ফাইট্টা ফাইট্টা রইছে যত
খালা-বিল আর গাঙ,
মেঘ বিনে ঝইরা পড়ে
আমার সোনা ধান।
এই লাইন দুটো পুরো গানের মধ্যে সবচেয়ে নির্দিষ্ট অংশ। আগের সব লাইনে বিপর্যয় ছিল বিমূর্ত; মানে আকাশ ভাঙছে, মাটি ফাটছে, পাখি কাঁদছে। কিন্তু এখানে প্রথমবার একটা সুনির্দিষ্ট ক্ষতির কথা এলো। মেঘ মা আসাগ সোনা ধান ঝরে পড়ছে।
‘খালা বিল আর গাঙ’—এই তিনটি শব্দ বাংলার জলবিন্যাসের একটা সম্পূর্ণ মানচিত্র। খাল হলো সবচেয়ে ছোট, মানুষের কাছের। বিল হলো মাঝারি কিন্তু বর্ষায় থইথই করে, শুকনায় তলিয়ে যায়। গাঙ হলো নদী, বাংলার প্রাণ, সভ্যতার ধমনি। এই তিনটি একসঙ্গে ‘ফাইট্টা ফাইট্টা’ থাকা মানে পুরো জলচক্রটাই ভেঙে পড়েছে। সবচেয়ে বড় থেকে সবচেয়ে ছোট, সব শেষ। কোথাও কিছু নেই।
‘ফাইট্টা ফাইট্টা’, আগে একবার বলেছিলাম এই দ্বিরুক্তির কথা। কিন্তু এখানে এটা আরো একটু ভিন্নভাবে কাজ করছে। খাল-বিল-নদী একসঙ্গে ফাটছে, মানে শুধু শুকনোর বর্ণনার ঊর্ধ্বে উঠে। একটা ধারাবাহিকতার বর্ণনা। প্রথমে খাল শুকায়, তারপর বিল, তারপর নদী। গানের মানুষটা যখন এই লাইন বলছে, তখন সে সেই ক্রমটা পেরিয়ে এসেছে। খাল শুকিয়েছে অনেক দিন আগে। বিল শুকিয়েছে। এখন গাঙও ফাটছে। এই যাত্রাটা কয়েক সপ্তাহের, হয়তো কয়েক মাসের। ধীরে ধীরে শেষ হওয়ার এই যাত্রাটা হঠাৎ আসা বিপদের চেয়ে অনেক বেশি ক্লান্তিকর। কারণ প্রতিদিন একটু একটু করে কমে এবং প্রতিদিন মানুষ ভাবে, হয়তো কাল আসবে।
মেঘ বিনে ঝইড়া পড়ে আমার সোনা ধান।
গ্রাম-বাংলায় সাধারণত সন্তানদের ‘সোনা’ বলে আপ্যায়ন করা হয়। সবচেয়ে প্রিয়, ‘সোনাধন’, ‘সোনার চান’ ইত্যাদি শব্দে সবচেয়ে প্রিয় মানুষকে সম্বোধন করা হয়। ‘সোনা ধান’ শব্দযুগলও আমাদের সেই প্রাণপ্রিয় সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যে জিনিস মানুষকে অন্ন জোগায়, তারচেয়ে প্রিয় আর কী-ই-বা হতে পারে? এই সমন্বয়টা কাকতালীয় নয়। বাংলার মানুষ যা ভালোবাসে তাকে সোনা বলে এবং যা সোনা তা তার নিজের। ‘সোনা ধান’ আর ‘সোনার বাংলা’, একই ভাষার দুটো প্রকাশ।
এই দুটো শব্দে পুরো বাংলার কৃষিসভ্যতার অহংকার আর ভালোবাসা একসঙ্গে আছে। ধানকে ‘সোনা’ বলা বাংলায় নতুন নয়। বাংলার গান, কবিতা ও প্রবাদে বারবার ধান আর সোনা একসঙ্গে আসে। কারণ ধান আক্ষরিক অর্থেই সোনা। এটা একই সঙ্গে খাদ্য, সম্পদ এবং কখনো কখনো মর্যাদা। যার গোলায় ধান আছে, তার সংসার আছে; যার ধান নেই, তার কিছুই নেই।
কিন্তু এই লাইনে সেই সোনা ধান ‘ঝইড়া পড়ছে।’ মেঘ ছাড়া। ফলার আগেই ঝরছে।
কৃষির বিপর্যয়ের বর্ণনা, কিন্তু একইসঙ্গে এটা একটা পিতামাতার ভাষা। ‘আমার সোনা ধান’, এই ‘আমার’ শব্দটা লক্ষ করলে বোঝা যায়, ধানকে সে নিজের বলছে। তার সন্তানের মতো। সে এই ধান বুনেছে, পানি দিয়েছে, পাহারা দিয়েছে এবং মেঘ না আসায়, সেই ধান বিপদে পড়েছে। একজন বাবা বা মা যখন তার সন্তানকে বিপদে দেখে এবং কিছু করতে পারে না, সেই অসহায়তার ভাষা এই বাক্যে আছে।
এই ধান যদি না ওঠে, তাহলে কী হবে? শুধু খাবার নেই, তা নয়, বীজও নেই। আগামী বছরের জন্য বীজ রাখা হয় এই বছরের ধান থেকে। ধান না হলে আগামী বছর বোনার কিছু থাকবে না। একটা খরার ক্ষতি শুধু একটা বছরের ক্ষতি নয়। পরের বছরেও গড়িয়ে যায়, এমনকি পরশুতেও। এই শৃঙ্খলটা একবার বুঝলে ‘মেঘ বিনে ঝইড়া পড়ে আমার সোনা ধান’ লাইনটার ভেতরে যে আতঙ্ক আছে সেটা অনুভব করা যায়।
মনোবিজ্ঞানে ‘anticipatory grief’ বা আগাম শোকের একটা ধারণা আছে। ক্ষতি এখনো হয়নি, কিন্তু হবে, তা নিশ্চিত জানা যাচ্ছে। সেই শোকটা অনেক সময় আসল ক্ষতির চেয়ে বেশি কষ্টের, কারণ তখন মানুষ একইসঙ্গে আশা আর হতাশা উভয়ই একসঙ্গে বহন করে। ধান ঝরছে কিন্তু এখনো সব ঝরেনি; এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে গানের মানুষটা সেই আগাম শোকটা বহন করছে, তাই সে এত জোরে ডাকছে। এখনো সময় আছে যদি এখনই মেঘ আসে, হয়তো কিছুটা বাঁচানো যাবে।
‘ঝইড়া পড়ে’, এই ক্রিয়াটায় একটা অসহায়তার শব্দ আছে। ধান নিজে থেকে পড়ছে, কেউ কাটছে না। ফলার আগেই গাছ থেকে খসে যাচ্ছে। এটাকে ফসল তোলার ব্যর্থতা বলা যায় না; বরং ফসল তোলার সুযোগটুকুও না পাওয়া। শ্রম দেওয়া হয়েছে, বীজ বোনা হয়েছে, অপেক্ষা করা হয়েছে; কিন্তু ঘরে তোলার ঠিক আগে সব শেষ হয়ে গেছে। এই ‘ঠিক আগে শেষ হওয়া'র বেদনাটাই একেবারে আলাদা। শুরুতেই না হলে হয়তো মানুষ মেনে নিতে পারত; কিন্তু এতদূর এসে, এটাও সহ্য হওয়ার নয়।
এই লাইনটার একটা নৃতাত্ত্বিক মাত্রাও আছে। বাংলায় ধান কাটার উৎসব আছে, ধান ঘরে তোলার আনন্দ আছে, নবান্ন আছে। সেই উৎসবের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে এই দৃশ্য, মেঘ বিনে ঝরে পড়া ধান। উৎসব যেখানে হওয়ার কথা, সেখানে শোক। এই উল্টোটা হওয়াটাই গানের মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভাঙছে।
এবং সবশেষে, এই লাইনের পর গানটা আবার ফিরে যায় সেই প্রার্থনায়। ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে।’ ধান ঝরে পড়ছে দেখে সে হাল ছেড়ে দেয়নি। সে আরো জোরে ডাকছে। যাকে সে ভালোবাসে, যাকে সে লালন করেছে, তার কথা এবং যে তার সোনাকে বাঁচাতে পারে, তার কাছে ছুটে যাওয়া ছাড়া আর কী পথ আছে?
হালের গরু বাইন্দা
গিরস্ত মরে কাইন্দা,
ঘরেতে নারী কান্দে
ডাইল খিচুড়ি রাইন্ধা।
পুরো গানে এই লাইন চারটা আসার আগ পর্যন্ত বিপর্যয়টা ছিল বাইরের। আকাশ ভেঙেছে, মাটি ফেটেছে, নদী শুকিয়েছে, পাখি কাঁদছে, ধান ঝরছে। সবকিছু মাঠে, আকাশে, প্রকৃতিতে। কিন্তু এই চার লাইনে প্রথমবার বিপর্যয় ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। এবং এতে পুরো গানের আবেগের মাত্রাও একটা আলাদা জায়গায় চলে গেল।
‘হালের গরু বাইন্দা’। হাল মানে লাঙল, চাষের যন্ত্র। গরু মানে সেই শক্তি যে লাঙল টানে। এই দুটো মিলে হলো বাংলার কৃষির ইঞ্জিন। এবং সেই ইঞ্জিন বাঁধা আছে, চলছে না। এই ‘বাঁধা থাকা’টা একটা পুরো অর্থনীতির থেমে যাওয়ার ছবিকে চিত্রায়িত করে।
কিন্তু গরু কেন বাঁধা? কারণ জমি শুকনো। ফাটা মাটিতে হাল চালানো যায় না। বৃষ্টি না হলে জমিতে লাঙল দেওয়ার অর্থ নেই। তাই গরু বাঁধা, হাল বাঁধা, কাজও বন্ধ। চাষি কাজের মধ্যে বাঁচে। কাজ না থাকলে সে কী করবে? সে কাঁদবে। তার বাঁচার আর যে কোনো উপায় নেই।
‘গিরস্ত মরে কাইন্দা’। সংস্কৃত ‘গৃহস্থ’ থেকে আসা শব্দ ‘গিরস্ত’। আমরা গৃহস্থ শব্দের একটা সংকীর্ণ অর্থ-ই কেবল জানি। গৃহস মানে কৃষক। না, শুধু কৃষক না। গৃহস্থ মানে সংসারী মানুষ, ঘরের কর্তা, পরিবারের কেন্দ্র। যে মানুষটার উপর সংসার নির্ভর করে, সে নিজেই কেঁদে মরে তখন। ‘মরে কাইন্দা।’ বাংলার কথ্য রূপে ‘মরে কাঁদা’ মানে এমনভাবে কাঁদা, যেটা মৃত্যুর কাছাকাছি একটা অনুভূতি। চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং ভেতর থেকে ভেঙে পড়া।
একজন কর্তার কান্না, সংসারে একটা বিশেষ ধরনের আতঙ্ক তৈরি করে। বাংলার সামাজিক কাঠামোয় কর্তা কাঁদে না বা কাঁদতে পারে না। সে ধরে রাখে, সামলায় এবং সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু যখন সে-ই কাঁদছে, তখন বোঝা যায় যে, আঁকড়ে ধরার আর কিছু নেই। সেই কান্নাটা সবচেয়ে ভারী।
এবং তারপর, ‘ঘরেতে নারী কান্দে।’
এই লাইনটায় একটা নীরব পর্দা আছে। দৃশ্যটা কল্পনা করলে দেখা যায়, বাইরে কর্তা কাঁদছে, ভেতরে নারী কাঁদছে। কিন্তু এই দুটো কান্না আলাদা। কর্তার কান্না প্রকাশ্য, মাঠে, খোলা আকাশের নিচে। নারীর কান্না ঘরের ভেতরে, চার দেয়ালের মধ্যে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা, রান্নাঘরে। বাংলার সমাজে নারীর কান্না এই রান্নাঘরেই থেকে যায়। সে বাইরে এসে আকাশের দিকে মুখ তুলে চিৎকার করতে পারে না। সে রান্না করতে করতে কাঁদে।
এবং সে কী রান্না করছে? ‘ডাইল খিচুড়ি ।’
এই দুটো শব্দে পুরো দারিদ্র্যের ছবি আছে। খিচুড়ি বাংলার সবচেয়ে সরল রান্না। চাল আর ডাল একসঙ্গে, একটা হাঁড়িতে, একটু তেল আর লবণ দিয়ে। এই রান্না করা সহজ, কারণ স্বাভাবিকভাবে অন্য খাবারের মতো এতে অনেক বেশি দক্ষতা লাগে না। এটা খেতে পারা যায়, কারণ এতে স্বাদের প্রত্যাশা রাখতে হয় না। সংসারে যখন কিছুই থাকে না, মাছ নেই, মাংস নেই, এমনকি যখন সবজিও নেই, তখন ডাল-খিচুড়িই ভরসা।
কিন্তু খিচুড়ির আরেকটা ইতিহাস আছে। বাংলায় খিচুড়ি উৎসবেও রান্না হয়। আবার বিশেষ দিনেও হয়, যেমন, ঝড়-বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি, অসুস্থ মানুষের জন্য খিচুড়ি। অর্থাৎ খিচুড়ি একইসঙ্গে উৎসবের খাবার এবং সংকটের খাবার। এই দ্বৈততাটা বাংলার দারিদ্র্যের একটা নিষ্ঠুর রসিকতা বলা চলে। যা উৎসবে খাই, তা-ই বিপদেও খাই। কারণ মাঝখানের ব্যবধান যে এতটাই কম।
‘ডাইল-খিচুড়ি রাইন্ধা’, এই ‘রাইন্ধা’ মানে রান্না করেছে, রান্না করছে। কিন্তু এই রান্নার মধ্যে একটা অসামান্য মানবিক জিনিস আছে। নারী কাঁদছে, কিন্তু রান্না করছে। এই একযোগে কাঁদা আর রান্না করা, এটা বাংলার নারীর চিরকালীন ছবি। সে থামে না, সংসার ভেঙে পড়ুক, আকাশ শুকিয়ে যাক, কর্তা কাঁদুক সে হাঁড়ি চাপাবেই। ‘দায়িত্ব’ যে শুধু তারই। কারণ, সন্ধ্যায় ঘরে মানুষ আসবে, তাদের খেতে হবে। এই দায়িত্বের বোঝাটা কান্নার চেয়ে বড়।
বাংলার কবিতায়ও এই দৃশ্যের একটা প্রতিধ্বনি আছে। ‘দুই বিঘা জমি’তে যে কৃষক তার সর্বস্ব হারিয়ে ফেলে, তার পেছনে থাকা নারীর কথা লেখা নেই। সে কিন্তু আছে। তখন হয়তো খোলা আকাশের নিচে, রান্নাঘরে আছে। কাঁদছে এবং রান্না করছে। সাহিত্যের বড় অনুপস্থিতিগুলো অনেক সময় উপস্থিতির চেয়ে বেশি কথা বলে।
এই চার লাইনে আরেকটা জিনিস ঘটছে। গানটা এখানে দুটো আলাদা স্থান তৈরি করছে। বাইরের স্থান, মাঠ, হাল, বাঁধা গরু এবং কর্তার কান্না। ভেতরের স্থান, ঘর, রান্নাঘর, নারীর কান্না এবং খিচুড়ির হাঁড়ি। এই দুটো স্থান আলাদা, কিন্তু একই বিপর্যয়ের দুটো দিক। বাইরে উৎপাদন বন্ধ, ভেতরে ন্যূনতম টিকে থাকার চেষ্টা চলছে। কর্তা পারছে না, নারী তবুও করছে। এই ‘তবুও’-র মধ্যে একটা নীরব বিপ্লব আছে।
নৃবিজ্ঞানীরা বাংলার দুর্ভিক্ষকালীন পরিবারের আচরণ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছেন, সংকটে পুরুষ প্রায়ই স্থবির হয়ে পড়ে, নারী সচল থাকে। কারণ পুরুষের পরিচয় তার কাজের সঙ্গে বাঁধা। কাজ বন্ধ হলে সে কে, এই প্রশ্নটা তাকে ভেতর থেকে ভাঙতে থাকে। নারীর পরিচয় তার যত্নের সঙ্গে বাঁধা। মানুষ বেঁচে থাকলে তার যত্নের কাজ শেষ হয় না। তাই ‘গিরস্ত মরে কাইন্দা’ আর ‘ঘরেতে নারী কান্দে ডাইল খিচুড়ি রাইন্ধা’, এই দুটো প্রতিক্রিয়া মনোবিজ্ঞানের দিক থেকেও সত্য।
এই লাইনগুলোতে আরেকটা জিনিস আছে যেটা না বললেই নয়। এখানে একটা পরিবারের পুরো দিনের ছবি আছে। কর্তা সকালে উঠে গরু নিয়ে মাঠে গেছে হাল দিতে। কিন্তু মাটি ফাটা, পানি নেই, হাল দেওয়া যাচ্ছে না। গরু বেঁধে রেখে সে বসে কাঁদছে। বাড়িতে নারী অপেক্ষা করছে, কর্তা কখন ফিরবে, কী নিয়ে ফিরবে। কিন্তু ঘরে চাল আছে, ডাল আছে, এটুকুই। তাই কান্না করতে করতে ডাল-খিচুড়ি রান্না করছে। সন্ধ্যায় দুজন একসঙ্গে থাকবে। একটা শূন্য সংসারে, একটা খিচুড়ির হাঁড়ির পাশে।
এই দৃশ্যটা পাঁচশ বছর আগেও সত্য ছিল, আজও কোথাও না কোথাও সত্য। বাংলার কোনো মাঠে আজও কোনো কর্তা বসে আছে বাঁধা গরুর পাশে। কোনো রান্নাঘরে আজও কোনো নারী খিচুড়ি নাড়ছে চোখের পানি মুছতে মুছতে।
এবং এই দৃশ্যের শেষে গানটা আবার সেই একই জায়গায় ফেরে, আল্লাহ মেঘ দে। কারণ হাল বাঁধা থাকলে, কর্তা কাঁদলে, নারী খিচুড়ি রাঁধলে, তখন একটাই পথ খোলা। আকাশের দিকে মুখ তোলা।
কপোত-কপোতী কান্দে
খোপেতে বসিয়া,
শুকনা ফুলের কলি পড়ে
ঝরিয়া ঝরিয়া।
আগের লাইনগুলোয় মানুষ ছিল মাঠে, বাইরে, খোলা আকাশের নিচে। কর্তা কাঁদছিল মাঠে, নারী কাঁদছিল রান্নাঘরে। কিন্তু এই লাইনে এসে গানটা হঠাৎ একটা ছোট্ট জায়গায় ঢুকে পড়ল। খোপে। কপোত-কপোতীর খোপে।
'খোপ’। এই শব্দটা বাংলায় একটা বিশেষ অর্থ বহন করে। খোপ মানে ঘর। পায়রার ঘর। সেই ঘর, যেটা তারা নিজেরা তৈরি করেছে, যেখানে তারা ডিম দেয়, বাচ্চা ফোটায়, আশ্রয় নেয়। পাখির কাছে খোপ মানে যা, মানুষের কাছে এসে তা হয়ে যায় সংসার।
এই খোপেতে বসে কপোত-কপোতী কাঁদছে।
পাখি সাধারণত নিরাপদ থাকলে বাসায় ফেরে। বিপদে থাকলে উড়ে বেড়ায়, খোঁজে এবং পালিয়ে বেড়ায়। কিন্তু এই পায়রা জুটি বাসায় ফিরে এসেছে এবং বাসায় বসেই কাঁদছে। এর মানে হলো, বাইরে আর যাওয়ার জায়গা নেই। পানি নেই, খাবার নেই এমনকি আশ্রয়ও নেই। তাই ঘরে ফিরে এসেছে; কিন্তু ঘরেও সমাধান নেই। তারা শুধু বসে আছে, আর কাঁদছে।
এই দৃশ্যটা মানুষের সংকটের একটা নিখুঁত রূপক। বাংলার ইতিহাসে কতবার মানুষ ঠিক এই অবস্থায় পড়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। বাইরে যাওয়ার পথ নেই, ঘরেও সমাধান নেই। শুধু ঘরের ভেতরে বসে থাকা, আর ভেতর থেকে ভাঙা। কপোত-কপোতী সেই মানুষেরই প্রতিনিধি, যারা চেষ্টা করেছে, ফিরে এসেছে এবং এখন আর করার কিছু নেই বলে কাঁদছে।
বাংলার সংস্কৃতিতে পায়রার জুটি প্রেম আর সংসারের প্রতীক। তাই, কপোত-কপোতীর অর্থ শুধু দুটো পাখি মনে করলে ভুল হবে। এর মানে, একটা সম্পর্ক, একটা পারস্পরিক নির্ভরতা। এই জুটি একসঙ্গে কাঁদছে মানে তাদের সংসারটাই কাঁদছে। একজনের কষ্ট অন্যজনের মধ্যে দিয়ে দ্বিগুণ হচ্ছে।
বাংলার কবিতায় এই যুগলের বেদনার একটা ভাষা আছে। যেমন, ‘তোমার সোনার থালায় সাজাব আজি, দুঃখের অশ্রুমালা।’
যন্ত্রণাকেও সাজিয়ে উপহার দেওয়ার এই ভঙ্গিটা বাংলার প্রেমের সাহিত্যে বারবার আসে। কপোত-কপোতীর কান্নাতেও সেই সাজানো বেদনা আছে। তারা একা কাঁদছে না, একসঙ্গে কাঁদছে। এই একসঙ্গে কাঁদাটাও এক ধরনের ভালোবাসার প্রকাশ।
মনোবিজ্ঞানে ‘co-rumination’ বলে একটা ধারণা আছে। যখন দুজন মানুষ একসঙ্গে তাদের কষ্টের কথা বলতে থাকে, একে অন্যের বেদনাকে নিশ্চিত করতে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় একদিক থেকে সান্ত্বনা আসে কারণ একা নয়। কিন্তু অন্যদিক থেকে কষ্ট আরো গাঢ় হয়। কপোত-কপোতীর এই খোপে বসে কাঁদাটা সেই প্রক্রিয়ারই একটা চিত্র।
শুকনা ফুলের কলি পড়ে,
ঝরিয়া ঝরিয়া।
পুরো গানের এই লাইনটা নিয়ে সবচেয়ে বেশিক্ষণ ভাবা যায়। ‘শুকনা ফুলের কলি’—এখানে তিনটা শব্দ পাশাপাশি আছে এবং তিনটাই একে অন্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন। ফুল মানে সৌন্দর্য, পরিপূর্ণতা। কলি মানে, যা ফোটেনি, কিন্তু যা ফোটার পথে। শুকনা মানে যা মরে গেছে, যা আর ফুটবে না। তাহলে ‘শুকনা ফুলের কলি’ মানে, যা ফোটার কথা ছিল, কিন্তু ফোটার আগেই মরে গেছে।
বাংলা ভাষার কী অসামান্য প্রয়োগ! ফুল শুকায়, ফোটার পরে। কলি শুকায়, ফোটার আগে। এই দুটো আলাদা ধরনের মৃত্যু। ফোটার পরে মৃত্যু হলো স্বাভাবিক পরিণতি; সে তার কাজ করেছে, ফুটেছে, সুন্দর হয়েছে, তারপর গেছে। কিন্তু ফোটার আগে মৃত্যু মানে, একটা অসম্পূর্ণতার মৃত্যু। সে তার একটা কাজ করতে পারেনি, সে কাউকে তার সৌন্দর্য দেখাতে পারেনি, সে কোনো ঘ্রাণ দিতে পারেনি।
এই অসম্পূর্ণতাই এই লাইনের মূল বেদনা।
বাংলার ইতিহাসে শুকনা ফুলের কলির মতো ঝরে পড়া মানুষের সংখ্যা অগণিত। ১৭৭০ সালের মন্বন্তরে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা গিয়েছিল। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে পঞ্চাশ লাখ। এই মানুষগুলো কলির মতো, ফোটার আগেই গেছে। যে শিশু হাঁটতে শিখেছিল কিন্তু কথা বলতে শেখেনি, যে কিশোর স্বপ্ন দেখছিল কিন্তু স্বপ্ন পূরণের বয়স হয়নি, যে কৃষক মাঠ চিনেছিল কিন্তু বীজ বোনার সুযোগ পায়নি—এরা সবাই শুকনা ফুলের কলি।
‘ঝরিয়া ঝরিয়া’, এই দ্বিরুক্তিতে একটা অবিরাম পতনের শব্দ আছে। একটা কলি ঝরছে না, অনেকগুলো। একের পর এক। থামছে না। একটা ঝরলে হয়তো মানুষ থামত। কিন্তু যখন ঝরতেই থাকে, তখন মানুষ অসাড় হয়ে যায়। এই অসাড়তাটাই বাংলার দুর্ভিক্ষের বর্ণনায় বারবার আসে। যখন এত মানুষ মরছে, তখন একজনের জন্য আলাদা করে কাঁদার সময় নেই।
কিন্তু এই গানের মানুষটা অসাড় হয়নি। সে গাইছে। ‘ঝরিয়া ঝরিয়া’ দেখছে এবং গাইছে। এই দেখতে পারার ক্ষমতাটাই তার মানসিকভাবে শক্ত অবস্থার প্রমাণ। প্রতিটা পতন দেখা যাচ্ছে, গোনা যাচ্ছে এবং থামানো যাচ্ছে না, তবুও অসাড় হয়নি।
বাংলার কবিতায় এই ঝরে পড়ার একটা বিখ্যাত ছবি আছে। ‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে, তব অপেক্ষায়, তব অপেক্ষায়।’ বসন্ত এসেছে অপেক্ষায়, কিন্তু সে যার জন্য অপেক্ষা করছিল সে নেই, সে ঝরে গেছে। এই অপেক্ষার মধ্যে যে শূন্যতা, শুকনা ফুলের কলি পড়ার মধ্যেও সেই একই শূন্যতা।
এই লাইন চারটার বিন্যাসটা বিশেষভাবে খেয়াল করলে দেখায় যায়, প্রথম প্রথমে জুটি পাখির দৃশ্য, তারপর তাদের ঘরে ফেরা, তারপর কান্না, তারপর কলি ঝরা। এই ক্রমটা একটা গল্পের ক্রম। পাখি বাইরে গিয়েছিল, খুঁজেছিল কিন্তু পায়নি, ফিরে এসে কাঁদছে। তাদের চারপাশে ফুলের কলি ঝরছে। এই শেষ দৃশ্যটা এত সুন্দর, এত বেদনাদায়ক!
এই লাইনগুলোর পর গানটা আবার প্রার্থনায় ফেরে। সেখানে কপোত-কপোতীর কান্না দেখা, কলি ঝরতে দেখা, এরপর আর কথা থাকে না। শুধু সেই একটাই ডাক বেরিয়ে আসে ভেতর থেকে।
‘আল্লাহ মেঘ দে।’
পুরো গানের গড়নটা নিয়ে ভাবলে একটা কাব্যিক কৌশল চোখে পড়ে। গানটা ক্রমেই জুম ইন করছে। শুরুতে আকাশ ও মাটি, অর্থাৎ মহাজাগতিক স্কেল। তারপর নদী-বিল-খাল, একটু ছোট। তারপর পাখি, আরো ছোট। তারপর দম্পতি পাখি, তার থেকেও ছোট। তারপর কূপ, একটা জায়গা। তারপর একটা ফুলের কুঁড়ি, সব সম্ভাবনার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষুদ্র, সবচেয়ে ক্ষণস্থায়ী। এই যাত্রায় একটা হৃদয়গ্রাহিতা তৈরি হয়। মহাজাগতিক বিপর্যয় যখন একটা ছোট্ট কুঁড়ির ঝরে পড়ায় পরিণত হয়, তখন সেই ছোট্ট ঘটনাটাই সবচেয়ে বড় অনুভূতি বহন করে।
এই গানটা প্রার্থনার মতো দেখতে, কিন্তু ভেতরে একটা যুক্তিও আছে। আকাশ ভেঙেছে, সাক্ষী। মাটি ফেটেছে, সাক্ষী। মেঘরাজা ঘুমাচ্ছে, সাক্ষী। নদী শুকিয়েছে, সাক্ষী। পাখি কাঁদছে, সাক্ষী। দম্পতি পাখি কূপের পাশে কাঁদছে, সাক্ষী। কুঁড়ি ঝরছে, সাক্ষী। এই সব সাক্ষী সামনে রেখে গানটা বলছে, এই অবস্থায় তুই না দিলে কে দেবে? এটা একটা অদৃশ্য আদালতে মামলা দায়ের। যে মানুষ কোনো জাগতিক আদালতে যেতে পারেনি, যার অভিযোগ শোনার কোনো জায়গা ছিল না, সে এখানে তার যুক্তি সাজিয়েছে, পুরো প্রকৃতিকে সাক্ষী করে।
মনোবিজ্ঞানে ‘learned helplessness’ বা শেখা অসহায়ত্বের ধারণা আছে। যখন মানুষ বারবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়, সে একসময় চেষ্টাই বন্ধ করে দেয়। কিন্তু এই গান সেই শেখা অসহায়ত্ব ভাঙছে। কারণ গানটা চলছে। ‘আল্লাহ মেঘ দে আল্লাহ মেঘ দে,’ এই পুনরাবৃত্তি কি শুধু সুরের প্রয়োজনে? মনে হয় না। এটা একটা মানসিক অবস্থার বর্ণনা। চরম কষ্টে মানুষ একই কথা বারবার বলে, কারণ উত্তর না আসা পর্যন্ত মস্তিষ্ক সেটাকে ছাড়তে পারে না। প্রতিটি পুনরাবৃত্তিতে একটা নতুন চেষ্টা আছে। এই চেষ্টা করতে থাকাটা নিজের ভেতরের হতাশার বিরুদ্ধে একটা প্রতিরোধ।
বলা হয়ে থাকে, বৈশাখের কাঠফাটা রোদে গ্রামীণ নারীরা উঠানে কলাগাছ পুঁতে, কলসে পানি ঢেলে, সেই কাদামাটিতে আকুতি-মিনতি করতে করতে এই গান গাইতেন। একপর্যায়ে কারো মধ্যে ভাবের সঞ্চার হতো, এবং সে বলে দিত অমুক দিন বৃষ্টি হবে। কখনো কখনো তা মিলেও যেত। এই আচারটার মধ্যে একটা নৃতাত্ত্বিক সত্য আছে। গভীর ভাবের মধ্যে মানুষের একটা স্বজ্ঞা জেগে ওঠে, যে স্বজ্ঞা প্রকৃতিকে পড়তে পারে, মাটির গন্ধে বুঝতে পারে বৃষ্টি আসছে। আধুনিক বিজ্ঞান এটাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করবে। এই আচারে সাধারণ সময়ে তৎকালীন সময়ে, যারা কম ক্ষমতাবান ছিল, যেমন নারী, দরিদ্র, তারাই কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আসতেন। প্রার্থনার সামনে সব মানুষ সমান, এই বোধ আচারে বাস্তবে রূপ পেত। যে জমিদারের দরবারে যেতে পারত না, সে খোদার দরবারে যেতে পারত।
এই গানের যাত্রাটা অদ্ভুত। বাংলার একটা খেতমাঠ থেকে এটা পৌঁছে গেছে হিন্দি সিনেমায়, পাকিস্তানের সিনেমায়। শচীন দেব বর্মণ কলকাতায় আব্বাসউদ্দিনের গান শুনেছিলেন, পরে মুম্বাইতে গিয়ে সেই প্রভাব তার সংগীতে রেখে গেছেন বলে জানা যায়। ১৯৬৫ সালে গাইড সিনেমায় এই গান ব্যবহার হয়েছিল। বাংলার মাঠের গান দিল্লির ফিল্মস্টুডিওতে পৌঁছেছে। এই ভ্রমণ সম্ভব হয়েছে, কারণ গানের ভেতরের অনুভূতিটা কোনো ভাষা বোঝে না, কোনো সীমান্ত মানে না। তৃষ্ণা সর্বজনীন। ঝরে পড়া কুঁড়ির ব্যথা সর্বজনীন।
আজকের নগর-বাঙালির কাছে বৈশাখ অন্য একটা জিনিস। হালখাতার জায়গায় এসেছে কনসার্ট, খাজনার হিসাবের জায়গায় এসেছে সেলফি। এটা দোষের নয়, এটা সময়ের স্বাভাবিক পরিবর্তন। মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম বদলে এবার বৈশাখী শোভাযাত্রা, নামের রাজনীতি চলছেই। কিন্তু এই পরিবর্তনের মধ্যে একটা জিনিস হারিয়ে গেছে যেটাকে চিনে রাখাটা দরকার। সেই মৌলিক সত্যটা। বছরের শুরু মানে, একটা অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হওয়া, একটা শূন্য থেকে শুরু করা। বাংলার কৃষক যখন বছর শুরু করত, সে জানত এই বছরটা কেমন যাবে, তা নির্ভর করবে আকাশের উপর। সেই জানার মধ্যে একটা বিনয় ছিল, একটা নির্ভরতা ছিল। সেই বিনয় এখন আমাদের উৎসবে নেই।
আমি প্রায়ই ভাবি, আমরা যখন ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে’ শুনি, তখন আমরা আসলে কী শুনি? সুর শুনি, কথা শুনি। কিন্তু সেই মানুষটার কথা ভাবি কি, যে একটা শুকনো মাঠে দাঁড়িয়ে সত্যিই এই কথাগুলো বলেছিল? সে জানত না আগামীকাল কী হবে। সে জানত না বৃষ্টি আসবে কি না। সে শুধু জানত, তার কাছে আর কোনো পথ নেই, আছে শুধু এই গানটুকুই এবং সেই গানটুকুই সে গেয়েছিল। পুরো ভক্তি দিয়ে, পুরো বিশ্বাস দিয়ে।
বৈশাখ আসে প্রতি বছর। নাম নিয়ে রাজনীতি হয়, উৎসবে বদল আসে। কিন্তু কোথাও না কোথাও, কোনো না কোনো মানুষ এখনো আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা চায়, হয়তো বৃষ্টি নয়, হয়তো অন্য কিছু। কিন্তু সেই তাকানোর ভঙ্গিটা একই। সেই অসহায়তার মধ্যেও চাইতে থাকার জিদটা একই।
আকবরের ফসলি সন থেকে আজকের বৈশাখী শোভাযাত্রা, এত বছরের এই যাত্রায় অনেক কিছু বদলেছে। কিন্তু এই গান বদলায়নি। কারণ সে গান কোনো নির্দিষ্ট আমলের নয়, কোনো রাজার নয়, কোনো সরকারের নয়। সে গান সেই মানুষটার, যে শুকনো মাঠে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে বলেছিল, ‘তুই মেঘ দে।’
প্রশ্নটা থেকে যায়, এই যে এত বছর ধরে একটা গান গাওয়া হচ্ছে, বারবার গাওয়া হচ্ছে, বদলে বদলে গাওয়া হচ্ছে, তার মানে কি এই যে, উত্তর এখনো আসেনি? নাকি এই যে, প্রশ্নটা করতে থাকাটাই আসলে উত্তর?
শুভ নববর্ষ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

