মেট্রোশোকে হাসিনার মায়াকান্না, রাজপথে লাশের সারি

মেট্রোশোকে হাসিনার মায়াকান্না, রাজপথে লাশের সারি
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কলঙ্কময়, নৃশংসতম ও লজ্জার দিন হিসেবে রক্তাক্ষরে লেখা থাকবে ২০২৪ সালের ২৫ জুলাই তারিখটি। যখন রাজধানীর প্রতিটি হাসপাতালের বারান্দা গুলিবিদ্ধ তরুণদের আর্তনাদে কেঁপে উঠছিল এবং মর্গে লাশের স্তূপ জমা হচ্ছিল, ঠিক তখনই দেশবাসী দেখল চরম অমানবিক ও বীভৎস এক প্রহসন—রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্টের অজুহাত তুলে মাফিয়া শাসক ও ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার কৃত্রিম অশ্রুপাত। সে সময় জুলাই বিপ্লবীরা হাসিনাকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘নাটক কম কর পিও’। এই একটি বাক্য চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের প্রতিবাদের অন্যতম নিদর্শন হয়ে আছে।

বিজ্ঞাপন

কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিশু, কিশোর, যুবক থেকে শুরু করে পথচারী বৃদ্ধ—কেউ রক্ষা পায়নি শেখ হাসিনার লেলিয়ে দেওয়া বাহিনীর নির্মম বুলেট ও সন্ত্রাসী হামলা থেকে। বিশেষ করে উত্তরার চিত্র ছিল রীতিমতো বিভীষিকাময়। ১৮ থেকে ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে শুধুমাত্র উত্তরার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে অন্তত ৮৬৭ জন আহত ব্যক্তিকে আর প্রাণহীন অবস্থায় আনা হয়েছিল ২৯টি লাশ।

বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ ও সৈয়দ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছিল লাশের সারি। কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালেই ২৬৫ জনকে আহতাবস্থায় এবং আটটি লাশ আনা হয়। উত্তরা আধুনিক মেডিকেলে ১১টি লাশ এবং ২৬৩ জন আহত শিক্ষার্থীর হাহাকারে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, চিকিৎসকরা চরম চাপের মুখে হিমশিম খাচ্ছিলেন। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় ছিল পুলিশের হয়রানি ও গণগ্রেপ্তারের ভয়ে অনেক গুরুতর আহত শিক্ষার্থী চিকিৎসা অসমাপ্ত রেখেই হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। হাসপাতালের বারান্দায় যখন গুলিবিদ্ধদের আর্তনাদ চলছিল, তখন বাইরে ওতপেতে ছিল পুলিশের প্রিজন ভ্যান, যে ভ্যানে স্কুলের ইউনিফর্ম পরা কিশোরদেরও টেনেহিঁচড়ে তোলা হচ্ছিল।

রাজধানীর মর্গগুলোয় সেদিনের দৃশ্য ছিল অকল্পনীয়। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের তথ্যমতে, ওই দিনগুলোয় তারা ২১টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করে, যার অধিকাংশেরই পরিচয় মেলেনি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের ডোম রামু চন্দ্র দাসের বর্ণনা অনুযায়ী, যেসব লাশ দাফনের জন্য পাঠানো হয়েছিল, তাদের শরীরে ছিল সরাসরি গুলির ক্ষত এবং পিটিয়ে মারার মারাত্মক জখম। ওই লাশের স্তূপই প্রমাণ করে, তৎকালীন সরকার কতটা বেপরোয়াভাবে নিজের দেশের নাগরিকদের ওপর ‘শিকার’ চালিয়েছিল।

হাসিনার ‘মেট্রোশোক’ ও বেদনার ‘নাটক’

যখন শত শত মায়ের বুক খালি হচ্ছে, হাসপাতালের মেঝেতে রক্ত শুকানোর সময় পাচ্ছে না, তখন মানবাতাবিরোধী অপরাধে ফাসির দণ্ডপ্রাপ্ত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ব্যস্ত ছিলেন অবকাঠামোর মায়াকান্নায়। ২৫ জুলাই সকালে তিনি মিরপুর-১০ নম্বর মেট্রো স্টেশন পরিদর্শনে যান, যেখানে রহস্যজনক আগুনে কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, শিক্ষার্থী নয়; বরং সন্দেহভাজন কিছু লোক ওই নাশকতা চালিয়েছিল, যার দায় শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করেন।

পরিদর্শন শেষে টিস্যু হাতে নিয়ে চোখ মুছতে মুছতে আগে থেকে প্রস্তুত ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেন। পেছনে ভাঙা কাচ রেখে বলতে শুরু করলেন সেই চিরচেনা বেদনার গল্প ও স্বজন হারানোর বেদনার কথা। তিনি ভাঙচুরের ঘটনায় দেশবাসীর কাছে বিচার চান। বলেন, দেশের জনগণকে তাদের (আন্দোলনকারী) বিচার করতে হবে। আমি জনগণের কাছে ন্যায়বিচার চাইছি। ধ্বংসযজ্ঞের বর্ণনা দেওয়ার মতো আমার আর কোনো ভাষা নেই। অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে নিহত শত শত প্রাণের বিষয়ে তার মুখে ছিল পৈশাচিক নীরবতা।

তাই ফ্যাসিস্ট হাসিনার ওই কান্নাকে সাধারণ মানুষ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। নেটিজেনরা একে ‘নাটক কম কর পিও’ বলে ব্যঙ্গ করেন এবং দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতিতে এ স্লোগান ফুটে ওঠে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রেজা নিউটন হাসিনার ওই কৃত্রিম শোককে যথার্থভাবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘মাফিয়া মায়ের মেট্রোশোক’। শত শত মানুষের জীবনের চেয়ে হাসিনার কাছে যে যান্ত্রিক কাঠামো বড় ছিল, তা তার বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এ্যানি-পার্থসহ গ্রেপ্তার ৭০০

কেবল গুলি করেই ক্ষান্ত হয়নি তৎকালীন মাফিয়া সরকার। ২৫ জুলাই পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য শিক্ষার্থীকে আসামি করে গণগ্রেপ্তার চালানো হয়। এমনকি গভীর রাতে বর্তমান পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থকে তাদের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই দিন সারা দেশে প্রায় ৭০০ আন্দোলনকারী ও বিভিন্ন দলের নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

ওই ভয়াবহ পরিস্থিতির ওপর ২৫ জুলাই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। তারা স্পষ্টভাষায় জানায়, সরকার প্রতিবাদ দমনে ‘প্রাণঘাতী’ অস্ত্র ব্যবহার করছে। ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের চোখ এড়িয়ে গণহত্যা চালানো হয়েছে বলেও সংস্থাটি তাদের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করে।

ঢাবি থেকে বিতাড়িত ছাত্রলীগ

তবে এত দমনপীড়নেও প্রতিরোধের আগুন নেভানো যায়নি। ২৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঐতিহাসিক এক বিজয় অর্জন করেন শিক্ষার্থীরা। তারা দেশি-বিদেশি অস্ত্রধারী ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের শক্ত হাতে প্রতিরোধ করে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করেন। শিক্ষার্থীদের ঐক্যের শক্তির সামনে ছাত্রলীগের বহু নেতাকর্মী সংগঠন ছাড়ার ঘোষণা দেন এবং ক্যাম্পাস থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এটি ছিল জুলাই বিপ্লবের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যা প্রমাণ করে বন্দুকের গুলি দিয়ে একটি জাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে দমানো যায় না।

২৫ জুলাইয়ের ইতিহাস হলো একদিকে স্বৈরাচারের পৈশাচিকতা, অন্যদিকে তার নির্লজ্জ অভিনয়ের। তবে ওই অভিনয় সাধারণ মানুষের চোখে ধুলা দিতে পারেনি; বরং ওই রক্তভেজা দিনটিই হাসিনার পতন ত্বরান্বিত করে এবং ছাত্র-জনতার বিপ্লবকে পৌঁছে দেয় চূড়ান্ত বিজয়ের দোরগোড়ায়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন