সময়টা ২০০৮। বলছি শহীদুল জহিরের কথা। ফাল্গুনের এক বসন্তে ২৩ মার্চ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বড্ড অসময়ে এ ভুবন থেকে তিনি চিরবিদায় নেন। এই বিদায় ছিল অপ্রত্যাশিত। সেবার ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে কানাডার মন্ট্রিয়ল থেকে ঢাকায় আসি পরিকল্পিত সময়ের আগেই। মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকেই দৈনিক সংবাদপত্রের পাতা উল্টোতেই চোখে পড়েছে একটি অবয়ব—পুরু লেন্সের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে তীক্ষ্ণ এক দৃষ্টি! অত্যন্ত বড় মাপের একজন লেখক, আর সেইসঙ্গে সর্বোচ্চ পদমর্যাদাসীন আমলা—শহীদুল হক, লেখক হিসেবে পরিচিতি শহীদুল জহির। সচিব শহীদুল হককে চিনি, জানি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায়ই। তবে শহীদুল জহিরকে জানলাম মাত্রই দুই বছর আগে, ২০০৬ সালে, তাও ঢাকা ছেড়ে মন্ট্রিয়ল পৌঁছানোর পর। জানতাম না শহীদ লেখক নামের আবরণে ‘আলাওল সাহিত্য পুরস্কার’ ও ‘আজকের কাগজ’ পুরস্কার প্রাপ্তির এত বড় কীর্তি লুকিয়ে রেখেছেন।
মৃত্যুর মাত্র কদিন আগেই শহীদ পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আর তিন বছর পরই কর্মক্ষেত্র থেকে তার অবসর গ্রহণের কথা ছিল। কর্মক্ষেত্রের মতো সচিব শহীদুল হক আজ নিজ মহিমায় ‘শহীদুল জহির’ হিসেবে সাহিত্যানুরাগী বিদগ্ধ পাঠক সমাজের স্মৃতির অলিন্দে স্থান করে নিয়েছেন। সেইসঙ্গে তার সৃষ্ট সাহিত্যভান্ডারের বিশালতাকে বোঝার এবং আমাদের অন্তরে ধারণ করার এক দুর্লভ সুযোগ করে দিয়ে গেছেন—তারই প্রমাণ মেলে প্রতিদিনের দৈনিক পত্রিকা, সাময়িকীতে তাকে নিয়ে বিস্তর লেখালেখির মাঝে । শহীদের যারা কাছের মানুষ ছিলেন, যাদের বিচরণ সাহিত্যের নানা ক্ষেত্রে। তাদেরই অনবদ্য লেখনীতে সাহিত্যিক শহীদুল জহির মূর্ত হয়ে উঠেছেন অপূর্ব ব্যক্তিত্বে।
আমরা যারা শহীদের বন্ধু ও সহপাঠী ছিলাম, যারা ছাত্রাবস্থাতেই তার চিন্তা-চেতনার ভুবনকে সান্নিধ্য থেকে চিনতে ও জানতে পেরেছিলাম, আজ আমরা নিজেদের সৌভাগ্যের অংশীদার মনে করি; কারণ শহীদুল জহিরকে না হোক, অন্তত শহীদুল হককে আমরা জানি।
আমরা ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের তরুণ প্রজন্ম। স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের প্রাঙ্গণে ভর্তির জন্য ছুটোছুটি করছি। তখনো এক হাতে সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ছাড়পত্র’, অন্য হাতে জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’। আমাদের তরুণ কণ্ঠে কখনোবা উচ্চারিত হচ্ছে —‘যে শিশু ভূমিষ্ঠ হলো আজ রাত্রে…’ অথবা ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর বুকে…’। ভর্তি হলাম প্রিয় একটি সাবজেক্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সম্মানে। সে দিনগুলোয় শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সরদার ফজলুল করিম স্যারের হবস, লক, রুশো ও ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রীয় দর্শন ছাত্রছাত্রীদের আবেগতাড়িত করছিল—স্বপ্ন থেকে বাস্তবতা, বাস্তবতা আর ইউটোপিয়ান মতবাদ, রাষ্ট্রের রূপরেখা, কোন রাষ্ট্র হবে জনগণের জন্য আদর্শ, রাষ্ট্রের শাসকের গুণাবলি বা বৈশিষ্ট্য কী কী অথবা কেমন হওয়া প্রয়োজন।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের অবসানের জন্য যেমন ‘কারার ওই লৌহ কপাট’ ভাঙার জন্য ডাক দিয়েছিলেন, তেমনিই সমাজের শ্রেণিবিভেদকে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলার জন্য শহীদ তখনই দুর্বার, অস্থির ও ব্যাকুল। এ যেন নিজের মাঝে নিজের নিরন্তর বোঝাপড়া! তাই তো শেষ পর্যন্ত শাসক আর শোষিতের মাঝে যে প্রচার তা ভাঙার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ হতেই শহীদ বেছে নিলেন তার স্বপ্নের সমাজ গড়ার হাতিয়ার হিসেবে সরকারের প্রশাসনিক কর্মকেই, যোগ দিলেন বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে। শহীদ বুঝে নিয়েছিলেন—এ সমাজের পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজন রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো অর্থাৎ প্রশাসনের পরিবর্তন আনা। সে কারণেই শহীদুল জহির এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘প্রতিবাদী ভঙ্গি থেকে সরে এসেছি, ওখান থেকে সরে আসা মুশকিল।’ প্রশ্ন হলো—‘প্রতিবাদী ভঙ্গি থেকে সরে আসা’ আর ‘ওখান থেকে সরে আসা’র অর্থই বা কী?
