মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগে রোবোটিকস বিদ্যাচর্চা

আলজাজারির বিস্ময়কর উদ্ভাবন

মাহমুদ আহমাদ

আলজাজারির বিস্ময়কর উদ্ভাবন

আলজাজারি মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগের শ্রেষ্ঠ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। প্রায় ৮০০ বছর আগে তিনি মানবজাতির কল্যাণে অভিনভ সব যন্ত্র উদ্ভাবন করেছিলেন। বর্তমানে প্রযুক্তির অভাবনীয় উৎকর্ষ ও অগ্রগতির যুগেও তার আবিষ্কৃত যন্ত্রগুলো এখনো প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ভাগ্যবশত, পানির চাপ ও বায়ুশক্তি দ্বারা পরিচালিত অটোমেটিক মেকানিক্যাল ডিভাইসের জনক হিসেবে বিখ্যাত আল-জাজারিকে দীর্ঘদিন যথাযথভাবে আলোচনা ও বিশ্লেষণ করা হয়নি। তার উদ্ভাবিত সাইবারনেটিকসকে রোবোটিকস ও স্বয়ংক্রিয় মেকানিক্যাল ডিভাইসের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

বিজ্ঞাপন

আধুনিককালে দৈনন্দিন প্রযুক্তির অনেক প্রোটোটাইপের উৎস হিসেবে আল-জাজারির আবিষ্কারগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফোর-স্ট্রোক ইঞ্জিন, গিয়ার সিস্টেম, ক্র্যাঙ্কশ্যাফট, হাইড্রোলিক ও নিউম্যাটিক সিস্টেম, অটোমাটা এবং কন্ট্রোল সিস্টেম—এসবের মূল ধারণা মূলত তারই উদ্ভাবন। সেই যুগে নির্ভুল গণনার সুযোগ সীমিত থাকা সত্ত্বেও এতসব জটিল ও সফল আবিষ্কার তার প্রখর মেধা ও অদম্য আগ্রহের উজ্জ্বল প্রমাণ বহন করে।

আল-জাজারির অমর কীর্তি তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিতাব ফি মারিফাতিল হিয়ালিল হান্দাসিয়া’ (كتاب في معرفة الحيل الهندسية)। এই গ্রন্থে তিনি প্রায় ১০০টি মেকানিক্যাল ডিভাইসের বিস্তারিত বর্ণনা, গঠনপ্রণালি ও নির্মাণপদ্ধতি সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেছেন। প্রতিটি যন্ত্রের সঙ্গে সুন্দর চিত্র, নকশা ও ধাপে ধাপে নির্দেশনা সংযুক্ত থাকায় গ্রন্থটি একটি ব্যবহারিক প্রকৌশল গাইডবুকের রূপ লাভ করেছে।

রোবোটিকস ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ধারণা লিওনার্দো দা ভিঞ্চির প্রায় ২৫০ বছর আগেই আল-জাজারি অসাধারণ কিছু উদাহরণসহ উপস্থাপন করেছিলেন। প্রযুক্তির আবিষ্কার, উদ্ভাবন ও উন্নয়নের ইতিহাসে তিনি এক প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব।

ক্র্যাঙ্কশ্যাফট ও ক্র্যাঙ্ক-স্লাইডার মেকানিজম

আলজাজারি সর্বপ্রথম ক্র্যাঙ্কশ্যাফট উদ্ভাবন করেন। তিনি ক্র্যাঙ্ক ও সংযোগকারী রডের একটি প্রক্রিয়া ব্যবহার করে এটিকে দ্বি-সিলিন্ডারযুক্ত পানির উত্তোলন যন্ত্রে প্রয়োগ করেছিলেন। আল-জাজারির সংজ্ঞা অনুযায়ী, ক্র্যাঙ্কশ্যাফট ঘূর্ণায়মান গতিকে সরলরৈখিক পুনরাবৃত্তিশীল গতিতে রূপান্তর করে। আধুনিক বিভিন্ন যন্ত্র, যেমন বাষ্প ইঞ্জিন, তাপ ইঞ্জিন ও রোবোটিক সিস্টেমের মৌলিক কাঠামো হিসেবে এটিকে বিবেচনা করা হয়।

সেগমেন্টাল গিয়ার

পূর্ণ বৃত্তাকার দাঁতযুক্ত একটি চাকার অংশবিশেষ (খণ্ডাংশ) নিয়ে গঠিত এবং দাঁতযুক্ত চাকার সঙ্গে সংযুক্ত থেকে পারস্পরিকভাবে পুনরাবৃত্তিমূলক (reciprocating) গতির আদান-প্রদানের সক্ষমতাসম্পন্ন যন্ত্র সেগমেন্টাল গিয়ার। আল-জাজারির পানির উত্তোলনযন্ত্রে নিপুণভাবে সেগমেন্টাল গিয়ার ব্যবহার করা হয়েছে। ইউরোপে চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের আগে যে গিয়ার প্রযুক্তি দেখা যায়, তার তুলনায় এটা ছিল অনেক সরল।

সাকিয়া চেইন পাম্প

১২০৬ সালে আল-জাজারি পানির উত্তোলনের পাম্প উদ্ভাবন করেছিলেন। তিনি ভালভ ও আগা-গোড়া চলনশীল (reciprocating) পিস্টনসহ দ্বিমুখী সাকশন পাম্প উদ্ভাবন করেছিলেন। আল-জাজারির সাকিয়া যন্ত্রগুলোর অংশ এই চেইন পাম্পে ক্র্যাঙ্কশ্যাফটের প্রথম ব্যবহার দেখা যায়। এই ব্যবস্থার লক্ষ্য ছিল বিঘ্নিত কার্যক্রম কমিয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি করা। পানির শক্তিতে চালিত সাকিয়া চেইন পাম্প উঁচু স্থানে পানি উত্তোলনের জন্য ব্যবহৃত হতো।

অটোমাটা (স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র)

আলজাজারির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো অটোমাটা। অটোমাটা হলো শক্তিশালী ও স্থিতিশীল যন্ত্রকাঠামো, যা যান্ত্রিক উপায়ে কোনো কার্যপ্রণালি উপস্থাপনের প্রয়োজন বা তাগিদ থেকে সৃষ্টি হয়েছে। এটা বিভিন্ন যন্ত্রে ব্যবহৃত হয়। যেমন পানিশক্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলমান ময়ূর, মানবাকৃতির রোবট, স্বয়ংক্রিয় দরজা ও জলঘড়ি। মানবাকৃতির রোবটের প্রাচীনতম প্রতিরূপ সৃষ্টির কৃতিত্বও আল-জাজারির।

তার নির্মিত অটোমাটনের একটি ছিল স্বয়ংক্রিয় নৌকা। সেখানে চারজন স্বয়ংক্রিয় সংগীতশিল্পী থাকত। তারা হ্রদের ওপর ভেসে অতিথিদের বিনোদন দিত। পানিশক্তিতে চালিত এই অটোমাটা ইউরোপের জটিল জলঘড়ির আদিরূপ হিসেবে বিবেচিত। অটোমাটা ব্যবহার করে তিনি বিভিন্ন ধরনের জলঘড়ি ও মোমবাতি ঘড়ি নির্মাণ করেন। তার উদ্ভাবিত ‘হাতিজলঘড়ি’ মধ্যযুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হিসেবে পরিচিত।

সাইবারনেটিকস

সাইবারনেটিকস হলো নিয়ন্ত্রণ ও যোগাযোগের বিজ্ঞান। ১৯৪৮ সালে নরবার্ট উইনার এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। এটি প্রাণী ও যন্ত্রের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এবং নিয়ন্ত্রণের উপায় নিয়ে গবেষণা করে। এর মূল লক্ষ্য হলো—সিস্টেমগুলোকে জীবন্ত প্রাণীর মতো করে সঠিক লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করা।

এটি আন্তঃবিষয়ক বিজ্ঞান। গণিত (mathematics), নিয়ন্ত্রণ (control), যোগাযোগ (communication), শারীরবিদ্যা (physiology) প্রভৃতি অনেক বিষয় এর সঙ্গে জড়িত। আজকের রোবোটিকস, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ও ইলেকট্রনিকস প্রযুক্তির অনেক কিছুই সাইবারনেটিকস থেকে উদ্ভূত।

যদিও বিশ্ব সাইবারনেটিকসের কথা উইনারের কাছ থেকে শুনেছে, কিন্তু প্রায় ৮০০ বছর আগে আল-জাজারি (১২০৬ সাল) এই বিজ্ঞানের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন। তিনি পানির শক্তি ও চাপ ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র তৈরি করেন। তার যন্ত্রগুলোয় ভারসাম্য, ফিডব্যাক ও হাইড্রো-মেকানিক্যাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল, যা আজকের সাইবারনেটিকস ও রোবোটিকসের অনেক ধারণার সঙ্গে মিলে যায়।

পানি উত্তোলনের যন্ত্র

প্রাচীনকালে মানুষ হাত বা বালতির মাধ্যমে কূপ ও নদী থেকে পানি তুলে দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করত। এতে অনেক পরিশ্রম ও কষ্ট হতো। আল-জাজারি এই কাজ সহজ করতে ১২০৬ সালে পাঁচটি উন্নত পানি তোলার যন্ত্র আবিষ্কার করেন। তার আবিষ্কৃত যন্ত্রগুলো ছিল অত্যন্ত নিখুঁত। আল-জাজারির এসব আবিষ্কার আজকের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভিত্তি। অনেকে মনে করেন, দুই-স্ট্রোক পিস্টন ২০ শতকের আবিষ্কার। কিন্তু আল-জাজারি ১২ শতকে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলেন। তিনি দুই সিলিন্ডারবিশিষ্ট একটি দুই-স্ট্রোক সাকশন পাম্প আবিষ্কার করেছিলেন।

আলজাজারি প্রথমবারের মতো সাকশন পাইপ, ডাবল-অ্যাকটিং পাম্প, ক্র্যাঙ্কশ্যাফট ও কানেক্টিং রডের মতো উপাদান ব্যবহার করেন। পুরো ব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়—কোনো মানুষের শ্রম এতে লাগত না।

আলজাজারি বিজ্ঞানকে কী দিয়েছেন

১২ শতকের মহান বিজ্ঞানী আল-জাজারি হলেন রোবোটিকস ও সাইবারনেটিকসের জনক। তিনি পানি ও বাতাসের চাপের শক্তি ব্যবহার করে আধুনিক প্রযুক্তিতে অসামান্য অবদান রেখেছেন। তিনিই প্রথম সেগমেন্টাল গিয়ার ও হাইড্রোলিক ব্যবস্থা তৈরি করেন। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির অনেক আগে জন্ম নেওয়া আল-জাজারি যন্ত্রগুলোয় নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য ব্যবস্থা ব্যবহার করে সাইবারনেটিকসের পথিকৃৎ হয়ে ওঠেন।

তার অন্যতম আবিষ্কার হলো—স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র, রোবট ও হাইড্রো-মেকানিক্যাল সিস্টেম; সাইবারনেটিকসের উন্নয়ন; পানির চাপ, প্রবাহের হার ও ভরকেন্দ্রের স্থানান্তর ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র উদ্ভাবন; ক্র্যাঙ্কশ্যাফট ও পিস্টন ব্যবহার; গিয়ারের সাহায্যে গতির দিক উল্লম্ব থেকে অনুভূমিক পরিবর্তন; সাকশন পাইপ, ডাবল-অ্যাকটিং পাম্প এবং ডাবল-সিলিন্ডার পিস্টন পাম্প উদ্ভাবন প্রভৃতি।

(মাহমুত দিরিক-এর আর্টিকেল অবলম্বনে)

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন