বাংলায় মাদরাসা স্থাপত্য

ড. খোন্দকার আলমগীর

বাংলায় মাদরাসা স্থাপত্য

ইসলামের প্রথম দিকে মুসলমানদের স্বতন্ত্র কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না। প্রাথমিক পর্যায়ে মসজিদে নববি শিক্ষাদানসহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতো। সে সময় শিক্ষাব্যবস্থা ছিল অনেকটাই শিক্ষককেন্দ্রিক। পরবর্তীকালে সেলজুকরা শিক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় এবং বিভিন্ন শাস্ত্রের শিক্ষাকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসে। তবে সেলজুক আমলের আগেও কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া যায়। সুইস-জার্মান ইতিহাসবিদ টিটাস বুর্কহার্ট বলেন, ‘আপাতদৃষ্টিতে সেলজুকরাই প্রথম মাদরাসা নামক বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের বিস্তার ঘটিয়েছিল; এটি ছিল বহুমুখী জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্র। এর আগে এসব জ্ঞান-বিজ্ঞান (প্রধানত) মসজিদে শেখানো হতো।’ (Burckhardt, Art of Islam Language and Meaning, p. 137)

অন্য একজন গবেষক এ বিষয়ে বলেছেন, মসজিদেই সবসময় একজন তরুণ মুসলমানের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার একটি অংশ সম্পন্ন হতো। মসজিদের ভেতরেই শিক্ষার জন্য নির্ধারিত জায়গা ছিল। পরবর্তীকালে এর জন্য বিশেষ ভবন নির্মাণ করা হয়। এর নাম হয় মাদরাসা। পরবর্তী সময়ের মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল মসজিদের সঙ্গে মাদরাসার এই নিবিড় যোগাযোগ। (Dogan Kuban, Muslim Religious Architecture, p. 10)

বিজ্ঞাপন

মঙ্গোলরা যখন মধ্য এশিয়া আক্রমণ করে, তখন সেই অঞ্চলের মুসলিম অধিবাসীরা মাতৃভূমি ছেড়ে মিসর এবং বাংলার মতো দূরবর্তী বিভিন্ন দেশে বসতি স্থাপন করে। তারা সঙ্গে করে উন্নত স্থাপত্যের ধারণার পাশাপাশি এই ধরনের স্থাপনা তৈরির জন্য কারিগর ও স্থপতিদেরও নিয়ে আসে। এই প্রবন্ধে আমরা ‘সুলতানি আমলে বাংলার মাদরাসা স্থাপত্য’ নিয়ে আলোচনা করব।

মূলত মাদরাসার জন্য কোনো আলাদা ভবন ছিল না। ইরান ও মধ্য এশিয়াতেও মসজিদগুলো মাদরাসা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। অন্যদিকে আমরা জানি, উসমানি বা মিসরের মসজিদে অথবা তুর্কি প্রভাব রয়েছে এমন মসজিদে একধরনের মঞ্চ বা ‘দিক্কা’ (dikka) থাকে। এগুলোকে ‘দিক্কাতুল মুবাল্লিগ’ বলা হয়। কায়রোতে সবচেয়ে প্রাচীন দিক্কাটি পাওয়া যায় কায়েতবে (Kaytbay) আমলে (১৫ শতক)। আবিদ আলীকে অনুসরণ করে এসএম হাসান পান্ডুয়ার কুতুব শাহী মসজিদে এটিকে ‘চবুতরা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং তার মতে, শুক্রবারে জুমার নামাজের দ্বিতীয় আজানের সময় এটি মুয়াজ্জিন ব্যবহার করতেন। খান সাহেব আবিদ আলী খান এটিকে কোনো ফকিরের কবর মনে করেন, মসজিদটি জরাজীর্ণ হয়ে যাওয়ার পর যাকে সেখানে দাফন করা হয়েছিল। আমি মনে করি, মসজিদের এই দিক্কাগুলো শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যেও ব্যবহৃত হতো। বগুড়ার মহাস্থানগড়ের মানকালীর ধাপ মসজিদে ১৫ সেমি থেকে ২৩ সেমি উঁচু তিনটি মঞ্চ পাওয়া গেছে। নাজিমুদ্দিন আহমেদের মতে, দুটি মঞ্চ শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে এবং একটি মুকাব্বিরের জন্য ব্যবহৃত হতো। ঝিনাইদহ জেলার বারোবাজারের সাতগাছিয়া ও মনোহর মসজিদেও এমন মঞ্চ পাওয়া গেছে। সাতগাছিয়ার মঞ্চটির পরিমাপ উত্তর-দক্ষিণে ২.২ মিটার × পূর্ব-পশ্চিমে ১.৮০ মিটার এবং এটি ০.২৩ মিটার উঁচু। বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদেও এই একই ধরনের দুটি মঞ্চ ছিল। সতীশ চন্দ্র মিত্র লক্ষ করেছেন—‘সদর দরজা দিয়া প্রবেশ করিলে উহার সোজাসুজি পশ্চিম দিকের বদ্ধ প্রাচীরের গাত্রে একটি প্রস্তরবেদী ছিল; উহার উত্তর দিকে মধ্যস্থানে আরো দুইটি ইষ্টকবেদী ছিল। নমাজের সময়ে উহার একটি বেদীতে খাঁ জাহান এবং অন্য দুইটিতে প্রধান মৌলবীগণ দণ্ডায়মান হইতেন এবং অন্য সময়ে খাঁ জাহান ও তাহার উজির উত্তর দিকের দুইটি ইষ্টকবেদীতে সমাসীন হইয়া রাজকার্য্য নির্বাহ করিতেন।’ (সতীশচন্দ্র মিত্র, যশোহর-খুলনার ইতিহাস, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪২৭)

এ ধরনের মঞ্চ ১৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত পশ্চিম বাংলার হজরত পাণ্ডুয়ার কুতুব শাহী মসজিদে, ১৪৫১ খ্রিষ্টাব্দে গুজরাটের আহমদাবাদে নির্মিত শেখ আহমদ খাত্তারির সমাধিতে এবং ১৪৪০ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত মধ্যপ্রদেশের মাণ্ডুর মসজিদেও পাওয়া যায়। কুতুব শাহী মসজিদের মঞ্চটির পরিমাপ ২.৫০ মিটার × ১.৭৫ মিটার এবং এটি ০.৭৬ মিটার উঁচু। এই মঞ্চগুলো নির্দেশ করে, এগুলো মাদরাসা হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যটি এই ভবনগুলোর প্রাচীনত্বের দিকেও ইঙ্গিত করে। ষাট গম্বুজ মসজিদ আনুমানিক ১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল এবং সাতগাছিয়া ও মনোহর মসজিদ দুটি এই মসজিদের আগেই নির্মিত। মানকালীর ধাপের কাছের একটি পুকুর থেকে ৭০০ হিজরির (১৩০১ খ্রি.) একটি সমাধিফলক (শিলালিপি) উদ্ধার করা হয়েছিল। সে অনুযায়ী, এই মসজিদটিকে ওই বিলুপ্ত সমাধির সমসাময়িক বলে গণ্য করা যেতে পারে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, মঙ্গোলরা যখন মধ্য এশিয়ায় আক্রমণ করেছিল, তখন সেখানে একটি মুসলিম অভিবাসী গোষ্ঠী বা ‘ডায়াসপোরা’র সৃষ্টি হয়। সেই অঞ্চলের মুসলিম বাসিন্দারা অভিবাসী হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলে যান। তারা মিসর, বাংলা এবং আধুনিক তুরস্কে আশ্রয় নিয়েছিলেন। উসমানি, মিসরি এবং বাংলার মসজিদগুলোয় ‘দিক্কা’ দেখতে পাওয়া যায়। এই সূত্রে প্রশ্ন জাগতেই পারে যে, এই দিক্কাগুলোর কোনো সাধারণ বা একই উৎস রয়েছে কি না। মধ্য এশিয়ার বাইরে মাদরাসা স্থাপত্যের ওপর মঙ্গোল আক্রমণ এবং তার ফলে মুসলমানদের ক্ষমতাচ্যুতির কোনো সম্ভাব্য প্রভাব রয়েছে কি না, তা এখনো খতিয়ে দেখা বাকি আছে।

বখতিয়ার খলজির সময় থেকে শুরু করে মুসলিম শাসকরা এই দেশে মাদরাসা নির্মাণ করেছিলেন। আব্দুর রহিম শিলালিপি, ইতিহাস এবং পীর-দরবেশদের জীবনীবিষয়ক সাহিত্যের (hagiological literature) ওপর ভিত্তি করে তৎকালীন শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর একটি তালিকা তৈরি করেছেন; সেগুলো হলো—লখনৌতি, মহীসুন, সোনারগাঁও, সাতগাঁও, নগুর, মান্দারণ, পাণ্ডুয়া, বাঘা, ঘোড়াঘাট, রংপুর, চট্টগ্রাম, মঙ্গলকোট, ঢাকা ও মুর্শিদাবাদ। তবে এই কেন্দ্রগুলোর ইতিহাস এবং এগুলোর স্থাপত্যশৈলীর বিস্তারিত বিবরণ সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। রাজশাহীর গোদাগাড়ীর সুলতানগঞ্জ শিলালিপিতে জালালুদ্দীন মুহম্মদ শাহের একটি মসজিদ-মাদরাসার উল্লেখ রয়েছে। বাংলার কিছু শিলালিপিতে মাদরাসার উল্লেখ পাওয়া যায়। এগুলো হলো—চাঁপাইনবাবগঞ্জের গৌড়ের দারাসবাড়ি মাদরাসা (৯০৯ হিজরি/১৫০৩-৪ খ্রিষ্টাব্দ); ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের গৌড়ের বেলবাড়ি মাদরাসা (১ রমজান, ৯০৭ হিজরি/১৫০২ খ্রিষ্টাব্দ); এবং হুগলির ত্রিবেণীতে জাফর খানের মসজিদ ও সমাধিসৌধের সঙ্গে যুক্ত দুটি শিলালিপি, যেগুলোয় মাদরাসার উল্লেখ রয়েছে (একটি ৬৯৮ হিজরি/১২৯৮ খ্রিষ্টাব্দের এবং অন্যটি ৭১৩ হিজরি/১৩১৩ খ্রিষ্টাব্দের)।

বেলবাড়ী ও দারাসবাড়ী মাদরাসা দুটি সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ নির্মাণ করেছিলেন। এছাড়া মহীসুনে মাওলানা তকিউদ্দীন আরবির মাদরাসা এবং সোনারগাঁওয়ে সুফি সাধক শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা কর্তৃক নির্মিত একটি মাদরাসার সাহিত্যিক প্রমাণ বা উল্লেখ রয়েছে। মাদরাসাগুলো ছিল মূলত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এখানে শিক্ষক ও ছাত্র উভয়ের জন্যই থাকা-খাওয়ার (বোর্ডিং ও লজিং) ব্যবস্থা ছিল। বাংলার কিছু মাদরাসা নিঃসন্দেহে উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল। এটি লক্ষ করা গেছে, জাফর খান গাজীর মসজিদটি সম্ভবত প্রথম দিকে শিক্ষামূলক কাজে ব্যবহৃত হতো এবং পরবর্তীকালে মাদরাসার জন্য একটি আলাদা ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে জাফর খানের মৃত্যুর পর তাকে সেই মাদরাসার ভেতরেই দাফন করা হয়।

দারাসবাড়ী মাদরাসাটি প্রায় বর্গাকৃতির। এতে মোট ৪০টি কক্ষ রয়েছে, যার মধ্যে তিনটি কক্ষ প্রবেশদ্বার বা গেটওয়ে হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এই কক্ষগুলোর প্রতিটি ১১ ফুট ৪ ইঞ্চি বর্গাকার। তবে পশ্চিম পাশের মাঝখানে অবস্থিত ছোট মসজিদটি ১৬ ফুট বর্গাকার। এর একটি উঠান বা আঙিনাকে কেন্দ্র করে চারদিকে চারটি বাহু (কক্ষগুলোর সারি) রয়েছে এবং এই আঙিনাটির মাপ ১২৩ ফুট বর্গাকার। তাছাড়া এই আঙিনার ঠিক মাঝখানে বাইরে থেকে ২৫ ফুট বাই ১৮ ফুট পরিমাপের একটি আয়তাকার প্যাভিলিয়ন (উন্মুক্ত মঞ্চ বা মণ্ডপ) রয়েছে। এর চার কোনায় চারটি অষ্টভুজাকৃতির বুরুজ (turrets) ছিল। যদিও এটি একটি পৃথক মাদরাসা ভবন ছিল, তবুও সম্ভবত মসজিদের ভেতরেই পাঠদান করা হতো এবং মাদরাসাটি কেবল আবাসিক উদ্দেশ্যে (থাকা-খাওয়ার জন্য) ব্যবহার করা হতো।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন