বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে প্রতিরোধ সাহিত্য বা ‘রেজিস্ট্যান্স লিটারেচার’ সর্বদা একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানের ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসে পশ্চিমা বিশ্বের আগ্রাসন, শোষণ এবং নব্য-উপনিবেশবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতি-আখ্যান বা কাউন্টার-ন্যারেটিভ গড়ে উঠেছিল, যার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল ছোটগল্প। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ থেকে শুরু করে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পূর্ব পর্যন্ত ইরানের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল মূলত ব্রিটিশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হস্তক্ষেপে জর্জর ছিল। ১৯৫৩ সালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেগের সরকারকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং ব্রিটিশ এমআইসিক্সের মদতে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনাটি ইরানি জনমানসে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতের সৃষ্টি করে। এই ঐতিহাসিক ট্রমা এবং পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে ইরানি বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিকরা তাদের কলমকে শানিত করেন। ফ্যান্ট্জ ফ্যাননের ‘কলোনাইজড মাইন্ড’ বা এডওয়ার্ড সাইদের ‘প্রাচ্যতত্ত্ব’-এর (Orientalism) আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পশ্চিমা বিশ্ব সর্বদা ইরানকে তাদের সম্পদ লুণ্ঠনের একটি প্রান্তিক ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করেছে। এর বিপরীতে ইরানি সাহিত্যিকরা ছোটগল্পের রূপক এবং সাঙ্কেতিকতার আড়ালে গড়ে তোলেন এক দুর্বার প্রতিরোধ, যা কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারের এক দার্শনিক ও তাত্ত্বিক সংগ্রাম।
ছোটগল্পের মতো একটি সংক্ষিপ্ত অথচ তীক্ষ্ণ সাহিত্যিক প্রকরণকে ইরানি লেখকরা প্রতিরোধের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন মূলত এর অন্তর্নিহিত শক্তির কারণে। তৎকালীন পাহলভি রাজতন্ত্রের কঠোর সেন্সরশিপ এবং সাভাকের মতো কুখ্যাত গুপ্তচর সংস্থার তীক্ষ্ণ নজরদারি এড়িয়ে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক ইশতেহার প্রকাশ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। তাই রূপক, পরাবাস্তববাদ এবং প্রচ্ছন্ন বাস্তবতার আশ্রয়ে ছোটগল্পের বুননে লেখকরা তাদের প্রতিবাদী বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেন। আন্তোনিও গ্রামসির ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ বা কালচারাল হেজিমনি তত্ত্বের বিপরীতে দাঁড়িয়ে এই ছোটগল্পগুলো ইরানি সমাজের নিজস্ব ঐতিহ্য, শেকড় এবং শ্রমজীবী মানুষের শোষিত জীবনের অধিকারের পক্ষে কথা বলেছে। এই তাত্ত্বিক প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো ইরানের পাঁচজন প্রখ্যাত সাহিত্যিকের পাঁচটি কালজয়ী ছোটগল্পের আলোকে পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের নানামাত্রিক চিত্র ও মনস্তাত্ত্বিক স্তরগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা।
