আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

এখনো পারভেজের কবর খুঁজে পায়নি পরিবার

শেখ ওমর ফারুক, মতলব উত্তর (চাঁদপুর)

এখনো পারভেজের কবর খুঁজে পায়নি পরিবার

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পারভেজের বাবা মো. সবুজ বেপারী এখনো তার সন্তানের কবর খুঁজে পাননি। কবে মারা গেছেন সে দিন-তারিখও সঠিক বলতে পারেন না।

তবে শুনেছেন তার একমাত্র সন্তান পারভেজকে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। এর আগে ছেলের লাশ খুঁজতে গিয়ে নিজের চাকরি হারিয়েছেন সবুজ। বর্তমানে ছোট টঙ দোকানে চা বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

শহীদ পারভেজের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব উত্তরের ফতেপুর পূর্ব ইউনিয়নের বার হাতিয়া গ্রামে। দীর্ঘ একযুগ ধরে ঢাকার বাড্ডা এলাকায় বসবাস করতেন ২৩ বছর বয়সি পারভেজ। সেখানে একটি ফার্নিচারের দোকানে নকশামিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতেন তিনি। ছোটবেলা থেকে মায়ের আদর পাননি শহীদ পারভেজ। বাবার সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় মায়ের অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়। দাদি তাকে লালন-পালন করেছেন।

এখনো শহীদ পারভেজের প্রসঙ্গ উঠলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন দাদি মাফিয়া বেগম। মনের মধ্যে ক্ষোভ, নাতির মরণ দেখতে পাননি। এমনকি লাশ খুঁজতে গিয়েও পাননি। কান্নার সময় শুধু ‘ভাই ভাই’ বলতে থাকেন। জানতে চাইলে ৭০ বছর বয়সি মাফিয়া বেগম বলেন, ‘আমার ভাই (পারভেজ) চলে গেছে। এখন কে আমারে খোঁজ নেবে। যেরা আমার নাতিরে মাইরা লাইছে, আমি হেগো ফাঁসি চাই।’

শহীদ পারভেজ পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস ছিলেন জানিয়ে বাবা সবুজ বেপারী বলেন, ‘আমি লঞ্চে সামান্য বেতনে চাকরি করতাম। পারভেজের লাশ খুঁজতে গিয়ে ও শহীদ হওয়ার পর যাবতীয় কাগজপত্র নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে চাকরিতে সময় দিতে পারিনি। ফলে চাকরি হারিয়ে আমি এখন বেকার।’

সবুজ বেপারী বলেন, আমার বড় মেয়ে নূপুরকে বিয়ে দিয়েছি। মেজো মেয়ে ঝুমুর কলেজে পড়াশোনা করে। ছোট মেয়ে খাদিজা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। আমার সংসারে মা, স্ত্রী, দুই মেয়ে নিয়ে কষ্টে দিনাতিপাত করছি। চাকরি না থাকায় বাড়ির পাশে একটি ছোট টঙ দোকানে চা বিক্রি করে কোনো রকমে সংসার চালাই।’

জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে ৫ লাখ টাকা পেয়েছেন জানিয়ে সবুজ বেপারী বলেন, সেই টাকার মধ্যে বড় মেয়ে নূপুরের বিয়েতে খরচ করেছি। বেকার অবস্থায় ধারদেনা ছিল, সেগুলো পরিশোধ করেছি। এ ছাড়া ছেলের নিহতের তথ্য দিতে বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করতে গিয়েও খরচ হয়েছে বলে জানান তিনি।

শহীদ পারভেজের বিষয়ে সবুজ বলেন, ‘জুলাই মাসে ঢাকায় আন্দোলন চলাকালে ১৯ জুলাই খবর পাই, আমার ছেলে পারভেজ নিখোঁজ। পরে ছেলের খোঁজ নিতে ঢাকায় যাই। অনেক খোঁজাখুঁজির পর না পেয়ে ২১ জুলাই আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে যাই। সেখানে গিয়ে শুনি আটটি লাশ আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামে পাঠানো হয়েছে।

সেখান থেকে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম অফিসে যাই। সেখানে যাওয়ার পর আমাকে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে যাওয়ার কথা বলে। শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে গিয়ে আমি আমার ছেলের ছবি দেখাই। ছবি দেখার পর কবরস্থানের লোকেরা বলছে আপনার ছেলের লাশ এখানে দাফন করা হয়েছে। তবে কোনটি আপনার ছেলের কবর তা নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না।’

সবুজ বেপারী আরো বলেন, সেই থেকে এখনো সন্তানের অপেক্ষায় আছি। আজও পর্যন্ত ছেলের লাশ দেখলাম না। কবর চিহ্নিত করতে পারলাম না। এই কষ্ট নিয়ে দিন কাটাচ্ছি। আমি আমার সন্তান হত্যার বিচার চাই। সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি দাবি করছি।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন