সালমা আল-খাদরা জাইয়ুসি
বাগদাদ
হে বাগদাদ, হে আমার স্মৃতিকাতরতার হিরণ্ময় দ্যুতি,
কী হলো আমার—কেন তোমায় এই জলভরা চোখে দুবার দেখছি?
একবার প্রেমময়... আর পরক্ষণেই রক্তভেজা;
যে-রক্ত আজ বয়ে চলেছে তোমার ভারাক্রান্ত দুই তীরে।
হে বাগদাদ, ওরা কতবার সৌন্দর্যকে জবাই করেছে, তবু তুমি মরনি;
বরং যুদ্ধের সব যন্ত্রণা তুচ্ছ করে তুমি বারবার জেগে উঠেছ,
ঠিক যেন এক দুর্দম বিশ্বাসের মতো।
অচেনা পথিকের গান
আমি এই পথঘাটে এক অচেনা পথিক, হেঁটে চলি অবিরাম,
অথচ আমার হৃদয়ে বয়ে বেড়াই এমন স্বদেশ, যা দেখা যায় না।
সব দেশই আজ আমার সামনে প্রসারিত, আমি তাদেরই মাঝে আছি,
তবু খুঁজে পাই না সেই ঘর, যার তরে আমার এই ব্যাকুলতা।
শূন্যতার নৈঃশব্দে আমি বসবাস করি,
আর নিজেকে শুধাই—পাব কি এমন কোনো দিগন্ত,
যা আমায় ফিরিয়ে দেবে কান্নার অধিকার?

সালমা আল-খাদরা জাইয়ুসি (১৯২৬-২০২৩) ছিলেন একাধারে ফিলিস্তিনি কবি, সমালোচক, অনুবাদক এবং আধুনিক আরবি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত। আরব ও পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধন-রচনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সালমা আল-খাদরার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বই : আল-আওদাহ মিন আন-নাবঅিল হালিম (১৯৬০) তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ, যেখানে তার ব্যক্তিগত ও জাতীয় অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে; Trends and Movements in Modern Arabic Poetry (১৯৭৭, দুই খণ্ড), Modern Arabic Poetry: An Anthology (১৯৮৭), তার সম্পাদিত আধুনিক আরবি কবিতার সুবিশাল সংকলন; The Literature of Modern Arabia: An Anthology (১৯৮৮), আরব উপদ্বীপের সমসাময়িক সাহিত্য নিয়ে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ; Anthology of Modern Palestinian Literature (১৯৯২), ফিলিস্তিনি সাহিত্যের ওপর তার একটি জনপ্রিয় আকর গ্রন্থ; The Legacy of Muslim Spain (১৯৯২), আন্দালুসিয়ায় মুসলিম শাসনামলের সংস্কৃতি ও ইতিহাস নিয়ে দুই খণ্ডের একটি অসাধারণ গবেষণাগ্রন্থ।
মে যিয়াদাহ
চোখ
মুখমণ্ডলে প্রজ্বলিত ওই নয়নতারাগুলো—
যেন কোমল আঁধার ও রুপোলি আলোর মিশ্রণে গড়া এক জাদুকরী কবচ।
চোখের পাতা ও পল্লবের ঢেউ-খেলা ওই জলরাশি—
যেন শুভ্র পপলার বৃক্ষরাজি আর সৈকতে ঘেরা একটি হ্রদ।
চোখ—সেই চোখ কি তোমাকে বিস্ময়ে বিমূঢ় করে না?
তাদের নিজস্ব স্বপ্ন নিয়ে ওই ধূসর চোখগুলো।
তাদের বৈচিত্র্য নিয়ে ওই নীল চোখগুলো।
তাদের মিষ্টতা নিয়ে ওই পিঙ্গল মধু-রঙা চোখগুলো।
তাদের প্রবল আকর্ষণ নিয়ে ওই বাদামি চোখগুলো।
আর ওই কৃষ্ণবর্ণ গভীর চোখগুলো—যাতে পর্যায়ক্রমে খেলা করে শক্তি ও মাধুর্যের মায়াবী আবেশ।

মে যিয়াদাহ (১৮৮৬-১৯৪১) ছিলেন একজন বিশিষ্ট আরব সাহিত্যিক ও লেখিকা। তিনি তার অসাধারণ ভাষাগত দক্ষতার জন্য সুপরিচিত ছিলেন; আরবি, ফরাসি, ইংরেজি ও জার্মানসহ মোট ৯টি ভাষায় তার পাণ্ডিত্য ছিল। এই ভাষাগত বৈচিত্র্য তার গদ্যে এক বৈশ্বিক রূপ
মে যিয়াদাহ ‘ইজিস কুবিয়া’ এবং ‘কুনার’-এর মতো ছদ্মনামে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রবন্ধ লিখতেন। তিনি নারী অধিকার রক্ষায় আপসহীন ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন যে শিক্ষা ও কর্মই হলো স্বাধীনতার দুই ডানা। তার ব্যক্তিগত জীবন ছিল অত্যন্ত ব্যতিক্রমী ও আবেগঘন; বিশেষ করে জিবরান খলিল জিবরানের সঙ্গে তার দীর্ঘ বিশ বছরের পত্রালাপ ছিল অনন্য, যদিও তাদের মধ্যে কখনো সরাসরি দেখা হয়নি। ১৯৩১ সালে জিবরানের মৃত্যু তাকে গভীর শোকে নিমজ্জিত করে।
১৯৪১ সালে কায়রোর আল-মাআদি হাসপাতালে অত্যন্ত একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতার মধ্যে কালজয়ী লেখিকার জীবনাবসান ঘটে। মে যিয়াদাহর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাহিসাত আল-বাদিয়া’, ‘সাওয়ানিহ ফাতাত’ এবং জিবরানের সঙ্গে তার চিঠিপত্রের সংকলন ‘আশ-শু’লা আয-যারকাহ (নীল স্ফুলিঙ্গ)।
আরবি থেকে বাংলা : আবদুস সাত্তার আইনী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

