মোহাম্মদ আকরম খাঁ, কবি শাহাদত হোসেন, কবি গোলাম মোস্তফা, বাবু নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ বারোজন সাহিত্যিক বারো মাসে বারো সংখ্যায় 'মাসিক মোহাম্মদী'তে 'বারোয়ারী' উপন্যাসটি লিখে শেষ করেন। বারোজন লেখকের মস্তিষ্কপ্রসূত বিভিন্নমুখী চিন্তাধারার এই উপন্যাসটি পরবর্তীকালে বই হয়ে প্রকাশিত হয়। মোহাম্মদ আকরম খাঁ রচিত অংশটি তার জন্মদিন উপলক্ষে নতুন করে প্রকাশ করা হলো। লেখকের বানানরীতি হুবহু রাখা হলো।
মকিমপুরের খোনকার সাহেবেরা সেকালের খুব বনেদী ঘর। বৃদ্ধ আহমদ আলী খোনকার সাহেবের লাখেরাজ ও জোতজমা সাবেকের মত বজায় থাকলেও আজকাল সংসারের খরচ-পত্র বেড়ে যাওয়াতে মাঝে কিছুদিন তাঁর একটু কষ্টে কেটেছিল। বড় ছেলে আশরাফ আলী স্থানীয় মহকুমার মুন্সেফী আদালতে চাকুরী পাওয়ার পর আর বড় একটা টানাটানি নেই। তার বেতনের ত্রিশ টাকার মধ্যে আমজাদের খরচের জন্য মাসে মাসে দশ টাকা কলিকাতায় পাঠিয়ে দিতে হয়। বাকী কুড়ি টাকা আর জমিজমার আয়ে এই ক্ষুদ্র ভদ্র পরিবারটি একরকম চলে যাচ্ছে।
আশরাফ খোনকার সাহেবের পরলোকগত প্রথম হাবেলীর পক্ষের একমাত্র সন্তান। তাঁর এন্তেকালের পর খোনকার সাহেব কয়েক বৎসর বিবাহ করেননি। তারপর ছেলেটা একটু খুঁটে খেতে শিখলে মুজানগরে মীর রমজান আলী সাহেবের এক বিধবা কন্যার পাণিগ্রহণ করেন। সেও বোধ হয় আজ ২৫ বৎসরের কথা। কিন্তু শেষ পক্ষের বিবিও আমজাদ ও রাশেদাকে রেখে পরলোক গমন করেছেন। সেই থেকে খোনকার সাহেব এই সন্তানগুলিকে ভর করে জীবনযাত্রা নির্বাহ করে আসছেন। সন্তানদের কষ্ট দেখে বয়ঃজ্যেষ্ঠা বিধবা ভগ্নিকে অনেক বলেক'য়ে সংসারে এনে রেখেছিলেন। কিন্তু কয়েক বৎসর পরে একমাত্র জীবন-সম্বল আবেদ আলীকে ভায়ের হাতে সঁপে দিয়ে তিনিও পরপারে যাত্রা করেছেন।
আশরাফের বয়স এখন ত্রিশের কাছাকাছি। আমজাদ তার প্রায় দশ বৎসরের ছোট। রাশেদা সর্বকনিষ্ঠা— বয়স বোধ হয় ১৪/১৫ বৎসর হবে। বাড়ীতে গিন্নী না থাকায় জামাই-এর আদর-যত্ন হবে না বলে, ছেলের মুরুব্বিরা রাশেদাকে নিতে নারাজ—অন্ততঃ মুখে তারা এই রকম প্রকাশ করে। এদিকে কিন্তু খোনকার সাহেবের ইচ্ছে—মা-মরা মেয়ে, একটু সেয়ানা করে পরের হাতে দিতে। লোকে জিজ্ঞেস কোল্লে বলতেন—আপনাদের দোয়ায় ছোট ছোঁড়াটা যদি পাসটা দিতে পারে, তা'হলে, ওদের কয় ভাই-বোনের বিয়ে তখন একেবারে সারা যাবে।
এই সব পাঁচ কারণে গ্রামের প্রথা হিসেবে রাশেদার বিবাহে একটু বিলম্ব ঘটে গিয়েছে। আশরাফের বিবাহ হয়ে গিয়েছে আজ চার-পাঁচ বৎসর হতে চল্লো। সৈয়দপুরের মওলবী সাহেবের সদ্ব্যবহারে গোটা খোনকার পরিবারটা তাঁর একান্ত অনুরক্ত হয়ে পড়েছে। খোনকার সাহেব লোকের কাছে বলতেন- মওলবী একটা মেয়ে দিয়ে আমার সব ছেলে-মেয়েগুলোকে কিনে ফেলেছেন।
বউও ভারি লক্ষ্মী। পাড়াপড়শীরা বলে—বুড়োর পুণ্যির জোর তাই একালে এমন বউ পেয়েছে। বউকে সেদিন খিড়কীর পুকুরে কাপড় কাঁচতে দেখে ও পাড়ার মনুর মা খানা-বাড়ী গিয়ে বউকে শুনিয়ে বলতে লাগলেন- “খোনকার ভাই বউ যা পেয়েছে, তা ওর কপাল ভাগ্যি। এ আখেরী জামানায় এমন মেলা দুর্ঘট। পোড়া কপাল বউ সংসার দেখবেন, পরের খেদমত খাদিম করবেন, না তাঁদের পায়রবী কত্তে কত্তে ছোড়াদের লবেজান।"
বউ যে লক্ষ্মী, তাতে আর মোটেই সন্দেহ নেই। সংসারের সমস্ত ঝঞ্ঝাট এই একটি প্রাণীর উপর। তার উপর 'বুড়ো ছেলের' স্নেহের আবদার আর দেওর-ননদের সোহাগের অত্যাচার। খোনকার সাহেব অনেক সময় বউকে 'মা-বরকৎ' বলে ডাকতেন। বউ আসার পর থেকে সংসারের লক্ষ্মী-শ্রী ফিরে আসতে আরম্ভ হয়েছে—একথা তিনি আত্মীয়-স্বজনদের কাছে মধ্যে মধ্যে প্রকাশও করেছেন।
আশরাফ মিয়া আই-এ পর্যন্ত পড়েছিলেন। অবস্থা গতিকে লেখাপড়া ছেড়ে তাকে সংসার ধর্ম্মে মন দিতে হয়েছে। একেবারে সদাশিব মিয়া মানুষ। আমজাদ প্রেসিডেন্সী কলেজে বি-এ পড়ে, আরবীতে তার অনার্স। আবেদের পিতা ছিলেন সেকালের ফার্সি-নবিশ পাকা মুনশী। ফার্সির সাহায্যে ধর্ম্মশাস্ত্রও তাঁর মোটামুটি রকম পড়া ছিল। ছেলেকে এসব পড়াতে তিনি কসুর করেন নি। তাঁকে ইংরাজী পড়ানোর কথা বল্লে, "রংরেজী এ-আংরেজী খতম শোদ" বলে তিনি হো হো করে হেসে উঠতেন। তাঁর পরলোক গমনের পর মামুর বাড়ী এসে আশরাফ মিয়ার আগ্রহের ফলে আবেদ পার্শ্ববর্তী হরিষকাঠি গ্রামে "নিস্তারিণী-গঙ্গাধর এম-ই স্কুল” ভর্তি হয়ে তার শেষ পরীক্ষা পাস করে ফেলে। বর্তমানে তার লেখাপড়ার কাজ শেষ হয়েছে। হাটঘাট করা, প্রজার বাড়ী থেকে বর্গার ধান বিচালি ভাগ করে আনা, আর মধ্যে মধ্যে মাছ ধরার আয়োজন করা, এইগুলো এখন আবেদ মিয়াঁর নিয়মিত কাজ। এসবের পর ভাবীর কাছে আব্দার করে দু'টো গাল শুনে হেসে-খেলে