গাজীর দরগা
যদিও এই স্থানটি সপ্তগ্রাম বা ত্রিবেণী নামে পরিচিত, স্থানীয়ভাবে একে গাজীর দরগা বলা হয়। প্রতিবছর পহেলা মাঘ এখানে বড় মেলা বসত। এ এইচ দানি উল্লেখ করেছেন, এর প্রবেশদ্বারটি পশ্চিমদিকে ছিল। কিন্তু বাস্তবে প্রবেশদ্বারটি দরগার পূর্বদিকে অবস্থিত। এটি হুগলি নদীর পশ্চিমতীরে অবস্থিত। এখানে মসজিদও রয়েছে। দরগাটি রাস্তার পাশে এবং মসজিদটি এর পশ্চিমদিকে অবস্থিত।
দরগাটিতে দুটি কক্ষ রয়েছে। দুটি কক্ষেই দক্ষিণ দিক দিয়ে প্রবেশ করতে হয়। পূর্বদিকের কক্ষটিতে দুটি ধাপে মোট চারটি শবাধার (নকল কবর এবং এর নিচে মাটির গভীরে আসল কবর) এবং উত্তর দিকে একটি দোচালা চিরাগদান (প্রদীপ রাখার স্থান) রয়েছে। এর চারদিকেই খিলানযুক্ত পথ রয়েছে। দক্ষিণ দিকের প্রবেশপথটি ছাড়া অন্য পথগুলোতে মূলত ইট বা পাথরের জালি বা পর্দা লাগানো ছিল। পূর্বদিকের খোলা পথে এখনো পাথরের জালির অংশ দেখা যায়। তবে সব জালিই এখন ভেঙে গেছে। এই জালিগুলো লাগানোর জন্য দরজার ওপরের কাঠামোর (Lintel) এবং পাশের চৌকাঠে ছিদ্র রয়েছে।
এই পূর্ব কক্ষটিতে জাফর খান গাজীর ভাই কালু খান গাজীর কবর রয়েছে। কিন্তু অনেকেই মনে করেন, এখানে স্বয়ং জাফর খান গাজীর মরদেহ রয়েছে, কারণ পরের কক্ষটিতে শিলালিপি পাওয়া গেছে। এখানে মূর্তিসজ্জিত পুরোনো উপাদানগুলো আবার ব্যবহার করা হয়েছিল। এই ভবনটি প্রথাগত হিন্দু স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি করা হয়েছে। দেয়ালের একটি নির্দিষ্ট উচ্চতা পর্যন্ত পাথরের আস্তরণ (Stone veneer) ছিল এবং এর উপরের অংশটি ইটের তৈরি। এই কক্ষের মেঝেতে দক্ষিণ-পূর্ব কোনায় একটি বর্গাকার গভীর অংশ রয়েছে।
বলা হয়ে থাকে, পশ্চিমের কক্ষটি জাফর খান গাজীর মাজার। আগের কক্ষটির মতো এখানেও দুটি ধাপে চারটি কবর রয়েছে। কালিকারঞ্জন কানুনগো উল্লেখ করেছেন, এ সময় ত্রিবেণীতে জাফর খান নামে দুজন ব্যক্তি ছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ের ঐতিহাসিকরা এর সঙ্গে একমত হননি। আবদুল করিমের মতে, জাফর খান একটি মাদরাসা তৈরি করেছিলেন এবং পরে ‘দারুল খায়রাত’ নামে আরেকটি মাদরাসা নির্মাণ করেন অথবা আগের মাদরাসাটিই পুনর্নির্মাণ করেন। আবদুল কাদির লক্ষ করেছেন, জাফর খান গাজীর মসজিদটি প্রথমে একটি মসজিদ-মাদরাসা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। যখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে যায়, তখন জাফর খান গাজী মাদরাসা হিসেবে একটি আলাদা ভবন তৈরি করেন এবং মৃত্যুর পর তাকে এই পরের ভবনটিতেই সমাহিত করা হয়।
জাফর খান গাজীর মসজিদ (১২৯৮ খ্রিষ্টাব্দ)
এটি বাংলায় টিকে থাকা সবচেয়ে পুরোনো মুসলিম স্থাপত্য। জাফর খান গাজীর মসজিদের চমৎকার চৌকোনাকার স্তম্ভগুলো এ দেশের নিজস্ব নির্মাণশৈলীর উপাদান। এই ধরনের স্তম্ভ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হজরত পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদের (৭৭৬ হিজরি/১৩৭৪-৭৫ খ্রিষ্টাব্দ) জেনানা গ্যালারিতে, বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জের গৌড়ে অবস্থিত দারাসবাড়ি মসজিদে (৮৮৪ হিজরি/১৪৭৯-৮০ খ্রিষ্টাব্দ), ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গৌড়ের গুনমন্ত মসজিদে (৮৮৯ হিজরি/১৪৮৪-৮৫ খ্রিষ্টাব্দ) এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গৌড়ের কদম রসুলে (৯৩৭ হিজরি/১৫৩১ খ্রিষ্টাব্দ) দেখতে পাওয়া যায়। এ ধরনের চৌকোনাকার স্তম্ভ শুধু বাংলাতেই দেখা যায়, উপমহাদেশের আর কোথাও এর চল নেই।
এটি মূলত একটি ১০-গম্বুজের মসজিদ ছিল। বর্তমানে এর মধ্যে মাত্র ছয়টি গম্বুজ টিকে আছে। উত্তর ও দক্ষিণ দিকে আলাদা দুটি বিভাজন দেয়াল রয়েছে, যার মধ্যে উত্তরের দেয়ালটি ভাঙা। এই আলাদা করা অংশগুলো সম্ভবত নারীরা এবং উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা ব্যবহার করতেন। কিবলার দিকে (পেছনের দেয়ালে) বাইরের দিকে বর্ধিত কোনো অংশ নেই। মসজিদে স্থাপিত একটি শিলালিপি অনুযায়ী, এটি ৬৯৮ হিজরি/১২৯৮ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল এবং সে হিসেবে এটিই বাংলার সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদ। এ বি এম হোসেনের মতে, সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহর রাজত্বকালে এটি মেরামত ও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল।
ছাদের পানি নিষ্কাশনের জন্য এখানে ছয়টি মুখ বা ড্রেন ছিল। তবে বর্তমানে উত্তরদিকে কোনো ড্রেন নেই। বাংলায় বহু গম্বুজের আয়তাকার মসজিদের এটিই সবচেয়ে আদি উদাহরণ। এর ভেতরের নামাজ কক্ষটির পরিমাপ ২০.০৩ মিটার এবং ৭.৫০ মিটার। গঠনগতভাবে এটি ভেতরে লম্বালম্বি দুটি বড় সারিতে (Bays) এবং আড়াআড়ি পাঁচটি অংশে (Aisles) বিভক্ত। দেয়ালের কিছু অংশ পাথর দিয়ে ঢাকা এবং বাকি দেয়ালগুলো ইট দিয়ে তৈরি। এ ধরনের মসজিদের আরেকটি উদাহরণ হলো ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হজরত পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদ।
পূর্বদিক থেকে পাঁচটি কৌণিক খিলানর (Pointed arched) প্রবেশপথ দিয়ে এই মসজিদে প্রবেশ করা যায়। এর উত্তর ও দক্ষিণ—উভয় দিকেই দুটি করে কৌণিক খিলানের প্রবেশপথ রয়েছে। কিবলা দেয়ালে তিনটি অর্ধবৃত্তাকার মেহরাব রয়েছে। মাঝের প্রধান মেহরাবের খিলানটির উপরিভাগ পরে প্লাস্টার দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। অন্য দুটি মেহরাবের খিলানের দুই পাশে আদি আমলের স্তম্ভ বিদ্যমান। দুই পাশের খিলানগুলোর কোনাগুলোতে (Spandrels) পদ্ম-গোলাপ ও অন্যান্য ফুল-পাতার নকশা দেখা যায়।