আধুনিক ইরানি সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ সাদেক হেদায়েত তার লেখায় পশ্চিমা জ্ঞানতাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে এক প্রচ্ছন্ন প্রতিরোধের চিত্র তুলে ধরেছেন। তার বিখ্যাত ছোটগল্প ‘আবু নসরের প্রাসাদ’-এ (Qasr-i Abu Nasr) তিনি প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের একটি সুচতুর রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। গল্পে দেখা যায়, একদল মার্কিন প্রত্নতাত্ত্বিক ইরানের প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনগুলো খনন করে নিজেদের দেশে পাচার করছে, আর অজ্ঞ ইরানি শ্রমিকরা সামান্য অর্থের বিনিময়ে তাদের এই লুণ্ঠনে সহায়তা করছে। পশ্চিমা দেশগুলো কীভাবে ‘সভ্যতা আবিষ্কার’-এর নামে প্রাচ্যের সম্পদ ও ইতিহাস লুণ্ঠন করে, হেদায়েত তা তীব্র শ্লেষের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। গল্পের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অংশে প্রাচীন ইরানের এক নারীর প্রতীকী আত্মার আবেশে বলা হয়েছে—‘আমি জানি তুমি আমাকে দেখে হাসছ; কিন্তু ভুল করো না, আমি হয়তো তোমার চেয়েও বেশি অবিশ্বাসী। তবে আমি কল্পনা করি, এটি এমন এক নারীর শেষ ইচ্ছা, যিনি হয়তো শত শত বছর আগে মারা গিয়েছিলেন এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, তার এই ঝরে পড়া রক্ত কেবল ন্যায়বিচারের জন্যই উৎসর্গীকৃত হয়েছিল।’ এই উদ্ধৃতিতে দেখা যায়, হেদায়েত এখানে পশ্চিমা প্রত্নতাত্ত্বিকদের অহংকার ও ঔপনিবেশিক তাচ্ছিল্যের বিরুদ্ধে ইরানি আত্মমর্যাদার এক ঐতিহাসিক প্রতিরোধের কথা বলেছেন। ওই প্রাচীন নারীর রক্ত যেন আধুনিক যুগে পশ্চিমা শোষণের বিরুদ্ধে ইরানি জাতির পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং হারানো পরিচয় ফিরে পাওয়ার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
সাংস্কৃতিক লুণ্ঠনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের একটি বলিষ্ঠ দলিল পাওয়া যায় নাসের মোয়াজ্জেনের লেখা ‘শিরুর জ্বর’ (Shiroo's Fever) নামক ছোটগল্পে। একে সাহিত্যতত্ত্বে ‘পেট্রো-ফিকশন’ বা তেলভিত্তিক সাহিত্য হিসেবেও আখ্যায়িত করা যায়। অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি কীভাবে ইরানের প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন করার পাশাপাশি স্থানীয় শ্রমিকদের অমানবিক দাসে পরিণত করেছিল, তা এই গল্পের মূল উপজীব্য। পশ্চিমা পুঁজিপতিদের কাছে ইরানি শ্রমিকদের জীবনের যে কোনো মূল্য ছিল না, তা মোয়াজ্জেন অত্যন্ত নিপুণভাবে চিত্রিত করেছেন। গল্পে এই অর্থনৈতিক শোষণের ভয়াবহতা তুলে ধরে রূপকার্থে বলা হয়েছে—‘তেলের এই দীর্ঘ পাইপলাইনগুলো যেন আমাদের বুকের ধমনি চুষে নিচ্ছে। বিদেশি কোম্পানির শ্বেতাঙ্গ সাহেবরা যখন তাদের শীতল ও বিলাসবহুল কক্ষে বসে মুনাফার হিসাব কষে, তখন শিরুর মতো খেটে খাওয়া শ্রমিকদের তপ্ত রক্ত ঘামে পরিণত হয়ে এই একই তেলের পাইপ দিয়ে দূর সাগরে পাচার হয়ে যায়।’ এই উদ্ধৃতিটি নব্য-উপনিবেশবাদের একটি রূঢ় চিত্র উপস্থাপন করে। পাইপলাইন এখানে কেবল একটি ভৌত অবকাঠামো নয়, বরং এটি পশ্চিমা পুঁজিবাদের সেই পৈশাচিক শোষক যন্ত্র, যা প্রান্তিক মানুষের জীবনীশক্তি শুষে নেয়। এর বিপরীতে শিরুর নীরব দহন এবং পরবর্তী সময়ে শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে গড়ে ওঠা পুঞ্জীভূত ক্ষোভই হলো অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ।
পশ্চিমা সামরিক ও সামাজিক আধিপত্য কীভাবে একটি জাতির নৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে, তার এক অসামান্য ও মর্মান্তিক চিত্র ফুটে উঠেছে গোলাম-হোসেন সায়েদি রচিত ‘দান্দিল’ (Dandil) ছোটগল্পে। দান্দিল হলো ইরানের একটি দরিদ্র ও অবহেলিত নিষিদ্ধ পল্লি, যা রূপকার্থে পুরো সমাজব্যবস্থার একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। গল্পে দেখা যায়, একজন মার্কিন সামরিক সার্জেন্ট এই দান্দিল এলাকায় আসে এবং স্থানীয় দালাল ও দুর্নীতিবাজ পুলিশদের সহায়তায় পনেরো বছরের এক নিষ্পাপ কুমারী মেয়েকে ভোগ করে। সায়েদি এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিকে একটি জাতির পবিত্রতা এবং আত্মমর্যাদা লুণ্ঠনের সমার্থক হিসেবে দেখিয়েছেন। ষাটের দশকে ইরানে পশ্চিমাদের দেওয়া আইনি দায়মুক্তির (ক্যাপিচুলেশন আইন) চরম অবমাননা ও প্রতিরোধের চিত্র এই গল্পে এভাবে উঠে আসে—‘এই অন্ধকার ও দুর্গন্ধযুক্ত গলিতে যখন সেই বিদেশি সামরিক উর্দি পরা মানুষটি দাম্ভিক পদক্ষেপে প্রবেশ করল, তখন সে কেবল একটি নিরপরাধ কুমারী মেয়েকেই লুণ্ঠন করেনি, বরং পুরো দান্দিলের অবশিষ্ট আত্মমর্যাদাকে কয়েক টুকরো নোংরা ডলারের বিনিময়ে চিরতরে কিনে নিয়েছিল।’ এই উদ্ধৃতির মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয় যে, পশ্চিমা আগ্রাসন কেবল ভূখণ্ড বা অর্থনীতি দখল করে না, বরং দেশের দালাল শ্রেণির সহায়তায় তা জাতির আত্মাকেও কলুষিত করে। তবে সায়েদি কেবল অবক্ষয়ের চিত্র আঁকেননি; গল্পে মার্কিন সার্জেন্টের এই অনাচারের বিরুদ্ধে একমাত্র যে চরিত্রটি উচ্চকণ্ঠে রুখে দাঁড়ায়, সে হলো একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ। ওই শ্রমিকের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরই হলো মার্কিন আধিপত্য ও দেশীয় মেরুদণ্ডহীন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধের এক জ্বলন্ত প্রতীক।
সামরিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনের বাইরে মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক স্তরে পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাব কতটুকু আগ্রাসী হতে পারে, তার এক অকাট্য তাত্ত্বিক ভিত্তি দাঁড় করিয়েছিলেন জালাল আল-এ আহমাদ তার বিখ্যাত ‘গার্বজাদেগি’ বা ‘পশ্চিমামোহ’ তত্ত্বের মাধ্যমে। তার ‘মার্কিন স্বামী’ (The American Husband) নামক ছোটগল্পটি এই পশ্চিমামোহের বিরুদ্ধে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সাহিত্যিক প্রতিরোধ। গল্পটিতে এক শিক্ষিত ইরানি নারী পশ্চিমা জীবনযাপনের মিথ্যা মোহে পড়ে একজন আমেরিকানকে বিয়ে করে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে সে চরম বিস্ময়ের সঙ্গে আবিষ্কার করে, তার স্বামীÑযাকে সে আধুনিকতা ও সভ্যতার প্রতীক ভেবেছিলÑসে আসলে আর্লিংটন সিমেট্রির বা গোরস্থানের একজন সাধারণ গোরখোদক। এই নির্মম সত্য আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে আল-এ আহমাদ পশ্চিমা স্বপ্নের অন্তঃসারশূন্যতাকে উন্মোচন করেন। গল্পে লেখিকা চরিত্রের উপলব্ধির মাধ্যমে একটি গভীর দার্শনিক সত্য উঠে আসে—‘তারা পাশ্চাত্যকে একটি নিখুঁত স্বর্গরাজ্য বলে ভ্রম করে; অথচ আমাদের প্রাচ্যের আত্মপরিচয় ও মূল্যবোধের জন্য তাদের ওই তথাকথিত সভ্য জগৎ এক সুবিশাল গোরস্থান ছাড়া আর কিছুই নয়, যেখানে আমাদের স্বপ্নগুলোকে কবর দিয়ে তারা নিজেদের আধিপত্যের স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলে।’ এই উদ্ধৃতিটি প্রমাণ করে, পশ্চিমা আগ্রাসনের সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি হলো মনস্তাত্ত্বিক উপনিবেশন। প্রাচ্যের মানুষকে নিজেদের সংস্কৃতি সম্পর্কে হীনম্মন্যতায় ভুগিয়ে তাদের আত্মপরিচয় বিলুপ্ত করার যে পশ্চিমা এজেন্ডা, তার বিরুদ্ধে এই গল্পটি এক তীব্র চপেটাঘাত। গোরখোদকের রূপকটি এখানে স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, অন্ধভাবে পশ্চিমা সংস্কৃতিকে অনুকরণ করার অর্থ হলো নিজেদের শেকড় ও অস্তিত্বকে স্বেচ্ছায় কবর দেওয়া।
প্রতিরোধ সাহিত্যের এই তাত্ত্বিক ক্রমবিকাশের চূড়ান্ত এবং সবচেয়ে বিপ্লবী রূপটি দেখা যায় সামাদ বেহরাঙ্গী রচিত রূপকধর্মী শিশুতোষ ছোটগল্প ‘ছোট্ট কালো মাছ’-এ (The Little Black Fish) । এই গল্পটি কেবল ইরানে নয়, বরং বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিরোধের এক ধ্রুপদি পাঠ হিসেবে স্বীকৃত। গল্পের ছোট্ট কালো মাছটি একটি আবদ্ধ পুকুর এবং গতানুগতিক জীবনের শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে বিশাল সাগরের সন্ধানে যাত্রা করে। পথে তাকে নানা বাধা এবং অবশেষে এক ভয়ংকর পেলিকান পাখির মুখোমুখি হতে হয়। পেলিকান এখানে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী ও স্বৈরাচারী শক্তির সুস্পষ্ট প্রতীক, যে তার বিশাল থলিতে ছোট মাছদের বন্দি করে এবং অন্ধকারের মধ্যে গিলে খায়। কালো মাছটি নিজের জীবন উৎসর্গ করে তার লুকিয়ে রাখা ছোরা দিয়ে পেলিকানের পেট চিরে অন্যান্য বন্দি মাছকে মুক্ত করে। মৃত্যুর ঠিক আগে ছোট্ট কালো মাছের একটি অমর ও কালজয়ী উক্তি হলো—‘মৃত্যু যেকোনো মুহূর্তে, যেকোনো রূপে আমার মুখোমুখি হতে পারে, কিন্তু আমি নিজে থেকে কখনো মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করব না। আসল কথা হলো, আমার এই বেঁচে থাকা বা মরে যাওয়া অন্যান্য মাছের জীবনে, তাদের মুক্তির সংগ্রামে ঠিক কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’ এই উদ্ধৃতিটি মার্কসবাদী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিরোধের এক চূড়ান্ত ইশতেহার। বেহরাঙ্গী এখানে তাত্ত্বিকভাবে বোঝাতে চেয়েছেন, পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কেবল ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; এটি হতে হবে আগ্রাসী, আত্মত্যাগী ও সামষ্টিক মুক্তির লক্ষ্যে সম্পূর্ণরূপে নিবেদিত। ছোট্ট কালো মাছের মৃত্যু কোনো পরাজয় নয়, বরং এটি অন্যান্য মাছ বা সাধারণ জনগণের মধ্যে বিপ্লবের যে চিরস্থায়ী স্ফুলিঙ্গ প্রজ্বালিত করে, সেটাই হলো প্রতিরোধের প্রকৃত ও তাত্ত্বিক বিজয়।
উপরিউক্ত পাঁচটি গল্পের তুলনামূলক ও সমান্তরাল আলোচনা থেকে একটি বিষয় অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ইরানের সাহিত্যিকরা পশ্চিমা আগ্রাসনকে কেবল একটি বহিরাগত রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখেননি, বরং এটিকে তারা একটি বহুমাত্রিক অস্তিত্বের সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সাদেক হেদায়েতের ‘আবু নসরের প্রাসাদ’ গল্পে যেখানে আমরা সাংস্কৃতিক লুণ্ঠন এবং হারানো ঐতিহ্যের জন্য এক ধরনের ঐতিহাসিক প্রতিরোধ ও হাহাকার দেখতে পাই, সেখানে নাসের মোয়াজ্জেনের ‘শিরুর জ্বর’ সেই প্রতিরোধকে নিয়ে আসে অর্থনৈতিক শোষণের রূঢ় বাস্তবতায়। অন্যদিকে গোলাম-হোসেন সায়েদির ‘দান্দিল’ সমাজ ও নৈতিকতার অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরে পশ্চিমা আধিপত্যের কুৎসিত রূপটি উন্মোচন করে। জালাল আল-এ আহমাদের ‘মার্কিন স্বামী’ এই সমস্যাকে মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব ও আত্মপরিচয়ের সংকটের জায়গা থেকে অত্যন্ত সফলভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং পশ্চিমামোহের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধের দুর্ভেদ্য দেয়াল গড়ে তোলে। আর এই সকল তাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধের একটি চূড়ান্ত প্রায়োগিক ও বিপ্লবী পরিণতি হলো সামাদ বেহরাঙ্গীর ‘ছোট্ট কালো মাছ’, যা ভয়কে জয় করে আত্মত্যাগের মাধ্যমে সামষ্টিক মুক্তির পথ নির্দেশ করে। এই সাহিত্যিক কর্মগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এগুলো একটি ঐক্যবদ্ধ কাউন্টার-ন্যারেটিভ, যা পশ্চিমা কেন্দ্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে প্রাচ্যের প্রান্তিক মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর এক ধারাবাহিক ইতিহাস রচনা করে।
পরিশেষে বলা যায়, ইরানের ছোটগল্পে পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধের চিত্র উঠে এসেছে, তা বিশ্বসাহিত্যের উত্তর-ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক কাঠামোর এক অমূল্য সম্পদ। এডওয়ার্ড সাইদ তার তত্ত্বে যেভাবে দেখিয়েছেন যে প্রাচ্যকে পশ্চিমা বিশ্ব সর্বদা একটি নির্মিত ধারণা হিসেবে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে, ইরানি সাহিত্যিকরা তাদের এই গল্পের মাধ্যমে সেই মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণের শেকল ভেঙে ফেলার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। পশ্চিমা বিশ্বের সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক শোষণ এবং মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্যের মোকাবিলায় এই ছোটগল্পগুলো কেবল সমকালীন সমাজবাস্তবতার নিছক দলিল হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এগুলো হয়ে উঠেছে ভবিষ্যতের যেকোনো নব্য-উপনিবেশবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে চিরস্থায়ী প্রতিরোধের ইশতেহার। কলমকে যখন তরবারির চেয়েও শানিত করে তোলা হয়, তখন একটি সাধারণ গল্পই হয়ে উঠতে পারে একটি জাতির আত্মরক্ষার সবচেয়ে বড় বর্ম। হেদায়েত, আল-এ আহমাদ, সায়েদি, মোয়াজ্জেন ও বেহরাঙ্গীর মতো প্রজ্ঞাবান সাহিত্যিকদের রচিত এই রূপকধর্মী অথচ তীক্ষ্ণ আখ্যানগুলো আজও দ্বিধাহীনভাবে প্রমাণ করে যে, বন্দুকের নল বা অর্থনৈতিক অবরোধ দিয়ে হয়তো সাময়িকভাবে কোনো দেশের মাটি দখল করা যায়, কিন্তু একটি জাতির শিকড়সন্ধানী আত্মপরিচয় ও প্রতিরোধের স্পৃহাকে কখনোই চিরতরে পরাভূত করা যায় না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

