সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা চব্বিশের এই দিনে তাদের চার দফা ‘জরুরি দাবি’ মেনে নিতে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছিল। ২৩ জুলাই ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম এই ঘোষণা দেন।
ছাত্রনেতারা স্পষ্টভাষায় জানান, চার দফা দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে আর কোনো আলোচনায় তারা অংশ নেবেন না তারা। একইসঙ্গে আন্দোলন আরো তীব্র ও বিস্তৃত হবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। এই দিন গভীর রাতে পুলিশ আন্দোলনস্থলের আশপাশে ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মেস ও ফ্ল্যাটে হানা দেয়। তারা আওয়ামী সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনকারীদের বাসা ঘেরাও করে ছাত্রদের গ্রেপ্তার করে।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দেওয়া জরুরি দাবিগুলো হলো- অবিলম্বে ইন্টারনেট সংযোগ পুরোপুরি সচল করা, সারা দেশে জারি করা কারফিউ প্রত্যাহার করা, বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরিয়ে নিয়ে আবাসিক হল খুলে দিয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং আন্দোলনের সমন্বয়কদের নিরাপত্তা প্রদান করা।
সমন্বয়করা বলেন, এই দাবিগুলো পূরণ হলেই সরকারের সঙ্গে মূল দাবি নিয়ে সংলাপের একটি পরিবেশ তৈরি হতে পারে। এ সময় সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আন্দোলনের তিন গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদার ও রিফাত রশীদ ১৮ জুলাই থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেন সন্তানের সন্ধানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ পর্যন্ত ঘুরেও কোনো হদিস পাননি বলে জানা গেছে। নিখোঁজ নেতাদের নিরাপত্তা ও অবস্থান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অন্য সমন্বয়করা।
শিক্ষার্থীদের মেসে, ফ্ল্যাটে অভিযান ও গণগ্রেপ্তার
এদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা দমনের নামে ইন্টারনেট বন্ধ করে রাজধানীসহ সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘চিরুনি অভিযান’ অব্যাহত ছিল। ইন্টারনেট বন্ধের ষষ্ঠ দিন ছিল এটি। শেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে প্রায় এক হাজার ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে শুধু ঢাকাতেই গ্রেপ্তার হন ৫১৭ জন। ১৭ থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত এক সপ্তাহে সারা দেশে গ্রেপ্তারের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়ে যায় । রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাটে ও মেসে তল্লাশি চালিয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে যায় পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। সাধারণ শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। একদিনেই ঢাকায় ৩৮টি নতুন মামলা দায়ের করা হয় । আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানে ২৩ জুলাই পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে তিন শত পেরিয়ে যায়।
আদালত চত্বরে স্বজনদের আহাজারি, আটক বাণিজ্যের অভিযোগ
রাজধানীর সিএমএম আদালতের গেটে ছেলের আইডি কার্ড, কলেজ ব্যাগ, অ্যাডমিট কার্ড, খাবার, পোশাক ও বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে অপেক্ষায় থাকতেন গ্রেপ্তার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের স্বজনেরা। আদালত প্রাঙ্গণে প্রিজন ভ্যান দেখলেই কান্নাকাটি চিৎকার করেছিলেন স্বজনেরা। এ সময় অভিভাবকদের অনেকে অভিযোগ করেছিলেন, পুলিশ আন্দোলনকারী ছাত্র- জনতাকে গ্রেপ্তার করে নির্যাতন তো চালিয়েছেই, বাণিজ্যও করেছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যেই ২৩ জুলাই আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে ৯৩ শতাংশ মেধা ও ৭ শতাংশ কোটা পদ্ধতি কার্যকর করে প্রজ্ঞাপন জারি করে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার। তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছিলেন, শিক্ষার্থীদের কাউকে অন্যায়ভাবে মামলায় জড়ানো হলে তথ্য সাপেক্ষে তা যাচাই করা হবে। তবে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী সাফ জানিয়ে দেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আবাসিক হলগুলো খুলে দেওয়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে, র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক হারুন অর রশিদ আন্দোলনে থাকা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ছাত্র আন্দোলনের নামে যারা নাশকতা চালিয়ে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
স্থবির জনজীবন ও সীমিত ইন্টারনেট
টানা ছয়দিন ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন থাকার পর ২৩ জুলাই রাতে ঢাকা ও চট্টগ্রামে সীমিত পরিসরে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু করা হয়। যদিও সাধারণ ব্যবহারকারীদের বড় অংশই এর আওতার বাইরে ছিল। কারফিউ কিছুটা শিথিল করে বেলা ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত অফিস ও পোশাক কারখানা খোলার অনুমতি দেওয়া হয়। টানা পাঁচদিন রেল চলাচল বন্ধ থাকার পর ২৩ জুলাই তেলবাহী ট্রেন চালু হয়।
দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ও প্রকাশকরা কোটা আন্দোলনের সহিংসতা ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানান। তারা বলেন, বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষে কয়েকজন সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক সাংবাদিক ও ফটো সাংবাদিক। এখনো সাংবাদিকেরা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে ব্যাপক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সম্পাদক পরিষদ ও নোয়াব মনে করে, গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্ব নিতে হবে। প্রাণহানি, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসাত্মক ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি দিতে হবে। এ ছাড়া সারা দেশে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ থাকায় সংবাদ আদান-প্রদান ও তথ্য যাচাইয়ের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ তথ্যগত ব্ল্যাকআউটের আশঙ্কা তৈরি হয়। গত কয়েক দিনে গুজব ও মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন তথ্য আরো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ১৬ থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত সরকারের কঠোর নিপীড়ন ও সহিংসতা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। সাধারণ জনগণের ওপর জুলুম ও নির্যাতনের মাত্রা বাড়ায় সরকারের প্রতি আস্থা তলানিতে নেমে আসে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সে সময় আন্দোলনে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ, গ্রেপ্তার এবং কারফিউয়ের মাধ্যমে দমন-পীড়ন চালায়। ফলে তা দেশব্যাপী অসন্তোষ ও প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গকে আরো তীব্র করে তুলেছিল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

