আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতা বাতিলে অসংগতির অভিযোগ

গাজী শাহনেওয়াজ

দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতা বাতিলে অসংগতির অভিযোগ

আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একই ধরনের তথ্য ও কাগজপত্রের ভিত্তিতে কোথাও প্রার্থিতা বাতিল, আবার কোথাও বৈধ ঘোষণার ঘটনায় নির্বাচনব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট মহল।

অন্তত চারজন রিটার্নিং কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

বিজ্ঞাপন

এক্ষেত্রে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ভূমিকা ও সিদ্ধান্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচন কমিশন (ইসি) অবশ্য দাবি করছে, মনোনয়নপত্র গ্রহণ বা বাতিলের ক্ষেত্রে কমিশনের কোনো হস্তক্ষেপ নেই।

ইসির মতে, রিটার্নিং কর্মকর্তারাই এক্ষেত্রে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী। তবে তাদের সিদ্ধান্তে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে আপিল কর্তৃপক্ষ হিসেবে ইসিতে অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে। সেক্ষেত্রে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে ওই প্রার্থীর প্রার্থিতা কোন যুক্তিতে অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন তার দালিলিক প্রমাণ হাজির করাতে হবে। কমিশন শুনানি করে সন্তুষ্ট হলে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়া যেতে পারে।

সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন বা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন, তবে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য বলে গণ্য হবেন।

সারা দেশে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই কার্যক্রম শেষ হয়েছে গত রোববার। এ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটেছে কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনে। যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার অভিযোগে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মাহবুবুল আলম (সালেহী)-এর মনোনয়নপত্র বাতিল করেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ।

মনোনয়ন বাতিল প্রসঙ্গে মাহবুবুল আলম সালেহী অভিযোগ করেন, আমাকে ডাকা হলেও কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে থাকলেও তা দেখানোর সুযোগ পাইনি। রিটার্নিং কর্মকর্তা শুরু থেকেই বায়াসড ছিলেন। আর সে হিসেবেই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।

এ বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা অন্নপূর্ণা দেবনাথ আমার দেশকে বলেন, প্রার্থীর দেওয়া কাগজপত্র নাগরিকত্ব ত্যাগের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ও বিশ্বাসযোগ্য নয়। তার মতে, প্রার্থী যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব পুরোপুরি ত্যাগ করতে আগ্রহী নন এবং দুটি দেশের সুবিধা নিতে চান। প্রার্থীর হলফনামায় দেওয়া তথ্যের উদ্ধৃতি করে এ রিটার্নিং অফিসার আরো জানান, তিনি এখন বাংলাদেশের নাগরিক, আগে যুক্তরাজ্যের নাগরিক ছিলেন। ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করার জন্য সম্প্রতি আবেদন করেন এ সংক্রান্ত একটা অনলাইন কপি সরবরাহ করেছেন, ‍যা প্রমাণ হিসেবে খুবই দুর্বল। এরপর তিনি পেমেন্ট কনফরমেশনের কাগজ এবং একজন ব্যারিস্টারের প্রত্যয়নপত্র দাখিল করেন। কিন্তু সেগুলো পর্যালোচনা করে কোনো বৈধ কাগজপত্র না পাওয়ায় মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়।

অন্যদিকে একই সময়ে ফেনী-৩ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আব্দুল আওয়াল মিন্টু দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগের কোনো চূড়ান্ত দালিলিক প্রমাণ ছাড়াই মনোনয়নপত্রের বৈধতা পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফেনীর রিটার্নিং কর্মকর্তা মনিরা হক আমার দেশকে জানান, প্রার্থীর হলফনামা, ই-মেইল যোগাযোগ, আইন ফার্মের লিগ্যাল মতামত ও সরকারি কৌশলীর মতামতের ভিত্তিতে প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

বৈধ করার ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছেÑজানতে চাইলে রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেন, হলফনামার ওই ঘোষণাপত্র এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকত্ব ত্যাগ করার বিষয়ে ই-মেইল যোগাযোগ এবং আবেদনের সঙ্গে তিনি দুটি ল’ ফার্মের লিগ্যাল মতামত দাখিল করেন। পাশাপাশি আমাদের সরকারি যে কৌশলী রয়েছে, তার মতামত নিয়েছি। এরপর সার্বিক বিবেচনায় তার নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি যৌক্তিক মনে হওয়ায় প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়। তবে এটা চূড়ান্ত নয়। সংক্ষুব্ধ যে কেউ ইসিতে আপিল করতে পারেন বলে জানান তিনি।

অনুরূপভাবে সাতক্ষীরা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী মনিরুজ্জামানের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগের কোনো দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। এ সিদ্ধান্তকে ‘দ্বিমুখী আচরণ’ বলে মন্তব্য করেন একই আসনের প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য এইচএম গোলাম রেজা।

তিনি বলেন, মনিরুজ্জামান ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন তার কোনো দালিলিক প্রমাণ রিটার্নিং অফিসারের সামনে হাজির করতে ব্যর্থ হন। আমি নিজে সেখানে অভিযোগ জানিয়েছিলাম। অথচ রিটার্নিং কর্মকর্তার সার্টিফাইড কপিতে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রার্থী বৈধ হওয়ার ব্যাপারে কেউ অভিযোগ করেনি। এতেই প্রমাণ হয়, সাতক্ষীরার রিটার্নিং কর্মকর্তা পক্ষপাতদুষ্ট।

একই ইস্যুতে সিলেট-১ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী এহতেশামুল হকের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার সরোয়ার আলম এ বিষয়ে বলেন, আমরা দেখতে চেয়েছিলাম, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডকুমেন্ট কিংবা নাগরিকত্ব ত্যাগের পত্র। সেটি না পাওয়ায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়।

এদিকে রিটার্নিং অফিসারদের এমন কর্মকাণ্ডে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সংগঠনটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় কোনো কোনো রিটার্নিং অফিসারের কর্মকাণ্ডে উদ্দেশ্যমূলক ও বৈষম্যমূলক চিত্র দেখা যাচ্ছে। কোনো একটি মহলের ইন্ধনে এসব করা হচ্ছে বলে আমাদের মনে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ হবে কি নাÑএ প্রশ্ন দেশবাসীর সামনে বড় হয়ে দাঁড়াবে। তিনি তুচ্ছ অজুহাতে বাতিল হওয়া সব প্রার্থীর মনোনয়ন অবিলম্বে বৈধ ঘোষণার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবদুল রহমানেল মাছউদ আমার দেশকে বলেন, আমরা আপিল কর্তৃপক্ষ। কেস টু কেস ভিত্তিতে বিষয়গুলো বিচার হয়। সব জায়গায় একই সিদ্ধান্ত হবে—এমন নয়। আপিল এলে শুনানির পরই প্রকৃত অবস্থান জানা যাবে।

উল্লেখ্য, ৫ থেকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। আপিলের শুনানি অনুষ্ঠিত হবে ১২ থেকে ১৮ জানুয়ারির মধ্যে। শুনানিতে দ্বৈত নাগরিকত্বের অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেলে যেকোনো প্রার্থীর বৈধতা বাতিল করার এখতিয়ার রয়েছে নির্বাচন কমিশনের।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন