৩৫ জুলাই, ২০২৪। শেখ হাসিনার অন্তিমকাল স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভয়হীন মানুষ বেরিয়ে এসেছে রাজপথে, অলিতে-গলিতে। সারা দেশ বিক্ষোভে উত্তাল। পথঘাট বিক্ষোভকারীদের রক্তে রঞ্জিত। বাতাসে টিয়ারগ্যাস, বারুদের গন্ধ। পুলিশের উন্মত্ত চেহারা তখনো ফিকে হয়ে ওঠেনি। রাজধানীর মোড়ে মোড়ে সশস্ত্র প্রহরায় হাসিনার পেটোয়া বাহিনী—ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ সব লীগ।
আমার অফিস তখন বনশ্রীতে। ৩৫ জুলাই সকালে বাবর রোডের বাসা থেকে বের হয়ে কলেজগেট বাসস্ট্যান্ডে গেলাম। গাড়ি নেই। ভয়ের পরিবেশ চারদিকে। বাসস্ট্যান্ড সুনসান, ফাঁকা। হাঁটা শুরু করলাম। জনবিচ্ছিন্ন শেখ হাসিনা যেখানে থাকেন, সেই গণভবনের সামনের মূল সড়ক কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে রেখেছে সেনাবাহিনীর সদস্যসহ বিভিন্ন বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা। সেটার পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এগোতে লাগলাম। সুরা বুরুজের ২০ নম্বর আয়াত মনে পড়ল—‘আর আল্লাহ আড়াল থেকে তাদের ঘিরে রেখেছেন।’ (সুরা বুরুজ : আয়াত ২০)
সুবহানআল্লাহ! জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হাসিনা নিরাপত্তার নামে নিজেকেই ঘিরে রেখেছেন!
আসাদগেট পেরিয়ে আড়ংয়ের উল্টো দিকের মোড়ে দেখলাম প্রচুর সেনা, সঙ্গে অন্য বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা। সামরিক যান তো আছেই। আড়ংয়ের নিচে শত শত প্লাস্টিকের চেয়ার পেতে বসে আছেন সরকারদলীয় লোকজন। সবার হাতে লাঠিসোঁটা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সামনেই তারা বুক চিতিয়ে বসে আছেন। তাদের সামনে দিয়েই এগোতে লাগলাম। ধানমন্ডি রাপা প্লাজার সামনে বেশ শোরগোল। এগিয়ে গেলাম। সাইকেলে বসা এক কিশোরকে লাঠিসোঁটা হাতে ঘিরে রেখেছে রাস্তা পাহারা দেওয়া সরকারদলীয় ছেলেরা। হরিণকে যেমন হায়েনার দল ঘিরে ধরে, তেমন আর কী! ছেলেটার গলায় কোনো এক ফুড ডেলিভারি কোম্পানির আইডি কার্ড।
স্থানীয় জনগণের সহায়তায় কিশোরটা কোনোমতে বের হলো হায়েনাদের হিংস্র থাবা থেকে। বিব্রত, কিছুটা ভীত এবং রাগও দেখলাম তার চোখেমুখে। সাইকেল চালিয়ে চলে গেল কিশোরটা।
প্রচণ্ড রোদ। হাঁটতে লাগলাম। পান্থপথ মোটেও একই অবস্থা দেখলাম। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের মোড় ও এর আশপাশে সরকারদলীয় সন্ত্রাসীরা লাঠিসোঁটা হাতে পাহারা দিচ্ছে। প্লাস্টিকের চেয়ার পেতে কেউ খবরের কাগজ পড়ছে। কেউবা আরামে খানাপিনায় ব্যস্ত। রিলাক্স ভাব সবার। ওদের পাশ কাটিয়ে পান্থপথ ধরে সার্ক ফোয়ারার দিকে এগোতে লাগলাম। সার্ক ফোয়ারার মোড়ে আওয়ামীপন্থি কয়েকজন সাংবাদিক ব্যানার হাতে শেখ হাসিনার পক্ষে সমাবেশ করছেন। সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরী বক্তব্য দিচ্ছেন। সেই সারিতেই দাঁড়ানো পরিচিত হাতেগোনা কয়েকজন আওয়ামীপন্থি সাংবাদিককে দেখলাম। দাঁড়ালাম সমাবেশটার সামনে। ওদের চোখে চোখ রাখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ওদের চোখে যেন কেউ ধুলো দিয়েছে। তারা সামনের কাউকেই যেন দেখতে পারছেন না!
সেখান থেকে হাতিরঝিল হয়ে চলে এলাম রামপুরা মোড়ে। সেখানকার সড়ক ছাত্র-যুবা জনতার দখলে। বনশ্রীর আবাসিক এলাকার অলিতে-গলিতে শিশু-কিশোরেরা দেয়ালে দেয়ালে ইতিহাস লিখছে। দেয়ালে দেয়ালে যেন বসন্তের রঙ ছড়িয়ে দিয়েছে তারা।
নিউজ দিয়ে বিকাল সাড়ে ৪টার পরপরই অফিস থেকে বের হলাম। বনশ্রীর অফিস থেকে এলাম রামপুরা ব্রিজের নিচে। সঙ্গে ছিলেন অর্থনীতিবিষয়ক রিপোর্টার নাঈম কামাল। ব্রিজের নিচে রাস্তাজুড়ে বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থীরা। একটা রিকশা নিলাম। আটকে দিলেন বিক্ষোভকারীদের একজন। পরিচয় পেয়ে অসম্ভব ভালো ব্যবহার করলেন সেই তরুণ। ব্লক খুলে দিলেন। রিকশা ছুটল কারওয়ান বাজারের দিকে। এফডিসি পার হওয়ার পরই থামতে হলো। সামনে দাউ-দাউ আগুন জ্বলছে। এগিয়ে গেলাম। একজন শিক্ষার্থী জানালেন, কিছুক্ষণ আগে হেলমেট পরে সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে সরকারদলীয় গুন্ডারা। জনগণ প্রতিরোধ গড়ে তুললে পালিয়ে যায় হাসিনার পেটোয়া বাহিনী।
পেট্রোবাংলার সামনের রাস্তায় একটা গাড়ি জ্বলছে। কারওয়ান বাজার থেকে বাংলামোটরের দিকে এগোলাম। হাজার হাজার ছাত্র-জনতা তখন সেই সড়কজুড়ে বিক্ষোভ করছেন। কয়েকজন শিক্ষার্থী জানালেন, বাংলামোটর এলাকায় বিক্ষোভকারীদের লক্ষ করে গুলি করা হয়েছে। স্থানীয় কাউন্সিলরের লোকেরা হামলা চালিয়েছে। এগিয়ে চললাম শাহবাগের দিকে। শাহবাগ মোড় তখন যেন মিসরের তাহরির স্কোয়ারে পরিণত হয়েছে। সব বয়স-শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়ো হয়েছেন। সবার চোখেমুখে দ্রোহ। অকুতোভয় বীর ছাত্ররা ঘুরছেন বীর ছত্রপতির মতো। নির্ভীক তারুণ্য জালিমের বিরুদ্ধে বিজয়ের প্রত্যয় নিয়েই নেমেছে। এক দম্পতিকে দেখলাম পানি বিলি করছেন।
হাঁটতে শুরু করলাম শহীদ মিনারের দিকে। সেখানেও মানুষের ঢল। একটু পরই ভ্যানে করে এক তরুণের গুলিবিদ্ধ লাশ আনলেন বিক্ষোভকারীরা। পুরো রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ল ছোপ ছোপ রক্ত। বাংলামোটর এলাকায় গুলিতে তিনি নিহত হয়েছেন।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে দেখা হলো আমাদের সাংবাদিক শরিফুল ইসলামের সঙ্গে। সকাল ৯টা থেকে এই এলাকায় নিউজ কাভার করছিলেন তিনি। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত ও ক্ষুধার্ত মনে হলো তাকে।
কারফিউ শুরু হয়ে গেছে—ঘড়ি দেখে জানালেন একজন। হাঁটতে হাঁটতে শাহবাগ থানার সামনে এলাম। পুলিশ ভেতরেই অবস্থান করছে। থানার সামনে হাতে হাত রেখে নিরাপত্তা ব্যূহ তৈরি করে রেখেছেন শিক্ষার্থীরা। অথচ এই পুলিশের বন্দুকই গর্জে উঠেছিল শিক্ষার্থীদের বুক বরাবর।
জাতীয় জাদুঘরের সামনের ফুটপাতে বসলাম আমরা। সবাই ক্লান্ত, পিপাসার্ত। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে জানলাম, সেদিন সারা দেশে ৮১ জন মারা গেছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকেও সেখানকার এক সাংবাদিক ঢাকায় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর নিহত হওয়ার খবর জানালেন। মনটা আমাদের বেশ খারাপ। আর কত লাশ দরকার শেখ হাসিনার? কয়টা লাশ পেলে তিনি আসলেই ‘স্বজন হারানোর বেদনা’ বুঝবেন?
সময় গড়াচ্ছে। ছাত্র-যুবারা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে স্লোগান দিচ্ছেন, আবার থেমে যাচ্ছেন। স্লোগান উঠল—‘এইমাত্র খবর এলো, কারফিউ ভেঙে গেল।’
কারফিউকে তোয়াক্কা না করেই নেমেছে ছাত্র-জনতা। কতক্ষণ থাকবে তারা? রাতেও রাজপথে থাকবে লোকজন? জালিম সরকারের গুন্ডারা রাতের আঁধারে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে! এমন অপকর্মের ইতিহাস তো রয়েছে তাদের। মনে অনেক প্রশ্ন-ভয়-শঙ্কা উঁকি দিল।
সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা। খণ্ড খণ্ড স্লোগানে মুখরিত শাহবাগ। সাংবাদিক বন্ধুদের বিদায় দিলাম। আমিও হাঁটতে শুরু করলাম সায়েন্স ল্যাবের দিকে। কারফিউয়ের মাঝেই রাস্তায় কয়েকটি রিকশা বিক্ষিপ্তভাবে চলছে। দোকানপাট বন্ধ। রাস্তার দুধারে সাধারণ মানুষ খণ্ড খণ্ড হয়ে জটলা বেঁধে ফিসফিস করে কথা বলছে। চোখেমুখে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। বাটা সিগন্যাল মোড়ের কাছাকাছি যেতেই ধোঁয়া দেখলাম। সেখানেও একটা গাড়ি পুড়ছে। সেখানকার একজন জানালেন, সরকারদলীয় গুন্ডারা বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা করেছিল। পাল্টা ধাওয়ায় পালিয়ে যাওয়ার সময় গাড়িতে আগুন লাগিয়ে যায় হাসিনার সন্ত্রাসীরা।
বাটা মোড়ের ভোজ্যতেলের গলির মুখে দাঁড়ালাম। প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়েছে। রাস্তার এপার-ওপার দুধারেই আমার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের বাসা। ভাবলাম কিছু খেয়ে যাব। নাহ্! বাসায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন স্বজনেরা। মোবাইল ফোনে চার্জ প্রায় শেষ, ইন্টারনেটও বন্ধ।
কুদরাত-এ-খুদা সড়ক (সায়েন্স ল্যাব সড়ক) ধরে হাঁটতে লাগলাম। মোড়ে মোড়ে প্রচুর জটলা। রাস্তা পার হয়ে সিটি কলেজের সামনে দেখলাম শত শত তরুণ বিক্ষোভ করছেন। সেখান থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে। সিটি কলেজের রাস্তায় ঢুকে পড়লাম। সীমান্ত স্কোয়ারের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। একটু পরই দেখলাম শেখ হাসিনার বিনিয়োগ উপদেষ্টা ও অতীতের শেয়ার কেলেঙ্কারির খলনায়ক সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন ‘ইয়েলো’ নামক শোরুমটি আগুনের লেলিহান শিখায় ছারখার হয়ে যাচ্ছে।
সেখান থেকে সীমান্ত স্কোয়ারের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। দুই কিশোর এগিয়ে এলো, থামাল আমাকে। ‘ওই দিকে পুলিশ-বিজিবি বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে আছে। একজনকে গুলি করে মেরেছে। ওই দিকে যাবেন না,’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল তারা।
তাদের কথামতো মূল সড়কে ফিরে এলাম। হাঁটতে শুরু করলাম কলাবাগানের দিকে। সেখানেই পেয়ে গেলাম একটা রিকশা। সড়কের দুপাশে বাতি জ্বলছে মিটমিট করে। হাসিনার গুপ্তঘাতকেরা লুকিয়ে আছে মোড়ে-মোড়ে কোণে-কোণে—আশঙ্কায় বুকটা দুরু-দুরু করছে। রিকশা ছুটে চলল। আড়ংয়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সশব্দে সেনাবাহিনীর একটা বড়সড় কনভয় সাঁই করে চলে গেল। কনভয়টি ছুটছে গণভবনের দিকে। জিপে বসা সেনাদের দিকে তাকালাম। গত কয়েক দিনে তাদের যেমন উদ্ধত চেহারা দেখেছি, সড়কবাতির আবছা আলোয় আজ আর তেমনটা মনে হলো না।
পুলিশও দেখলাম সারিবেঁধে বসে আছে গণভবনের উল্টো দিকে। তাদের মধ্যেও বেশ আলস্য ভাব লক্ষ করলাম। কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নামা জনগণকে বিরক্ত করতে এখন তারাও আর রাজি নন। হয়তো তাদের কাছে সেদিনই পৌঁছে গিয়েছিল আগাম খবর—‘৩৬ জুলাই হাসিনার দুঃশাসন থেকে মুক্ত হবে বাংলাদেশ।’
লেখক : বিশেষ সংবাদদাতা, আমার দেশ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


