১৯৩০ ঈসায়ী, ২৯ ডিসেম্বর, আল্লামা মুহাম্মদ ইকবালের জীবন ও এই উপমহাদেশের ইতিহাসে একটা ওয়াটারশেড মুহূর্ত হইতেসে এলাহাবাদে, ওল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের অধিবেশন; এই অধিবেশনে প্রদত্ত তাঁর ভাষণে ইকবাল প্রথমবারের মতো উত্তর-পশ্চিম ভারতের মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলিকে একত্রিত কইরা একটি স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্রের নাখোজাবাদি স্বপ্ন উপস্থাপন করেন; এই ভাষণে বলা হইলো, এই রাষ্ট্রে মুসলমানেরা নিজ কওমের মূল্যচেতনা ও আদর্শ অনুসারে জীবনযাপন করতে পারবে। এই ভিশনারি ভাষণই পাকিস্তান রাষ্ট্রের বুনিয়াদ; আর কিছু নয়।
১৯৩১ ঈসায়ীর, ২৭ ফেব্রুয়ারি, এলাহাবাদেরই, আলফ্রেড পার্কে, অগ্নিপুত্র বিপ্লবী চন্দ্রশেখর আজাদ দিনদুপুরে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন; আজাদ মায়ের কাছে কসম খাইসিলেন যে, তাঁকে কেউ জিন্দা ধরতে পারবে না। এই মৃত্যু আমূল কাঁপায় দেয়, ব্রিটিশ রাজকে। লাহোর সেন্ট্রাল জেলে ফাঁসি হয় ভগৎ সিং, শুকদেব ও রাজগুরুর। মাতৃভূমির এই বীর সন্তানদের কোরবানিতে বিস্রস্ত ইকবাল, দ্বিতীয় গোলটেবল বৈঠকে যোগদান করতে বিলাত আসেন। একটু অনুপ্রেরণার খোঁজে তিনি এইখান থেকে পৌঁছান আন্দালুস। ইবেরীয় উপদ্বীপে, কর্ডোবার খিলাফতের রাজধানী, মাদীনাতুজ জাহরার ধ্বংসস্তূপে তিনি একা একা হাঁটেন। এক সূর্যাস্ত কালে, কর্দোবার বিখ্যাত ক্যাথিড্রাল-মসদিজের সামনে তাঁর কাছে, অপূর্ব ওহীর মতো উদয় হয় ‘মসজিদে কুরতুবা’ কবিতাটি। তিনি এটি তাঁর ‘বাল-এ-জিবরিল’ কিতাবে অন্তর্ভ্যুক্ত করেছেন।
পতনের ভূগোল, পুনরুত্থানের আত্মা
এখানে বোঝা জরুরি যে, ইকবালকে আন্দালুসে এনে ফেলসিল কোনো আকস্মিক ভ্রমণপিপাসা না; তাঁকে টেনে আনসিল এক অন্তর্লীন বেদনা, আর এক অদ্ভুত কৌতূহল যে, মুসলিম ইতিহাসের পতনস্পর্শে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ভারতীয় উপমহাদেশীয় মুসলমান কীভাবে নিজের ভবিষ্যতের মানচিত্রটা পড়ে। সেই সময় ইউরোপের বুকে মুসলিম ক্ষমতার রাজনৈতিক স্মৃতি অনেকটাই অদৃশ্য, আর উপমহাদেশে মুসলমানদের আত্মবিশ্বাসও টালমাটাল।
ইকবাল ঠিক তখনই আন্দালুস গিয়েসিলেন, যেন ইতিহাসের মৃতপ্রান্তে স্পর্শ নিয়ে দেখতে চান জীবনের পালস এখনো আছে কি না। কুরতুবার মসজিদে দাঁড়িয়ে তিনি দেখলেন এক অদ্ভুত মিলনক্ষেত্র: যেখানে উম্মাহর উচ্চচূড়া একসময় আকাশ ছুঁইসিল, আর একই সঙ্গে সেই শিখার পতনের ধুলো গায়ে মেখে আজকের মুসলিমরা নূতুন পথ খুঁজছে। আন্দালুস ছিল তাঁর কাছে একটা দ্রষ্টব্য চিহ্ন, যা দেখিয়ে দেয় কিভাবে সাম্রাজ্য ভেঙে যায়, কিন্তু আত্মিক নির্মাণ অটুট থেকে মানবজমিনে নূতুন বীজ ফেলতে থাকে।
এটা ছিল তাঁর জন্য এক পরীক্ষাগার, যেখানে তিনি রাজনৈতিক পতনের পরও ভাবগত স্থায়িত্বের প্রমাণ খুঁজসিলেন।
বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশের একজন মুসলমান হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল ভঙ্গুরতার ওপর দাঁড়ানো—ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির চাপ, মুসলিম সমাজের বিভ্রান্তি, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নের পাহাড়। সেই অবস্থায় তিনি আন্দালুসে এসে একটি ভিন্ন রকমের শিক্ষা পেলেন: ক্ষমতা হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু ইশ্কের ভিতরে নির্মিত মানসিক জগতকে সময় ছুঁতে পারে না।
এ শিক্ষা সরাসরি উপমহাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে জুড়ে গেল, কারণ সেখানে মুসলমানদের সামনে রাজনৈতিক পতন, আত্মপরিচয়ের সঙ্কট আর আধুনিকতার চাপে বিশ্বাসের অবক্ষয়—সব একসঙ্গে ঘটছে। কুরতুবা তাকে দেখাল যে উম্মাহ কোনো ভৌগোলিক মালিকানার নাম না,
বরং এক ঐতিহাসিক স্নায়ুতন্ত্র।
সেই স্নায়ুক্ষতির অভিজ্ঞতা যেমন আন্দালুসে ঘটসে, তেমনি তাঁর নিজস্ব সভ্যতার ইতিহাসেও প্রতিধ্বনিত। তাই মসজিদে দাঁড়িয়ে তিনি উম্মাহর অতীতের গৌরবকে স্মরণ করছেন বলে মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে তিনি উপমহাদেশীয় মুসলমানের বর্তমানকে পড়ছেন এবং ভবিষ্যতের একটা আধ্যাত্মিক নকশা নির্মাণ করছেন।
ইশক ও খুদি: দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের হৃদয়
‘মসজিদে কুরতুবা’ কবিতার কেন্দ্রীয় আধ্যাত্মিক টান হলো ইশক এবং খুদি (আত্মসত্তা)-র মধ্যে এক গভীর দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক, যা হেগেলীয় অর্থে মাস্টার-স্লেভ ডায়ালেকটিকসের মতো কাজ করে; কিন্তু এখানে দাসত্ব নয়, বরং আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে আত্মার পূর্ণতা আসে।
ইকবাল বলছেন: “রব্বের আশিকি বিনা মইরা মিটে যাই ভাঙনের স্রোতে”। অর্থাৎ, খুদি তখনই টিকে থাকে যখন সে ইশকের আগুনে পোড়ে।
এটা হেগেলের Phenomenology of Spirit-এর সেই মুহূর্ত যেখানে আত্মচেতনা অপরের স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে নিজেকে জানে, কিন্তু ইকবালের ক্ষেত্রে সেই "অপর" হলো আল্লাহ, এবং স্বীকৃতি নয়, বরং ফানা ও বাকা(স্থায়িত্ব)-র চক্র।
হাফিজ শিরাজি তাঁর গজলে বলসেন: ‘‘মন চু তু শুদি মন নমানদম / ওয়ার না তু মন কি বুদাম কি হস্তাম”
(যখন তুমি হইলাম, আমি আর থাকলাম না /
আর যদি তুমি না হইতাম,
আমি কে ছিলাম, কি ছিলাম)।
এই আত্মবিলোপের মধ্য দিয়ে আত্মার প্রকৃত জাগরণ; এটাই ইকবালের ইশক-খুদি দ্বান্দ্বিকতার মর্মকথা। কিন্তু ইকবাল হাফিজের থেকে একটা জায়গায় আলাদা:
হাফিজ রেন্দ (মালামাতি সুফি) ঐতিহ্যে বিশ্বাস করতেন যে, আত্মসমর্পণই শেষ কথা; ইকবাল বলছেন, আত্মসমর্পণের পর আসে পুনর্নির্মাণ। তাঁর খুদি শুধু ফানা হয় না, বরং ইশকের মধ্য দিয়ে শাহিন হয়ে ওঠে, যে উড়তে পারে, শিকার করতে পারে, ইতিহাস বদলাতে পারে।
ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘হাম দেখেঙ্গে’-তে লিখসেন:
“জব আহল-এ-সফা মারদুদ-এ-হরম /মাসনাদ পে বিঠায়ে জায়েঙ্গে”
(যখন পবিত্রজনেরা, যাদের হারাম থেকে তাড়ানো হইসে,
সিংহাসনে বসবে)।
ফয়েজের এই বিপ্লবী আধ্যাত্মিকতা ইকবালের ইশকের রাজনৈতিক মাত্রা। ইকবাল বলছেন: “যে কামের গভীরে ইশ্ক, আবাদিয়ত সেখানে ভারী”, অর্থাৎ, প্রেমের মধ্যে যে কর্ম, সেই কর্মই চিরন্তন। এটা শুধু মিস্টিক ভাবোচ্ছ্বাস না, বরং প্র্যাক্সিস—হেগেলীয় অর্থে, চিন্তা ও কাজের ঐক্য।
জাইট উন্ড জাইন: হাইডেগারের সময় ও ইকবালের সিলসিলা
কবিতার প্রথম লাইন “সিলসিলা-এ-রোজ-ও-শব" (দিন-রাতের অন্তহীন ধারা) । হাইডেগারের (সত্তা ও সময়) কেন্দ্রীয় সমস্যাকে স্পর্শ করে। হাইডেগার বলসেন, মানুষ ‘‘জাইন-জুম-টোদে” (মৃত্যুর-দিকে-থাকা সত্তা);
আমরা সময়ের মধ্যে নিক্ষিপ্ত, এবং আমাদের অস্তিত্বের অর্থ তৈরি হয় এই কালিকতা থেকে।
ইকবালও বলছেন:
“জীবন-নদীর ঢেউ বয়ে যায় ক্ষণমাত্র, ক্ষণকাল / তবু নূর নিঃসৃত হয়, নিঃশ্বাসে নাচায় যায় আযল”।
এখানে আযল (অনাদি কাল) হলো সেই ট্রান্সেন্ডেন্টাল টাইম, যা হাইডেগারের "উরস্প্রুংলিশে জাইট" (আদিম সময়)-এর মতো, যে সময় ঘড়ির কাঁটায় মাপা যায় না, বরং অস্তিত্বের গভীরে প্রবাহিত। কিন্তু হাইডেগারের সাথে ইকবালের পার্থক্য হলো: হাইডেগার বলছেন, আমরা "গেভোরফেনহাইট" (নিক্ষিপ্ততা)-র মধ্যে আছি, এবং "জাইন-জুম-টোদে" আমাদের সবচেয়ে খাঁটি সম্ভাবনা।
ইকবাল বলছেন, না, আমরা নিক্ষিপ্ত না, আমরা আমানত। আল্লাহ আমাদের সময়ের মধ্যে পাঠাইসেন এক মিশন নিয়ে, এবং সেই মিশন পূরণ করতে হলে দরকার ইশক, যা সময়কে ভেঙে চিরন্তনতার সাথে যোগ করে।
হাইডেগারের "ভরহান্ডেনহাইট" (উপস্থিতি-হাতে-রাখা) এবং "জুহান্ডেনহাইট" (হাতের-মুঠোয়-থাকা) ধারণার বিপরীতে, ইকবালের ইশক হলো "মাওজুদিয়াত-এ-মুতলাক" (পরম উপস্থিতি), যা সময়ের ভিতরে থেকেও সময়ের বাইরে।
হোল্ডারলিনের কবিতা "ব্রোট উন্ড ভাইন" (রুটি এবং মদ)-এ যে "দুর্ফটিগার জাইট" (দারিদ্র্যময় কাল)-এর কথা বলা হইসে, যেখানে দেবতারা চলে গেছেন, এবং তাঁদের ফিরে আসার অপেক্ষায় কবি দাঁড়িয়ে আছেন রাতের অন্ধকারে, ইকবালের কুরতুবা ঠিক সেই একই "দুর্ফটিগার জাইট"।
মসজিদটা দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার ভিতরে আর আজান নাই, নামাজ নাই। তবু ইকবাল বলছেন:
"হে মসজিদ, তোর খিলানভরা অন্ধকারের গভীর মায়ায় / এ
ক নিঃশব্দ সুর ওঠে বেজে, কালের ধূলির জমাট ছায়ায়"।
হোল্ডারলিন যেমন বিশ্বাস করতেন যে কবিতা
"দাস আন্দেংকেন ডেস হাইলিগেন" (পবিত্রের স্মরণ) ধরে রাখে,
ইকবালও বলছেন মসজিদ ধরে রাখে সেই রুহানি সুর,
যা আবার জাগাতে পারে উম্মাহকে।
পল ভালেরির সমুদ্রকবরস্থান ও ইকবালের কুরতুবা
পল ভালেরির বিখ্যাত কবিতা "লে সিমিতিয়ার মারাঁ" (সমুদ্র-কবরস্থান) শুরু হয় এভাবে: "সে তোয়া ট্রাঁকিল, উ মার্শঁ দে কলোঁব"(এই শান্ত ছাদ, যেখানে ঘুঘুরা হাঁটে)। ভালেরি ভূমধ্যসাগরের ধারে দাঁড়িয়ে দেখছেন মৃতদের কবর, আর সমুদ্রের অনন্ত শান্তি, কিন্তু সেই শান্তির নিচে লুকিয়ে আছে "লা মের, লা মের, তুজুর রেকমঁসে" (সমুদ্র, সমুদ্র, সবসময় নূতুন করে শুরু)। ভালেরির এই টেম্পোরাল প্যারাডক্স, স্থিরতা ও গতির, মৃত্যু ও পুনর্জীবনের, ইকবালের কুরতুবাতেও দেখি।
ইকবাল লিখছেন: "কুরতুবা, তোকে সইতে হইসে হুতাশন-নিমগ্ন নিরাশা অনেককাল / তবু দাঁড়িয়ে আছিস আজ, প্রেমে ভরা আমলের ভরসায় অটল"।
ভালেরির কবিতায় চেতনা সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সসীমতা ও অসীমতা দুটোই উপলব্ধি করে: "ইল ফো তাঁতে পুর ভিভ্র"(বেঁচে থাকতে হলে চেষ্টা করতে হয়)। ইকবালও বলছেন: "হস্তি ফানি, ইশকই বাকি" (জীবন ক্ষণিক, কিন্তু প্রেমই স্থায়ী)। দুজনেই সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু ভালেরি খুঁজছেন "লাক্সিওঁ পুর" (বিশুদ্ধ কর্ম), আর ইকবাল খুঁজছেন "আমল-এ-সালেহ" (সৎকর্ম যা ইশকে ডুবানো)। ভালেরির সমুদ্র-কবরস্থান একটা নিরাশাবাদী সৌন্দর্য, কিন্তু ইকবালের কুরতুবা একটা আশাবাদী শোক, যেখানে পতন আছে, কিন্তু পুনরুত্থানের বীজও লুকিয়ে আছে।
রিলকের মুহাম্মদ-কবিতা ও নবুওয়তের নদী-রূপক
রাইনার মারিয়া রিলকের "গেজাং ফোম প্রফেতেন মুহাম্মদ" (নবী মুহাম্মদের গান, যা গোয়েটের ভেস্ট-এস্টলিশার দিওয়ান-এর জন্য লেখা) একটা অসাধারণ রূপক তৈরি করে: নবীজি (সা.)কে তুলনা করা হয় এক ঝর্ণার সাথে, যা পাহাড় থেকে নেমে আসে, প্রথমে ছোট্ট ধারা, তারপর নদী, তারপর মহাসাগর।
রিলকে লিখছেন: "ভাস এর ইস্ট শেনেস, হেল জু জাইন" (কত সুন্দর, উজ্জ্বল হওয়া)। এই নদী-রূপক ইকবালের "সিলসিলা" (ধারাবাহিকতা) ধারণার সাথে হুবহু মিলে যায়। ইকবাল বলছেন: "কুঁড়ের পাশে যে নদী বয়ে গেছে, গুফতগু-ই ইশ্ক তার ওপারে", এই নদী শুধু ভৌগোলিক নদী না, এটা ওহির নদী, ইশকের নদী, যা প্রবাহিত হয় ইতিহাসের ভিতর দিয়ে।
রিলকের নবীজি-কবিতায় নদী শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে মিশে যায়: "ভেল্ট-মেয়ার ভার্তেট আউফ ইহ্ন" (বিশ্ব-সমুদ্র তাঁর অপেক্ষা করে)। ইকবালের ক্ষেত্রেও, কুরতুবার মসজিদ হলো সেই নদীর একটা মুকাম, যেখানে ইশকের ধারা একসময় শক্তিশালী ছিল, এখন শুকিয়ে গেছে, কিন্তু আবার প্রবাহিত হতে পারে।
রিলকে তাঁর "দুইনেজের এলেগিয়েন" (দুইনো শোকগাথা)-তে লিখসেন:
"ভের, ভেন ইশ স্রীটে, ইস্ট আইন এংগেল উন্টার ইহ্নেন?"
(কে, যদি আমি চিৎকার করি, শুনবে দেবদূতদের মধ্যে?)।
ইকবালের উত্তর: যে হৃদয়ে ইশক আছে, সেই শুনবে।
"যে হৃদয়ে ইশ্ক কামিল, তার তাবাহী নাই"।
কাজী নজরুল, ফররুখ আহমদ ও বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের সন্ধান
ইকবালের এই কবিতার সাথে বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস এক গভীর সূত্রে বাঁধা। কাজী নজরুল ইসলাম, যিনি ইকবালের সমসাময়িক, তাঁর "বিদ্রোহী" কবিতায় লিখসিলেন: "আমি চিরবিদ্রোহী বীর / আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির"। নজরুলের এই খুদি ছিল তীব্র, বিস্ফোরক, কিন্তু ইকবালের মতো সেই খুদিকে ইশক-এর সাথে মেলাতে পারেননি সবসময়। নজরুলের বিদ্রোহ ছিল রোমান্টিক, স্বতঃস্ফূর্ত; ইকবালের বিদ্রোহ ছিল দার্শনিক, নির্মিত।
ফররুখ আহমেদ, যিনি ইকবালের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন, তাঁর "সাত সাগরের মাঝি" হল সেই শাহিন, যার কথা ইকবাল বলতেন; যে ভয় পায় না, যে ইতিহাসের ঝড়ের মধ্যেও পথ চলে। কিন্তু ফররুখের সমস্যা ছিল, তিনি ইকবালের ইশক-খুদি দ্বান্দ্বিকতার রাজনৈতিক মাত্রা ধরতে পারসিলেন, কিন্তু তার দার্শনিক গভীরতা সম্পূর্ণ আত্মস্থ করতে পারেননি।
১৯৪৭ সালে যখন উপমহাদেশ ভাগ হলো, বাঙালি মুসলমান পেল এক নূতুন রাষ্ট্র (পাকিস্তান, পরে বাংলাদেশ), কিন্তু হারালো এক ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা।
ইকবাল যেমন আন্দালুসে দাঁড়িয়ে দেখসিলেন ভৌগোলিক পতনের পরও আধ্যাত্মিক স্থায়িত্ব, বাঙালি মুসলিম বুদ্ধিজীবী সমাজ ১৯৪৭-পরবর্তী সময়ে সেই একই প্রশ্নের মুখোমুখি: আমরা কারা? আমাদের শিকড় কোথায়? আমরা কি শুধু ভাষাগত বাঙালি, নাকি ধর্মীয় মুসলমান, নাকি দুটোই—এবং কীভাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা কখনো নজরুলের বিদ্রোহ ধরসি, কখনো ফররুখের রোমান্টিসিজম, কখনো আধুনিকতাবাদী সেক্যুলারিজম, কিন্তু ইকবালের সেই ইশক-ভিত্তিক পুনর্নির্মাণ-এর পথ আমরা এখনো পুরোপুরি খুঁজে পাইনি।
বাল-এ-জিবরিল: প্রকাশের ডানা ও আধ্যাত্মিক উড্ডয়ন
"বাল-এ-জিবরিল" অর্থ "জিবরিলের ডানা" । জিবরিল (আ.) হলেন প্রকাশের দূত, যিনি রব্বের বাণী নিয়ে আসেন পৃথিবীতে। ইকবাল এই নামটি বেছে নিয়েসিলেন কারণ এই গ্রন্থটি তাঁর ইউরোপ ভ্রমণ (বিশেষ করে স্পেন-আন্দালুস) থেকে অনুপ্রাণিত এক আধ্যাত্মিক উন্মোচন। এটি শুধু একটি কাব্যগ্রন্থ না, বরং এক দার্শনিক ম্যানিফেস্টো, যেখানে ইকবাল তাঁর পূর্ববর্তী গ্রন্থ "বাঙ্গ-এ-দারা"-র তুলনায় আরো পরিপক্ব, আরো গভীর, আরো জটিল হয়ে উঠসেন।
"বাল-এ-জিবরিল"-এ ইকবাল তাঁর দার্শনিক চিন্তার সবচেয়ে গভীর স্তরগুলো উন্মোচন করেন: খুদি (আত্মসত্তা), ইশক (আধ্যাত্মিক প্রেম), জামান (সময়ের ধারণা), এবং ইসলামী সভ্যতার ঐতিহাসিক পতন ও পুনরুত্থান। তিনি ঐতিহাসিক ঘটনা (যেমন আন্দালুসের পতন) ব্যবহার করেন মুসলিম উম্মাহর বর্তমান সঙ্কটকে বিশ্লেষণ করতে এবং ভবিষ্যতের জন্য আধ্যাত্মিক পথনির্দেশ দিতে। গ্রন্থটি গজল, মসনবি, রুবাই এবং উপদেশমূলক রচনা নিয়ে গঠিত। এখানে তিনি ইবলিস ও জিবরিল-এর মতো প্রতীক ব্যবহার করেন ঈশ্বরীয়-মানবীয় সম্পর্কের গভীরতা অনুসন্ধান করতে।
জিবরিলের ডানা একটা প্রতীক: যেমন জিবরিল (আ.) নবীজির কাছে ওহি নিয়ে আসতেন উর্ধ্বলোক থেকে, তেমনি ইকবালের কবিতা চায় মুসলিম উম্মাহকে তার রুহানি শিকড়ের কাছে ফিরিয়ে নিতে, কিন্তু অন্ধ অনুকরণে নয়, বরং তাজদিদ (নবায়ন) ও ইজতিহাদ (স্বাধীন চিন্তা)-এর মাধ্যমে। ইকবালের জিবরিল শুধু অতীতের বার্তাবাহক না, ভবিষ্যতের স্থপতিও।
"মসজিদে কুরতুবা": বাল-এ-জিবরিল-এর কেন্দ্রীয় শিখর
"মসজিদে কুরতুবা" "বাল-এ-জিবরিল"-এর কেন্দ্রীয় শিখর হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে কারণ এটি গ্রন্থের মূল থিমগুলো—ইশক, খুদি, ঐতিহাসিক পতন এবং আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে একত্রিত করে।
এটি ইকবালের ইউরোপ ভ্রমণের অনুপ্রেরণা থেকে জন্মানো একটি মাস্টারপিস, যা মসজিদকে একটি প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে ইসলামের অমর আত্মিক শক্তিকে তুলে ধরে। কবিতাটির বহর (ছন্দ) অসাধারণ, ইকবাল ব্যবহার করসেন বহর-এ-মুতাকারিব, যা আরবি-ফার্সি কবিতায় গতি, তীব্রতা এবং উত্তেজনা প্রকাশ করে। এই বহর যেন ঘোড়ার পায়ের শব্দ, যুদ্ধের দামামা, হৃদয়ের ধুকপুকানি।
মুতাকারিব মানে "কাছে আসা", আল্লাহর কাছে, সত্যের কাছে, নিজের প্রকৃত সত্তার কাছে। ইকবাল এই ছন্দে কবিতাটিকে এমনভাবে বুনসেন যে প্রতিটি লাইন যেন এক জিকির, এক তাসবিহ, এক দুআ ।
কবিতার প্রথম অংশে ইকবাল সময়ের চক্র নিয়ে কথা বলেন, "সিলসিলা-এ-রোজ-ও-শব" (দিন-রাতের ধারা), যা মানুষের জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বকে তুলে ধরে। কিন্তু তারপরেই তিনি বলেন: "তবু নূর নিঃসৃত হয়, নিঃশ্বাসে নাচায় যায় আযল" অর্থাৎ, ক্ষণস্থায়ী জীবনের মধ্যেও চিরন্তনতার স্পর্শ আছে। এই দ্বান্দ্বিকতা: ফানি (নশ্বর) ও বাকি (স্থায়ী)-র মধ্যে, পুরো কবিতার মর্মবাণী।
দ্বিতীয় অংশে ইকবাল কুরতুবা মসজিদকে সরাসরি সম্বোধন করেন, এবং এই সম্বোধনের মধ্যে আছে এক আশিকানা (প্রেমিকসুলভ) আবেগ। তিনি বলছেন: "কুরতুবা—তোর পাথর-দেয়ালে রোদের নরম আদর / পুরানা কওমের রগে জাগে নতুন কদর"। এখানে "পুরানা কওম" শুধু আন্দালুসের মুসলমান না, বরং পুরো উম্মাহ, যারা আজ বিচ্ছিন্ন, দুর্বল, কিন্তু যাদের রক্তে এখনো সেই পুরনো গৌরবের স্মৃতি প্রবাহিত।
তৃতীয় অংশে ইকবাল ইশক-এর ধারণাটি পুরোপুরি খুলে দেন। তিনি বলছেন: "যে কামের গভীরে ইশ্ক, আবাদিয়ত সেখানে ভারী" অর্থাৎ, যে কাজ প্রেম থেকে জন্ম নেয়, সেই কাজই চিরস্থায়ী। এটা ইকবালের "আমল-এ-সালেহ" (সৎকর্ম) ধারণার মূলমন্ত্র।
তিনি বলছেন, অহংকার থেকে জন্মানো নির্মাণ ধ্বংস হয়, কিন্তু প্রেম থেকে জন্মানো নির্মাণ টিকে থাকে।
চতুর্থ অংশে ইকবাল মসজিদের খিলান গুলো নিয়ে কথা বলেন, এবং সেই খিলানের অন্ধকারে তিনি শুনতে পান "এক নিঃশব্দ সুর"। এই সুর হলো সেই রুহানি ধারাবাহিকতা, যা পাথরের মধ্যে গাঁথা আছে। ইকবাল এখানে বলছেন যে স্থাপত্য শুধু ইট-পাথর না, বরং এক জীবন্ত সত্তা, যদি সেটা ইশক দিয়ে তৈরি হয়।
শেষ অংশে ইকবাল বলেন সেই বিখ্যাত লাইন: "হস্তি ফানি, ইশকই বাকি" (জীবন ক্ষণিক, কিন্তু প্রেমই স্থায়ী)। এটা শুধু একটা কাব্যিক উচ্চারণ না, বরং এক অন্টোলজিক্যাল ঘোষণা যে প্রেমই একমাত্র বাস্তব, বাকি সব ছায়া।
অনুবাদের কারুকাজ: ছন্দ ও প্রসোডির প্রতি বিশ্বস্ততা
ইকবালের মূল উর্দুতে যে গভীর সঙ্গীতময়তা আছে, বিশেষ করে বহর-এ-মুতাকারিব, , আমি চেষ্টা করসি সেই সঙ্গীতকে বাংলায় ধরতে। উর্দু-ফার্সি কবিতার ছন্দ (আরুজ) বাংলার অক্ষরবৃত্ত বা মাত্রাবৃত্তের থেকে আলাদা, সেখানে দীর্ঘ (মাদ্দ) ও হ্রস্ব (কাসর) স্বরের খেলা আছে। বাংলায় সেই খেলা রক্ষা করা কঠিন, কিন্তু আমি চেষ্টা করসি ধ্বনি-প্রবাহ ও ছন্দ-লয় দিয়ে সেই তীব্রতা আনতে।
যেমন, মূল উর্দু লাইন: "হস্তি ও ফানা, ইশক হ্যায় বাকি", এখানে "হস্তি" (হ), "ফানা" (ফ), "ইশক" (ই), "বাকি" (ব) এই চারটা শব্দের মাখরাজ (উচ্চারণস্থল) আলাদা, এবং সেগুলো একসাথে এক সঙ্গীতময় ঢেউ তৈরি করে।
আমি বাংলায় লিখসি: "জীবন ক্ষণিক— / কিন্তু প্রেম-হেফাজতে গড়া নির্মাণ / মহাকালের মহিমা ধারণ করে চিরকাল"
এখানে আমি "জীবন ক্ষণিক" বলে একটা বিরতি (পজ) দিয়েসি, যেটা উর্দুতে "হস্তি ও ফানা"-র পর আছে। তারপর "প্রেম-হেফাজতে" শব্দবন্ধ দিয়ে ইশক-এর ভাবটা ধরার চেষ্টা করসি। "মহাকালের মহিমা"-তে "ম"-কারের পুনরাবৃত্তি একটা অ্যালিটারেশন তৈরি করে, যা মূল উর্দুর "বাকি" শব্দের ওজন ধরে।
আরেকটা উদাহরণ: "সিলসিলা-এ-রোজ-ও-শব, নূর কি কিরনোঁ কা খেল"। এখানে "সিলসিলা" (ধারাবাহিকতা) একটা দীর্ঘ, প্রবাহমান শব্দ, যেটা সময়ের অন্তহীনতা বোঝায়। আমি বাংলায় লিখসি:"সিলসিলা-এ-রোজ-ও-শব, নূর ও নিগাহের অনন্ত ধারা"। এখানে "অনন্ত ধারা" শব্দবন্ধ দিয়ে সেই প্রবাহের ভাবটা ধরার চেষ্টা করসি। "নূর ও নিগাহ" (আলো ও দৃষ্টি) দুটো আরবি-ফার্সি শব্দ রাখসি, কারণ এগুলোর বাংলা প্রতিশব্দ ("আলো ও দেখা") ততটা রুহানি ভার বহন করে না।
এভাবে পুরো কবিতা জুড়ে আমি চেষ্টা করসি থিম ও প্রসোডি দুটোতেই মূলের কাছাকাছি থাকতে, শুধু অর্থ অনুবাদ না, বরং আত্মা অনুবাদ করতে। ইকবালের কবিতা যেমন শুধু পড়ার জিনিস না, শোনার জিনিস, আমি চাইসি বাংলা অনুবাদও সেইভাবে কানে বাজে, হৃদয়ে নাড়া দেয়, আর রুহে আগুন জ্বালায়। রব্ব আমাকে কবিতা লেখবার ক্ষমতা দেন নাই। কবিতা বা ছন্দ সম্পর্কে আমার জ্ঞান নাই বললেই চলে। আমি আশা করবো, কোন প্রকৃত কবি, এই অসাধারণ কবিতাটি অনুবাদে উৎসাহিত হবেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


কুর্দিকে জাতীয় ভাষার মর্যাদা দিল সিরিয়া
মসজিদে কুরতুবা
৩৬ জুলাই: ঐতিহ্যবাদী বিপ্লব ও বাঙালি মুসলিম ফিউচারিটি (১ম পর্ব)
৩৬ জুলাই ঐতিহ্যবাদী বিপ্লব ও বাঙালি মুসলিম ফিউচারিটি (শেষ পর্ব)