তিনটি মেহরাবের খিলানই চারকোনাকার ফ্রেমে বাঁধানো। উত্তর দিকের মেহরাবের ফ্রেমটি একেবারেই সাদামাটা হলেও দক্ষিণ দিকের মেহরাবের ফ্রেমে আরবি ক্যালিগ্রাফি বা লেখা রয়েছে। কিবলা দেয়ালে বেশ কিছু আরবি শিলালিপি বসানো আছে। এই মসজিদে আলাদা কোনো কোনা-স্তম্ভ ব্যবহার করা হয়নি, তবে মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব কোনায় একটি আস্ত পাথরের স্তম্ভ লুকিয়ে রাখা হয়েছে। বাংলায় কোনা-বুরুজ ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে আদি উদাহরণ।
লক্ষ করা গেছে, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদের সঙ্গে উজবেকিস্তানের খিভা মসজিদের (যা দশ শতকে নির্মিত এবং আঠারো শতকে পুনর্নির্মিত) গভীর মিল রয়েছে। সাধারণ মানুষের ধারণা, এই মসজিদটির ওপর দিল্লির খিরকি (আনুমানিক ১৩৭৫ খ্রিষ্টাব্দ) এবং কালান (১৩৭০ খ্রিষ্টাব্দ) মসজিদের প্রভাব ছিল। তবে বাংলায় এর মূল আদর্শ বা পূর্বসূরি রূপটি খুঁজে পাওয়া যায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার ত্রিবেণীতে অবস্থিত জাফর খান গাজীর মসজিদে (১২৯৮ খ্রিষ্টাব্দ)।
এখানকার দুটি শিলালিপি সাক্ষ্য দেয় যে, এই স্থানে একটি মাদরাসা ছিল। আব্দুল করিম উল্লেখ করেছেন, ‘ত্রিবেণীতে জাফর খানের তৈরি মাদরাসাটি এখন আর টিকে নেই; রুকনুদ্দিন কায়কাউসের আমলের শিলালিপিটি জাফর খানের মসজিদের দেয়ালে এবং শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহর আমলের শিলালিপিটি জাফর খানের মাজারের দেয়ালে ঢাকা পড়ে ছিল।’ (আব্দুল করিম, কর্পাস অব দি ইন্সক্রিপশন্স অব বেঙ্গল, পৃষ্ঠা : ৬৮)
অন্যদিকে রাজন লক্ষ্য করেছেন, ‘…ভবনের উচ্চতা ও বহির্দৃশ্যের (Elevation) কথা বলতে গেলে, বাংলায় আদি ইসলামিক স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন মামলুক আমলের জাফর খান গাজীর মসজিদ (১২৯৮), পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদ (১৩৭৪) এবং গৌড়ের তাঁতিপাড়া মসজিদ (১৪৮০) নিশ্চিতভাবেই ভবনের উচ্চতা ও বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের নকশা তৈরির ক্ষেত্রে একেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে স্পষ্টভাবে অনন্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।’
হুগলির মোল্লা শিমলা মসজিদ (৭৭৭ হিজরি/১৩৭৫ খ্রিষ্টাব্দ)
এটি প্রাচীন সরস্বতী নদীর শুকিয়ে যাওয়া খাতের পূর্বতীরে অবস্থিত। এটি মূলত ৭৭৭ হিজরি/১৩৭৫ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান সিকান্দার শাহর আমলে নির্মিত হয়েছিল। তবে পরে সম্পূর্ণভাবে সংস্কার করা হয়। এস এম হাসানের মতে, এর ভেতরের পরিমাপ ১৭ ফুট বর্গাকার এবং এ এইচ দানির মতে, এর বাইরের পরিমাপ (কোনা-স্তম্ভ ছাড়া) ২৪ ফুট বর্গাকার। এ এস মোস্তাক আহমেদের বাইরের পরিমাপ ৪ দশমিক ৯৩ মিটার উল্লেখ করেছেন।
মসজিদের চার কোনায় নির্দিষ্ট দূরত্বে আনুভূমিক নকশাযুক্ত (Horizontal bands) আট কোনাকার কোনা-স্তম্ভ বা বুরুজ রয়েছে, যেগুলোর মাথায় ছোট গম্বুজ বা চূড়া (Cupolas) রয়েছে।
পূর্বদিকে শুধু একটি প্রবেশপথ এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিকে দুটি খিলানযুক্ত জানালা রয়েছে। ভেতরের কিবলা দেয়ালে তিনটি সমতল মেহরাব রয়েছে। মেহরাবের অংশটি পশ্চিমদিকে বাইরের দিকে বর্ধিত নয়।
এ এস মোস্তাক আহমেদ লক্ষ করেছেন, ‘বর্গাকার সাপোর্টিং অংশটিকে গম্বুজের জন্য একটি বৃত্তাকার ভিত্তিতে রূপান্তর করার কাজটি করা হয়েছে। —প্রথমত প্রতি কোনায় চারটি স্কুইঞ্চ (Squinches) ব্যবহার করে এবং এরপর সামান্য ঢালু পেন্ডেন্টিভ একে একটি নিখুঁত বৃত্তে পরিণত করেছে, যার ওপর মূল হলের গম্বুজটি দাঁড়িয়ে আছে।’
বাংলায় এই প্রথম কোনো মসজিদে বাঁকানো কার্নিশ দেখতে পাওয়া যায়। তবে কোনা-স্তম্ভ বা বুরুজের আগের কিছু ভবনেও দেখা গেছে। মসজিদটি প্রচুর সংস্কার করা হয়েছে এবং পূর্বদিকে এর একটি বর্ধিত অংশ রয়েছে। এম এম চক্রবর্তী এই মসজিদটিকে একটি প্রাচীন স্থাপনা হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এ এইচ দানির মতে, এই মসজিদটি পরবর্তী সময়ে পুরোনো ভবনকে মানিয়ে নেওয়ার বা ব্যবহারের পদ্ধতিকে ফুটিয়ে তোলে। পারভীন হাসান লক্ষ করেছেন, ‘ভবনটি যদি সত্যিই চতুর্দশ শতাব্দীর হয়ে থাকে, তবে এটিই বাংলার সবচেয়ে প্রাচীন বর্গাকার মসজিদ।’
১২৯৮ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান রুকনউদ্দিন কায়কাউসের (১২৯১-১৩০০ খ্রিষ্টাব্দ) রাজত্বকালে নির্মিত জাফর খান গাজীর মসজিদটিই বাংলায় টিকে থাকা সবচেয়ে পুরোনো মুসলিম স্থাপনা। এই মসজিদের উত্তর-পূর্ব কোনায় লুকিয়ে রাখা আস্ত পাথরের স্তম্ভটি বাংলায় কোনা-বুরুজ ব্যবহারের সবচেয়ে আদি উদাহরণ। এটি বাংলায় প্রথম মসজিদ-মাদরাসারও একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।
জাফর খান গাজীর মাজারটি একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দিরের স্থানে নির্মিত হয়েছিল। বাংলার এই আদি আমলের মুসলিম স্থাপত্যগুলোয় স্থানীয় ও মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর এক অপূর্ব মিশ্রণ লক্ষ করা যায়।
একটি মত অনুযায়ী, ছোট পাণ্ডুয়ার বড়ি মসজিদটি ১৩০০ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে নির্মিত হয়েছিল। এটি অনন্য, কারণ এখানেই বাংলায় নারীদের জন্য সংরক্ষিত গ্যালারি এবং চাঁদোয়াযুক্ত মিম্বরের সবচেয়ে পুরোনো উদাহরণ দেখা যায়। বিভিন্ন লেখক এই মসজিদের বিবরণ ও নকশা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন। আসলে বড়ি মসজিদের দুটি অংশ অসমান। এই মসজিদের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত পাণ্ডুয়া মিনারটিও বাংলায় এ ধরনের মিনারের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন।
এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় যে, মোল্লা শিমলা মসজিদসহ এসব আদি মুসলিম স্থাপত্যগুলো বর্তমানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হুগলি জেলাতেই অবস্থিত।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

