দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিয়ে চলমান সংকট মোকাবিলায় ভোক্তা, ব্যবসায়ী, খাত বিশেষজ্ঞ ও নীতি বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোকে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন সরকারের নীতি নির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, আমদানি নির্ভর নীতি দিয়ে চলমান সংকট পুরোমাত্রায় কাটানো সম্ভব নয়। এতে সাময়িক সুবিধা মিললে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর জোর দিতে হবে।
মঙ্গলবার রাজধানীর একটি মিলনায়তনে ‘জ্বালানি খাতের সংকট: সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ (এফইআরবি) এ সেমিনারের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম, ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী, বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত প্রমুখ আলোচনা করেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন এফইআরবির চেয়ারম্যান এম আজিজুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন এফইআরবির নির্বাহী পরিচালক সেরাজুল ইসলাম সিরাজ। এতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সরকারের নীতিনির্ধারক, বেসরকারি জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, সরকার রুফটপ সোলারে আগ্রাসীভাবে এগোচ্ছে। বিনিয়োগবান্ধব নীতি করা হয়েছে এবং পাঁচ বছরের কর অবকাশসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন। আমি মনে করি, এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।
তিনি বলেন, ঢাকা থেকে শুরু করে সারাদেশে ক্লাস্টারভিত্তিক ও অপেক্স মডেলে রুফটপ সোলার স্থাপনে বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা হবে। সরকার এতে সরাসরি বিনিয়োগ করবে না; বেসরকারি বিনিয়োগকারীরাই কাজ করবেন।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সরকার কয়লা দিয়ে আরও বিদ্যুৎকেন্দ্র করার চিন্তা করছে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের অর্থায়ন কমে যাওয়ায় এ বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে।
জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হবে। ভারতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও জ্বালানি তেল বিক্রি করে।
একটি নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে্তএমন অভিযোগ নাকচ করে মন্ত্রী বলেন, এটা ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। একটি কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়ার জন্য আমরা এটা করছি না। যাতে সবাই ব্যবসা করতে পারে, সেজন্যই একটি নীতি তৈরি করছি।
ভোলার গ্যাস নিয়ে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে সরকার আশাবাদী বলে জানিয়েছেন ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করেছেন। এরপর আমরা অনলাইনে পেট্রোনাসের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের চেয়ারম্যানের সঙ্গেও কথা হয়েছে। আমাদের একটি টিম সেখানে গিয়েছিল এবং গতকাল ফিরে এসেছে। আমরা খুবই আশাবাদী, পেট্রোনাসের সঙ্গে কোলাবোরেশন করে ভোলার গ্যাসে কিছু করতে পারব।
শিল্পের গ্যাসসংকট প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, গ্যাসের চাপ না থাকলে শিল্পোদ্যোক্তাদের ব্যবসা ও ক্যাশ ফ্লোতে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। এতে ব্যাংকে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। আমি চাই না, আমাদের জন্য কোনো ব্যবসায়ীর নাম ব্যাংকের লাল খাতায় উঠুক।
এলএনজি সংকট নিয়ে তিনি বলেন, একটি ঘটনায় এলএনজি সরবরাহে সমস্যা তৈরি হওয়ায় সারাদেশে সংকট দেখা দিয়েছে। শিল্পকারখানা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টি সরকার গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। শিল্পের বর্তমান সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী, শিল্পোদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এ সত্য আমরা অস্বীকার করছি না। এই সংকটের দায় এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই। কারণ জনগণ ভোট দিয়ে এই সরকারকে নির্বাচিত করেছে। তাই যারা প্রতিনিয়ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে ভুগছেন, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।
বিদ্যুৎ সংকটের কারণ তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানোর মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি আমরা সরবরাহ করতে পারছি না। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে পারলে বর্তমান সংকট হতো না। দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়েও গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ প্রতি বছর দেশীয় কূপগুলোর উৎপাদন প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট করে কমছে।
এলএনজি আমদানি বাড়ানোর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে তিনি বলেন, টাকা থাকলেও রাতারাতি এলএনজি আমদানি বাড়ানো সম্ভব নয়। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই। নতুন একটি এফএসআরইউ কার্যকর করতে ৩০ থেকে ৩৬ মাস সময় লাগতে পারে। তবে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার হলো, সর্বোচ্চ চেষ্টা করে দুই বছরের কম সময়ে এটি কার্যকর করা।
প্রবন্ধে অধ্যাপক ইজাজ বলেন, ২০৩০ সালে দেশে গ্যাসের চাহিদা অন্তত ৪ হাজার ৬০০ এমএমসিএফডি হতে পারে। এ চাহিদা পূরণে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন এফএসআরইউ প্রয়োজন হবে। তবে এলএনজি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলার জোগাড় করাই বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বর্তমান জ্বালানি সংকটের তাৎক্ষণিক কোনো একক সমাধান নেই। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে। তাই গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি আমদানি, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং দ্রুত ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, বাপেক্স-নির্ভর গ্যাস অনুসন্ধান নীতি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগের ঘাটতি পূরণে আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে কাজে লাগাতে হবে। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের সম্ভাবনাময় স্তরগুলো উন্নত প্রযুক্তিতে কাজে লাগানোর পাশাপাশি ছাতক গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নতুন সরকারকে আগের ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে বিপ্লবী পরিবর্তন আনতে হবে। তা না হলে ব্যর্থতার দায় বর্তমান সরকারকেও নিতে হবে।
তিনি বলেন, এ খাতের অন্যতম বড় সমস্যা যৌক্তিক প্রাইসিং না করা। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে না পেরে বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ কিনে বেশি দামে বিক্রি করছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে আমদানি করা জ্বালানির দাম দেশীয় উৎপাদনের চেয়েও কম পড়ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেঞ্চমার্ক মূল্য ও বিনিয়োগের শর্ত স্পষ্ট করা জরুরি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