তার দিন কেটে যায়। গ্রামে খানা মেজমানী হলে, নিকটে সভাসমিতির আয়োজন হ'লে, মসজিদের মেহমান-মোসাফের আসলে আবেদ মিয়ার আর অবকাশ থাকে না। দিনরাত খেটে সকলের কাজ তুলে দেয়। মানুষ মরলে কবর খুঁড়তে নামে, গোসল ও কাফন-দাফন করে। এজন্য দুই-একজন বাজে লোক ছাড়া গ্রামের গেরমানী কেছেমের লোকেরা তাকে বকাটে, ভবঘুরে, লক্ষ্মীছাড়া ইত্যাদি বিশেষণ দিয়ে রেখেছিলেন। অতবড় ছেলে, ছাত্রলী করতে বেরুলেও ত দশ টাকা হাতে করে ফিরতে পারে। ভাল মানুষের ছেলে তাতে ত দোষ নেই।
পূজা উপলক্ষে দীর্ঘকালের জন্য কলেজ বন্ধ হচ্ছে। আমজাদ লিখেছে—এবার তার বাড়ী যাওয়া হবে না, পরীক্ষা নিকটবর্তী।
ছুটিতে আমজাদ বাড়ী আসবে না শুনে বাড়ীশুদ্ধ যেন অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। পরদিন আশরাফ মিয়াঁ চিঠি লিখলেন—বিশেষ অসুবিধা না হলে দিন কয়েকের জন্য তোমার বাড়ী আসাই জনাব কেরলাগাহ সাহেবের অভিমত। তিনি বলছিলেন, একঘেয়ে পড়ার চাইতে মাঝে মাঝে শরীর মন ও মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দিয়ে সুস্থ করে নিলে ফল অধিক সন্তোষজনক হয়।
এদিকে আবেদ মিয়াঁর মুসাবেদা অনুসারে ভাবী ছাহেবাও দেবরকে অভিমান ও অসন্তোষ জ্ঞাপন করে এক পত্র লিখলেন। ফলে শ্রীমান আমজাদ আলী খোন্দকার দুই-তিন দিনের মধ্যে বাড়ী এসে হাজির।
আজ বাড়ী সরগরম। আবেদ সকালে পূর্বপাড়ার বাগানের ছেঁড়ে গাছ থেকে ঝুনো নারিকেল পেড়ে এনেছে। আমজাদ আর সে রান্না ঘরের দরজায় পড়ে জটল্লা কচ্ছে, আর ভাবীর স-স্নেহ তিরস্কার খেয়ে হো হো করে হাসছে। জটল্লাটা পেকে উঠেছিল মুড়ি ভাজা নিয়ে। ভাবীও সহজে মুড়ি ভাজা দেবে না, দেওররাও সহজে ছাড়বে না। কাজেই অনুযোগ, আবদার ও অভিযোগের ভিতর দিয়ে ব্যাপারটা ঘোরাল হয়ে উঠেছে।
আবেদ বলল, দোহাই ভাবী আজকের এই অনুরোধটা রাখ। আমরা ত মাঝে মাঝে তোমার হুকুম তামিল করি। এই ত সেদিন এক ঝাঁকা থালাবাটি-
ভাবী-থাম থাম, আর গুণের ব্যাখ্যান কর্ত্তে হবে না! ঐজন্যে ত—
আবেদ—ঐ জন্যে বিয়ে হয় না, না?
ভাবী—তা মিছে কি!
আমজাদ মিয়া মুরুব্বির মত মাঝে মাঝে দুই একটা বোলচাল দিচ্ছিলেন, উপস্থিত প্রসঙ্গ চাপা দিবার জন্য তিনি বলে উঠলেন—
আচ্ছা ভাবী, রাশুকে গেরস্থালীর কাজকর্ম্ম, রাধাবাড়া কিছু শিখিয়েছ, না আদর দিয়ে পরকালটা ঝরঝরে করছ?
আবেদ—হচ্ছিল মুড়ি ভাজার কথা, তার মধ্যে এল সংসার ধর্ম্ম; ইহকাল থেকে একদম পরকালে।
আবেদের কথার প্রতি লক্ষ্য না করে ভাবী বল্লেন—
তারজন্য ভাবনা নেই ভাই। তোমাদের যে সোনার চাঁদ সংসার, তাতে বসে খাবার যোটি কারও নেই। অমন আপন-ভোলা আধু পাগল তাকেও এখানে খেটে খেতে হয়।
আবেদ—ভাবীর মুখে পাগল পাগল কেমন মিষ্টি লাগে। ঐ শুনে শুনে সেদিন দেখি রাশুও বলছে-আমার পাগল দাদা আসছে।
‘রাশু—বা! আমি কি সত্যি করে বলেছিলাম?
ভাবী—যা বলেছিলি, বেশ করেছিলি। পাগলকে পাগল বলবে না ত কি করবে?
আবেদের মুখে সহসা যেন একটু গাম্ভির্যের ছায়া পড়িল। সে জিজ্ঞাসা করিল, আচ্ছা বলত ভাবী, কি করলে আর লোকে আমাকে পাগল বলবে না।
ভাবী—তোমার মাথা কল্লে আর আমার মুণ্ডু কল্লে। তাই ত বলি পাগল। নিজের ভালমন্দ বুঝতে হয়, পরিণামের ভাবনা ভাবতে হয়। এ সব বুঝলে শিখলে আর কেউ পাগল বলবে না, বুঝলে পাগল কানাই?
আবেদ—কি জানি ভাবী, বুঝি কি না-তাও বুঝতে পারিনে। ও ভাবনার ঝঞ্ঝাট সইবার ক্ষমতাও বুঝি আমার নেই।
আর আরও কি বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার বুকের মধ্যকার কোন এক অজ্ঞাত কোণের পাথর চাপা দেওয়া কত অজানা বেদনা তার স্বরনালীকে অলক্ষিতে আক্রমণ করে বসল, তার উজ্জ্বল চোখ দুটি ক্ষণেকের তরে বিস্ফারিত হয়ে উঠলো, "থাক ওসব কথা, অনর্থক মাথা খারাপ করে কাজ নেই, এখন দাখানা একবার দাও দেখি, নারকেল দুটো ভেঙ্গে আনি!"
ভাবীর হাত থেকে দা নিয়ে আবেদ চলে গেল। তার এই ভাব-পরিবর্তন আমজাদ ও ভাবী উভয়েই লক্ষ্য করলেন। সে বাহিরে চলে গেলে আমজাদ আস্তে আস্তে বল্লে—
দেখলে ত ভাবী ও পাগল মোটেই নয়। ভাই নেই বোন নেই, মা নেই বাপ নেই, ওর ব্যথার ভাগ নিবার, ওকে প্রাণ ভরে সোহাগ দিবার কেউ নাই। তাই শূন্য প্রাণে আমাদের আঁকড়ে ধরে ও শান্তি পেতে চায়, হেসে ফেলে নিজের বুকভরা বেদনাকে চাপা দিয়ে রাখতে চায়। ও পাগল মোটেই নয়।...
ভাবী—তুমি দেখছি আর একটা আস্ত পাগল মেজ মিয়া। আমি ত ওকে আপন ভাইয়ের মত ভালবেসে ফেলেছি।
আমজাদ—আর আমাকে? এ প্রশ্নের উত্তর দিবার পূর্ব্বেই আবু ভাজা নারিকেল নিয়ে রান্নাঘরের দাবায় উঠে বলতে লাগল-কই, এখনও তোমরা গল্প কচ্ছ? কথায় কি পেট ভরে। দেখছি ভাল ভাল করে বউটাও শেষে গোল্লায় গেল। আচ্ছা যাক্, আর যদি তোমার কাছে খাবার চাই! রাশেদা, রাশু ও রাশু! বলি কালা হলি নাকি?
রাশেদা—কালা হব কেন?
আবেদ—তবে কি ভাবীর হাতে মুরিদ হলে না কি? বলি, দু'খোলা চাল ভেজে দিতে পার্ব্বি?
রাশেদা—পার্ব্ব না কেন?
আবেদ—অত কার্য্যকরণ পারম্পর্য্য আমি বুঝিনে, পারিস ত দে! বুড়ীভদ্দরের নড়াচড়ার গতিক দেখ, নানী বলি কি সাধে? বরের বাড়ী গিয়ে তুমি যে আর কি কর্ব্বে?
রাশেদার পক্ষে সেখানে বসে থাকা আর সম্ভব হলো না। সে তাড়াতাড়ি রান্নাঘরের মধ্যে উঠে মুড়ি ভাজতে আরম্ভ করে দিল। একখোলা ভাজা হলে আবু পাত্র নিয়ে খাওয়া আরম্ভ করে দিল। আমজাদ তখন বেগতিক দেখে আবুর মুঠো থেকে নারকেল কেড়ে নিয়ে সেই মহাচর্ব্বণে যোগ দিল।
সে কাড়াকাড়ি দেখে ভাবী ত হেসে খুন। রাশুর একটা প্রতিশোধ দিবার ইচ্ছে হয়েছিল, এতক্ষণে সে বলে উঠল—"খাওয়ার জালায় যেন একেবারে—।"
রাশুর এই অসম্পূর্ণ পদবিন্যাস শুনে দুই ভাই হো হো করে হেসে উঠেলো।
রাশেদার বয়স ১৪-১৫ বৎসরের মধ্যে বলে সকলের অনুমান। আবার মেয়েটা একটু বাড়ন্ত ধরনের। তাই বয়সের ধর্ম্ম তার শরীর ও মনের উপর এরই মধ্যে বেশ একটু প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে বসেছে। রাশেদাকে রূপসী বল্লে অভিধানের হিসাবে ভুল হবে, যেমন কুশ্রী বল্লেও তা সত্য হবে না। পুরান ধরনের পিতার সংশ্রবে তার শিক্ষাদীক্ষাও হয়েছে পুরান ধরনের। অর্থাৎ গান গাওয়া, নভেল পড়া, হার্ম্মোনিয়ম বাজান, প্রেমপত্র লেখা আর আধুনিকতার এই শ্রেণীর অন্য উপকরণগুলির সঙ্গে আজও তার পরিচয় ঘটেনি। খোনকার ছাহেব তাকে নিজের মতন কোরআন শরিফ, তরজমা, তফছীর মোরাদিয়া, রাহে নাজাত, তাম্বিহুল গাফেলিন পর্যন্ত পড়িয়েছিলেন। ভাবীর সঙ্গে মিলে সে জঙ্গনামা ও আকবরী আজগরীর কেতাবও শেষ করে ফেলেছিল। স্কুলে পড়া আরম্ভ করার পর আবেদ আলী তাকে বাঙ্গালা পড়াবার ভার নিয়েছিল।
নিজের বাদপড়া স্কুলপাঠ্য সাহিত্যের বই কয়েক খানাও তাকে পড়িয়ে ফেলেছিল। তার খুব ইচ্ছে ছিল রাশেদাকে একটু ব্যাকরণ আর প্যারীচরণের ফার্ষ্ট বুকখানা পড়িয়ে দিবার। কিন্তু রাশুর মেজাজ ইদানিং কেমন একরকম হয়ে উঠেছিল বলে তাকে একরকম হাল ছেড়ে দিতে হয়েছে। অবশ্য রাশুর এই ভাব পরিবর্ত্তনের যে কোন কারণ ছিল না তা' নয়। কিছুদিন আরো একটা কবিতার ব্যাখ্যা উপলক্ষে রাশুর এই মানসিক পরিবর্তনের সূচনা হয়। কবিতাটা আর কিছুই নয়, 'মেঘনাদ বধের' উদ্ধৃত অংশ বিশেষ। রাশু পড়েছিল—
ছিনু মোরা সুলোচনে
গোদাবরী তীরে
কপোত-কপোতী যথা
উচ্চ বৃক্ষ-চুড়ে
বাঁধি' নীড় থাকে সুখে,
মাইকেলের এই কয়টি লাইন আবু মিয়ার ওস্তাদগিরিকে হঠাৎ যেন দমিয়ে দিল। রাশু অর্থ বুঝে নিতে চাইলে সে একটু ঢোক গিলে আম্মা আম্মা করে বলল, ওর' আর মানে কি? কপোত দেখিস নি, এই পায়রা—কবুতর। আর গোদাবরী একটা নদীর নাম, যেমন গঙ্গা যমুনা সেই রকম। সেখানে গাছের ডালে এক ঝাঁক পায়রা থাকে। নে পাতা ওল্টা ওর আর মানে কি?
রাশেদা পাতা উল্টে গেল বটে—কিন্তু সন্তুষ্ট হল না।
আবেদের মনও যেন কেমন একটা অজানা সন্দেহে দুলে উঠত। 'তাইত!' তার ইচ্ছা হ'ত গোদাবরীর সেই তীর ভূমিটা দেখবার জন্যে। কেন হ'ত সে প্রশ্ন সে মনের কাছে কোনদিন জিজ্ঞেস করেনি, জিজ্ঞাসা করবার দরকারও মনে করেনি।
আজ রবিবার আশরাফ মিয়াঁ কাছারী যাননি। তাই খাবার ব্যবস্থাটা একটু ভাল মতই হয়েছে। খোনকার ছাহেব বলে রেখেছেন— ওদের নিয়ে এক সঙ্গে খাব এখন।
উত্তর ঘরের দাওয়ায় দুটো মাদুর পেতে সেখানে সকলের খাওয়ার ব্যবস্থাটা হয়েছে। বউ রান্নাঘর থেকে সব যোগাড় করে দিচ্ছেন, আর রাশেদা সেগুলি নিয়ে একে দস্তরখানের উপর সাজিয়ে দিচ্ছে।
ভাত খেতে বসে নানা দিককার নানা রকম আলোচনা আরম্ভ হল। আমজাদ ও আবু প্রায়ই কথা বলছে না, আশরাফ সংক্ষেপে পিতার কথার উত্তর দিয়ে যাচ্ছে। একটু পরে আমজাদের দিকে তাকিয়ে খোনকার ছাহেব জিজ্ঞেস করেন—আমজু! তোর পরীক্ষার আর কত বাকি।
আমজাদ—জি, এই মাস বাদে আর চার মাস।
খোনকার—তারপর কি করবি মনে করেছিস?
আমজাদ—আমি তার কি বলব, আপনার যা মর্জি।
খোনকার— মর্জি ত সব, আমরা ওসব বুঝিই বা কি? আর এই লেখাপড়াটা নিজের মনের এরাদার উপরই অনেকটা নির্ভর করে। নিজের ইচ্ছার বিপরীত বাপ-ভায়ের অনুরোধে ঢোক-গেলার মত একটা রাস্তা বর্ত্তে যাওয়া অন্যায়। তোমাদের দাদাজান মরহুম বলতেন—সব খানায় যেমন সব লোকের সমান রুচি হয় না, সেই রকম সব এলেমেও সকলের সমান আগ্রহ হয় না। ছেলের তবিয়ত বুঝে তার জন্য পাঠ্য নির্বাচন কর্ত্তে হয়। ভায়ের সঙ্গে পরামর্শ করে যা হয় একটা ঠিক করিস। খোদা খোদা করে সে সময় ত আসুক।
আই-এ পাস করার পর থেকে আমজাদের মনের মধ্যে নিজের জীবনের উপরও একটু ধিক্কারের ভাব উপস্থিত হয়েছে। তার এই মাতৃহীন ভাই-বোন তিনটিকে মানুষ করার জন্য বৃদ্ধ পিতার অস্থি-মজ্জা যে কিরূপ জর্জ্জরিত হয়েছে, একটু একটু করে সে তাহা অনুভব কর্ত্তে লেগেছে! "বড় ভাই—দুনিয়ার পরিভাষায় যিনি আমার সতাত ভাই—আমাদের দু'টি ভাই-বোনকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছেন তিনি, বাবার যখন বোঝা ছিলাম আমরা, আমাদের জন্য তিনি একটি পয়সাও রোজগারের চেষ্টা দেখতে পারেরনি। এই সতাত ভাই জীবনের আশা-আকাঙ্খাকে বলিদান করে আদালতের কোরানীগিরি কবুল করেছেন আমাদের প্রতিপালন করবার জন্য। এখনও তিনি খেটে খুন হচ্ছেন, কেরানীগিরি করে মাসে মাসে আমার কলকাতার খরচ যোগাচ্ছেন। আমার সারাটা জীবন এইভাবে বাড়ী থেকে এনে লেখা-পড়া শিখতেই যদি শেষ হয়ে যায়, তাদের যদি খেদমত আমি না কর্ত্তে পাল্লাম, তাহলে এ পণ্ডশ্রমের তো কোন কারণ ছিল না। আর বাপজান যদি ইতিমধ্যে, রোখসত হয়ে যান, তা'হলে তারপর আমার জন্য ম্যাজিষ্ট্রেট হলে বা কি-আর লাখ টাকা রোজগার কল্লেই বা কি? তা' হলে এ ব্যর্থতার বেদনাকে যে কবর পর্যন্ত বয়ে চলতে হবে। এতদিন পরে তার কথা বলবার সুযোগ ঘটেছে। খোনকার ছাহেবের কথার উপর ভর করে সে আশরাফের মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল—
আমিতো কিছু ঠিক কর্ত্তে পাচ্ছিনে। কেউ বলে আরবীতে এম, এ দিতে, কেউ বলে ওকালতি পড়তে। একটু আরবী শিখার আমার খুব ইচ্ছে। একটু বেশী পরিশ্রম কল্পে, বোধ হয়, দুটোই একসঙ্গে পারা যায়। তা' এদিকে সংসারের জন্য—এক একবার মনে করি, কোথাও মাষ্টারী করে এম-এ পরীক্ষা দেই।
আশরাফ—তোর আর এখন সংসারের ভাবনা ভাবতে হবে না, যা কচ্ছিস তা' তাই মন দিয়ে করে যা। আরবীতে এম-এ দেয়াটা আমারও খুব পছন্দ। বাবাজান কি বলেন?
খোনকার—মোছলমানের ছেলে আরবী পড়বে এতে পরামর্শের কোন দরকার রাখে না। দুনিয়ার আবহাওয়া দেখে মাথাঘুরে যাচ্ছে। মানুষের জীবনের সব চাইতে বড় দরকার দীন ইসলাম সালামত রাখা, খোদা রসুলকে না ভোলা। টাকা রোজগার খুব বড় কাজ নয়, মানুষের জীবনের সেটা সব থেকে বড় উদ্দেশ্য হওয়াও উচিত নয়। শেখ সাদী কি সুন্দর কথাই বলে গেছেন—
"আয় কেনায়াত তোওয়াজরম গরদান" "হে সন্তোষ! তুমি আমাকে বড় লোক করে দাও।" লোক বড় হয় মনে, ধনে নয়। আর সংসারে আত্মার তৃপ্তি হয়- সন্তোষে, ধন পিপাসায় নয়, আর একটা কথা— তোমাদের কামাই রোজগার খাবার আশায় আমি তোমাদিগকে লেখাপড়া শিখতে দেইনি। তোমাদের দাদাজান মরহুম যা রেখে গেছেন, খোদার শোকর আমার দিনক'টা তাতে বেশ সচ্ছলে চলে যেতে পারবে; আমি চাই, তোমাদের 'মানুষ' করে রেখে যেতে, আর তোমাদের কটা ভাই-বোনকে সংসারী আর সুখী দেখে যেতে। -তা বেশ, পারিসত এক সঙ্গে দুটোই পড়িস। তোর ভাইত আর তোকে রোজগার কর্ত্তে পীড়াপীড়ি কচ্ছে না।
এই সব কথাবার্তা হচ্ছে এমন সময় রাশু কোর্মার বাটি নিয়ে দস্তরখানের এক পাশে রেখে দিল। সঙ্গে সঙ্গে বউ 'পাছদোর' দিয়ে ঘরে ঢুকে হাত ইশারা করে আমজাদকে কি বলে দিলেন। খোনকার সাহেব এক চামচ কোর্মার গোশত নিয়ে খেতে আরম্ভ করেছিলেন, সেই সময় আমজাদের দিকে ফিরে তিনি জিজ্ঞাসা করেন—
বউমা কি বলছেন, আমজু?
"গোশত বুঝি রাশু রেঁধেছে, তাই আপনাকে বলতে বলেছেন বোধ হয়।"
"তা বেশ হয়েছে—বেশ শিখিয়েছে মা"—বলে খোনকার সাহেব হেসে উঠলেন। কিন্তু একটু পরেই একটা গভীর অবসাদের কালছায়া তাঁর সেই স্বাভাবিক আনন্দ উজ্জ্বল সুন্দর মুখখানাকে আচ্ছাদিত করে ফেল্লে। অসাবধানে একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে তিনি বল্লেন—
"রাশু! পানি দে।"
আশরাফ, আমজাদ, আবু সকলেই এ ভাবান্তর লক্ষ্য করেছিল। তোমরা খাও—"আমি উঠলাম"—বলে খোনকার সাহেব হাত ধুয়ে পাশের মাদুরে বসে হামানদিস্তা দিয়ে পান খাওয়ার যোগাড় কত্তে লাগলেন। ভাবীকে চলে যেতে দেখে রাশুও তার অনুসরণ কল্পে। খোনকার সাহেব তখন ছেলেদের সম্বোধন করে ধীর গম্ভীর কণ্ঠে বলতে লাগলেন—"তোমরা সকলেই এখন জ্ঞানবান হয়েছ। আমি আর কার সঙ্গে পরামর্শ কত্তে যাব। আত্মীয়-স্বজনের অবস্থা আর কি বলব? আমার বিপদে সহানুভূতি করা ত দূরে থাক-অদূর ভবিষ্যতে বিপদ-আপদ কেটে যেতে পারে মনে করে, তারা যেন উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে। কয় জায়গা থেকে রাশুর কাজ উপস্থিত হ'ল কিন্তু এরাই সব ষড়যন্ত্র করে তা' ভেঙ্গে দিল। ইদানিং আমজুর জন্য পয়গামের উপর পয়গাম আসছে, কিন্তু রাশুর কথা ত আর কেউ বলছে না। আর আবুকে তো সববাই বাদ দিয়েই রেখেছে। লেখাপড়া জানে মালঞ্চীদের, কাজীদের ছেলে, কারও ভাল ছাড়া মন্দ নেই। আজ কেবল টাকা বলে ত!"
আমজাদ এই সময় গুঁজ গুঁজ করে কি বলছিল। খোনকার সাহেবের প্রশ্নের উত্তরে আশরাফ মিয়া বুঝিয়ে দিলেন—বলছে, রাশুর বিয়ের ব্যবস্থা করা হক আর সব এখন থাক! "দেখ, তোরাও ভেবেচিন্তে, যা' তার মর্জি থাকে—হবে।" বলতে বলতে খোনকার সাহেব আরাম করবার জন্য দহলিজে তাঁর শোবার ঘরে চলে গেলেন।
সংগ্রহ ও ভূমিকা: মুহিম মাহফুজ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

