বাংলায় মুসলমানদের উৎপত্তি-তত্ত্বের বিশ্লেষণ (পর্ব-৩)

বঙ্গে মুসলিম অভিবাসন

ড. মোহর আলী

বঙ্গে মুসলিম অভিবাসন
১৮৭২ সালে ডব্লিউ. ব্রেনান্ডের তোলা সোনারগাঁয়ে গিয়াসুদ্দিন আজম শাহর কবরের ধ্বংসাবশেষের আলোকচিত্র

গিয়াসুদ্দিন আজম শাহর রাজত্বকালে বেশ কিছু হাবশি (আবিসিনীয়) মুসলমানের বাংলায় আগমনের সুস্পষ্ট প্রমাণ মেলে। পবিত্র মক্কা ও মদিনা নগরীতে উপঢৌকন প্রেরণ এবং মাদরাসা নির্মাণের গুরুদায়িত্ব পালনার্থে তিনি ‘ইয়াকুত’ নামক জনৈক বিশ্বস্ত হাবশিকে নিযুক্ত করেছিলেন। [পূর্বে দেখুন, পৃষ্ঠা : ১৪২-১৪৫] আজম শাহর মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই রাজা গণেশের (Raja Kans) ক্ষমতা দখল, অতঃপর তার ছেলের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ এবং ‘জালালুদ্দিন মুহম্মদ শাহ’ নাম ধারণ করে সিংহাসনে আরোহণের যে ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন হয়। এই ক্ষেত্রে শায়খ আলাউল হকের সুযোগ্য ছেলে ও আধ্যাত্মিক উত্তরসূরি শায়খ নূর কুতুবুল আলম যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছিলেন। অন্যান্য অনুষঙ্গের পাশাপাশি এ ঘটনা দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করে যে, মুসলমানরা ততদিনে এ দেশের জনমিতি ও রাজনীতিতে এক অপ্রতিরোধ্য এবং নির্ধারক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল।

রাজা গণেশের এই ক্ষমতা দখলের তিক্ত অভিজ্ঞতা পুনরধিষ্ঠিত ইলিয়াস শাহি শাসকদের দৃষ্টি এড়ায়নি। ফলে তারা বহির্বিশ্ব থেকে অধিক হারে মুসলমানদের বাংলায় আমন্ত্রণ জানিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে বসতি স্থাপন ও উপনিবেশ গড়ে তোলার একটি সুচিন্তিত নীতি গ্রহণ করেছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়। শাসন ও বসতি স্থাপনের এই সুদূরপ্রসারী প্রক্রিয়ায় যারা অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাদের একটি প্রামাণ্য বিবরণ এই আলোচনার পরবর্তী অংশে সন্নিবেশিত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তবে প্রাসঙ্গিকভাবে এটুকু উল্লেখ করা প্রয়োজন, পরবর্তী ইলিয়াস শাহি শাসক নাসিরুদ্দিন মাহমুদের রাজত্বকালে বাংলার দক্ষিণাঞ্চলে সুবৃহৎ ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মুসলিম বসতি স্থাপিত হয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে ‘খান জাহান’ নামক এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব আধুনিক খুলনার দক্ষিণাংশে (বর্তমান বাগেরহাটে) এক বিস্তীর্ণ মুসলিম জনপদ গড়ে তোলেন। সুন্দরবনের দুর্ভেদ্য ও গহিন অরণ্য পরিষ্কার করে সেটিকে বাসযোগ্য জনপদে রূপান্তরিত করার দুঃসাধ্য কাজটিও তার এই অমর কীর্তির অন্তর্ভুক্ত।

তার এই অসামান্য কৃতিত্বের মূল্যায়ন করতে গিয়ে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ব্লকম্যান লিখেছেন, “যশোরের কপোতাক্ষ (Kabatak) নদ ধরে অগ্রসর হলে আমরা আমাদিতে এসে পৌঁছাই। এর ঠিক উত্তরে, একেবারে সন্নিকটেই মসিদকুড় অবস্থিত, যা মূলত ‘মসজিদকুড়’ শব্দের অপভ্রংশ। এটি হলো খান জাহানের (মৃত্যু : ১৪৫৯ খ্রিষ্টাব্দ) আবাদ করা বনভূমিগুলোর অন্যতম। তিনি ছিলেন খলিফাতাবাদ বা দক্ষিণ যশোরের এক যোদ্ধা-দরবেশ (শায়খ), যাকে এ অঞ্চলের বর্তমান লোকঐতিহ্য সুন্দরবন আবাদের (জঙ্গল কাটার) এক অক্লান্ত রূপকার হিসেবে স্মরণ করে। এটি হলো পার্শ্ববর্তী সেই অঞ্চল বাগেরহাট, যা গত শতাব্দীর শেষ ভাগ পর্যন্ত ‘আইন’-এ (আইনে আকবরি) উল্লিখিত ‘হাভেলি খলিফাতাবাদ’ বা ‘প্রতিনিধির আবাদ’ নামেই সমধিক পরিচিত ছিল।” [জেএএসবি-১৮৭৩, সংখ্যা : ৩, পৃষ্ঠা : ২২৭। আরো দেখুন খান জাহানের শিলালিপি, প্রাগুক্ত, ১৮৬৭, পৃষ্ঠা : ১৩০-১৩৫]

একইভাবে সুলতান মাহমুদের সুযোগ্য উত্তরসূরি রুকনুদ্দিন বারবক শাহর রাজত্বকালে বর্তমান বরিশালেও মুসলিম বসতি গড়ে ওঠার প্রামাণ্য দলিল মেলে। [মির্জাগঞ্জ শিলালিপি, ৮৭০ হিজরি/১৪৬৫ খ্রিষ্টাব্দ। জেএএসবি-১৮৬০, পৃষ্ঠা : ৪০৭] তিনি সেনাবাহিনীসহ প্রশাসনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে বিপুলসংখ্যক হাবশি নিয়োগ দিয়েছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে হাবশিদের সম্মিলিত সংখ্যা ছিল অন্তত আট হাজার।

রুকনুদ্দিন বারবক শাহর শাসনামলে বেশ কয়েকজন আরব নাগরিকেরও বাংলায় আগমন ও স্থায়ীভাবে বসবাসের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। সমসাময়িক সাহিত্যিক সূত্র এবং যুগ-যুগান্তরের জনশ্রুতি—উভয় ক্ষেত্রেই একজন কুরাইশ বংশীয় আরব বীর, শাহ ইসমাইল গাজীর বীরত্বগাথা সযত্নে বিধৃত হয়েছে। তিনি তার প্রায় একশ বিশজন বিশ্বস্ত সহযোগী ও অন্য অনুগামীদের সঙ্গে নিয়ে মাদারান (হুগলি) এবং কাঁটাদুয়ার (রংপুর) অঞ্চলে মুসলিম উপনিবেশ স্থাপনে এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। [রিসালাতুশ শুহাদা, জেএএসবি-১৮৭৪, পৃষ্ঠা : ২১৫-২৩৯] বস্তুত, এই প্রখ্যাত গাজী সম্পর্কিত ইতিহাসের একটি অমূল্য পাণ্ডুলিপি ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্ট জি এইচ দামান্ত কাঁটাদুয়ারে অবস্থিত শাহ ইসমাইলের মাজারের খাদেমের কাছ থেকে উদ্ধার করেছিলেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ওই খাদেম নিজেকে সুদূর আরব থেকে ইসমাইল গাজীর সঙ্গী হিসেবে আগত জনৈক ভৃত্যের অধস্তন বংশধর বলে দাবি করতেন। [প্রাগুক্ত।] তবে, প্রচলিত লোকশ্রুতিতে ইসমাইল গাজীকে আলাউদ্দীন হোসেন শাহর সমসাময়িক বলে উল্লেখ করা হয়, যা ‘রিসালাতুশ শুহাদা’-তে প্রদত্ত তথ্যাবলির নিরিখে ঐতিহাসিকভাবে সঠিক বলে প্রতীয়মান হয় না।

অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সাহিত্যের দলিল ও লোকশ্রুতি উভয় সূত্রেই উল্লেখ রয়েছে, সুলতান একপর্যায়ে শাহ ইসমাইল গাজীর ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা ও অভাবনীয় প্রভাবে ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠেন এবং শেষ পর্যন্ত তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। এই বিয়োগান্ত ঘটনা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, হাজি ইলিয়াস শাহর সিংহাসন আরোহণের সূচনার মতোই, তার প্রতিষ্ঠিত রাজবংশের গোধূলিলগ্নেও বাংলায় বহিরাগত ও প্রভাবশালী বিদেশি মুসলমানদের নিরবচ্ছিন্ন আগমন ছিল এবং এর ফলে এ দেশের রাজনীতি ও ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন নিয়ামকের উদ্ভব হচ্ছিল। এর অব্যবহিত পরেই হাবশিদের ক্ষমতা দখল এবং ৮৯২ থেকে ৮৯৬ হিজরির (১৪৮৬-১৪৯০ খ্রিষ্টাব্দ) মধ্যবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে চারজন হাবশি শাসকের রাজত্ব করার ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে উপর্যুক্ত সমীকরণটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তবে, এই অরাজক পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে আরব অভিবাসী মুসলমানরা শিগগিরই নিজেদের আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। ১৪৯০ খ্রিষ্টাব্দে, সর্বশেষ হাবশি শাসকের প্রভাবশালী মন্ত্রী এবং আরব বংশোদ্ভূতদের অবিসংবাদিত নেতা সৈয়দ হোসেন এক সফল বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে হাবশি শাসনের যবনিকাপাত ঘটে এবং বাংলার ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়—হোসেন শাহি রাজবংশ। এই যুগান্তকারী রাজনৈতিক পালাবদলের ফলে বাংলা থেকে সিংহভাগ হাবশিকে বিতাড়িত করা হলেও, স্বভাবতই তাদের অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত কিছু সাধারণ মানুষ এই ভূখণ্ডেই স্থায়ী নিবাস গড়ে তুলেছিলেন।

পর্তুগিজ ইতিহাসের সূত্র অনুযায়ী, হোসাইনী রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ হোসেন তথা আলাউদ্দীন হোসেন শাহ প্রায় পাঁচশ আরব অনুগামী সমভিব্যাহারে বাংলায় পদার্পণ করেছিলেন। (জে.দ্য বারোস (J.de Barros), ‘দ্য এশিয়া’ (Da Asia); জেএএসবি (J.A.S.B.)-১৮৭৩, পৃষ্ঠা : ২৮৭) তার রাজত্বকালের শেষ ভাগে, তিনি যখন চট্টগ্রাম থেকে আরাকানি দস্যুদের বিতাড়ন করছিলেন, তখন আলফা হোসাইনী নামক জনৈক ধনাঢ্য আরব বণিক সুলতানকে বিশেষ সহায়তা দেন। প্রভূত ধনসম্পদ ও অসংখ্য দাসের অধিকারী এই বণিক ছিলেন চতুর্দশ অর্ণবপোতের অধিপতি। কথিত আছে, অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সুলতান তাকে জামাতা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং তিনি অত্যন্ত মর্যাদাবান ও অভিজাত জীবন অতিবাহিত করেন। ‘তারিখে হামিদী’ গ্রন্থের রচয়িতা এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘বস্তুত, সমসাময়িককাল পর্যন্ত তার উত্তরসূরিরাই চট্টগ্রামের অভিজাত সমাজের শীর্ষস্থানে আসীন ছিলেন; এমনকি সুপ্রসিদ্ধ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত মীর ইয়াহিয়া ইসলামাবাদী, মোল্লা মইনুদ্দীন সন্দ্বীপী এবং আরো অনেকেই গর্বের সঙ্গে নিজেদের হোসাইনীর বংশধর বলে পরিচয় দিতেন।’ (আহাদিসুল খাওয়ানীন (তারিখ-ই-হামিদী), মৌলভি হামিদুল্লাহ খান বাহাদুর, কলকাতা, ১৮৭১, পৃষ্ঠা : ১৭-১৮; জেএএসবি- ১৮৭২, পৃষ্ঠা : ৩৩৬-৩৩৭-এ উদ্ধৃত)

অনুবাদ : মুহাম্মদ আরিফ বিল্লাহ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন