জৈন্তিয়া রাজ্যের ইতিহাসের কিছু বিষয় আজও রহস্যাবৃত। এর মধ্যে অন্যতম হলো জৈন্তিয়ার মূল রাজধানী জয়ন্তীপুরের (বর্তমান নিজপাট) বাইরে আরো তিনটি রাজধানী বা রাজবাড়ির অস্তিত্ব। এসব রাজধানী বা রাজবাড়ি কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল, তার কোনো দালিলিক ইতিহাস নেই। জনশ্রুতি ও অনুমানের ভিত্তিতে ঐতিহাসিকরা এসব রাজবাড়ির ইতিহাস অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছেন। রাজবাড়িগুলোর অবস্থান ছিল জয়ন্তাপুরী রাজের প্রতিবেশী জাফলং, চারিকাটা ও ফালজুর পরগনায় (ব্রিটিশ আমলে রাজকে পরগনা বলা হতো)। বর্তমানে শুধু জাফলং রাজবাড়ির কিছু অংশ টিকে আছে; বাকি দুটির কোনো অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। জৈন্তিয়ার রাজধানী থেকে দূরবর্তী এই রাজবাড়িগুলোর অস্তিত্ব ব্রিটিশ আমলে পুরোপুরিভাবে দৃশ্যমান ছিল। তখন মানুষের মধ্যে এসব রাজবাড়ি নিয়ে বেশ কৌতূহল ছিল। এসব রাজবাড়ির আদি বাসিন্দা—অর্থাৎ রাজাদের নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে অনেক কিংবদন্তি প্রচলিত ছিল। এসব কিংবদন্তি থেকে ঐতিহাসিকরা কিছু রাজার নাম ও তাদের সম্পর্কে কিছু তথ্য উদ্ধার করেছেন।
জাফলং নদীর তীরবর্তী বল্লাপুঞ্জি-জুমপার এলাকায় অবস্থিত জাফলং রাজবাড়িটি একসময় স্থানীয়দের কাছে ‘মাইলং রাজার বাড়ি’ নামে পরিচিত ছিল। ‘জৈন্তা রাজ্যের ইতিহাস’ বইটির লেখক মোহাম্মদ আব্দুল আজিজের মতে, মাইলং রাজা ছিলেন জৈন্তিয়ার পুরোহিত রাজবংশের শেষ রাজা জয়ন্ত রায়ের পুত্র। পঞ্চদশ শতকের শেষার্ধের (১৪৫০-১৫০০ সাল) কোনো একসময়ে রাজা জয়ন্ত রায় জাফলং খণ্ডরাজ্য সৃষ্টি করে তা মাইলং রাজাকে দিয়েছিলেন (জয়ন্ত রায় জৈন্তিয়াকে কয়েকটি খণ্ডরাজ্যে তার সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিলেন)। এই খণ্ডরাজ্যের রাজধানী ছিল জাফলং নদীর তীরে। রাজবাড়িটি এই রাজধানীরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। বর্তমানে এই রাজবাড়িতে যা যা টিকে আছে, তা আসল রাজবাড়ির সামান্য অংশমাত্র। রাজধানী ও রাজবাড়ির মূল স্থাপনাগুলো কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বাড়ির দুটি ফটক ও দুটি দেয়ালের কিছু অংশ এখনো অক্ষত। দেয়ালের পুরুত্ব ও ফটকগুলোর গঠনশৈলী দেখে মনে হয়, জৈন্তিয়ার অন্যান্য স্থাপনার তুলনায় এগুলোর বয়স বেশি।
অন্য ঐতিহাসিকরা এই রাজবাড়ি সম্পর্কে ভিন্ন ধরনের তথ্য দিয়েছেন। তাদের মতে, এই বাড়িটি ছিল প্রাচীন মালনিয়াং রাজ্যের রাজবাড়ি। মালনিয়াং রাজ্যের রাজধানী ছিল জাফলংয়ের বল্লাপুঞ্জি এলাকায়; এই রাজধানীর বেশিরভাগ স্থাপনা বিলীন হয়ে গেলেও রাজবাড়ির একটি অংশ টিকে আছে। এই মালনিয়াং রাজ্যটি একটি রহস্যময় রাজ্য। এর কোনো স্পষ্ট ইতিহাস নেই। জৈন্তিয়ার ভেতরে এই রাজ্যটি কী করে সৃষ্টি হলো, তা কেউ ব্যাখ্যা করেননি। ২০০৫ সালে প্রকাশিত ‘খাসিয়া জনগোষ্ঠী : ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি’ গ্রন্থের লেখক রুশ পতাম দাবি করেছেন, মালনিয়াং রাজ্যের রাজধানী প্রথমে অন্যত্র ছিল। তখন রাজ্যটি অনেক বড় ছিল। একসময় এর দুপাশের গৌড় ও জৈন্তিয়ার রাজারা প্রভাবশালী হয়ে উঠলে রাজ্যটির আয়তন কমে যায়। তখন ‘বালা’ নামক স্থানে রাজ্যটির রাজধানী স্থানান্তরিত হয়। এই ‘বালা’ স্থানটিই বর্তমানের বল্লাপুঞ্জি বা বল্লাঘাট এলাকা। ‘বালা’র কাছে রাজারা কিছু প্রস্তরফলক স্থাপন করেছিলেন। রাজাদের মাতৃভাষায় এসব প্রস্তরফলককে বলা হতো ‘ফ্লুং’। এই ‘ফ্লুং’ শব্দটি থেকেই প্রথমে ‘ইয়াওফ্লাং’ ও পরে ‘জাফলং’ শব্দটির উৎপত্তি হয়। রুশ পতাম আরো দাবি করেছেন, মালনিয়াং রাজ্যটি ত্রয়োদশ শতকের (১২০১-১৩০০ সাল) আগেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।
রাজ্যটি সম্পর্কে আরো কিছু গ্রন্থ থেকে ভাসা ভাসা তথ্য পাওয়া যায়। এইচ এম বারেহ রচিত ‘ENCYCLOPEDIA OF NORTH EAST INDIA’, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ চৌধুরী রচিত ‘THE KHASI CANVAS : A CULTURAL AND POLITICAL HISTORY’ ও ‘KI KHUM KHASI-KHARA (THE KHASI PEOPLE)’ গ্রন্থদ্বয় এবং ডক্টর হোমিওয়েল লিংদহ রচিত ‘KI SYIEM KHASI BAD SYNTENG’ গ্রন্থে মালনিয়াং রাজ্য সম্পর্কে কিছু তথ্য রয়েছে। ডক্টর হোমিওয়েল লিংদহ রাজ্যটি সম্পর্কে বলেছেন, ‘The Malyangiang Syiems or Madur Maskut Syiems were great and powerful Syiems of these hills. The people used to call them ‘God Kings’; and their kingdom tradition holds, touched Damer (Dimarua) in Nowgong is Assam to the north, running along the Khasi and Jaintia Hills up to Kuwain (Sylhet) in the south. Tradition affirms that at one time the kingdom included the whole of Jaintia Hills. After Kyllong Raja was killed, the Synteng (Jaintia) succeeded in conquering and annexing the Kingdom of Madur Maskut. From that time, the Malyangiang people were scattered throughout Khasi and Jaintia Hills. According to tradition, from the time that disappearance of the Malyangiang kingdom till the advent of the British, seven generations have passed by. If you allow 25 years for a generation and if you take 1826 as the year when the East India Company first came to these Hills, the Kingdom of Maskut came to an end in 1651 i.e. at the time of Jasamanta Roy, the Syiem of the Synteng people and Jaintapur.’ (খাসিয়া ভাষায় রচিত মূল বই থেকে এই অংশটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ‘THE KHASI PEOPLE’ গ্রন্থের লেখক জ্যোতিরিন্দ্রনাথ চৌধুরী)
ডক্টর লিংদহের লেখা থেকে জানা যাচ্ছে, মালনিয়াং রাজ্যটি ‘মাদুর মাস্কুট’ নামেও পরিচিত ছিল এবং এর রাজাদের উপাধি ছিল ‘সিয়েম’। তাদের শাসনাধীন এলাকা সিলেটের গোয়াইনঘাট অঞ্চল থেকে শুরু হয়ে খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়ের ভেতর দিয়ে আসামের নগাঁও জেলার ডিমারুয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই বর্ণনা অনুযায়ী, মালনিয়াং রাজ্যটি ছিল উত্তর-দক্ষিণ বরাবর লম্বাকৃতির একটি রাজ্য। এর দক্ষিণপ্রান্ত ছিল সিলেটের গোয়াইনঘাট এলাকায়, উত্তরপ্রান্ত ছিল আসামের নগাঁও জেলার সমভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত আর মধ্যবর্তী অংশ ছিল খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়ের মধ্যবর্তী অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত (খাসিয়া পাহাড়ের পূর্ব প্রান্তবর্তী কিছু অংশ এবং জৈন্তিয়া পাহাড়ের পশ্চিম প্রান্তবর্তী কিছু অংশ মালনিয়াং রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল)। জনশ্রুতি অনুযায়ী, একসময় জৈন্তিয়া পাহাড়ের পুরোটাই মালনিয়াং রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কিল্লং রাজা নিহত হওয়ার পর সিন্টেং বা জৈন্তিয়া জনগোষ্ঠীর হাতে মালনিয়াং বা মাদুর মাস্কুট রাজ্যটির পতন হয়। তখন থেকে মালনিয়াং জনগোষ্ঠীর লোকজন খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়ে (এই জনগোষ্ঠীর লোকজন খাসিয়াদের একটি শাখা অর্থাৎ ‘কুর’ হিসেবে স্বীকৃত ছিল)। সিন্টেংদের হাতে মাদুর মাস্কুটের পতনের সাত প্রজন্ম পরে এই অঞ্চলে ব্রিটিশদের আগমন হয়েছিল।
ডক্টর লিংদহ বলেছেন, যদি একটি প্রজন্মের সময়কালকে ২৫ বছর বিবেচনা করা হয়, তাহলে ১৬৫১ সালকে মালনিয়াং বা মাদুর মাস্কুট রাজ্যের পতনের সময়কাল ধরতে হবে। এ সময়ে সিন্টেংদের সিয়েম বা জৈন্তিয়ার রাজা ছিলেন যশোমন্ত রায়। হয়তো তিনিই কিল্লং রাজাকে হত্যা করে মালনিয়াং রাজ্যটিকে জৈন্তিয়ার অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। ঐতিহাসিক সৈয়দ মুর্তাজা আলীর মতে, এর বহু আগেই জাফলং খণ্ডরাজ্যটি (মালনিয়াং রাজ্য) জৈন্তিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। ১৫৬৪ সালের আগের কোনো একসময়ে এই রাজ্যটি দখল করেছিলেন জৈন্তিয়ার রাজা বিজয় মাণিক। রাজ্যটির শেষ রাজার নাম নিয়েও সংশয় আছে। ডক্টর লিংদহ কিল্লং রাজাকে শেষ রাজা বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু অন্যদের মতে, মাইলং রাজাই ছিলেন শেষ রাজা। গবেষক রুশ পতাম এই রাজ্যের আরো দুজন রাজার নাম উল্লেখ করেছেন। তারা হলেন—নিয়াং রাজা ও কন্দুর রাজা। এদের নিয়ে মালনিয়াং রাজ্যের মোট চারজন রাজার নাম জানা সম্ভব হয়েছে। এই রাজ্যটির অস্তিত্ব নিয়ে কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই। সিন্টেং রাজাদের আমলে এটি জৈন্তিয়ার অন্তর্ভুক্ত হলেও তাদের আগে এটি একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী রাজ্য ছিল।
মালনিয়াং ও জৈন্তিয়া রাজ্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে মনে হয়, রুশ পতামের অনুমান অনুযায়ী ত্রয়োদশ শতকের আগে মালনিয়াং রাজ্যটি বিলুপ্ত হয়নি। বরং ওই সময়েই খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়ের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে রাজ্যটির উদ্ভব হয়েছিল এবং একসময় জৈন্তিয়া সমতলের কিছু অংশের (জাফলং অঞ্চল) অধীনে চলে গিয়েছিল। জৈন্তিয়ার কৃষক রাজবংশের শ্রেষ্ঠ রাজা ছিলেন কামদেব। আনুমানিকভাবে, ত্রয়োদশ শতকের প্রথমদিকে তিনি জৈন্তিয়ার রাজা ছিলেন। তার মৃত্যুর পরে জৈন্তিয়া রাজ্যের অধঃপতন শুরু হয় এবং ক্রমেই আয়তন সংকুচিত হয়ে আসে। সীমানা সংকোচনের এই পর্বে জৈন্তিয়ার কিছু ভূখণ্ড পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কিছু রাজা বা সরদারের অধীনে চলে যায়। ওই সময়ে পাহাড়ি রাজা বা সরদাররা যেসব স্বাধীন রাজ্য বা খণ্ডরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার মধ্যে মালনিয়াং ছিল সবচেয়ে বড়।
মালনিয়াং রাজ্যের মতো জৈন্তিয়ার ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া আরো দুটি খণ্ডরাজ্য ছিল ফালজুর ও চারিকাটা।
এসব খণ্ডরাজ্যের উত্থানের ফলে মূল জৈন্তিয়া রাজ্যটি তখন শুধু জয়ন্তাপুরী রাজ ও এর আশপাশের কিছু অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। ষোড়শ শতকের সূচনার দিকে এই ক্ষুদ্র রাজ্যটিও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর হাতে চলে যায়। কিন্তু এতে জৈন্তিয়া রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটেনি; বরং এর উল্টোটাই ঘটেছিল। পাহাড়ি সিন্টেং জনগোষ্ঠীর সিয়েমের হাতে জৈন্তিয়ার পুরোহিত রাজবংশের অবসান হলে রাজ্যটি নতুন শক্তিতে ঘুরে দাঁড়ায়। সিন্টেং রাজবংশের হাতে রাজ্যটির সম্প্রসারণ ঘটে। মালনিয়াং রাজ্য বা জাফলং খণ্ডরাজ্য, চারিকাটা খণ্ডরাজ্য এবং ফালজুর খণ্ডরাজ্য ছাড়াও অনেক নতুন অঞ্চলকে সিন্টেং রাজারা তাদের অধীনস্থ করেছিলেন। এসব অঞ্চল জৈন্তিয়ার প্রশাসনিক অঞ্চল বা ‘রাজ’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। তাদের শাসনামলে জয়ন্তাপুরী রাজ, জাফলং, চারিকাটা ও ফালজুর ছিল জৈন্তিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চারটি রাজ (খেলুরাজ)।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

