জুলাই মাসটি প্রথমে অন্য সব জুলাইয়ের মতোই এসেছিল। আকাশে মেঘ ছিল, রাস্তায় ধুলো ছিল, শহরের মানুষের হাতে ছিল অসমাপ্ত কাজের তালিকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা কেউ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে কেউ চাকরির আবেদন করছিল, কেউবা বিকালে বন্ধুদের সঙ্গে চায়ের দোকানে বসে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করছিল। তখনো কেউ জানত না, কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের পরিচিত শহরটি বদলে যাবে। পরিচিত সড়কগুলো হয়ে উঠবে প্রতিরোধের মঞ্চ, রাস্তায় পাওয়া যাবে বারুদের খোসা, হাসপাতালের বারান্দা ভরে যাবে রক্তাক্ত তরুণে, আর মায়ের ফোন ধরার আগে সন্তানকে একবার ভেবে নিতে হবে—সত্যিটা বলবে, নাকি বলবে, ‘আম্মু, আমি নিরাপদে আছি।’
একটি দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। দাবি ছিল ন্যায্যতার, সমতার, ভবিষ্যৎকে নিজের যোগ্যতায় অর্জনের অধিকারের। কিন্তু রাষ্ট্র যখন তরুণদের এই চাওয়াকে অপরাধ হিসেবে দেখতে শুরু করল, তখন সেই দাবি আর কেবল কোটার মধ্যে রইল না। একটি প্রজন্ম হঠাৎ বুঝতে পারল, তাদের শুধু চাকরির সুযোগ নয়। কথা বলার এমনকি বেঁচে থাকার অধিকারও সংকুচিত হয়ে এসেছে।
১৬ জুলাই আবু সাঈদ বুক পেতে দাঁড়িয়েছিলেন। তার হাতে অস্ত্র ছিল না। সামনে ছিল বন্দুক, পেছনে ছিল তার প্রজন্ম। গুলি চলল। একজন তরুণ মাটিতে পড়ে গেলেন, কিন্তু সেই মুহূর্তে যেন হাজার হাজার বা লাখ লাখ নয়, বরং অগণিত তরুণ উঠে দাঁড়ালেন। শহরের ওপর দিয়ে একটি অদৃশ্য শব্দ ছড়িয়ে পড়ল; প্রথমে ক্ষীণ, পরে প্রবল। সেই শব্দ কোনো দলীয় স্লোগান ছিল না। সেই শব্দে জেগে উঠল ওয়াসিম আকরাম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত, মো. ফারুক ও মো. শাহজাহানরা। সে শব্দ অপমানিত মানুষের কণ্ঠ, নিহত সহপাঠীর জন্য ক্রোধ এবং নিজের ভেতরে নিষ্পেষিত ও জমে থাকা ভয় ভেঙে ফেলার শব্দ।
১৭ জুলাই সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা বন্ধ হলো, ঢাবির হল খালি হলো, আবাসিক শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে পড়লেন ঘরের উদ্দেশে। কিন্তু ছড়িয়ে পড়ল আগুন। ফ্যাসিস্ট ড্রাকুলা ব্লাডহাউন্ডটা হয়তো ভেবেছিল, সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ মানেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। কিন্তু তরুণেরা নদীর জলের মতো। এক পথ আটকে দিলে তারা অন্য পথ খুঁজে নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল নিঃশব্দ হওয়ার পরদিনই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও আশপাশের সড়কগুলো জেগে উঠল।
১৮ জুলাই সকালে কেউ কাউকে নেতা ঘোষণা করেননি। কোনো কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে প্রত্যেকের হাতে নির্দেশনাও পৌঁছায়নি। তবু নর্থ সাউথ, ব্র্যাক, ইস্ট ওয়েস্ট, আইইউবি, এআইইউবি, ইউআইইউ, ড্যাফোডিল, স্ট্যামফোর্ড, সাউথইস্ট এবং আরো অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পথে নেমে এলেন। কেউ বসুন্ধরা থেকে, কেউ বাড্ডা থেকে, কেউ উত্তরা, রামপুরা, আফতাবনগর, বনশ্রী, মহাখালী, মিরপুর কিংবা ধানমন্ডি থেকে।
তাদের বেশির ভাগের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল না। কেউ আগে কখনো মিছিলে হাঁটেননি। কেউ টিয়ার গ্যাসের গন্ধ চিনতেন না, গুলির শব্দ কতটা কাছে এলে বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে, সেটাও জানতেন না। কিন্তু সেদিন তারা একটি কথা জানতেন—সহপাঠীর রক্তের পর ঘরে বসে থাকা যায় না।
সেদিন ঢাকা শহর একটি নতুন ভাষা শিখেছিল। সেই ভাষায় বক্তৃতার চেয়ে চোখের ইশারা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একজন পড়ে গেলে পাঁচজন তাকে তুলে নিয়েছেন। স্বরাষ্ট্র কামালকে যেমন ব্রিফ করেছেন পুলিশ কর্মকর্তা—‘গুলি করি, মরে একটা। একটাই যায় স্যার, বাকিডি যায় না।’ একজন পানি চেয়েছেন, অপরিচিত একটি হাত তার দিকে বোতল বাড়িয়ে দিয়েছে। কেউ নিজের জামা ছিঁড়ে আহতের ক্ষত বেঁধেছেন, কেউ মায়ের নিষেধ অমান্য করে রক্ত দিতে হাসপাতালে ছুটেছেন। এই ভাষার কোনো ব্যাকরণ ছিল না, কিন্তু তার একটিমাত্র উচ্চারণ ছিল—মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াবে; স্বৈরাচার মাস্ট গো।
আন্দোলনের মূল শক্তি তখন আর কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন নয়। মূল শক্তি হয়ে উঠেছিলেন সেই সাধারণ শিক্ষার্থীরা, যাদের নাম সংবাদে আসেনি, যাদের হাতে মাইক্রোফোন ছিল না, যারা শুধু জানতেন—এবার আর পেছনে ফিরে যাওয়ার পথ নেই।
এই কাহিনি তাদেরই, যারা পথে নেমেছিলেন, যারা আহত বন্ধুকে কাঁধে তুলেছিলেন, যারা মায়ের কাছে শেষবারের মতো মিথ্যা বলেছিলেন, ‘চিন্তা কোরো না আম্মা, আমি নিরাপদে আছি।’ আর তাদের, যারা সত্যিই আর ঘরে ফিরে আসেননি।
৫ আগস্ট বিকালে শহরের ওপর যে শব্দ উঠেছিল, তা শুধু বিজয়ের উল্লাস ছিল না। তার মধ্যে কান্না ছিল, অবিশ্বাস ছিল, দীর্ঘদিন ধরে আটকে রাখা নিঃশ্বাস ছেড়ে দেওয়ার স্বস্তি ছিল, গুনে গুনে নিঃশ্বাস না নেওয়ার অনুভূতি ছিল। মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, পতাকা উড়েছিল, অপরিচিতেরা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেছিল। কিন্তু সেই আনন্দের মধ্যেও কিছু মুখ অনুপস্থিত ছিল।
আবু সাঈদ ছিলেন না। মীর মুগ্ধ ছিলেন না। ইয়ামিন নেই, তাহমিদ আবদুল্লাহ তামিম নেই, নাঈমা-আহাদ নেই, রিয়া গোপ নেই, সাংবাদিক প্রিয় ভাই নেই, জাহিদ্দুজ্জামান তানভিন আর ক্যাম্পাসে কোলাহল করবেন না, সাকিব হাসান আর কলেজে যাবেন না ইন্টারের পরীক্ষার রুটিন নিতে। ছিলেন না সেই নাম জানা ও না-জানা তরুণেরা, যাদের রক্ত শুকানোর আগেই শহর বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছিল। অজ্ঞাত পরিচয়ে যাদের বেওয়ারিশ (অশনাক্ত) শহীদের লাশগুলোর সিংহভাগ দাফন করা হয়েছিল রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ-সংলগ্ন কবরস্থান এবং জুরাইন কবরস্থানে, যাদের মাটি ভেসে গিয়েছিল বৃষ্টিতে—সেসব মা জানালার পাশে বসে সন্তানের ফেরার অপেক্ষা করেছিলেন...।
বিজয়ের পর সাধারণ শিক্ষার্থীরা আবার পথে নামলেন। এবার তাদের হাতে ইট কিংবা ব্যানার ছিল না; ছিল ঝাড়ু, ট্রাফিকের সংকেত, রঙের তুলি আর পাহারার দায়িত্ব। তারা সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করলেন, দেওয়ালে নতুন দেশের স্বপ্ন আঁকলেন, মন্দির ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সামনে রাত জেগে দাঁড়িয়ে থাকলেন। যেন বলতে চাইলেন, ধ্বংস করা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না; তারা একটি দায়িত্বশীল দেশ ফিরে পেতে চেয়েছিলেন।
এই আন্দোলনে বিভিন্ন মত ও সংগঠনের মানুষ পাশে দাঁড়িয়েছেন। যেমন ছাত্রশিবির ছিল লজিস্টিকস সাপোর্টে—সেফহোমের মতো জীবন রক্ষাকারী পথ নিয়ে, তেমনি কেউ পানি দিয়েছেন, কেউ আশ্রয়, কেউ চিকিৎসা, কেউ যোগাযোগের সহায়তা। এসব সহযোগিতা ইতিহাসের অংশ; কিন্তু সহায়তা আর নেতৃত্ব এক নয়। কোনো সংগঠনের পতাকা এই আন্দোলনের আকাশ ঢেকে রাখতে পারে না। কারণ সেই এক উন্মুক্ত প্রোজ্জ্বল আকাশ তৈরি হয়েছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের বুকের ওপর দিয়ে, আর তার উজ্জ্বল নীল রঙ এসেছিল শহীদদের রুহ থেকে। আর ওই উদ্দীপ্ত সূর্যটা যেন শহীদদের টকটকে লাল রক্তের মতো রঙিন।
জুলাইকে কোনো দলীয় কার্যালয়ে বন্দি করা যাবে না। জুলাইকে কোনো একক সংগঠনের বিজয়গাথা বানানোও যাবে না। যে তরুণ থ্রি নট থ্রি গুলির সামনে দাঁড়িয়েছিল, যে স্নাইপারের সামনে উঁচিয়ে ছিল, যে ছাত্রলীগের চাপাতির নিচে অকাতরে ঘেন্নাভরা চোখে তাকিয়েছিল, সে কারো সদস্যপদ প্রমাণ করতে দাঁড়ায়নি। যে মেয়েটি তার আব্রুর ওড়না দিয়ে আহত বন্ধুর ক্ষত চেপে ধরেছিল, সে কোনো রাজনৈতিক হিসাব করেনি। যে বাবা সন্তানের লাশ শনাক্ত করতে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরেছেন, তার শোকের কোনো দলীয় পরিচয় নেই। নব্য বিবাহিত স্ত্রী যে শোক সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে, সে কোনো দলের মেনিফেস্টোয় আকর্ষিত নয়।
আমাদের এই জুলাই ছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত উচ্চারণ। এতদিন ধরে একটি জাতির কণ্ঠে যে শব্দ আটকে ছিল, তরুণেরা নিজেদের জীবন দিয়ে সেই শব্দকে মুক্ত করেছিলেন। কেউ তাকে ন্যায়বিচার বলেছে, কেউ স্বাধীনতা, কেউ মর্যাদা। কিন্তু শব্দের গভীরে ছিল একই আকাঙ্ক্ষা—মানুষ যেন মাথা নিচু করে বেঁচে থাকতে বাধ্য না হয়।
ইতিহাস একদিন হিসাব চাইবে। কে সামনে ছিল, কে পেছনে ছিল, কে সাহায্য করেছিল, আর কে পরে এসে কৃতিত্ব দাবি করেছিল—সবকিছুরই বিচার হবে। তবে ইতিহাসের প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা থাকবে তাদের নাম, যারা বিনিময়ে কিছু চাননি, বিনিময়ের অনেক অনেক ঊর্ধ্বে উঠে গিয়েছেন তারা, যে বিনিময় একমাত্র মহান রবের হাতেই ন্যস্ত। যারা নেতৃত্বের পদ চাননি, নির্বাচনের টিকিট চাননি, স্মৃতিফলকে নিজের নামও চাননি, তারা শুধু চেয়েছিলেন অন্যায় থামুক। চেয়েছিলেন অন্যায়ের করাল গ্রাসে যারা ফাঁসির সেলে ঘুমাচ্ছেন তারা যেন মুক্ত আকাশ দেখেন; যারা ফাঁসির রশিতে ঝুলেছেন, তাদের পরিবার যেন মুক্ত সমাজে পুলিশ আর এজেন্সির হাতে অপ্রেসড না হয়। যেন তরুণদের হাত পেতে ভিক্ষা না নিতে হয়, তরুণরা যেন কোনো গোষ্ঠীর হাতে বন্দি না হয়।
জুলাইয়ের প্রকৃত উত্তরাধিকার তাই ক্ষমতার পরিবর্তন নয়। তার উত্তরাধিকার হলো ভয়কে অতিক্রম করা। একজন পড়ে গেলে আরেকজনের দাঁড়িয়ে যাওয়া। একটি কণ্ঠ স্তব্ধ হলে হাজার কণ্ঠের একসঙ্গে ধ্বনিত হওয়া।
সেই ধ্বনি এখনো শেষ হয়নি। শহরের দেয়ালে, মায়ের অপেক্ষায়, আহত তরুণের শরীরে এবং নতুন বাংলাদেশের অসমাপ্ত স্বপ্নে তা ফিরে ফিরে আসে।
জুলাইয়ের ইতিহাস সাধারণ শিক্ষার্থীদের ইতিহাস। জুলাইয়ের গৌরব শহীদদের গৌরব। আর যে স্বাধীন উচ্চারণ তারা রক্ত দিয়ে রেখে গেছেন, সেটিই একটি জাতির সবচেয়ে কঠিন, সবচেয়ে বেদনাময় এবং সবচেয়ে অমোচনীয় ওংকার।
লেখক : শিক্ষার্থী, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

