জুলাই বিপ্লবের অমর যোদ্ধা

পুলিশ গুলি করছে শুনেও বিক্ষোভে ছুটে যান শহীদ আদিল

পুলিশ গুলি করছে শুনেও বিক্ষোভে ছুটে যান শহীদ আদিল

দিনটি ছিল শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০২৪। জুমার নামাজের পর নারায়ণগঞ্জের ভূঁইগড়ে নিজ বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দুপুরের খাবার খেতে বসেছিল ১৬ বছর বয়সি মোহাম্মদ আদিল। যাত্রাবাড়ীর তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষার্থী কয়েকদিন আগেই টেস্ট পরীক্ষা শেষ করে ছাত্রাবাস থেকে বাড়ি ফিরেছিল। পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর আনন্দ তখন সবার মুখে। কিন্তু কেউ জানত না, সেটিই হবে তাদের একসঙ্গে শেষ মধ্যাহ্নভোজ।

ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার বিভিন্ন শাখার সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। কিশোর আদিল ছিল তাদেরই একজন।

বিজ্ঞাপন

দুপুরের খাবার পর হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ে আদিলের চাচাতো ভাই সাজিদ। আদিলকে জানায়, কাছেই ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরাসহ স্থানীয়রা বিক্ষোভ করছে। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা গুলি ছুড়ছে। খবরটা শুনে এক মুহূর্তও দেরি করেনি আদিল। আগের দিনই সাবেক মিল্লাতিয়ান সাংবাদিক শাকিল পারভেজ শহীদ হওয়ার খবর শুনেছে। এছাড়াও সারাদেশে গুলি চালিয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোও মাথায় ছিল। তাই সবকিছু উপেক্ষা করে রাজপথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে।

বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মা আয়েশা আক্তার ও বাবা জামায়াত নেতা আবুল কালাম ছেলেকে বারবার নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। আগের দিন তারা তাকে আটকে রাখতে পেরেছিলেন। কিন্তু শুক্রবার আর পারেননি।

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের এসবি স্টাইল কম্পোজিট লিমিটেডের সামনে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দেয় আদিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা গুলি ছুড়তে শুরু করলে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে থাকেন। কিন্তু নির্ভীক কিশোর আদিল নির্ভয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল বলে জানায় সঙ্গে থাকা বন্ধু সজিব।

‘তুই সামনে যাস না’ বলে আদিলকে বাধা দিচ্ছিল সজিব। কিন্তু আদিল তাকে জবাব দেয় ‘ভয়ে সবাই পিছিয়ে গেলে সামনে যাবে কে?’ এর কয়েক মুহূর্ত পরই পুলিশের ছোড়া পর পর দুটি গুলি এসে বিদ্ধ হয় আদিলের বুকে। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সেখানেই শাহাদত বরণ করেন মোহাম্মদ আদিল। চোখ তখনো ছিল খোলা, মুখে ছিল দৃঢ়তা। ফলে সহযোদ্ধারা মনে করেছিল, সে তখনও জীবিত। দ্রুত তাকে সাইনবোর্ড এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আদিল ছিল ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্র শিবিরের মিল্লাত ক্যাম্পাস থানা শাখার কর্মী।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিন ভাইয়ের মধ্যে আদিল ছিল সবার ছোট। মেধাবী, সাহসী ও স্বপ্নবাজ এই কিশোর একাধিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়েছিল। সহপাঠীদের কাছেও ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। তার স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা হয়ে দেশের সেবা করা। সেনাবাহিনীতে কর্মরত এক মামাকে দেখে প্রায়ই বলত, আমিও একদিন আর্মি অফিসার হব। কিন্তু যার চোখে ছিল দেশ রক্ষার দায়িত্ব নেওয়ার স্বপ্ন, সে-ই রক্ষা পেল না নিজের দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলির হাত থেকে।

আদিলের মা আয়েশা বলেন, আদিলকে অনেকবার বলেছি, তুমি ছোট মানুষ, যেও না। আদিল উলটা আমাকে প্রশ্ন করেছে— যারা মরছে তারা কি কারো ছেলে না? তাদেরও তো মা আছে! এই কথা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন আয়েশা। তিনি বলেন, আমার ছেলে চেয়েছিল সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে দেশের জন্য কাজ করবে। তার সে স্বপ্ন হারিয়ে গেলেও দেশের ভবিষ্যতের জন্য কাজ করার ইচ্ছা পূরণ হয়েছে।

আদিলের মা এখন আর কিছু চান না, শুধু চান ছেলের হত্যার বিচার। তিনি বলেন, আমাদের সন্তানদের হত্যার বিচার না করলে এদেশে আবারো ফ্যাসিবাদ কায়েম হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন