আবু ফাতেমা মুহাম্মদ ইসহাক

নতুন যুগের আলোয় খুঁজি (শেষ পর্ব)

বাইজিদ আহমাদ

নতুন যুগের আলোয় খুঁজি (শেষ পর্ব)

৪. ‘মুসলিম রেনেসাঁয় নজরুলের অবদান’ লেখকের সর্বশেষ এ গ্রন্থটিই মুদ্রিত ছিল। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মুসলিম চিন্তা ও সামাজিক চেতনায় নজরুলের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে। পরে ১৯৮৭ সালের অক্টোবর মাসে নতুন সংস্করণ প্রকাশ করা হয় এবং ২০১৪ সালে পুনর্মুদ্রিত করা হয়।

৫. ‘ফুরফুরার পীর হজরত মওলানা আবুবকর সিদ্দিকী’—বইটি ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত হয়। প্রকাশক ছিলেন অধ্যাপক এ এস এম ওমর খান, সহকারী পরিচালক, ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, ঢাকা বিভাগ। প্রকাশকাল শাবান, ১৪০০ হিজরি; আষাঢ়, ১৩৮৭ বাংলা; জুন, ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দ। প্রচ্ছদ করেছেন কাজী আসাদুজ্জামান। মূল্য ছিল ৭ টাকা মাত্র।

বিজ্ঞাপন

ভূমিকায় আবু ফাতেমা মুহাম্মদ ইসহাক লিখেছেন—‘বাংলাদেশ ও আসামের মুসলিম ধর্মাকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র ফুরফুরার প্রখ্যাত পীর হজরত মওলানা আবুবকর সিদ্দিকীর একটি জীবনী লেখার আমার ইচ্ছা ছিল। কয়েক বছর ধরে আমি তার জীবনের টুকরা টুকরা কথা নোট করে করে জমা করতে থাকি। ইতোমধ্যে কলকাতা থেকে প্রকাশিত মরহুম মওলানা রুহল আমিন সাহেবের বিভাগ-পূর্ব যুগে লিখিত হজরত পীর সাহেবের বিস্তারিত জীবনীর একটি পুরাতন কপি আমার হাতে এসে পড়ে। এই বই থেকেও আমি বহু মাল-মসলা কুড়িয়ে নিয়েছি। শর্ষিনা থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক ‘তাবলিগের’ বিশেষ সংখ্যাগুলো ও ঢাকা থেকে প্রকাশিত মাসিক ‘নেদায়ে ইসলামে’র বিশেষ বিশেষ সংখ্যা থেকেও আমি এই জীবনকথার বহু উপকরণ সংগ্রহ করেছি। মরহুম ডক্টর শহীদুল্লাহ সাহেবের ‘ইসলাম প্রসঙ্গ’ বইটিও আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছে। মহান পুরুষের এই জীবনী লিখতে গিয়ে কোনো রূপ বেয়াদবি করছি কি না এই ভয়ও মনে রয়েছে। সকল রকমের ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য তার বেহেশতি আত্মার কাছে ক্ষমা চাইছি এবং সব দোষ-ত্রুটি মাফ করে বইটি কবুল করে নেওয়ার জন্য রাব্বুল আলামিন আল্লাহর দরগাহে সবিনয় প্রার্থনা করছি।...

ইতি—আবু ফাতেমা মোহাম্মদ ইসহাক, আষাঢ়, ১৩৮৭, শাবান, ১৪০০ হিজরি

৬. ‘পত্রে মুসলিম তামাদ্দুন’—পত্রসাহিত্যেও আবু ফাতেমা মুহাম্মদ ইসহাক ছিলেন সিদ্ধহস্ত। এ বইয়ে চারটি বা পাঁচটি দীর্ঘ পত্র উল্লেখ আছে; যেখানে তিনি ইসলামি বিশ্বাস ও চিন্তার নানা প্রসঙ্গ উল্লেখ করে গল্পভাষ্যে কারো কাছে চিঠি লিখেছেন অথবা কারো চিঠির জবাব দিয়েছেন। বইটি যেমন তথ্যসমৃদ্ধ, তেমনি এর ভাষা খুবই সুগঠিত ও মার্জিত। ‘সোসাইটি ফর পাকিস্তান স্টাডিজ’ পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে। মূল্য ছিল ২ টাকা মাত্র। পরে প্রকাশনা হিসেবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উল্লেখ পাওয়া যায়।

৭. ‘সাহিত্য বিচিত্রা’—বইটি মূলত একটি প্রবন্ধ সংকলন। প্রকাশিত হয় জানুয়ারি, ১৯৭১ সালে, সোসাইটি ফর পাকিস্তান স্টাডিজ, ঢাকা থেকে। মূল্য ছিল ২ টাকা ৫০ পয়সা মাত্র।

১৬৩ পৃষ্ঠার বইটিতে ব্যক্তি, সমাজ ও ধর্মকেন্দ্রিক ১৯টি প্রবন্ধের মাধ্যমে সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মুসলিম ভাবধারার একটি সমন্বিত চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে।

৮. ‘বিতর্ক বিচিত্রা’—এই বইটি মূলত সাহিত্যসমালোচনার একটি সংকলন। বিশেষত, রবীন্দ্রনাথের পর্যালোচনা ও সমালোচনা নিয়ে একাধিক রচনা স্থান পেয়েছে এ বইয়ে। প্রথম প্রকাশিত হয় ১০ জানুয়ারি ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে, ২৫ পৌষ ১৩৯৪ বঙ্গাব্দে। প্রকাশক ছিলেন সুলতানা পারভিন, বড়ইবাড়ী, কুমারুলী, ময়মনসিংহ। মূল্য : সুলভ বাঁধাই ১৫ টাকা, শোভন বাঁধাই ২৫ টাকা।

এ বইয়ের উৎসর্গপত্রটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কবি লায়লা রাগিবের স্মরণে তিনি একটি কবিতা লিখেছেন উৎসর্গের জায়গায়—“লায়লা! স্মরণ করছি তোমায়/ আজ বড় বেদনায়। তুমি চলে গেলে এতো অকালে/ আমাদেরে ছেড়ে দূরে, বহু দূরে/ একেবারে চিরতরে। সাহিত্য ও তামাদ্দুনিক অঙ্গনে/ সত্য ও সুন্দরের অন্বেষণে/ তুমি এসেছিলে আলোক শিখা হয়ে/ অনন্তের বাঁশি বাজিয়ে। তব উদয়নে ধীরে ধীরে/ যেতে ছিলো সরে/ আমাদের তামাদ্দুনিক তমসা/ আর বিকশিত হচ্ছিল ঠোঁটের ভাষা। তব অবদান আছে বিকীর্যমাণ/ ‘কবি সংলাপে’, ‘সিলেট লেখিকা সংঘ’ সংগঠনে/ ইসলামী ছাত্রী সংস্থা প্রতিষ্ঠায়/ ‘কিংখাবে মোড়া’য়/ ‘বৃষ্টি আমার জন্মাবধি দুঃখ মুছে নাও’-এ/ ‘নীড়াঙ্গনে পাখী’তে/ বিবিধ গদ্য প্রবন্ধে। এত শীঘ্র, তব অন্তর্ধান/ সৃষ্টি করেছে বহু ব্যবধান—/ আমাদের আশা/ আমাদের সকল ভরসা/ ভেঙ্গে করেছে খান খান। এতেও আমরা কখনো হব না নিরাশ/ তোমার চলার পথই/ হোক মোদের সন্তানদের মিরাশ।”