প্রশাসনে যোগ দিয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতাকে ফলপ্রসূ ও অর্থবহভাবে কাজে লাগাতে পারবেন—এই আকাঙ্ক্ষায় শহীদুল হক তার স্বপ্নের সমাজ গড়ার ‘প্রতিবাদী’ রূপটাকে বেঁধে ফেলেন শ্রেণি আর শ্রেণিবিরোধ নিরসনকল্পে সমাজ গঠনের লিবারেল রিফর্মিস্টদের মতবাদে, অর্থাৎ ‘আইরন কেইজ অব বুরোক্রেসিতে।’ আর আমলাতন্ত্রের সেই লৌহাবৃত খাঁচায় বসে নিজের ভেতর গড়ে তোলেন আরেক প্রতিবাদী সত্তা।
শহীদের সহপাঠী ও ঘনিষ্ঠজনদের একজন হিসেবে জানি, ‘শহীদুল হক’ ও ‘শহীদুল জহির’—এই দ্বৈত সত্তার সংমিশ্রণে যে ব্যক্তিটি, তার জীবনের নানা দিক সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন অনেকেই। শহীদ আজ মেমোয়ার, আমাদের সবার স্মৃতির নির্জন ঘরে তার নিংশব্দ আনাগোনা, যে স্মৃতিকে এখনো ধূসরিমা ছুঁতে পারেনি। অনেকের ধারণা শহীদ নির্জন ও একাকী থাকতে ভালোবাসতেন। ছিল ঠিক তারই উল্টো । সারা জীবনই ভালোবাসতেন বন্ধুদের মধুর সান্নিধ্য—আমৃত্যুও তাই। অত্যন্ত হাসি-খুশি ও উচ্ছলতায় ভরা—সেইসঙ্গে কখনো ভাবনার গভীরে হারিয়ে যাওয়া। সবাই ছিলেন তার বন্ধু, তবে শত্রু কে জানি না। বাবার মৃত্যুর পরে সংসারে মা ও ভাই-বোনদের কাছে ছিলেন পরম নির্ভরতার স্থান। অন্যের সাহায্যে সবসময়ই মমতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি ভালোবাসতেন তার গল্প-উপন্যাসে ব্যবহৃত বাংলাদেশের জনমানুষের ভাষায় কথা বলতে, ভালোবাসতেন মানবতা আর জীবনধর্মী কবিতা।
কর্মক্ষেত্রে কর্মঠ, বিচক্ষণ ও সাহসী একজন আমলা, যিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ইকোনমিক রিলেশন্স ডিভিশনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্বপালন করেছেন। মৃত্যুর মাত্র অল্প কিছুদিন আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব প্রাপ্তিটি তার জন্য ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। আমাদের মাঝেও আশার সঞ্চার হয়েছিল—পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এবার ভিন্ন রূপ পাবে। দুঃখ রয়ে গেল বড় অসময়ে চলে গিয়ে অর্পিত কর্ম শুরু করতে পারলেন না।
আমলাতন্ত্রের লৌহাবৃত খাঁচায় বসেও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শহীদুল হক স্বপ্ন দেখেছেন—শুধু স্বপ্নই নয়, ইঞ্জিনিয়ার অ্যাসোসিয়েশন ও রোটারি ক্লাবের সদস্যদের সঙ্গে পরিকল্পনা করছিলেন— ঢাকা শহরের পথশিশু ও বড়দের জন্য স্থায়ী গোসলখানা তৈরির। এ রকম আরো স্বপ্ন ও পরিকল্পনা ছিল পথবাসী সর্বহারাদের জন্য।
শহীদ আজ নেই। আছে তার রেখে যাওয়া আদর্শ নিত্যদিনের কল্যাণে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে। সেই উৎস থেকে উৎসারিত হবে শোষণহীন ও বৈষম্যহীন সুস্থ সমাজ গড়ার এ প্রজন্মের উত্তরসূরিদের অঙ্গীকার, যা শহীদুল হকের মতো তার অনুজদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ভিত্তি গড়ে তুলবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

