এক
উঠোন ভরে প্যাঁচপেচে কাদা। পা টিপে টিপে হাঁটায় পিচপিচ শব্দ উঠছে। আঙুলের ফাঁক গলে ফিচকে কাদায় উঠোন আরো নোংরা হচ্ছে।
এসব ছাপিয়ে মানুষের কোলাহল আর গুনগুন কথা, মিনমিনে কান্না বাড়ির পরিবেশকে ঘোলাটে করে ফেলেছে। পিঁপড়ের মতো ঢুকছে মেয়েমানুষ। মাঝে মাঝে ‘ওরে আল্লারে’ বলে কেঁদে উঠছে মজিদের বউ নুরবানু।
গতকাল থেকে মজিদ মিয়া যা যা করেছে, সব ইতিহাস তুলে বিলাপ করছে। মজিদ তার আশি বছরের অসমাপ্ত জীবন নিয়ে হাঁ করে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। আশেপাশে হুড়োহুড়ি ভিড়। সবার দৃষ্টি মজিদের মুখের ওপর হুমড়ি। দু-দুবার চোখের পাতা চেপে দেওয়ার পরেও ধীরে ধীরে তা খুলে গেছে।
কেউ কেউ বুকের ওপর কান পেতে শুনছে বেঁচে আছে কি না। কেউই সুবিধা করে বলতে পারছে না মজিদ বেঁচে আছে কি না। হাত টিপে নাড়ি দেখার চেষ্টা করছে কেউ কেউ।
রাত-দিন এক করে ফিটফিটে বৃষ্টি পড়ে চলেছে। পাড়ার ছেলে ফরিদ এমন একটা ভাব করছে যেন, ডাক্তারির অনেক কিছু সে জানে। সে বুকে কান দিয়ে একবার ধ্বক শব্দ শুনে বলে উঠেছিল, ‘বাইচ্যা আছেরে, মেডিকেলে লিতে হবে।’ এ কথা শোনার পর বিলাপ হঠাৎ করে থমকে গেলেও বিশ্বাসের দোলাচলে একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল।
এমন সময় পশ্চিমপাড়ার কম্পাউন্ডার নুরুলকে ছাতার সাপোর্ট দিয়ে নিয়ে এলো বজলু। সবাইকে ‘হট হট’ করে জায়গা করে দিতে হলো। নুরুল গলায় হাত চেপে কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করল। তার কাছে মজিদের এই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ যেন ধাঁধায় ফেলে দিল।
শরীরের বেশি ভাগ ঠান্ডা হয়ে এলেও একটু একটু গরম ভাব আছে। প্রেশার মাপার যন্ত্রটায় ফুসফুস করে বাতাস দিয়ে প্রেশার মাপার সময় মনে হলো, দু-একবার ধক ধক শব্দ উঠছে। কিন্তু কথাবার্তা আর বিলাপের কারণে ব্যাপারটা ধরতে পারল না। নুরুল আশেপাশে দেখল, তার মেশিনের দিকে হুমড়ি খাওয়া দশ-পনেরো জন। কষে ধমকে উঠল বজলু। ‘কেউ কথা বুলবানা, কান্দন বন্ধ কর। আগে মরতে দেও। মজিদ এখনো মরেনি।’ তার ধমককে অনুসরণ করে একে একে ধমক চলতে থাকল। তারপর আবার প্রেশার মাপার মেশিনে ফসফস করে বাতাস ঢুকিয়ে দেখার চেষ্টা করল নুরুল। শ্বাস ফেলে বলল, ‘প্রেশার এত লো যে বেঁচে আছে কি না বুঝতে পারছি না। মুখে পানি দ্যেও তো।’ প্রথম থেকেই মজিদের মুখে চামচে করে শরবত দেওয়া হচ্ছিল। এবারও তার হাঁ-করা মুখে আরেক চামচ শরবত দেওয়া হলো। সবাই ভালো করে দেখল শরবত ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে, যদিও একবারও ঢোঁক গিলল না। সবার মধ্যে এমন একটা ভাব, ঢোঁক গিললেই বেঁচে আছে বলে সবাই মজিদের জানটা চেপে ধরবে।
নুরুল বুঝল সামান্য হলেও মজিদের জীবনের স্পন্দন চলছে। বজলু বলল, ‘তাহলে ভ্যান ডাকি হাসপাতালে লিতে হবে।’
নুরুল বজলুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মজিদের শরীরের যা অবস্থা নাড়াচাড়া করা যাবে না, যেমন আছে তেমন চুপচাপ রেখে দাও। নাড়াচাড়া করতে গেলে সব শেষ।’
বজলু বলল, ‘হাত-পা ঠান্ডা, আমার তো মুনে হচে চাচা মইরে গেলছে। মজিদ চাচা নাই।’
নুরুল জিজ্ঞেস করল, ‘নজর আলী কই?’ মজিদের মেয়ে চেঁচিয়ে বলল, ‘ভাই সকালে দুকানে গেলছে।’—তোমরা কুনু কান্নাকাটি করবা না। চিল্লাচিল্লি বন্ধ। ধমকে দিয়ে নুরুল স্যালাইন লাগাতে শুরু করল, তাতে লোকজনের মধ্যে কিছুটা বিশ্বাস ফিরে এলো যে, মজিদ এখনো জীবিত।
এরই মধ্যে নজর আলী ভয়াবহ বিলাপ করে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল মজিদের বুকে। যুবকেরা তাকে টেনে নিয়ে গেল উঠোনে। স্যালাইনের নল গেল ছিটকে। ছুটে এসে আবারও হুমড়ি খেয়ে পড়ছে নজর। নুরুল কম্পাউন্ডার মাথায় হাত দিয়ে ‘হায় আল্লাহ’ বলে বসে পড়ল।
দুই
নজর আলী সকালে পান্তা খেয়ে গিয়েছিল দোকানে। মজিদ বারান্দায় বসে বৃষ্টির গতিবিধি বুঝছিল। এমন সময় হঠাৎ মজিদের মনে হয়েছিল বৃষ্টি যেন তার গায়ে, কলিজার মধ্যে, চোখে-মুখে এবং নাড়িভুঁড়িতে ঢুকে যাচ্ছে। এ অবস্থায় তার চোখে সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল। তারপর ধীরে ধপ করে শুয়ে পড়ল। মজিদের বউ হেঁশেলে থালাবাসন ধুতে ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ শব্দ শুনে দেখল মজিদ শুয়ে পড়েছে। সঙ্গে সঙ্গে বিলাপ শুরু। সেই বিলাপ পাড়ার আসমান-জমিনে পৌঁছে গিয়েছিল। মানুষেরা ‘হায় হায়’ করে, ‘কী হলো, কী হলো’ বলে ছুটে এসেছে।
তিন
নুরুল বিরক্ত হয়ে আবারও স্যালাইনের নল লাগাল। খেয়ালে রাখল স্যালাইন পানি শরীরে নিচ্ছে কি না। খুব ধীরে হলেও শরীরে স্যালাইন যাচ্ছে। কিন্তু তার মাথার মধ্যে মজিদের বেঁচে থাকা না থাকা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা ঘুরপাক খাচ্ছে। স্যালাইন চলল সারা দিন। মজিদ আর বেঁচে নেই, সে বিশ্বাসই গাঁয়ের বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে প্রচার-প্রসার লাভ করল।
নজর আলী জ্ঞান ফিরে আবারও ধেয়ে আসছে। তাকে বোঝানো যাচ্ছে না যে তার বাপ এখনো জীবিত। অনবরত শক্তি প্রয়োগ করে ছুটে আসা নজর আলী একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ল। লোকজনের ভিড়ভাট্টাও কমে গেল। আবদুল মজিদের মৃত্যুর ঘোষণা নুরুল দেয়নি, তবুও এ পাড়া থেকে ও পাড়া মজিদের মৃত্যুর খবরই প্রচার হলো। নুরুল ঝিম ধরে বসে ভাবে, মজিদের এখনও জান আছে। বড় ডাক্তার দেখাতে পারলে ভালো হতো। সকাল পর্যন্ত যদি টিকে, তো কাল সকালে উপজেলা হাসপাতালে নিতে হবে। নজর আলী এখন শান্ত হয়েছে। তার বাবা বেঁচে আছে কি না মাঝে মাঝে বুকে কান দিয়ে ধুকপুকুনি শোনার চেষ্টা করছে।
কিছু একটা ঘড়ঘড় ঢিপঢিপ শব্দ উঠছে। আবার হাত দিয়ে নিশ্বাস পরীক্ষা করছে, এরই মধ্যে অন্ধকার রাত নিয়ে এল। জাগতে জাগতে ঘুমের ঘোরে নেতিয়ে পড়ল আত্মীয়স্বজন প্রায় সবাই। শুধু চোখের পাতা টান করে জেগে রইল মজিদের বউ।
সকাল সকাল বজলু উপজেলা ডাক্তারকে মোটরসাইকেলে করে হাজির করল। ডাক্তার খুব বিরক্ত। সকাল সকাল বজলু টেনে এনেছে। সে বজলুকে ভালোবাসে বলে আসা, বজলুকে ‘না’ বলতে পারেনি। ডাক্তার ঘুম ঘুম চোখ নিয়ে প্রেশার মাপা যন্ত্রটায় চেপে চেপে বাতাস দিয়ে শুনল। প্রেশার আছে, একেবারে বাঁচা-মরার কাছাকাছি। ফস করে নিঃশ্বাস ফেলে ডাক্তার বলল, ‘চাচার তো বাঁচা-মরা অবস্থা। তো এখন কী করবা? হাসপাতালে নিবা? নিলে শহরে নিতে হবে।’ নুরুল বলল, ‘আপনি যা মনে করেন।’ ডাক্তার বলল, ‘নড়াচড়া করলে তো কিছু একটা হয়ে যেতে পারে। যদি বল, আমি একটা ইনজেকশন পুশ করে দেখতে পারি।’ নুরুল, বজলু, নজর আলী মুখ চাওয়াচাওয়ি করে নজর বলল, ‘শুন্যাছি ইঞ্জেকশন দিলেই মানুষ মইরা যায়।’ নুরুল বোঝাল যে, তোমার বাপের বুকে যে ধুকপুকানি আছে, ইনজেকশন দিলে সেট্যা বেড়ে যাবে। তখন আরও তাজা হবে। নজর অনিচ্ছা সত্ত্বেও বলল, ‘দেখেন আপনারা যা ভালো মুনে করেন।’ এরপর ডাক্তার স্যালাইনের মধ্যে ইনজেকশন পুশ করল। নুরুল আর ডাক্তার বাইরে গিয়ে দুজন ফুসুরফুসুর করে কী সব কথা বলল; শেষে বজলু মোটরসাইকেল করে ডাক্তারকে নিয়ে উধাও হলো।
চার
আবদুল মজিদের অনেকক্ষণ কোনো জ্ঞান ছিল না। কিন্তু যখন সে নিজেকে আবিষ্কার করল, দেখল সে একটা জঙ্গলের পাশে মাঠের ধারে শুয়ে আছে। মজিদ তার শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখল—ভরা যৌবন। সবুজ ঘাসের মাঠের পাশে শুয়ে আছে। মজিদ দেখল মাইলের পর মাইল মাঠ। তার দূরে হালকা গাছপালার পেছনে শুভ্র সোনালি অট্টালিকার শহর। সেখান থেকে যেন একটা সুগন্ধি বাতাস বয়ে এসে শরীরে ঢুকে যাচ্ছে।
মজিদ শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে দৌড়াতে লাগল। শহরের টান মজিদকে দৌড়াতে বাধ্য করছে। দৌড়াচ্ছে—দৌড়াচ্ছে—দৌড়াচ্ছে। মাঠ শেষ হয় না। মজিদ মনে মনে পণ করেছে যেন তাকে শহরেই যেতে হবে। কিন্তু মাঠ আর শেষ হয় না। শহরের দূরত্ব যেন কোনোমতেই কমছে না। দূর থেকে দেখলে কাছেই মনে হয়, এখনো সে ক্লান্ত হয়নি। শরীরের তাগিদ আছে। তাই নতুন উদ্যমে মজিদ দৌড়ে চলেছে। দৌড়াতে তার ভালোই লাগছে, কিন্তু শহরটা কেন যেন দূরে সরে যাচ্ছিল। এবার সে দাঁড়িয়ে হাঁপ ছাড়ে। তারপর ভাবে, হয়তো অনেকখানি চলে এসেছে। তাই আবার দৌড় দেয়। এবার সে বুঝতে পারে সে শূন্যে ভাসছে। হঠাৎ ক্লান্ত এবং বিধ্বস্ত মনে হলো। আপন মনে সবুজ ঘাসের কার্পেটে নেমে এল। ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে মজিদ শুয়ে পড়ল। হঠাৎ খেয়াল হলো, যেখান থেকে সে দৌড় শুরু করেছিল, ঠিক সেখানেই পড়ে আছে। বুকের মধ্যে হাহাকার করে উঠল। তারপর দাঁড়িয়ে দেখল যেখানে সোনার শহর ছিল, ঠিক সেখানেই আছে। পেছন ফিরে দেখল একটা গাছের নিচে এক বুড়ো বসে আছে। পরনে সাদা আলখাল্লা। মাথায় পাগড়ি।
মজিদ লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দেখল বুড়ো খাতায় কী যেন লিখছে।
বুড়োর সামনে গাছ থেকে একটি পাতা এসে পড়ছে, সে পাতায় লেখা নাম খাতায় লিপিবদ্ধ করছে। মজিদ সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কে, আর আমিই বা কোথায়?’ লোকটা হাঁ করে মুখের দিকে তাকিয়ে, রোশনাই হাসি হেসে বলল, ‘তুই চলে এসেছিস? দাঁড়া’ বলে পকেটে হাত দিয়ে কী যেন বের করে। বলে, ‘লে ধর।’ মজিদ হাতের তালু পেতে গ্রহণ করে! আলখাল্লা বুড়ো বলে, ‘মুষ্টিবদ্ধ কর, তারপর চলে যা।’
পাঁচ
নুরুল শোকে পাওয়া লোকগুলোর সঙ্গে খোশগল্প জমিয়ে তুলেছিল। কেননা আজ দুদিন হতে চলল মজিদের সাড়াশব্দ নাই। তবে সবাই বুঝে ফেলেছে মজিদ এখনো মরেনি, তবে মরবে।
হঠাৎ মৃত মানুষের জেগে ওঠার মতো সবাই ভীত হয়ে চমকে উঠল। তাকিয়ে দেখল মজিদের দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেছে। শরীর কাঁপছে বোঝা যায়। মজিদের গায়ে হাত দিয়ে দেখল নুরুল। গায়ে গরম চলে এসেছে। মজিদের বউ হঠাৎ বিলাপের সুরে চিৎকার করে বলল, ‘বুঝি জান কবজ হছে গো।’ নজর আলী ঢুলছিল, সেও চিৎকার করে উঠল, ‘বাপজান গো!’
নুরুল হাসিমুখে সবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মজিদ চাচার জ্ঞান ফিরছে।’ হঠাৎ শোকের বিলাপ থামিয়ে সুখের বিলাপ শুরু করল মজিদের বউ। পাড়ার লোকজন এসে দেখল মজিদ তাকাচ্ছে।
ছয়
মজিদের জ্ঞান ফেরার পর সে তার মুষ্টিবদ্ধ হাত খুলে দেখে নিয়েছিল, তারপর আবার কঠিন মুষ্টি গেড়ে শুয়ে থাকল।
মজিদ দেখেছে, তার হাতের তালুতে তিনটি চালের দানা।
তারপর এই গল্প শেষ হয়েছিল আরও তিন বছর পর।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

