাম রোকেয়া হলের সামনে থেকে মেয়েরা লেয়ার আফটার লেয়ার মিছিলে যোগ দিচ্ছেন। এর আগে আন্দোলনে এত মেয়ের অংশগ্রহণ আমি দেখিনি। ওখানেই আমি নাহিদকেও দেখলাম। ওই সময় আমি ফেসবুকেও নাহিদকে নিয়ে ৫০০ শব্দের একটি লেখা লিখেছি।

সেখানে দেখলাম তারা খুব প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। কেমন প্রস্তুতি সেটা? ২০১৮ সালের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা এবার কোনো একক নেতা না রেখে ৫৭ জন কো-অর্ডিনেটর মনোনীত করেছিল, যাতে পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করলেও আন্দোলন থেমে না যায়। এর আগে ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনের সময় নুরুল হক নুরের একক নেতৃত্বে তারা বিক্ষোভ করেছিল। নুর গ্রেপ্তার হওয়ার পর সে আন্দোলন ভেঙে পড়েছে। এবার আর তারা সে ভুল করেনি। নাহিদ আর মাহফুজ আমাকে বলল, তারা দ্রুতই সমন্বয়কদের সংখ্যা ১১০ থেকে ১৫০ করার পরিকল্পনা করছিল। তখনই তারা এর সঙ্গে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের যুক্ত করার চেষ্টা শুরু করে। সে সময়ই আমি বুঝলাম তারা খুবই ক্যালকুলেটেড ওয়েতে আন্দোলনে নেমেছে। এবার তারা সফল হবেই।

সেখানে আমি ছাত্রদলের ছেলেমেয়েদের দেখেছি। তারা পরিচয় দিচ্ছিল না; তবে তারা আছে। শিবিরের ছেলেদের দেখেছি। গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তির ছেলেমেয়েদের দেখেছি। বামপন্থি ছেলেরাও ছিল।

বিষয়টি নেশনওয়াইড হলো কবে? এরপরও ওরা অনেকগুলো বাংলা ব্লকেড করেছে। তবে তখনো আমরা ৩০০, ৪০০ বা ৫০০ শব্দের নিউজ করছিলাম। এর বেশি নয়। যেদিন রাতে ‘রাজাকার রাজাকার’ বলে মিছিল বের হলো, সেদিনই গণবিস্ফোরণ হয়েছে। ওইদিনই ছিল প্রথম বড় আন্দোলন। আমরা সবাই সারপ্রাইজড হয়ে গেছি। তখনকার স্বৈরাচার যে প্রেসব্রিফিং করল, রাজাকারের বাচ্চা বলল—এটাই মানুষের মনের ডিগনিটিতে গিয়ে আঘাত হেনেছিল।

আলাপচারিতায় শফিকুল আলম ও এম আবদুল্লাহ। ছবি: আমার দেশ
আলাপচারিতায় শফিকুল আলম ও এম আবদুল্লাহ। ছবি: আমার দেশ

১৪ তারিখে এটা হলো। আমরা ১৫ তারিখে কাভার করলাম। ওইদিন ছাত্রলীগের ছেলেরা মেয়েদের বেধড়ক পিটিয়েছে। ১৬ তারিখে আবু সাঈদ শহীদ হলেন। সারা দেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল। ইন্টারন্যাশনাল প্রেস সবচেয়ে বেশি কাভার করা শুরু করল ১৬ তারিখ থেকে। ওইদিন ছয়জন মারা গেল, এটা আর অ্যাভয়েড করা যায় না।

বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আবু সাঈদের যে ভিডিওগুলো সামনে আসছিল, একজন বিদেশির জন্য বিষয়টি বিস্ময়কর, এটা কী দেখছে তারা!

১৭ তারিখে আমি গায়েবানা জানাজা কাভার করতে গিয়ে ক্ল্যাশের মধ্যে (সহিংসতার মধ্যে) পড়ি। পুলিশ ওখানে মিছিলের পেছনে সাউন্ড গ্রেনেড মেরে মিছিলটি ডিসবার্স করার চেষ্টা করল। ওই রাতে বিভিন্ন হল ভ্যাকেন্ট করে দেয় কর্তৃপক্ষ। ফলে পুরো ইউনিভার্সিটি ভূতুড়ে এলাকা হয়ে গেছে।

আমি ফিরছি, তখন পুলিশের সঙ্গে কথা হচ্ছে। রমনার এডিসি আমাকে দেখে মশকরা করে বলেন, যান যান, যেদিন ভার্সিটি খুলবে, তখন আবার যদি আন্দোলন দানা বাঁধে, তখন আবার আসবেন। এবারের মতো আন্দোলন সমাপ্ত। কারণ, শেখ হাসিনাসহ স্বৈরাচারের পাটে যারা ছিল, তাদের সবার ধারণা ছিল বাংলাদেশে পাবলিক ইউনিভার্সিটির হলের ছেলেরাই বেশি আন্দোলন করে। হল খালি হলে দেশে আর কোনো আন্দোলন থাকে না। এর কারণও আছে। ৯০-এর আন্দোলনেও একই ঘটনা ঘটেছিল।

১৭ তারিখ রাত থেকেই মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় সরকার। ১৮ তারিখে অবস্থা ছিল আমরা কিছু ইন্টারনেট পাই, কিছু পাই না। ওইদিন বেলা ১১টায় অফিসে বসে আছি। হঠাৎ করেই আমার ফটোগ্রাফার ও ভিডিও জার্নালিস্ট আমাকে জানালেন, ভাই সারা ঢাকা একটা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার ছেলেমেয়ে রাস্তায় নেমে গেছে। আমি তখন ডিএমপির স্পোকসপারসনকে ফোন করে জানতে চাইলাম, ঢাকায় আজ কত লোক নেমেছে। তিনি জানালেন দুই লাখ পার হবে। এদের প্রায় সবাই প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়ে।

আপনি বলতে পারেন ওইদিন বিষয়টি নেশনওয়াইড হয়ে যায়। ১৮ তারিখ সকালে তারা শটগান, রাবার বুলেট আর টিয়ারগ্যাস ব্যবহার করে। বেলা ৩টার দিকে ওদের সেসব গোলাবারুদের মজুত ফুরিয়ে যায়। তখন নির্দেশ আসে গুলি করার। ওই ৩টার পর থেকে ওরা লাইভ বুলেট মারা শুরু করে। আপনি যদি ওইদিনের কথা মনে করেন, ৩টা পর্যন্ত সব আহত ছিল ছররা বুটেলে ঝাঁঝরা হওয়া। এরপর থেকে যা আসে, সব বুলেটবিদ্ধ। আমরা খোঁজ নিচ্ছিলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ অন্যান্য হাসপাতালে। আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছেন, যিনি উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালের মালিক। তিনি আমাকে জানালেন, সকালের আহতরা সবাই ছররা গুলির। আর বিকালের দিকে যা আসছে, সব বুলেটবিদ্ধ।

আমি আপনাকে সিনারিওটা বোঝালাম। পরে ইন্টেরিম গভর্নমেন্টে ঢোকার পর এসএসএফের অনেক সদস্য আমাদের সঙ্গে কাজ করত, যারা হাসিনার আমলেও ছিল। এসএসএফের এক সিনিয়র কর্মকর্তা আমাদের বলেন, ওইদিন রাতে হাসিনাকে যখন বলা হয় ৭০-৮০ জন মারা গেছে, তখন তিনি বলেন, তাহলে আমি রিজাইন করি, এরা যখন আমাকে চাইছেই না। তবে পরদিন সকালেই তিনি আবার তার আগের রূপে ফিরে যান।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এই বিক্ষোভ কাভার করতে শুরু করে ১৬ জুলাই থেকে। স্থানীয়গুলো ১৪ তারিখ থেকে। আর আমরা যারা অপজিশনকে একটু স্পেস দিতাম, তারা কাভার করছি প্রথম সপ্তাহ থেকেই।

এম আবদুল্লাহ : ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় সংবাদপত্রের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছিল। ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়ার দিকে আমরা যদি দেখি, সবাই বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। ওই সময় তাদের ওপর সরকারেরও চাপ ছিল। বিবিসির আতাউস সামাদকেও গ্রেপ্তার করা হয়।

এবার আপনারা ইন্টারন্যাশনালি নিউজ কাভার করার ব্যাপারে সরকারের দিক থেকে কী ধরনের চাপের মধ্যে ছিলেন?

শফিকুল আলম : ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়ার অনেকেই ছিলেন দোসর। ১৮ তারিখের আন্দোলনটি যে একটি বিপ্লবের দিকে টার্ন নিচ্ছে, এটাকে তারা সেভাবে দেখেনি। তারা বিষয়টিকে দেখানোর চেষ্টা করেছে এভাবে—বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ, এখানে পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স হয়ে থাকেই।

তবে এএফপি, আলজাজিরা এবং কিছু ক্ষেত্রে নেত্র নিউজ দেখিয়েছে, এখানে যা হচ্ছে—তা হাসিনার বিরুদ্ধে গণবিস্ফোরণ। আমরা প্রথম থেকেই এটা দেখিয়েছি। ৯০-এর আন্দোলন যদি দেখেন; আমি সে আন্দোলনেও ছিলাম। আমি তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্র। তখন আন্দোলন হতো মাত্র কয়েটি জায়গায়। মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক আন্দোলন। তাও পুরো ঢাকা নয়। টিএসসি, দোয়েল চত্বর, মল চত্বর, গুলিস্তান—এই তো। তবে ব্যাপ্তি এবারের মতো নয়। আপনি দেখুন, ১৬ তারিখে আবু সাঈদ মারা গেছে রংপুরে, ওয়াসিম চট্টগ্রামে। ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’—এই স্লোগান শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই দেওয়া হয়নি; পুরো দেশের সব ক্যাম্পাসেই এ স্লোগান দেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি ছিল আপনি আমার ডিগনিটিতে, আমার সম্মানে হাত দিয়েছেন। একটি ইয়াং ছেলের কাছে তার সম্মানটাই সবচেয়ে বেশি ইম্পর্টেন্ট। আমি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বহু ছাত্রের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের আন্দোলনে নামার মূল কারণ ওই জব কোটা নয়। কারণ, ওই ডিগনিটি। আপনি আবু সাঈদকে- ওয়াসিমকে এভাবে মারলেন—এটা আমরা মেনে নেব না।

১৮ তারিখ রাত ৯টায় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। ব্রডবেন্ডও বন্ধ হয়ে যায়। মোবাইলের নেট ছিল না আগের দিন থেকেই। তখন আমাদের একটি বড় ভূমিকা ছিল।

প্রশ্ন : এটা নিয়েই কথা বলতে চাচ্ছিলাম। ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আপনারা কী করে কাজ করেছেন? অনেকের ক্ষেত্রেই তখন শুনেছিলাম, সরকার থেকে তাদের কিছু সময়ের জন্য ইন্টারনেটের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। আপনারাও কি সে ধরনের সুবিধা পেয়েছেন?

শফিকুল আলম : একেবারেই মিথ্যা কথা। কেউই কানেকশন পায়নি। ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আর সবার মতোই আমরাও এএফপি বন্ধ করে দিয়ে বাড়ি চলে গেছি। পরদিন সকাল সাড়ে ৮টায় অফিসে যাওয়ার পর কম্পিউটার ওপেন করে দেখি, আমার ইন্টারনেট আসছে। এর কারণ হলো আমাদের একটি আলাদা ভিস্যাট কানেকশন নেওয়া ছিল, ইন্টারনেটের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে। বহু বছর ধরে আমরা এর জন্য পে করে আসছিলাম। এত বছর পর এসে সেটা কাজে লাগল।

১৯ তারিখে ভিস্যাট সুবিধা পাওয়ার পর আমরা ১৮ তারিখের ভিডিও ফুটেজ পাঠালাম। সেগুলো আমাদের হাতে এসেছে বেশ পরে। এই যে পাঠানো শুরু করলাম, সেটা আবার জানাজানি হয়ে গেল আমাদের কম্পিটেটরদের (প্রতিযোগী সংবাদমাধ্যমের) কাছে। তখন রয়টার্সের এশিয়া চিফ আমাদের এশিয়া চিফের কাছে ফোন করে বললেন, তোমরা তো ইন্টারনেট সুবিধা পেয়ে গেছ, আমাদের একটু ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ করে দাও। আমার যে এশিয়া চিফ আলজেরিয়ান ফ্রেঞ্জ মেহিদি লেবুচরা, তিনি বললেন, শফিক, এটা তুমি সিদ্ধান্ত নেবে নেট ব্যবহার করতে দেবে কি-না। এমন যদি হয় তুমি দিলে, এরপর তোমাকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেল; তাহলে তো আমার কাভারেজও হলো না, আবার তুমিও অ্যারেস্ট হয়ে গেলে। কাজেই তুমি কী করবে, সে সিদ্ধান্ত তুমি নাও। তুমি যদি দাও, তাহলে আমরা তোমার সঙ্গে আছি। তুমি যদি না দাও, তাহলেও তোমার সঙ্গে আছি। আমি তখন আমার কলিগদের সঙ্গে কথা বললাম। তারপর জানালাম, আমরা সবাইকেই ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দেব। আমি শুধু রয়টার্সকেই দিইনি, নিউ ইয়র্ক টাইমস, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস, গার্ডিয়ান, আলজাজিরা, নেত্র নিউজ, এপি—বাংলাদেশে যারা বিদেশি সংবাদমাধ্যমের জন্য কাজ করেন, তাদের সবাইকেই নেট ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছি।

আমাদের মোট পাঁচটি কম্পিউটার। সেখানে ১৯ তারিখ থেকে ২৪ তারিখ পর্যন্ত দিনে গড়ে ৫০ থেকে ৬০ জন আমাদের অফিসের ইন্টারনেট ব্যবহার করেছেন। পরে আমি সময় ভাগ করে দিতাম। বলতাম, কেউ ১০ মিনিটের বেশি নেবেন না। ১০ মিনিট হলে আবার আরেকজন এসে বসতেন। অনেকে আবার আছেন ফ্রিল্যান্সিং করেন। গ্লোবাল অনেক পত্রিকায় লেখেন তারা। অনেক অ্যাক্টিভিস্ট আছেন, যারা শুধু ফুটেজ পাঠান বা ছবি পাঠান। ইন্টারনেট না থাকলে আপনি ফোনে কথা বলে বা টেক্সট করে নিউজ পাঠাতে পারবেন; কিন্তু ফুটেজ বা ছবি পাঠানো সম্ভব নয়। আমরা তখন সবাইকে ভিডিও ও ছবি পাঠানোর জন্য এলাউ করেছি। এ টু জেড। পুরো বিশ্ব তখন বাংলাদেশের নিউজ পেয়েছে এএফপির কারণেই।

এছাড়া প্রথম আলো, ডেইলি স্টারসহ ২৫টি পত্রিকা ছিল আমাদের ক্লায়েন্ট। তারা শুধু লোকাল নিউজ দিয়ে তো আর পত্রিকা ভরতে পারে না। তারা আমাদের কাছে এসেছে। আমরা তাদেরও সুযোগ দিয়েছি। আমরা কাউকে ‘না’ বলিনি। এদের অনেককে আমরা লাঞ্চও করিয়েছি। দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিনে এসে আমাকে আলজাজিরা, ফিন্যান্সিয়াল টাইমসসহ কয়েকটি পত্রিকার সংবাদিক বললেন সাবধানে থাকতে, আমার কাজের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। ওই সময়ের তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত আমার ওপর খুবই ক্ষিপ্ত হয়ে আছেন। তখন আমার মনে হয়েছে, আমাকে খুব বেশি হলে অ্যারেস্টই করবে। যে পরিমাণ মৃত্যু তখন পর্যন্ত আমি দেখেছি, তাতে বিষয়টি আমাকে আর খুব বেশি প্রভাবিত করতে পারেনি।

আমি সবাইকে অ্যালাও করেছি। সবাই নিউজ করেছে। কিছু ক্ষেত্রে লোকাল পত্রিকাগুলো আমার কাছে এসেছে, যারা নিজেদের পত্রিকায় তাদের নিউজ ছাপতে পারেনি। আমার মনে আছে, এনটিভির একটি ছেলে আছে নূর, এখন নাহিদের সঙ্গে কাজ করে, সে একটি ফুটেজ নিয়ে এসেছিল। রামপুরার দিকে বিডিআরের কর্নেল শ্যুট করছে—সেই ভিডিও। তার অফিস এই ফুটেজ দেখাতে দেবে না। আমি সেটা নিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি।

এছাড়া আমাদের আর্মিরা যে ইউএনের এপিসি ব্যবহার করে, সেটি আমাদের ব্রেকিং ছিল। লোকাল পত্রিকাগুলো তো এটা ব্যবহার করতে পারবে না।

আবার নাহিদসহ সবাই যখন অ্যারেস্ট হয়ে গেলেন, তখন তাদের ৯ দফাটা আমাদের কাছেই প্রথম নিয়ে এসেছিল। আমরা বাকিদের কাছে সার্কুলেট করেছি। নাহিদদের ভুয়া কোট করে মোহাম্মদ আলী আরাফাত একটি কাজ করতে চেয়েছিলেন যে, আন্দোলন স্থগিত হয়ে গেছে। পরে কাদের, মাসুদ আমাদের জানিয়েছেন যে, আন্দোলন স্থগিত হয়নি, তারা ভুল বলছে। আমরা যখন এর কাউন্টারে রিপোর্ট করলাম, তখন আরাফাত আমাদের ওপর খুব ক্ষিপ্ত হলন। হুমকি দিয়েছিলেন এই‌ বলে যে, আন্দোলন শেষ হোক, এএফপিকে তিনি দেখে নেবেন। সে হুমকি আমলে নেইনি। কারণ, আমরা একা তো নই, আরো অনেকেই আমাদের সঙ্গে রয়েছেন। পাঁচজনের অফিসে আমরা ৫০ জন কাজ করছি—এমন একটা অবস্থা।

প্রশ্ন : সারা দেশে তখন ভয়াবহ ঘটনা ঘটছিল। আপনার অফিসে মাত্র পাঁচজন কর্মী রয়েছেন বললেন। তাহলে খবর সংগ্রহ করতেন কী করে?

শফিকুল আলম : আমাদের নেটওয়ার্ক ছিল। আরেকটি কাজ আমরা করতাম, যে কোনো মৃত্যুর ক্ষেত্রে আমরা হাসপাতাল বা পুলিশের বক্তব্য নিতাম। কাজেই আমাকে কেউ চ্যালেঞ্জ করলেও আমার বক্তব্য থাকে। আমি জেনেশুনে বলছি যে, এত লোক মারা গেছে। তবে আমি যেটা বলছি, সেটাও কনজারভেটিভ। আরো বেশি লোক মারা গেছে। আবার সব জায়গাতেই কেউ না কেউ থাকে, যাদের কথা আমরা শুনতে পারি। যেমন—উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতাল থেকে আমার বন্ধু জানালেন দুপুর পর্যন্ত প্রায় হাজারখানেক রোগী এসেছে ছররা বুলেটের আঘাত নিয়ে। বেলা ৩টার পর সে বলল, আমাদের এখানে ১০টির মতো লাশ এসেছে। আবার তাকেই যখন কোনো লোকাল সাংবাদিক ফোন করেছেন, তখন তাকে আর কোনো তথ্য দেননি।

আমার মতে, সবচেয়ে বেশি কিলিং হয়েছে ১৮-২২; তারপর ৪ ও ৫ তারিখে।

এম আবদুল্লাহ : ইন্টারনেট বন্ধ হওয়ার পর অবরুদ্ধ অবস্থায় কতটুকু সাংবাদিকতা করা গেছে বলে আপনি মনে করেন? আপনি নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন এ সময় জুনিয়র তথা তরুণ ছেলেরাই অনেক বেশি চেষ্টা করেছে।

শফিকুল আলম : এটাকে আমি একটি জেনারেশনাল চেঞ্জ বলব। ইয়াং ছেলেরা সবাই বিদ্রোহ করেছে, এনাফ ইজ এনাফ। তবে সিনিয়ররা, যারা পূর্বাচলে প্লট পেয়েছেন, আওয়ামী লীগের ক্রিম খেয়েছেন, তারা খুব সতর্কভাবে ন্যারেটিভ তৈরি করতে চেয়েছেন এই বলে, এসব কাজ জঙ্গিরা করছে; ইসলামিক জঙ্গিরা করছে এবং সরকার ন্যায়সংগতভাবেই ক্র্যাকডাউন করছে। ওদের মূল ইস্যুটা হচ্ছে এই যে, ক্র্যাকডাউন তো ইন্টারন্যাশনালি জায়েজ করতে হবে। ইন্টারনেট শাটডাউনের মূল কারণটা কী? পুরো পৃথিবী অন্ধকারে থাকবে আর আমি এখানে গণহত্যা চালাব—এটা হতে দেয়নি অকুতোভয় ইয়াং জার্নালিস্টরা। এই যে হাসান মেহেদী, তাকে একদম টার্গেট করে গুলি করা হয়েছে।

আমরা ইন্টারন্যাশনালি কাভার করার কারণেই লোকাল পত্রিকাগুলোর পক্ষেও এটা অ্যাভয়েড করা সম্ভব হয়নি।

প্রশ্ন : আবদুল্লাহ ভাই, আপনার কাছে আমার প্রশ্ন, ওই সময় আপনার মাথার ওপর ২৭টি মামলা ছিল। এই পরিস্থিতির মধ্যে আপনি কী করে সক্রিয় ছিলেন, কীভাবে খবর সংগ্রহ করতেন?

এম আবদুল্লাহ : আমার দেশ পত্রিকা তখন বন্ধ। আমার কোনো মিডিয়া ছিল না। কিন্তু আমরা কখনই দমে যাইনি। আমার প্রয়োজন ছিল না। ঘর থেকে না বের হলেও পারতাম। কিন্তু এই আন্দোলন এগিয়ে নেওয়াকে আমি আমার দায়িত্ব বলে মনে করেছি। আমি একটি কাজ করতাম, সারাদিনের সব ঘটনা কম্পাইল করতাম। তারপর হোয়াটসঅ্যাপে বা অন্যভাবে সবাইকে দিতাম। আমার কাছে কেউ চায়নি। তবে আমার মনে হতো, দিন শেষে যারা রিপোর্ট করবে, এটা তাদের জন্য সহায়ক হবে। ঢাকা শহরের হটস্পটগুলোতে আমি ঘুরে বেড়াতাম। ভিডিও সংগ্রহ করতাম। ওই সময় আমি আলাদা হার্ড ড্রাইভ কিনেছিলাম এসব ফুটেজ সংগ্রহে রাখার জন্য। আমার মনে হয়েছিল, এটা যদি আমি এখন দিতে নাও পারি, পরে কাজে লাগবে। এজন্য হার্ডডিস্কে সব ডাউনলোড করে রেখেছিলাম।

১৮ জুলাই উত্তরায় ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের ঘটনার পর ফেসবুকে আমি ওই ভিডিও আপলোড করেছি। সেটা হয়তো বেলা আড়াইটা বা ৩টার দিকে। এরপরই আমার ওপর হুমকি আসতে থাকে। অজ্ঞাত নম্বর থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়; ভিডিওগুলো সরাতে বলে। আইডির ওপর হুমকি আসে। যদিও আগে থেকেই তথ্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেল আমার ফেসবুক পোস্টে উষ্মা প্রকাশ করে আসছিল। হাসান মাহমুদের সময় থেকেই আমার ফেসবুকে লেখালেখি নিয়ে তাদের আপত্তি ছিল। তথ্য মন্ত্রণালয়ের পিআইডিতে একটি মনিটরিং সেল ছিল। যাদের ফেসবুক আইডি তারা মনিটর করত, তাদের ব্যাপারে নিয়মিত রিপোর্ট করত তারা। আমার ফেসবুক আইডি নিয়েও তাদের কাছে রিপোর্ট ছিল।

তথ্য মন্ত্রণালয়ের পিআরও তখন ছিলেন আকরাম। একটি পোস্ট নিয়ে ফোন করে খুব চড়া গলায় বললেন, আপনাকে নিয়ে কিন্তু আলোচনা হচ্ছে; বিপদে পড়ে যাবেন। একটি পোস্ট সরিয়ে নিতে বলছিলেন তিনি। রাত থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চার-পাঁচবার তার সঙ্গে এ নিয়ে কথা হয়। আমি রাজি না হলে তিনি বললেন, তাহলে বিষয়টি নিয়ে আমরা প্রসিড করতে বাধ্য হব। তখন আর তথ্য মন্ত্রণালয়কে দোষারোপ করতে পারবেন না। তারপর রাজি না হলে তিনি আমাকে ওই পোস্ট অন্তত ‘অনলি মি’ করে রাখতে বলেন, নয়তো মামলা হয়ে যাবে। মামলার সুপারিশ-সংক্রান্ত মনিটরিং সেলের একটি রিপোর্টও আমাকে পাঠিয়েছিলেন তিনি।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আমরা কাজ করেছি। নিজস্ব মিডিয়া নেই; তারপরও খবর সংগ্রহ করা নিজের জন্য, অন্যদের দেওয়ার জন্য। প্রাণান্তকর একটা প্রচেষ্টা ছিল। আমার সঙ্গে জুনিয়র সাংবাদিকদের অনেকেই কাজ করেছেন। আমার লেখায় আপনি দেখেছেন ইসরাফিল ফরাজি, কেফায়েত শাকিলসহ অনেকের নাম। বিশেষ করে মোবাইল জার্নালিস্টরা সে সময় যে কী ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন, তাদের স্বীকৃতি না দিলে সত্যকে অস্বীকার করা হবে, অকৃতজ্ঞতা হবে। বড় একটি অধ্যায় বাদ থেকে যাবে। যখন মেইন স্ট্রিম মিডিয়া তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ, তখন মোবাইল জার্নালিস্টরাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের অভাব পূরণ করে দেন। ফটোসাংবাদিক, ভিডিও জার্নালিস্টদের অধিকাংশই আন্দোলনের পক্ষে সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন।

প্রশ্ন : শফিক ভাই, আপনার কাছে আমার জানার ছিল যে, হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর যে ইস্যুটি, এটাও এএফপির ব্রেকিং ছিল। এপিসিতে ইউএন লোগো লাগানো এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলি—দুটি বিষয়ই আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এ নিয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।

শফিকুল আলম : বাংলাদেশে ইউএন রেসিডেন্ট চিফ আমার খুব ভালো বন্ধু ছিলেন। তাকে আমরা এগুলো পাঠালাম। তারা সঙ্গে সঙ্গে একটি স্টেটমেন্ট দিলেন। আবার ডিপ্লোম্যাটদের ডেকে পাঠিয়ে ওই সময়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ যখন কড়া কড়া কথা বললেন, তখন তিনিই আমাকে জানিয়ে দিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কী কী বলেছেন। তখন আমরা বুঝলাম, সরকার রিয়েলি এক বিশাল ক্রাইসিসের মধ্যে পড়েছে। এই ক্রাইসিস থেকে সরকারের বাঁচাটা খুব টাফ ছিল। তারপর তো সরকার সমন্বয়কদের ছয়জনকে গ্রেপ্তার করল। ওরা বলল যে, আন্দোলন উইথড্রো করেছে। আমরা আবার হান্নান মাসুদ, কাদেরের বিবৃতি প্রচার করলাম। বললাম যে, উইথড্রো হয়নি। তারপর যখন কাদেরসহ বাকিদের লুকানো হলো, এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ইউএনের হুমাসহ আরো কয়েকজন সাংবাদিক। আমরাও ছিলাম। আমরা কেউ বিট্রে করিনি। অনেক সাংবাদিক জানতেন কোথায় আছে। কিন্তু কেউ বিট্রে করেননি। পুলিশ বা ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি কেউ জানতেও পারেনি কোথায় আছে ওরা। আমরা প্রতিনিয়ত নিউজ পাচ্ছিলাম। ৯ দফা থেকে ৮ দফা। সেখান থেকে এক দফা।

এরপর যখন আমরা খবর পেলাম যে, আর্মির ইয়াং অফিসাররা বিদ্রোহ করেছে। তখন আমরা অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যাই। এর অন্যতম কারণ কিন্তু আমাদের এপিসি নিয়ে ওইসব নিউজগুলো। আর জাতিসংঘের ওই কড়া কড়া স্টেটমেন্টগুলো। ইউএন পিসকিপিং মিশনে নেওয়া বন্ধ করে দেবে—এমন একটি অবস্থান নিয়েছিলেন সেনাবাহিনীর জুনিয়র অফিসাররা। তখন ইয়াং অফিসারদের অনেকেই আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। আর্মি অফিসাররা সাধারণত সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন না।

তখনই আমরা বুঝে যাই তার (হাসিনার) পক্ষে টিকে থাকা টাফ। কারণ, তার পক্ষে ল অ্যান্ড অর্ডার কন্ট্রোল করবে কে? যদি এই ইয়াং ছেলেরা বিট্রে না করে। তবে তারা এক ভয়েসে ছিল। এক ডিটারমিনেশনে ছিল। আমি ছাত্রদলের প্রচুর ছেলেকে দেখেছি। শিবিরের প্রচুর ছেলেকেও দেখেছি। অন্য অনেক গ্রুপের ছেলেমেয়েদের দেখেছি। কাউকে আসলে ছোট করা ঠিক নয়। সবার সঙ্গেই আমার যোগাযোগ ছিল। ওই সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসার সামনে কয়েকটি খুন হয়েছে। ছাত্রদলের ছেলেরা আমাকে জানিয়েছিল, ওখানে কয়েকটি লাশ পড়ে আছে। খোঁজ নিন।

এম আবদুল্লাহ : ২২ থেকে যদি আমরা ২৯-৩০ তারিখ পর্যন্ত দেখি, এ সময় কারফিউ দেওয়ার কারণে আন্দোলনটা অনেকাংশেই স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল। পুলিশের আইজিপি বের হয়েছেন, নানা জায়গা পরিদর্শন করেছেন। সেনাপ্রধানও একদিন বের হয়েছিলেন। তাদের বেশ ফুরফুরে মেজাজে দেখা গেছে, যেন সব নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তখন শীর্ষ রাজনীতিকরা আমার সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বলেছেন, এবারও হাসিনা টিকে গেল। এখন তারা মন্ত্রী। আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে গেছে—এমন একটা আবহ তৈরি হয়েছিল তখন।

প্রশ্ন : ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আপনারা খবর বাইরে পাঠাতে পেরেছেন; কারণ আপনাদের নেট ছিল। কিন্তু দেশের মাঠ পর্যায় থেকে খবর/ফুটেজ কী করে সংগ্রহ করতেন?

শফিকুল আলম : পেনড্রাইভে করে ফুটেজ আসত। মেমোরি কার্ড দিয়েও ফুটেজ পেয়েছি। তবে একটি ঘটনা মনে আছে। এক বিদেশি সাংবাদিক আমার অফিসে আসতে ভয় পাচ্ছিলেন কোনো বিপদে পড়েন কি-না। চিন্তা করছিলেন তিনি আখাউড়া সীমান্তে যাবেন। ওখান থেকে ভারতের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ফুটেজ পাঠাবেন। পরে আমি তাকে ডেকে এনেছি। তিনি পেনড্রাইভে করে হাজার হাজার ছবি-ফুটেজ নিয়ে এসেছিলেন। সেসব এএফপি থেকে পাঠিয়ে দেন তিনি।

এম আবদুল্লাহ : এই বিপ্লব যদি সফল না হতো, তাহলে আপনার কি পরিস্থিতি হতো বলে মনে করেন?

শফিকুল আলম : এরেস্ট করত হয়তো। ওদের তো এরেস্ট করতে কোনো এক্সকিউজ লাগে না। হাজার হাজার ছেলেমেয়েকে ওরা খুন করেছে। আমার আর এর ব্যতিক্রম কী পরিণতি হতে পারত? তারা জানত সব খবর আমার এখান থেকেই যাচ্ছে। ইন্টেলিজেন্সের ধারণায় ছিল, আমার কাছ থেকে রিপোর্ট নিয়ে সব জায়গায় প্রকাশ করা হচ্ছে।

প্রশ্ন : সার্বিকভাবে জুলাইয়ের ওই ৩৬ দিনের সাংবাদিকতা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

