ছররা গুলিতে শহীদ হন আইইউটির শিক্ষার্থী জাহিদুজ্জামান তানভীন

এমরানা আহমেদ

ছররা গুলিতে শহীদ হন আইইউটির শিক্ষার্থী জাহিদুজ্জামান তানভীন
ফাইল ছবি

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন আইইউটির মেধাবী শিক্ষার্থী জাহিদুজ্জামান তানভীন (২৫)। রাজধানীর উত্তরার আজমপুরে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই তার বুকে বিদ্ধ হয় ছররা গুলি। তাৎক্ষণিক স্থানীয় কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বিজ্ঞাপন

ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) মেকানিক্যাল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন তানভীন। ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি ঝোঁক ছিল তার। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক দুই বোর্ড পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও শুরু থেকেই রেখেছেন প্রতিভার স্বাক্ষর। প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষে থাকাকালীন বুয়েট আয়োজিত ‘মডেল শিপ প্রোপালশন কম্পিটিশন’ ও ‘সকার বট কম্পিটিশন’-এ অংশ নিয়ে পুরস্কার লাভ করেন।

তানভীনের মা জানান, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ছিল আমার ছেলে তানভীনের পদচারণ। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইনস্টিটিউশন অব মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং আয়োজিত ইউএএস এয়ারক্র্যাফট সিস্টেম প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়। ওই প্রতিযোগিতার ছয়টি পুরস্কারের মধ্যে তিনটিই তানভীন ও তার দল জয় করেছিল। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নাসা আয়োজিত ইউরোপিয়ান রোভার চ্যালেঞ্জ প্রতিযোগিতায় বিশ্বে দশম এবং এশিয়ার মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করে আমার ছেলে তানভীনের দল।

তিনি আরো জানান, ২০২২ সালে স্নাতক শেষ হওয়া তানভীন যুক্তরাষ্ট্রে স্নাতকোত্তরে পড়তে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। তিন বন্ধুকে নিয়ে ‘অ্যান্ট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল। তারা ড্রোন দিয়ে জরিপের কাজ করত। পাশাপাশি অনলাইনে ড্রোন বিক্রি করত।

শহীদ তানভিনের পরিবার সূত্রে জানা যায়, মা-বাবা আর এক বোনকে নিয়ে থাকতেন উত্তরার আজমপুর কাঁচাবাজার জামতলার ভাড়া বাড়িতে। বাবা শামসুজ্জামান ইঞ্জিনিয়ার। বোন জেসিকা জামান আয়েশা যুক্তরাষ্ট্রে স্নাতকোত্তর করছেন। মা বিলকিস জামান গৃহিণী। তানভীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শুরু থেকেই সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।

একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে এখন তার মা বিলকিস জামান পাগলপ্রায়। দিনরাত কাঁদতে কাঁদতে চোখ ঝাপসা হয়ে গেছে। ঠিকমতো দেখতে পান না এখন। প্রেশার, হার্টের রোগসহ নানা জটিল রোগ বাসা বেঁধেছে শরীরে।

তিনি জানান, শহীদ পরিবারের জন্য অন্তবর্তী সরকার ঘোষিত ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এখনো পাইনি। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে কাগজপত্র জমা দিয়ে এসেছি। মন্ত্রণালয় থেকে জানিয়েছে সঞ্চয়পত্র দেওয়া শুরু হলে জানাবে। চলতি বছরের জুন থেকে ড. ইউনূস সরকারের সময় ঘোষিত ২০ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছি। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে ফেলেছি। কোনো কিছুতেই তো এই অপূরণীয় ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিলকিস জামান আমার দেশকে বলেন, আমার ছেলে দেশের জন্য শহীদ হয়েছে। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতে স্থান দেন। আমি চাই ভবিষ্যতে আর যেন কোনো মায়ের বুক খালি না হয়।

শহীদ তানভীন সম্পর্কে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু তারই বিভাগের সহপাঠী মুস্তাকীম আবতাহী বলেন, সাউথ হল অব রেসিডেন্সের ১১৯ নম্বর রুমের ‘সি’ বেডে থাকত জাহিদুজ্জামান তানভীন। যন্ত্রকৌশল ১৭ ব্যচের সেরা ছাত্র ছিল সে। ওই রুমে থাকতাম আমি, মিতিন, নেহাল, শাতিল আর তানভীন। চারজনের রুমে আমরা পাঁচজন থাকতাম। আমরা অনেকেই অনেক কিছু করার স্বপ্ন দেখতাম, শেষ পর্যন্ত সেটা আর বাস্তবায়ন করা হয়ে উঠেনি। কিন্তু তানভীন যেটা চিন্তা করত, তা করে দেখাত। আমরা হয়তো ভাবতাম, টিউশনি করে টাকা জমিয়ে একটি ভালো ফোন কিনব। কিন্তু তানভীনের ভাবনা ছিল আলাদা।

বন্ধু মুস্তাকীম জানান, একবার তানভীন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি রোবোরেস কম্পিটিশন জিতে এলো। আমরা সবাই বললাম, ট্রিট দে; কিন্তু সে ওই টাকার সঙ্গে আরো কিছু যোগ করে একটি রেডিও ওয়েভ কন্ট্রোলার কেনে। কারণ, থেমে থাকা যাবে না।

এরপর বোট বানানো, বিদেশ থেকে ডিফারেন্সিয়াল আনিয়ে রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি বানানো। জল-স্থল ও আকাশ সবদিকেই ছিল তানভীনের আগ্রহ। অথচ তার জানাজায়ও আমরা কেউ থাকতে পারিনি। ১৮ জুলাই উত্তরায় গুলিবিদ্ধ হয়ে সে মারা যায়। তানভীনের লাশ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে নিজ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

জাহিদুজ্জামান তানভীনের ব্যাংকে জমানো টাকা বন্যার্তদের সহায়তায় দিয়েছেন তার মা। ২৫ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে গিয়ে তার মা বিলকিস জামান টাকাগুলো জমা দেন।

তিনি বলেন, তানভীন মাটির ব্যাংকে টাকা জমাত। ঘর গোছানোর সময় ব্যাংকটি পাই। এরপর টিএসসিতে ত্রাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে শুনে চলে এসেছি। শহীদ ছেলের জমানো টাকা দিয়ে কিছু সামগ্রী ও নগদ সহায়তা দিয়েছি। সন্তানকে হারানোর কষ্ট থাকলেও দেশের জন্য প্রাণ দেওয়াতে মা হিসেবে আমি গর্বিত।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন