জুলাই বিপ্লবের অমর যোদ্ধা

প্রথম নারী শহীদ ১৫ বছরের নাঈমা সুলতানা

প্রথম নারী শহীদ ১৫ বছরের নাঈমা সুলতানা

‘আম্মু আমি শহীদ হলে তুমি কান্না করিও না। শুধু আলহামদুলিল্লাহ বলিও।’ শাহাদাতের আগের দিনও মাকে এ কথা বলেছিল জুলাই বিপ্লবের প্রথম নারী শহীদ নাঈমা সুলতানা। ২০০৯ সালের ২৫ জুলাই জন্ম নেওয়া এই শহীদের জন্মদিন আজ। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সন্ধ্যায় বাসার বেলকনিতে শুকনো কাপড় আনতে গেলে পুলিশের বুলেট মাথায় বিদ্ধ হয়ে বিকাল সাড়ে ৫টায় ঘটনাস্থলেই শাহাদাত বরণ করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

মাত্র ১৫ বছর বয়সেই দুনিয়ার সফর শেষ করেন নাঈমা। মৃত্যুকালে তিনি ছিলেন উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণি বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী। শাহাদাতের আগের দিনও সহপাঠীদের সঙ্গে বাংলাদেশ মেডিকেলের সামনের সোনারগাঁ জনপথে আন্দোলন করেছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শরীরের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছেন। জীবনের শেষদিনও বাসায় বসে অঙ্কনশিল্পী হিসেবে চিত্রাঙ্কন করেছেন। উত্তরার অনেক দেয়ালে এখনো তার আঁকা গ্রাফিতিগুলো জ্বলজ্বল করছে।

প্রথম নারী শহীদ হিসেবে নাঈমা সুলতানার নামটি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন শহীদ জননী আইনুন নাহার। তিনি আমার দেশকে বলেন, ‘আমার মেয়ে নাঈমা জুলাই বিপ্লবের প্রথম নারী শহীদ। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই প্রথম নারী শহীদ হিসেবে পাঠ্যপুস্তকে নাঈমা সুলতানার নামটি যেন অন্তর্ভুক্ত করা হয়।’

আইনুন নাহার আরো বলেন, শহীদ নাঈমা সুলতানা ছিল আন্দোলনের অগ্রসেনানী। সে শুধু নিজেই আন্দোলনে যেত না, বন্ধুদেরও উৎসাহিত করত। ছাত্রদের অধিকার আদায়ে এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলনে সে নিয়মিত অংশগ্রহণ করত। তার ছবি আঁকার হাত ছিল অনেক সমৃদ্ধ। ডায়েরিতে আঁকা পোস্টারে লিখেছিল, চেয়েছিলাম অধিকার হয়ে গেলাম রাজাকার, তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন স্লোগান। সে পোস্টারটি ফেসবুক ওয়ালে দিয়ে লিখেছিল- ‘আন্দোলন হবে এবার রংতুলিতে। কোটা প্রথা নিপাত যাক, মেধাবীরা মুক্তি পাক।’

মা আজও মেয়ের জন্য কান্না করছে, তার আর্তনাদ যেন থামছেই না। অন্যদিকে নাঈমার বাবা হোমিও চিকিৎসক গোলাম মোস্তফা জানান, দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সে ছিল মেজো। আমার সবচেয়ে মেধাবী সন্তান ছিল নাঈমা সুলতানা। নাঈমা চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখত। অথচ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে প্রথম মেয়েটি শরীরের তাজা রক্ত ঢেলে দিল। এখনো বাসার ড্রইং রুম ও তার রুমে বিজ্ঞান বিভাগের বই ও গাইডগুলো থরে থরে সাজানো। পুরো ঘরের চারদিকে নাঈমার স্মৃতি। সবই আছে, শুধু নেই শহীদ নাঈমা সুলতানা। ২০ জুলাই ২০২৪ নাঈমার লাশ তার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার আমুয়াকান্দির দেওয়ান বাড়িতে দাফন করা হয়।

কেমন আছে নাঈমার পরিবার

নাঈমারা দুই বোন এক ভাই। সে দুনিয়াতে আসার পর সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল তার বড় বোন তাসফিয়া। কারণ সে অনেকদিন পর তার একজন খেলার সঙ্গী পেয়েছিল। এখন একমাত্র বোনকে হারিয়ে সে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। সে এখন খাবার টেবিলে, পড়ার টেবিলে সব সময় নাঈমাকে মিস করে। একমাত্র ভাই আব্দুর রহমানের বয়স এখন ৯ বছর। সে তার বোনের রক্তমাখা কফিন দেখেছে। তার মাঝে এক ধরনের ভয় ও আতঙ্ক কাজ করছে এখনো। একমাত্র ভাই হিসেবে তাকে খুবই আদর করত নাঈমা। নাঈমাকে তার মনে পড়ে খুব। মাঝে মধ্যে মায়ের সঙ্গে সেও কান্না করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। বড় বোন তাসফিয়া বলেন, ‘আমার ছোট বোন হলেও সে আমার বন্ধুর মতো ছিল। আমাদের খুনসুটি লেগেই থাকত। একসঙ্গে বাইরে ঘুরতে যেতাম। এখন সবকিছুতেই তাকে মিস করছি। আমাদের জীবনে এখন শুধুই শূন্যতা। কেন পুলিশ আমার বোনকে আমাদের মাঝ থেকে কেড়ে নিল? আমি এর বিচার আল্লাহকে দিলাম।’

ক্লাসে নেই নাঈমা

নাঈমা এখন আর ক্লাসে যায় না। আর কোনোদিন তাকে ক্লাসে দেখা যাবে না। দেখা যাবে না অ্যাসেম্বলিতেও। সহপাঠীদের সঙ্গে প্র্যাক্টিকেল ক্লাসে বা করিডোরে দেখা হবে না আর। রংতুলিতে আঁকবে না আর মুক্তির স্লোগান। তার হাতে অঙ্কিত হবে না বৈষম্যবিরোধী দৃশ্যপট। মুক্তির আন্দোলনে লড়াকু অবস্থান চোখে পড়বে না আর। তার সহপাঠীদের চোখে মুখে কষ্টের ছোঁয়া। প্রিয় বন্ধুর জন্য তাদের মন কাঁদে খুব। এই তো অল্প কিছুদিন আগেও ক্লাসে ছিল সে, অথচ আজ নেই। ফ্যাসিস্ট হাসিনার পুলিশ বাহিনী বন্ধুদের মাঝ থেকে তাকে কেড়ে নিল।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন