সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সারা দেশে দ্বিতীয় দিনের মতো ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এদিন সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরা আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়। ইন্টারনেট বন্ধের পাশাপাশি হেলিকপ্টার থেকেও গুলি করা হয়। নজিরবিহীন সহিংসতায় রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে অন্তত ৬৭ জন নিহত হন। এর মধ্যে ঢাকায় ৬২ জন, রংপুরে দুজন এবং সাভার, সিলেট ও নরসিংদীতে একজন করে নিহত হন। এ নিয়ে তিনদিনে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫০ জনে। নিহতদের অধিকাংশের শরীরে গুলি ও মাথায় আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়।
বিপুলসংখ্যক পুলিশ-র্যাবের পাশাপাশি ৭৫ প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েনের পরও সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে ব্যর্থ হয়ে ১৯ জুলাই রাত ১২টা থেকে সারা দেশে কারফিউ জারি ও সেনা মোতায়েন করে। অন্যদিকে সরকারের সঙ্গে সংলাপের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা ৯ দফা দাবি ঘোষণা করেন।
পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেন। রামপুরা টিভি সেন্টারসংলগ্ন সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হয়। মালিবাগ মোড় থেকে রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত এলাকা বিক্ষোভকারীদের দখলে ছিল। পুলিশ, বিজিবি, র্যাবের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ গভীর রাত পর্যন্ত চলে। এদিন বিটিভি ভবনে অগ্নিকাণ্ডের কারণে সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়।
গুলশান এলাকায় সড়কে গাছের গুঁড়ি, কংক্রিটের স্ল্যাব ও প্লাস্টিকের ব্লক ফেলে আগুন দেওয়া হয়। গুলশান-বাড্ডা লিংক রোডে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়। জুমার পর প্রগতি সরণি অবরোধ করেন বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। কুড়িল চৌরাস্তা ও কালাচাঁদপুর এলাকায় লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা দফায় দফায় হামলা চালায়। কুড়িল এলাকায় র্যাবের হেলিকপ্টার থেকে টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ এবং গুলি করা হয়। নতুনবাজার এলাকাতেও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়।
বিজয়নগর এলাকায় ইসলামী যুব আন্দোলনের কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। যাত্রাবাড়ী এলাকায় দিনভর র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়। পুরান ঢাকা, সূত্রাপুর, লক্ষ্মীবাজার, ধানমন্ডিতেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। উত্তরায় গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে একদল কর্মী-সমর্থক শোডাউন করে গুলি ছুড়লে শিক্ষার্থীদের ধাওয়ার মুখে একপর্যায়ে তারা পালিয়ে যায়।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত যানবাহনের চলাচল প্রায় বন্ধ ছিল। দূরপাল্লার বাস, রেল যোগাযোগ এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটও স্থগিত করা হয়। ঢাকার বাইরে খুলনা, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, রংপুর, মানিকগঞ্জ, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।
চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট, সাভার, নরসিংদী, মাদারীপুর, সিলেট ও রংপুরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত হন। নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলা চালানো হয়। এ সময় কারারক্ষীদের অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে বেশকিছু কয়েদি পালিয়ে যায়।
এ সময় ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে দেশব্যাপী ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় অনলাইনভিত্তিক আর্থিক লেনদেন, যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। মোবাইল অপারেটরগুলো জানায়, কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ব্যান্ডউইথ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।
ওইদিন সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগে রাজধানী ঢাকাসহ ৩১ জেলা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সরকারের পক্ষ থেকে মোট নিহতের সংখ্যা ১০৩ জন এবং আহতের সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি বলে জানানো হয়। তবে বিভিন্ন সূত্রে হতাহতের সংখ্যা আরো বেশি হওয়ার দাবি করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাতেই সারা দেশে কারফিউ জারি এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।
এদিকে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন এবং প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির উদ্যোগের কথা জানান। শিক্ষামন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী আলোচনার প্রস্তুতি নিলেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা তা প্রত্যাখ্যান করে সংলাপের প্রস্তাবকে ‘প্রহসন’ আখ্যা দেন এবং আন্দোলন দমন বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
আন্দোলনের সমন্বয়করা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। রাত সাড়ে ৯টায় অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের নতুন করে ৯ দফা দাবি ঘোষণা করেন। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল—ছাত্রহত্যার দায় নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পদত্যাগ, ছাত্রহত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বরখাস্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও প্রক্টরের পদত্যাগ, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় দায়ী পুলিশ এবং ছাত্রলীগ, যুবলীগ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা ও গ্রেপ্তার, হতাহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে ছাত্র সংসদ চালু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক হল খুলে দেওয়া এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের একাডেমিক বা প্রশাসনিক হয়রানি না করার নিশ্চয়তা প্রদান।
এদিন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চলমান আন্দোলনে পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দলীয় নেতাকর্মীদের ‘বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে’ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত সমাবেশে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ অনেক ধৈর্য ধরেছে। এখন সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