৯. ‘আল-কোরান বিশ্ব মানবের জন্য’Ñকোরআনবিষয়ক একটি ছোট পুস্তিকা। প্রকাশক সোসাইটি ফর পাকিস্তান স্টাডিজ, ঢাকা। প্রথম সংস্করণ : জানুয়ারি, ১৯৭১। মূল্য : ৪০ পয়সা।

১০. ‘হৃদয় আমার কথা কয়’—কাব্যগ্রন্থ। ৩৬টি কবিতা নিয়ে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় শনিবার, ১০ মার্চ, ১৯৭৯; ২৫ ফাল্গুন, ১৩৮৫; ১১ রবিউস সানি, ১৩৯৯ হিজরি। প্রকাশক—এ কে এম হায়দার, প্রধান শিক্ষক : ভাসা সুইডিশ প্রাথমিক বিদ্যালয়, ডাকঘরÑবড়জোড়া, মোমেনশাহী। মূল্য ৩টাকা ৫০ টাকা।

উৎসর্গ করেন তৎকালীন প্রভাবশালী পত্রিকা ‘আল ইসলাহ’ সম্পাদক, সাহিত্যসাধক মোহতারাম মৌলভি নুরুল হক সাহেবকে।

১১. ‘উজ্জীবিত আত্মা’—কাব্যগ্রন্থ। প্রথম প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৬। মুদ্রণে : উদয়ন প্রেস, ময়মনসিংহ। গ্রন্থস্বত্ব : লেখক। মূল্য ছয় টাকা পঞ্চাশ পয়সা মাত্র।

উৎসর্গপত্রে লেখেন—‘আমার স্নেহভাজন ছাত্র বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় ও রাজস্ব হিসাব নিরীক্ষা পরিদপ্তরের অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস অফিসার মো. আখতার হোসেন ভূঞাকে...। প্রিয় আখতার, তুমি আমার সব রকমের লেখাই অতি শ্রদ্ধার সঙ্গে পাঠ করে থাক। অধিকন্তু তুমি ছাত্রজীবন থেকেই অতিমাত্রায় আমাকে ভক্তি-শ্রদ্ধা করে আসছ। তার প্রমাণ মেলে আজতক দেখা হওয়া মাত্রই আমাকে তোমার কদমবুসি করার মধ্যে। আমি তোমার কথা, মঞ্জুর কথা (বর্তমানে মেজর জেনারেল) ও মতিয়র রহমানের কথা (বাংলাদেশ রেলওয়ে বিভাগের সাবেক ডিরেক্টর) লোকের কাছে প্রায় সময়ই আলাপ করে থাকি। তোমরা আমার ছাত্র—এ জন্য আমার একটা গর্বও আছে। আজ বিশেষ করে তোমার বিনীত স্বভাব সুন্দর মনের কথা ভেবেই আমি তোমার হাতে আমার অতি ক্ষুদ্র কাব্য ‘উজ্জীবিত আত্মা’ তুলে দিচ্ছি। গ্রহণ করো। ইতিÑতোমার শিক্ষাগুরু, আবু ফাতেমা মোহাম্মদ ইসহাক, ১৫-৯-৮৬ খ্রিষ্টাব্দ।’

১২. ‘মিলাদ ও কিয়াম সমস্যা’Ñছোট একটি পুস্তিকা। প্রকাশক মোহাম্মদ কায়েম উদ্দীন, বিএ, ইপিসিএস, সার্কেল অফিসার (ডেভেলপমেন্ট), ঈশ্বরগঞ্জ, মোমেনশাহী। দাম ১ টাকা মাত্র। উৎসর্গপত্রে লেখেন : শান্তি ও ঐক্যের প্রতীক উলামায়ে হাক্কানিদের দস্ত মোবারকে।

৩.

আবু ফাতেমা মুহাম্মদ ইসহাকের সাহিত্যকর্মের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও প্রকাশনা-সংক্রান্ত নানা কারণে এসব পাণ্ডুলিপি প্রকাশের মুখ দেখেনি। তবে লেখক যত্নসহকারে সব পাণ্ডুলিপি গুছিয়ে রেখে গেছেন। রুলটানা লম্বা খাতায় স্পষ্ট হস্তাক্ষরে তিনি লিখতেন।

লেখকপুত্রের হেফাজতে সংরক্ষিত যেসব পাণ্ডুলিপির খোঁজ পাওয়া গেছে, সেগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয়—

১. ‘বৃহত্তর ঈশ্বরগঞ্জের ইতিবৃত্ত ও ঐতিহ্য পরিচিতি’Ñলেখক বইটির কাজ শেষ করেন ১৯৮৬ সালের ১০ জানুয়ারি । প্রখ্যাত লোকসাহিত্যিক ও কবি আবদুল হাই মাশরেকী এই পাণ্ডুলিপির ওপর রিভিউ লিখতে গিয়ে বলেন—‘গ্রন্থে আলোচিত কোনো কোনো গ্রাম, সেসব জায়গার নর-নারী এবং সাধারণভাবে সব ইউনিয়ন এলাকার মানুষের আচার-আচরণ, তাদের জীবিকা অর্জনের উপায় ও উৎস, এমনকি কোথাও কোথাও ব্যক্তিগত জীবনের একান্ত সত্য কাহিনি পাঠককে আন্তরিকভাবে আগ্রহী ও নিবিষ্ট করে তোলে। তাছাড়া এ গ্রন্থে রয়েছে মহান সুফি তাত্ত্বিক ও কামেল অলি-আল্লাহদের সম্পর্কেও তথ্যপূর্ণ আলোচনা এবং পাশাপাশি আছে অপর সম্প্রদায়ের সাধুসজ্জন ব্যক্তিদের নিয়ে অকুণ্ঠ প্রশংসা। তদুপরি রয়েছে মসজিদ-মন্দির, গোরস্তান-শ্মশান ও কোনো কোনো স্থানে এখনো বর্তমান প্রাচীন স্থাপত্যশিল্প ও নিদর্শনের বিবরণ।’

পরবর্তী সময়ে ১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বরে ‘আবু ফাতেমা মুহাম্মদ ইসহাক স্মৃতি পরিষদ, ঢাকা’র উদ্যোগে নতুন করে পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হলেও শেষ পর্যন্ত প্রকাশের মুখ দেখেনি।

২. ‘ইসলামি জীবন ও সংস্কৃতি কথা’—আল্লামা ইকবাল থেকে শুরু করে তার সমসাময়িক ফররুখ আহমদ, কাজী নজরুল ইসলাম কিংবা রবীন্দ্রনাথ—তাদের নিয়ে বিশ্লেষণ ও সমালোচনামূলক প্রবন্ধ রয়েছে এ পাণ্ডুলিপিতে। এছাড়া ধর্ম, ইতিহাস ও মনীষাবিষয়ক ১৮টি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। এখানেও তিনি প্রিয় ছাত্র মুহাম্মদ আখতার হোসেন ভূঞাকে উৎসর্গ করেছেন। পাণ্ডুলিপি তৈরির সময়কাল লেখা আছে—২২/০৬/৮৮ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ৭/৩/৯৫ বাংলা।

৩. ‘পবিত্র জীবনকথা’ (হজরত খাদিজা-ফাতিমা-যয়নব-সাকিনা রা.)—রচনার সময়কাল পাওয়া যায়নি। তবে অনুমান করা হচ্ছে, উপরোক্ত পাণ্ডুলিপির কাছাকাছি সময়েই হবে। ৬৭ পৃষ্ঠার মধ্যে চার মুসলিম নারীর জীবনচরিত আলোচনা করা হয়েছে।

উৎসর্গপত্রে লেখা : ‘পাগল’, ‘জীবন-কাব্য’ প্রভৃতি কাব্য প্রণেত্রী, মোহতারেমা বেগম মাহমুদা রহমানের—দস্ত মোবারকে।

৪. ‘পল্লিকবী রওশন ইজদানি : স্মৃতি ও সাহিত্যকথা’—অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিগুলোর মধ্যে এটাকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। কারণ কবি রওশন ইজদানি বাংলা সাহিত্যের আরেক বিস্মৃত প্রাণ। যোগ্য উত্তরসূরি ও যথাযথ চর্চার অভাবে এই মহান লেখকের অনেক পাণ্ডুলিপি কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। এমনকি ইজদানির জীবনচরিত উদ্ধার করা ছিল দুঃসাধ্য ব্যাপার। এই পাণ্ডুলিপি সে ঘাটতি পূরণে সহায়ক হয়েছে। ইজদানি ছিলেন লেখকের ঘনিষ্ঠজন। তাদের মধ্যে নিয়মিত পত্রযোগাযোগ হতো; সেসবের হদিসও আমরা পেয়েছি। ১০টি অধ্যায়ে কবির জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি।

উৎসর্গপত্রে লেখা : ফোকলোর স্কলার মোহতারেম চৌধুরী গোলাম আকবর সাহিত্যভূষণের দস্ত-মোবারকে। পাণ্ডুলিপি তৈরির সময়কাল : ৩০.১২.১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দ।

৪.

২০০০ সালের জানুয়ারি মাসে সিলেট থেকে লেখকের জীবন ও কর্মের ওপর একটি ছোট পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। গ্রন্থকার মুহাম্মদ আতাউর রহমান শেষ পৃষ্ঠায় কিছু বইয়ের তালিকা উল্লেখ করে জানান, এগুলো প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ওিই তালিকার কিছু বই প্রকাশিত হয় এবং কিছু পাণ্ডুলিপি লেখকপুত্রের হেফাজতে পাওয়া যায় (যেগুলো ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে)। তবে তালিকাভুক্ত অনেক গ্রন্থের কোনো সন্ধান আর পাওয়া যায়নি। তথ্যমতে, অপ্রাপ্ত গ্রন্থগুলো হলো—১. স্মৃতিকথা (আত্মজৈবনিক রচনা), ২. অমর কবি ফররুখ আহমদ, ৩. নানা প্রসঙ্গে, ৪. ইনসান-ই-কামিল, ৫. সূফীবাদ প্রসঙ্গ, ৬. কবি সুফিয়া কামালের কাব্যসাধনা, ৭. বাঙলা কাব্যে মুসলিম নারী, ৮. পাকিস্তানি জাতীয়তা ও সংস্কৃতি, ৯. রবীন্দ্রনাথ: সাহিত্য ও জীবন কথা, ১০. কতিপয় মহিলা কবির সাহিত্য ও জীবনকথা, ১১. বিদুষী সাইয়েদা সাকিনা, ১২. নজরুল মানস পরিক্রমা, ১৩. সাহিত্য ও সংস্কৃতি সুধা, ১৪. ইসলামী জীবন ও সংস্কৃতি, ১৫. ময়মনসিংহে ইসলাম প্রচার, ১৬. কতিপয় তাপসের জীবনকথা, ১৭. কুঁড়ানো মানিক (কাব্য)।

৫.

আবু ফাতেমা মুহাম্মদ ইসহাক মোমেনশাহীর ঈশ্বরগঞ্জ থানাধীন বড়ইবাড়ি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯২৭ সালের ১ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মুহাম্মদ ইসমাঈল আকন্দ ছিলেন সর্বজনমান্য ব্যক্তিত্ব। মার নাম জোলায়খা খাতুন।

তার স্মৃতিকথামূলক পাণ্ডুলিপিতে পূর্বপুরুষদের পরিচয় প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন—তার বড়বাপ হবিবুল্লাহ আকন্দ ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে এ অঞ্চলে আসেন; তিনি নিজ হাতে কোরআন নকল করে মসজিদে মসজিদে তিলাওয়াতের জন্য রেখে দিতেন। শিক্ষাবিদ হিসেবেও তিনি খ্যাত ছিলেন। তার ছেলে আশরাফ আকন্দ ছিলেন ইসহাকের দাদা এবং বাবা ইসমাঈল আকন্দ; চাচা মৌলভি ইব্রাহিম আকন্দ ছিলেন সুফি-সাধক প্রকৃতির মানুষ। শৈশবে তিনি বৈরাটি মক্তবে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় (১৯৩৭) গালাহার গ্রামে ফুফুর বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৩৮ সালে মক্তবের সমাপনী পরীক্ষা দেন। ১৯৩৯ সালে কুমারুলী মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে এক ভিন্ন সামাজিক পরিবেশে আসেন; প্রধান শিক্ষক শচীন্দ্র চন্দ্র চক্রবর্তীর প্রেরণায় সেখানে হিন্দুপ্রধান পরিবেশে থেকেও তিনি মুসলিম পরিচয় অটুট রাখেন, যা তার গভীর মূল্যবোধ ও স্বাতন্ত্র্যচেতনার পরিচায়ক।

একই বিদ্যালয় থেকে হাজি মহসিন বৃত্তি লাভ করে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠেন এবং ছাত্রাবস্থায়ই ‘দৈনিক আনন্দবাজার’ ও ‘দৈনিক যুগান্তর’ পড়তে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। ১৯৪৫ সালে জাটিয়া উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা, ১৯৫২ সালে উচ্চমাধ্যমিক, ১৯৫৭ সালে স্নাতক এবং ১৯৭৫ সালে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

৬.

কাজজীবনে তিনি ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত কুমারুলী মধ্যবঙ্গ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন; পরবর্তী সময়ে ১৯৫৩-৫৪ সালে পাঁচালী উচ্চবিদ্যালয়, ১৯৫৭-১৯৭০ পর্যন্ত আঠারবাড়ী এমসি উচ্চবিদ্যালয়, ১৯৭২ সালে রাউলেরচর সিনিয়র আলিয়া মাদরাসার প্রধান শিক্ষক, ১৯৭২-১৯৭৫ পর্যন্ত মধুপুর বিভাগের মহাবিদ্যালয় এবং ১৯৭৭-১৯৮৭ পর্যন্ত জাটিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৮৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অবসরে নেন।

শেষ কথা

যথাযথ চর্চার অভাবে আবু ফাতেমা মুহাম্মদ ইসহাকের লেখক পরিচয় আজ বিস্মৃতপ্রায়। ত্রিশের অধিক গ্রন্থ রচনা করে গেলেও সর্বশেষ শুধু ‘নজরুল অন্বেষা’ বইটি মুদ্রিত ছিল। প্রচারণার অভাবে সে বইটিও পাঠকের কাছে সুলভ নয়।

মীর মশাররফ হোসেন, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী, মৌলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, এয়াকুব আলী চৌধুরী, এস ওয়াজেদ আলী, অধ্যক্ষ ইবরাহীম খাঁ, খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ প্রমুখ লেখক যে বাংলাদেশী সাহিত্যধারা সৃষ্টি করেছিলেন, সেই ধারারই অন্যতম যোগ্য উত্তরসূরি আবু ফাতেমা মুহাম্মদ ইসহাক। ফলে বর্তমান প্রজন্মের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি বিনির্মাণে তার পাঠ অপরিহার্য। তার অপ্রকাশিত কাজগুলো আলোর মুখ দেখলে এবং যথাযথ মূল্যায়ন হলে তবেই পূর্বসূরীদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা পূর্ণ হবে। বিস্মৃতির আড়াল থেকে এই গুণী মানুষকে আলোচনায় নিয়ে আসা আমাদের সবার দায়িত্ব। তার কর্মের সঠিক মূল্যায়ন হোক—এটাই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন