আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

সাহরি ও ইফতারের মহিমা

নাজমুল হাসান কাসেমী

সাহরি ও ইফতারের মহিমা

নীল আকাশের বুক চিরে রমজানের নতুন চাঁদ উদিত হওয়া মাত্রই মুমিনের হৃদয়ে এক স্বর্গীয় বার্তার প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে। রমজান মানেই কেবল উপবাস নয়, বরং ত্যাগের মহিমায় নিজেকে নতুন করে চিনে নেওয়ার এক মাসব্যাপী সাধনা। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনুল কারিমে বলেছেন— ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অর্জন করতে পার।’ (সুরা বাকারা : ১৮৩)

আর এই সাধনার দুটি অবিচ্ছেদ্য স্তম্ভ হলো—সাহরি ও ইফতার।

বিজ্ঞাপন

সাহরি : রাতের শেষ প্রহরে যখন পৃথিবী নিবিড় নিস্তব্ধতায় ডুবে থাকে, তখন মুমিনের ঘরে বরকতময় ভোরের পবিত্র আলো ও প্রভুর সান্নিধ্য প্রকাশ পায়। সাহরি কেবল দিনের ক্ষুধা নিবারণের প্রস্তুতির নাম নয়, এটি মূলত এক ইবাদত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন— ‘তোমরা সাহরি খাও, কারণ সাহরিতে বরকত রয়েছে।’ (বুখারি : ১৯২৩)

১. আধ্যাত্মিক জাগরণ ও আল্লাহর রহমত : সাহরির সময়টি হলো ‘তাহাজ্জুদ’ ও ‘ইস্তিগফারের’ সময়। যখন সবাই গভীর ঘুমে মগ্ন, তখন একজন রোজাদার আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় শয্যা ত্যাগ করেন। হাদিসে কুদসিতে বলা হয়েছে— এই শেষ প্রহরে আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন— ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর ফেরেশতারা সাহরি গ্রহণকারীদের জন্য রহমত প্রার্থনা করেন।’ (মুসনাদে আহমাদ : ১১০৮৬)

২. নবীর সুন্নত ও স্বাতন্ত্র্য : সাহরি খাওয়া সুন্নতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এটি মুসলিম ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের রোজা পালনের মধ্যে পার্থক্যকারী রেখা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমাদের রোজা এবং আহলে কিতাবদের (ইহুদি ও খ্রিষ্টান) রোজার মধ্যে পার্থক্য হলো সাহরি গ্রহণ করা।’ (মুসলিম : ১০৯৬)

ইফতার : তপ্ত রোদে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যখন পশ্চিম আকাশে সূর্য বিদায়রাগ মেখে পাটে বসে, তখন শুরু হয় ইফতারের মাহেন্দ্রক্ষণ। এটি খোদাপ্রেমের এক অনন্য পরাকাষ্ঠা।

১. ধৈর্যের ফল ও দুই আনন্দ : সারা দিন ক্ষুধার্ত থাকার পর আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষায় দস্তরখানে বসে থাকা মুমিনকে প্রকৃত সংযমী করে তোলে। রোজাদারের এই আনন্দ নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন— ‘রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ; একটি যখন সে ইফতার করে, অন্যটি যখন সে তার রবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে।’ (বুখারি : ১৯০৪)

২. দোয়ার শ্রেষ্ঠ সময় : ইফতারের আগের মুহূর্তগুলো হলো আরজি কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন— ‘তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না, যাদের মধ্যে একজন হলো রোজাদার, যতক্ষণ না সে ইফতার করে।’ (তিরমিজি : ২৫২৬)

ইফতারের সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন, ‘পিপাসা দূরীভূত হলো, শিরাগুলো সিক্ত হলো এবং আল্লাহর ইচ্ছায় সওয়াব নির্ধারিত হলো।’ (আবু দাউদ : ২৩৫৭)

৩. সামাজিক সেতুবন্ধ ও সওয়াব : ইফতার এক পরম সামাজিক মিলনমেলা। অন্যকে ইফতার করানোর গুরুত্ব দিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে ওই রোজাদারের সমান সওয়াব পাবে; তবে রোজাদারের সওয়াব থেকে সামান্যও কমানো হবে না।’ (তিরমিজি : ৮০৭)

ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনুল কারিমে বলেছেন, ‘আর তোমরা আহার করো ও পান করো যতক্ষণ না ফজরের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে স্পষ্ট হয়।’ (সুরা বাকারা : ১৮৭)

আধুনিক বিজ্ঞান বলে, সাহরি শরীরের গ্লুকোজ লেভেল ঠিক রেখে সারা দিনের কর্মশক্তি জোগায়। আর ইফতারের সময় খেজুর বা পানি দিয়ে রোজা ভাঙার যে সুন্নাহ, তা দ্রুত রক্তে শর্করা সরবরাহ করে শরীরকে চাঙা করে তোলে।

পরিশেষে বলা যায়, সাহরি ও ইফতার কেবল দুটি ভোজনকাল নয়; বরং এটি আত্মিক পরিশুদ্ধি ও সামাজিক সহমর্মিতার এক মহোত্তম পাঠশালা। এই রমজানে আমাদের শপথ হোক—‘আমরা ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে সাহরি ও ইফতারের প্রকৃত শিক্ষা জীবনে ধারণ করব। আমাদের দস্তরখান যেন অভাবী মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকে। আল্লাহ আমাদের প্রত্যেকের সিয়াম সাধনাকে কবুল করুন। আমিন

লেখক : পরিচালক, আস-সুফফাহ মডেল মাদরাসা, গাজীপুর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...