শফিকুল আলম : আমি দুরকমই দেখেছি। সাংবাদিকদের সবচেয়ে সুন্দরতম জার্নালিজম দেখেছি। সবচেয়ে সাহসিকতাপূর্ণ জার্নালিজমও দেখেছি। আমাদের জীবদ্দশায় এমন জার্নালিজম আমরা দেখিনি। আবার সবচেয়ে কাওয়ার্ডলি জার্নালিজমও দেখেছি। চামচামি, দোসর, কলঙ্কিত জার্নালিজমও আমরা দেখেছি। সাহসিকতা দেখেছি ইয়াং ছেলেদের মধ্যে। তারা নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে ভিডিও ফুটেজ নিয়েছে, মোবাইল জার্নালিজম করেছে। সেসব নিউজ ট্রান্সমিট করেছে—এটা দেখেছি। আবার আমরা দেখেছি, যারা তথাকথিত সিনিয়র জার্নালিস্ট, পত্রিকাগুলোর সম্পাদক বা সিনিয়ররা সাংবাদিকতাকে কতটা কলঙ্কিত করা যায়, সে কাজগুলো করেছেন। তারা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোকে বলেছে জঙ্গি। তাদের ক্র্যাকডাউনের জন্য যতভাবে বয়ান তৈরি করা যায়, তা তারা করেছে। বরং আরো কঠোর হওয়ার জন্য উসকানিও দিয়েছে। তবে ইয়াং ছেলেরা দাঁড়িয়ে ছিল বলেই আন্দোলন সফল হয়েছে।

এম আবদুল্লাহ : ইয়াং জার্নালিস্টরা জীবন বাজি রেখে যে খবর ও ফুটেজ সংগ্রহ করেছে, গেটকিপিংয়ে যারা ছিল, সেগুলো কিল করে দিয়েছে। আবার এডিটেড জার্নালিজমও হয়েছে। ৯ দফা এসেছে। ৯ দফার কথা তারা বলছে। কিন্তু নিউজে সব দফার কথা উল্লেখ ছিল না।

প্রশ্ন : সার্বিকভাবে জুলাই পার করার পর আপনি কি আমাদের আজকের অ্যাচিভমেন্ট, আজকের জার্নালিজম নিয়ে সন্তুষ্ট?

শফিকুল আলম : অবশ্যই সন্তুষ্ট। এখনো সংবাদপত্রে হাসিনার অনেক দোসর আছে। সবাই এখন কথা বলতে পারছেন। এটা জুলাইয়ের অ্যাচিভমেন্ট। এটা তো জুলাইয়ের আগে আমাদের সময় ছিল না। আমরা কথাই বলতে পারিনি। এখন সবাই কথা বলছে। সিনিয়র সাংবাদিকরা দেখুন কেমন মিথ্যা মিথ্যা খবর ছাপাচ্ছেন। জুলাইয়ের স্পিরিট হচ্ছে কারো মুখ বন্ধ না করা। যে কারণে জুলাইয়ের রক্ত হয়ে যাচ্ছে টমেটোর সস। কিন্তু মানুষ তো এসব দেখছে। আমি বলব, যে বাংলাদেশ আমরা চাচ্ছি, সেই বাংলাদেশের পথেই আমরা আছি। ইন্টেরিম সরকারের আমলে এটা শুরু হয়েছে। এ আমলেও চলছে। একটা ট্রায়াল আর ইরোরের মধ্য দিয়ে যাবে। আমাদের সবার চোখ-কান খোলা রাখতে হবে যেন নতুন করে আরেকটি স্বৈরাচার তৈরি না হয়।

প্রশ্ন : আপনার দৃষ্টিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা কোনটি?

শফিকুল আলম : আমাদের কোনো ব্যর্থতা নেই।

প্রশ্ন : যা যা করতে চেয়েছিলেন, তার সব করতে পেরেছেন?

শফিকুল আলম : তারচেয়ে বেশি করে আসতে পেরেছি।

এম আবদুল্লাহ: আপনাদের বিরুদ্ধে একটা বড় অভিযোগ হচ্ছে, আপনারা সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করে জেলে নিয়েছিলেন। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

শফিকুল আলম : আমরা প্রথম থেকেই বলেছি, এদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে। ফৌজদারি অপরাধের কারণেই তাদের অ্যারেস্ট করা হয়েছে। আমি সব পত্রিকাকেই বলব, আপনারা যদি পারেন, তাদের বিরুদ্ধে যে ক্রাইমগুলো আছে, সেগুলো খতিয়ে দেখুন। সেগুলো কতটা গুরুতর। তাহলেই উত্তর পাওয়া যাবে। কেউ কেউ বলতে চান, সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ করার জন্যই এদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তেমন কিছুই নয়। আর তারা সাংবাদিকই নন। সাংবাদিকতা বাদ দিয়ে তারা বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের খুন করার লিজিটিমেসি তৈরি করার কাজ করেছেন। তারা জার্নালিজম করলে পুরো বাংলাদেশ তাদের সঙ্গে থাকত। আর একজন জার্নালিস্টকে শেষদিকে অ্যারেস্ট করা হয়েছিল, তার বিরুদ্ধেও সুর্নিদিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। তিন কোটি ৩৬ লাখ টাকা তিনি ট্যাক্স ফাইলে দেখাননি। তিনি তো বড় সাংবাদিক। সব আইন মেনে চলতেন।

এম আবদুল্লাহ : যিনি এখন সবচেয়ে ভোকাল সিনিয়র সাংবাদিক। আপনাদের প্রায়ই গালাগাল করেন।

শফিকুল আলম : তিনি আদৌ কোনোদিন ভালো জার্নালিস্ট ছিলেন কি না, তা নিয়েই সন্দেহ আছে।

প্রশ্ন : ৫ আগস্ট এএফপিই প্রথম শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার খবরটি প্রকাশ করে। তখন কি খুব ঝুঁকি নেওয়া হয়ে যায়নি? সেদিনের পরিস্থিতি জানতে চাই।

শফিকুল আলম : এটা আমাদের জন্য অবশ্য খুবই বড় ঝুঁকি ছিল। ওইদিন বেলা ১১টার দিকেই আমরা খবর পাচ্ছিলাম যে, শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী থেকে একটি গ্রুপ রওনা দিয়েছে। আরেকটি গ্রুপ উত্তরার দিক থেকে আসছে। তো একটি ভোলাটাইল অবস্থা! আমার অফিস ছিল কারওয়ান বাজারে। অফিসের বাইরে দেখছি একটি ভূতুড়ে অবস্থা। পুলিশ নেই, কিচ্ছু নেই। থমথমে অবস্থা শহরের। বেলা সাড়ে ১২টার পর আমি প্রাইম মিনিস্টার অফিসে ফোন দিই । আমার কিছু সোর্স ছিল। আমি যাকে ফোন দিলাম, তিনি আমাকে জানালেন, হাসিনা তো একটু আগেই চলে গেছেন। বললাম, চলে গেছেন মানে? উনি বললেন, ফ্লাই করে ভারতে চলে গেছেন। আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। এর মধ্যে তিনি ফোন রেখে দিলেন। তারপর ডিটেইলস নেওয়ার জন্য আবার ফোন দিলাম। তখন তিনি বললেন, এসএসএফের ওরা অলমোস্ট জোর করেই তাকে নিয়ে গেছে। কারণ, তাদের কাছে ইনফরমেশন আছে যে, উত্তরা থেকে পাঁচ লাখের মতো লোক আসছে। আর যাত্রাবাড়ী থেকে আসছে সাড়ে তিন লাখের মতো। এত লোককে কোনোভাবেই ক্র্যাকডাউন করে এখানে টিকে থাকা যাবে না। তাদের প্ল্যান ছিল হাসিনাকে নিয়ে হযরত শাহজালাল এয়ারপোর্ট দিয়ে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে। গণভবন থেকে বের হয়ে জাহাঙ্গীর গেটে যাবে; সেখান থেকে ক্যান্টনমেন্টের ভেতর দিয়ে একটি রাস্তা আছে—সেটা দিয়ে এয়ারপোর্টে যাবে।

তারা যখন বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী কেন্দ্রের ওখানে পৌঁছেছে, তখন তাদের কাছে খবর এসেছে এয়ারপোর্টের ভেতরে উত্তরা থেকে আসা জনতার একটি অংশ ঢুকে গেছে। কাজেই তাকে সেখানে নেওয়া যাবে না। সিদ্ধান্ত হয় তাকে তেজগাঁও ওল্ড এয়ারপোর্ট দিয়ে হেলিকপ্টারে করে দেশ থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হবে।

আমি শুনেছি, প্রধানমন্ত্রী যাওয়ার আগে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে চেয়েছিলেন। বিটিভিকে বিষয়টি সেভাবে জানানো হয়েছিল। কিন্তু বিটিভির একটি সমস্যা হচ্ছে, তাদের সেটআপ করতে এক ঘণ্টা সময় লাগে। প্রধানমন্ত্রীর হাতে সে সময়টা ছিল না।

আমি পুরো বিষয়টাই নিলাম। তারপর দিল্লিতে সাউথ এশিয়ায় এএফপির যিনি দেখাশোনা করেন, সেই পিটার মার্টেলকে জানালাম। তিনি বললেন, একক সোর্সে এই রিপোর্টটি যাবে না, স্যরি। তোমাকে বলেছে ঠিকই, কিন্তু পরে হয়তো দেখা গেল আধঘণ্টা পর তিনি আবার ঘুরে গণভবনে চলে এলেন। তাহলে আমাদের ক্রেডিবিলিটি তো প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আমরা বলছি যে, তিনি (হাসিনা) পালিয়ে গেছেন। আধঘণ্টা পর এসে বলল তিনি পালাননি, তোমরা মিথ্যা নিউজ দিয়েছ। তোমার জেল হবে, আমাদের ব্যুরো বন্ধ হবে। এমনও হতে পারে কন্সপিরেসি কেসে তোমার যাবজ্জীবনও হয়ে যাবে।

তিনি বললেন, ধরো আমি একটি বড় রেড ব্যানারে দিয়ে দিলাম ‘বাংলাদেশের প্রাইম মিনিস্টার হ্যাজ ফ্লেড দ্য কান্ট্রি’। তার আধঘণ্টা পর তিনি হয়তো ফিরে এলেন। কাজেই সিঙ্গেল সোর্স আমরা দেব না। দেখ মাল্টিপল সোর্স কী বলে। আরো কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলো।

তখন আমি আরো দুজন সোর্সের সঙ্গে কথা বললাম। তারা বললেন, যা তথ্য আছে আমার কাছে, তা সঠিক। আমি স্টোরি করে ফেলতে পারি।

বেলা ১টার পর এএফপি ব্রেকিং ছাড়ল। স্টোরি ছাড়া মাত্র আমাদের যারা ক্লায়েন্ট, দেশে-বিদেশে এএফপিকে কোট করে স্টোরি ছাড়তে শুরু করল। ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত আমি খুব ভয়ে ছিলাম। যদি অন্য কিছু হয়ে যায়! সুরা যা মুখস্থ ছিল—সবই পড়েছি। প্যানিক কিছুটা ছিল।

বেলা ২টার দিকে বিটিভি থেকে অ্যানাউন্স হলো সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। তখন আই ফিল রিলিভড (আমি ভারমুক্ত হলাম)। আমি কনফার্ম হলাম।

আমি বুঝলাম, হাসিনার ১৬ বছরের কালো অধ্যায় শেষ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন