আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

রমজান হত্যায় হাসিনার বিচার চান স্ত্রী নূরুন্নাহার

শফিকুল আলম শাহীন, পূর্বধলা (নেত্রকোনা)

রমজান হত্যায় হাসিনার বিচার চান স্ত্রী নূরুন্নাহার

আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই। খুনির বিচার চাই। যে বা যারা আমার স্বামীকে মেরেছে, আমি তাদের বিচার চাই। খুনি শেখ হাসিনার বিচার চাই। এভাবেই কেঁদে কেঁদে কথাগুলো বলছিলেন ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের হ্যালমেট বাহিনী ও পুলিশের গুলিতে নিহত নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার রমজান আলীর স্ত্রী নূরুন্নাহার। নিহতের একমাত্র ছেলে কাঠমিস্ত্রি কামাল হোসেন (২০) মেনেই নিতে পারছেন না বাবার অকালমৃত্যু। মেয়ে নূরজাহান (১৫) স্থানীয় কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। উপস্থিত সাংবাদিকদের দেখে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। আর নিহতের মা খাদিজা বেগমও যেন বাকরুদ্ধ।

গত ৪ ডিসেম্বর উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের দুধি গ্রামে নিহত রমজান আলীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এমন চিত্র। বলছিলাম ওই গ্রামের মৃত নূরহোসেনের একমাত্র ছেলে নিহত রমজান আলীর (৪০) কথা। যে রমজান আলী গত ৫ আগস্ট রাজধানী ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। রমজানকে দিনমজুর বাবার অভাব আর অনটনের সংসারে মাত্র ১৫ বছর বয়সেই ধরতে হয়েছিল সংসারের হাল। চরম দরিদ্রতার সঙ্গে সংগ্রাম করে এক নিকট আত্মীয়ের হাত ধরে রমজান চলে যান ঢাকার মধ্যবাড্ডা এলাকায়। সেখানে পেটে-ভাতে (বিনা বেতনে) এক কাঠমিস্ত্রির সঙ্গে কাজ করতে থাকেন। একসময় তিনি নিজেই হয়ে ওঠেন কাঠমিস্ত্রি। সেখানেই থেকে গেলেন রমজান। বিয়ে করলেন। স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে ও মাকে নিয়ে তার সংসার ভালোই চলছিল। কিন্তু ৫ আগস্ট সব উলট-পালট হয়ে গেল। নিভে গেল রমজানের পরিবারের প্রদীপ শিখা।

বিজ্ঞাপন

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রমজানের ছেলে কামাল হোসেন জানালেন ভয়াবহ সেই দিনের কথা। সেদিন ৫ আগস্ট ২০২৪, সকাল ৮টায় তার বাবা কাজের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। দুপুরে বাসায় এসে পরিবারের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করে আবারও কাজে চলে যান। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো, রাত ১০টা বেজে গেল কিন্তু বাবা আসছেন না। বাবা ফোনও ধরছেন না। ঘুম নেই। আত্মীয়স্বজনের কাছে বাবার খোঁজ নিতে লাগলাম। একসময় রাত ১২টার দিকে বাবার ফোন এলো। অন্য প্রান্ত থেকে একজন বললেন, ঢাকা মেডিকেলে আসেন। তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছেন। বাবার এমন খবরে নিজেকে ধরে রাখতে পারছিলাম না। শরীরটা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। বাইরে থমথমে পরিবেশ। আমার এক খালু ও মাকে নিয়ে অনেক কষ্ট করে রাত ২টার দিকে হাসপাতালে গিয়ে দেখি বাবা মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে আছেন। মুখে অক্সিজেন লাগানো। চিকিৎসক জানালেন তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। বুকে ও ডান হাতের বাহুতে গুলি লেগেছে। তাকে বাঁচানোর জন্য রক্তের প্রয়োজন। অনেক কষ্ট করে রক্ত পাওয়া গেলেও বাবাকে আর বাঁচানো গেল না। ৬ আগস্ট ভোর ৬টার দিকে মারা গেলেন বাবা। বাবার লাশ নিয়ে বাড়ি আসি। গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে দাদার কবরের পাশে বাবাকে কবর দিই। আজ বাবা নেই, বড্ড অসহায় হয়ে গেছি। কে দেখবে আমাদের। কার কাছে যাব।

নিহত রমজানের প্রতিবেশী উপজেলার দুধি গ্রামের রতন মিয়া জানান, রমজান সহজ-সরল ও ধার্মিক প্রকৃতির লোক ছিলেন। ২০-২৫ বছর ধরে রমজান ঢাকায় থাকেন। ঢাকায় কাজ করে অনেক কষ্টে গত বছর গ্রামের বাড়িতে একটি ঘর নির্মাণ করেছেন। এর জন্য অনেক টাকা ঋণও করেছেন তিনি। এত কষ্ট করে ঘর করে সেই ঘরে থেকে যেতে পারলেন না রমজান।

রমজানের স্ত্রী নূরুন্নাহার জানান, বাড়িতে ঘর করতে গিয়ে অনেক টাকা ঋণ করে ফেলেছি। এখন জানি না সেই ঋণ কীভাবে শোধ করব। আর পরিবারই কীভাবে চালাব। এরই মধ্যে ঢাকায় জামায়াতের নেতারা ১ লাখ ও জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে ৬ লাখ টাকা দিয়েছে। এখনো অনেক ঋণ।

বিপদগ্রস্ত এই পরিবারটির পাশে আর্থিক সহযোগিতায় সরকারসহ সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে আসবেন, এমনটিই মনে করছে সচেতন মহল। পূর্বধলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার রেজুয়ানা কবির বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পূর্বধলা উপজেলায় রমজান আলী নামের এক শ্রমজীবী শহীদ ও ১১ জন আহত হয়েছেন। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শহীদ ও আহতদের স্বজনদের নিয়ে এরই মধ্যে স্মরণসভা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত রমজানের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন আহতদের খোঁজখবর নিচ্ছে ও সব সময় তাদের পাশে থাকবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

বিষয়: