১২৮৪ খ্রিষ্টাব্দ। দিল্লিতে তখন সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের শাসন। তিন বছরের চেষ্টায় বাংলার স্বাধীন সুলতান মুগিসউদ্দীন তুগরল খানকে পরাজিত করে দিল্লি ফিরে গেছেন বলবন। বাংলা শাসনের দায়িত্বে রেখে গেছেন ছেলে বুগরা খানকে। এ সময় বোখারা থেকে দিল্লিতে আসেন দুনিয়াখ্যাত এক দরবেশ-শায়েখ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে দিল্লির হাজার হাজার মানুষ তার খানকায় প্রতিদিন জমায়েত হয়। অল্প দিনেই তার ভক্ত-শাগরেদের সংখ্যা হাজার দশেক ছাড়িয়ে যায়। এত মানুষের সমাগমে অস্থির বোধ করেন সুলতান। নিজের সাম্রাজ্যের জন্য হুমকি মনে করেন। সিদ্ধান্ত নেন তার খানকায় হাজির হওয়ার।
আবু তাওয়ামার সঙ্গে দেখা করেন সুলতান। নিজের আশঙ্কা গোপন রেখে কৌশলে তাকে বাংলায় হিজরতের পরামর্শ দেন। নির্বিবাদী আবু তাওয়ামা সম্মত হন। রওনা হন বাংলার উদ্দেশে। দিল্লি থেকে বিহার হয়ে বাংলায় আসার সময় মেহমান হন বিখ্যাত সুফি শায়েখ আবু ইয়াহইয়া মানেরীর। ছেলে ইয়াহইয়া মানেরীকে শাগরেদ হিসেবে আবু তাওয়ামার সঙ্গে বাংলায় পাঠান শায়েখ। শাগরেদকে সঙ্গে নিয়ে ১২৭৯ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার সোনারগাঁয়ে আসেন আবু তাওয়ামা।
সোনারগাঁয়ে এসে শায়েখ আবু তাওয়ামা গড়ে তোলেন একটি বিশ্ববিদ্যালয়। এটি ছিল তখনকার দুনিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম। বিশ্ববিদ্যালয় ও খানকাহ প্রতিষ্ঠার জন্য বুগরা খান শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামাকে প্রায় তিনশ একর আবাদী জমি লা-খেরাজ বা করবিহীন সম্পত্তি হিসেবে দিয়েছিলেন। ফলে তিনি ভক্ত-মুরিদদের জন্য একটি আলাদা খানকাহ এবং ছাত্রদের জন্য স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় ও কুতুবখানা বা পাঠাগার স্থাপন করেন।
জ্যোতির্বিজ্ঞান, নৌবিদ্যা, ভেষজবিজ্ঞান, গণিত, ভূগোল, রসায়ন, ধর্মতত্ত্ব, হাদিস, ফিকহ, তাসাওউফ, যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনসহ বিভিন্ন বিষয়ে এখানে শিক্ষা দেওয়া হতো। শায়েখ শরফুদ্দিন দুনিয়া জোড়া খ্যাতির কারনে তার কাছে পড়তো আসতো হিন্দুস্তান-পাকিস্তান, মধ্য এশিয়া, আরব ও আফ্রিকাসহ দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের ছাত্র ও সাধকরা। পাশাপাশি সোনারগাঁও ছিল বাংলার কসমোপলিটন সিটি। বাংলায় আরব ও ইউরোপীয়দের আনাগোনা ছিল সাধারণ বাস্তবতা। ফলে অচিরেই বাংলার সোনারগাঁও উচ্চশিক্ষা ও আধ্যাত্মিক সাধনার একটি কেন্দ্র পরিণত হয়। ধারনা করা হয়, তখন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংখ্যা ছিলো প্রায় ১০ হাজার।
সোনারগাঁয়ের মোগড়াপাড়া থেকে দমদমায় গেলে দেখা যায়, অবহেলা আর অযত্নে একটি ভগ্নপ্রায় ভবন কোনমতে টিকে আছে। ভবনটি বিরাট হলেও এখন অবশিষ্ট আছে মাত্র এক তৃতিয়অংশ। ভবনের অলঙ্কৃত তোরণ, প্রশস্ত কক্ষ এবং দোতলায় ওঠার সিঁড়ি প্রমাণ করে এ ভবনটি ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগার কক্ষ। পাঠাগার ভবনের ডান পাশ দিয়ে মাটির নিচে নেমে গেছে সরু একটি সিঁড়ি। দুজন একসঙ্গে নামার উপায় নেই। ৮ থেকে ১০ ধাপ সিঁড়ি ভাঙার পর মোড় নিতে হয় হাতের বাঁ দিকে। অন্ধকারে চোখের আলো কোন কাজে আসে না। গা ছমছমে পরিবেশ। কিছুক্ষণ পর ফিরে আসে চোখের আলো। চোখে পড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার এবং প্রায় ১০/১০ বর্গফুটের একটি কামড়া। নেই কোন দরজা বা জানালা। অন্ধকার এই কক্ষটি ছিলো শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামার ধ্যানাগার বা মেডিটেশন সেন্টার।
ফার্সি ভাষায় লেখা ‘নামায়ে হক’ নামে তার একটি বই পাওয়া যায়। এতে ১৮০টি কবিতা আছে। তিনি বাংলাভাষায় গ্রন্থ রচনায় ছাত্রদের উৎসাহ দিতেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে ‘মনজিলে মাকামাত’ নামে বাংলাভাষায় একটি সুফিতাত্ত্বিক দর্শনগ্রন্থ লেখা হয় বলে জানা যায়। যদিও এটি পাওয়া যায় না।
জানা যায়, শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা লিখিত একাধিক পাণ্ডুলিপি ব্রিটিশ জাদুঘরের আর্কাইভ ভবনে আছে। আবু তাওয়ামার সহিহ বোখারী নিয়ে লেখা একটি পাণ্ডুলিপি বাগদাদের গ্রন্থাগারে এখনো যত্নে রক্ষিত আছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত ছাত্র এবং পরবর্তীতে জগৎবিখ্যাত মুসলিম স্কলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন তার প্রথম ছাত্র ও মেয়ের জামাই ইয়াহিয়া মানেরী।
শায়েখ আবু তাওয়ামা ১৩০০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন । পরে সম্ভবত প্রখ্যাত সুফি ইবরাহিম দানিশমন্দ ও তাঁর বংশধরদের নেতৃত্বে পরিচালিত হতো।
এই বিশ্ববিদ্যালয় সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের আমল (১৩৯০-১৪১১ খ্রিস্টাব্দ ) পর্যন্ত টিকে ছিল। আজম শাহ রাজা গণেশের চক্রান্তে খুন হলে এই বিশ্ববিদ্যালয়টিও ধ্বংসের মুখে পড়ে। রাজা গণেশ ক্ষমতা দখল করার পর থেকে এ বিষয়ে কিছু জানা যায় না। সম্ভবত রাজা গণেশ বিশ্ববিদ্যালয়টি ধ্বংস করে দেন।
আজ সেই বিশ্ববিদ্যালয় নেই। আছে শুধু কয়েকটি ভাঙা ভবন আর আবু তাওয়ামার কবর। কিন্তু ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


