জুলাই বিপ্লবের অমর যোদ্ধা

রিয়াকে বাঁচাতে ছাদে ছুটে গিয়েছিলেন বাবা, কোলে নিয়েই দেখলেন রক্তাক্ত শরীর

রিয়াকে বাঁচাতে ছাদে ছুটে গিয়েছিলেন বাবা, কোলে নিয়েই দেখলেন রক্তাক্ত শরীর
রিয়া গোপ

গুলির শব্দে কেঁপে উঠছিল চারদিক। রাজপথজুড়ে সংঘর্ষ, আতঙ্ক আর ছোটাছুটি। এমন এক বিকালে ছয় বছরের মেয়েকে নিরাপদে নিচে নামিয়ে আনতে ছাদে ছুটে গিয়েছিলেন বাবা দীপক কুমার গোপ। কিন্তু যে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন, মুহূর্তের মধ্যে সেই মেয়েই রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়ে তার কোলে।

সেদিন শামীম ওসমান ও তার অস্ত্রধারী বাহিনী নিয়ে গুলি ছুড়তে ছুড়তে নারায়ণগঞ্জ ক্লাব থেকে বের হয়ে শহরের ডিআইটি এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে। আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে অর্ধশত রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে তারা। তাদের এলোপাতাড়ি গুলিতেই নিজ বাসার ছাদে গুলিবিদ্ধ হয় শিশু রিয়া গোপ।

বিজ্ঞাপন

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় নারায়ণগঞ্জ শহরের নয়ামাটি এলাকার এই ঘটনাটি আজও ভুলতে পারেননি স্থানীয়রা। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পাঁচ দিন পর ২৪ জুলাই, চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা যায় রিয়া গোপ।

পরিবারের দাবি, সেদিন বিকালে শহরের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ চলছিল। ওই সময় রিয়া নিজ বাড়ির ছাদে খেলছিল। গোলাগুলির শব্দ শুনে মেয়েকে নিচে নিয়ে আসতে দ্রুত ছাদে যান তার বাবা। ঠিক তখনই একটি গুলি এসে রিয়ার মাথায় লাগে। বাবার চোখের সামনেই রক্তাক্ত হয়ে লুটিয়ে পড়ে রিয়া। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে পাঁচ দিন পর তার মৃত্যু হয়।

রিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দীপক কুমার গোপ ও বিউটি ঘোষ দম্পতি তাদের একমাত্র সন্তানকে হারান। প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি তারা।

রিয়ার বাবা বলেন, আমার আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। আমি শুধু চাই আমার পরিবারটা শান্তিতে থাকুক। আমি আর কিছু চাই না। এর বাইরে এই পরিবারটি কোনো কথা বলতে চায়নি। রিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেও পরিবারের মধ্যে এখনো শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা কাজ করছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত শিশু রিয়া গোপের পরিবারের মধ্যে এখনো অজানা আতঙ্ক কাজ করছে। আমরা চাই এই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত হোক।

তিনি আরো বলেন, ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের সবচেয়ে কম বয়সি শহীদ ছিল রিয়া গোপ। এই হত্যাকাণ্ড সেই সময়ের নির্মমতার একটি ভয়াবহ উদাহরণ। কোনো অনুদান বা সান্ত্বনা দিয়ে এই ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয়। সন্তান হারিয়ে পরিবারটি দিশেহারা হয়ে গেছে।

সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, রিয়ার পরিবার যেন ভয়ভীতি ছাড়াই আদালতে সাক্ষ্য দিতে পারে, রাষ্ট্রকে সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা চাই তারা আতঙ্কমুক্তভাবে ন্যায়বিচারের পথে এগিয়ে যাক।

রিয়ার মৃত্যুর দুই বছর পরও নয়ামাটির মানুষ সেই রক্তাক্ত বিকালের স্মৃতি ভুলতে পারেননি। একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্যই বেদনার এক স্থায়ী স্মারক হয়ে আছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এই হত্যাকাণ্ডের বিচার একদিন নিশ্চিত হবে এবং পরিবারটি ন্যায়বিচার পাবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন