গত বছরের ১৮ জুলাই ‘কমপ্লিট শটডাউন’ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হয় ১৪ বছর বয়সি কিশোর সৈয়দ মুনতাসির রহমান আলিফ। কিন্তু গুলিও থামাতে পারেনি তাকে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায়ই আন্দোলনে অংশ নিতে থাকে সে।
এরপর ৫ আগস্ট বাবা-মায়ের বাধা উপেক্ষা করে ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নেয় সে। সেদিন জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া যাত্রাবাড়ী মাদরাসার সামনে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদাত বরণ করে আলিফ।
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে যাত্রাবাড়ীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা, যাত্রাবাড়ী মাদরাসা ও আশপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাবেক এবং বর্তমান শিক্ষার্থীরা। তাদেরই একজন আলিম প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মুনতাসির রহমান আলিফ। সে ইসলামী ছাত্রশিবির সাথী ছিল বলে জানিয়েছেন তার পিতা কাজলা এলাকার জামায়াত নেতা সৈয়দ গাজীউর রহমান।
১৮ জুলাই বাসা থেকে কোচিংয়ের কথা বলে বেরিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে যোগ দেয় আলিফ। সেদিনই পুলিশের ছররা গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় তার শরীর। প্রাথমিক চিকিৎসা করিয়ে বাসায় গেলেও বাবা-মাকে জানায়নি সে।
শরীরে যন্ত্রণা নিয়েই প্রতিদিন কোচিংয়ের কথা বলে আন্দোলনে যেত আলিফ। তার বাবা গাজীউর রহমান কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলেন বিষয়টি। কিন্তু তিনি নিজেও আন্দোলনে থাকায় একমাত্র সন্তান আলিফকে বাধা দিতেন না। আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন আলিফের মা শিরিন সুলতানাও।
যাত্রাবাড়ীতে পুলিশ-বিজিবি ও আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীর নৃশংসতা আলিফকে চরম ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। তাই বাল্যবন্ধু আকিল আবদুস শাকুরকে আলিফ বলেছিল, ‘পুলিশ আন্দোলনকারীদের মেরে কীভাবে যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার থেকে নিচে ফেলে দিচ্ছে তা সে নিজ চোখে দেখেছে। এরপর আর বাসায় বসে থাকার মানে হয় না। যা কিছুই হোক আমি আন্দোলনে যাব’।
৫ আগস্ট সকালে মায়ের নিষেধ অমান্য করে যাত্রাবাড়ী মাদরাসার সামনে ছাত্র-জনতার সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেয় আলিফ। এরপর দুপুর-বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতেই আলিফের বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকে। চারদিকে খোঁজ করতে থাকেন তারা। কোথাও আলিফের সন্ধান না পেয়ে শেষে আশপাশের সব কটি হাসপাতালে খোঁজ করেও তার সন্ধান মেলেনি।
ডাক্তাররা ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে গিয়ে খোঁজ নিতে বলেন আলিফের বাবাকে। পরে তিনি, বন্ধু ও সহযোদ্ধাদের নিয়ে রাত ১১টার দিকে পৌঁছান ঢামেকে। সেখানে মর্গের সামনে একটা ঘরে অনেক লাশ স্তূপ করে রাখা দেখতে পান তারা। এর মধ্যে থাকা আলিফের লাশ বের করে দেন সেখানে দায়িত্বে থাকা লোকজন।
লাশ নিয়ে তারা সেগুনবাগিচায় কোয়ান্টামে গেলে তারা গোসল দিয়ে কাফন পরিয়ে ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ চান। তাদেরকে বুঝিয়ে বন্ডসই দিয়ে ৬ আগস্ট ফজরের সময় কাজলার বাসায় ছেলের লাশ নিয়ে আসেন গাজীউর রহমান।
এরপর ভোরেই গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট উপজেলার দৌলখাঁ দেওভান্ডারের গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। জোহরের নামাজের পর পিতা সৈয়দ গাজীউর রহমান নিজেই ছেলের জানাজায় ইমামতি করেন। এরপর পারিবারিক কবরস্থানে শহীদ সৈয়দ মুনতাসির রহমান আলিফকে দাফন করা হয়।
সৈয়দ গাজীউর রহমান বলেন, ‘বেঁচে থাকলে আগামী ১১ সেপ্টেম্বর ছেলের বয়স ১৫ বছর পূর্ণ হতো। বিদেশে ইসলামি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠানোর ইচ্ছা ছিল। কিছুদিন পরই সবাই একসঙ্গে ওমরা করতাম। কিন্তু তার আগেই ঝরে গেল ছেলেটা।
আলিফ যেমন বাংলাদেশ দেখতে চেয়েছিল তেমন বাংলাদেশই যেন আমরা দেখতে পাই- এটাই প্রত্যাশা। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকে বিপ্লবী ছাত্র-জনতার বিপক্ষে না গিয়ে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরোধিতা না করে তাদের সংস্কার উদ্যোগ সঠিকভাবে করতে সহায়তা করারও আহ্বান জানান তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

