যেকোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সমর্থন থাকাকে ব্যক্তিগতভাবে দোষের মনে করেন না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে রাজনৈতিক দলের প্রতি কর্মকর্তাদের সমর্থনের প্রতিফলন সরকারি অফিসে নয়, ব্যালট বাক্সে ঘটতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের দক্ষতা, সততা ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে এসে কোনো নাগরিক যেন কোনোভাবেই হয়রানির শিকার না হন, তা কর্মকর্তাদের নিশ্চিত করতে হবে।
রোববার সন্ধ্যা সাভারের বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) মিলনায়তনে নবীন বিসিএস কর্মকর্তাদের ৮১তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সের সনদ বিতরণ ও সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
চার মাসব্যাপী বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে শীর্ষ ১০ জনের হাতে সনদ তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। পরে নবীন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন তিনি।
নবীন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা জীবনের আরেকটি অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছেন। আমি শুরুতেই আপনাদের ভবিষ্যৎ কর্মময় জীবনের সুখ, শান্তি, স্বাচ্ছন্দ্য ও সাফল্য কামনা করি। একাডেমিক জ্ঞান অর্জনের পর ব্যবহারিক জীবনে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের কলাকৌশল আপনারা শিখেছেন। এবার সরকারি প্রশাসনে যার ওপর যে দায়িত্ব অর্পিত হচ্ছে, অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করে আপনারা যথাযথভাবে সেই দায়িত্ব পালন করবেন।’
তিনি বলেন, সরকারি প্রশাসন যত বেশি দক্ষ হবে, সরকারের কার্যক্রমও তত বেশি সফল হবে। একটি সরকারের সার্বিক সফলতার জন্য দক্ষতা, সততা ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন প্রশাসন অত্যন্ত জরুরি। এই বৈশিষ্ট্যগুলো কেবল একজন কর্মকর্তাকেই সমৃদ্ধ করে না, রাষ্ট্র এবং সরকারকেও শক্তিশালী করে।
বর্তমানে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে ২৬টি ক্যাডার রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ক্যাডারভিত্তিক কাজের ধরন ও কর্মস্থল আলাদা হতে পারে। তবে প্রত্যেকের প্রথম ও প্রধান পরিচয়—তাঁরা সবাই জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা এবং তাঁদের মূল দায়িত্ব জনগণের সেবা করা।
নাগরিক সেবায় মানবিকতার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী একটি ‘গোল্ডেন রুল’ স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘Treat others how you want to be treated.’ অর্থাৎ, অন্যের সঙ্গে তেমন আচরণ করুন, যেমন আচরণ আপনি নিজের জন্য প্রত্যাশা করেন। তিনি একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো নাগরিক একটি আবেদনপত্র নিয়ে কর্মকর্তার কাছে আসার পর সেখানে ভুল থাকলে তা শুধরে দিয়ে কোথায় ও কার কাছে গেলে তা সংশোধন করা যাবে, সেই পরামর্শ দেওয়া উচিত। দেশের মানুষ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে শুধু আদেশ-নির্দেশ নয়, আন্তরিকতা ও মানবিকতাও আশা করে।
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পদায়ন ও পদোন্নতির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রশাসনের প্রতিটি পদই রাষ্ট্র ও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, পছন্দের পদে পদায়ন বা পদোন্নতির জন্য কেউ কেউ নিজেদের পেশাগত দক্ষতা ও সততার সঙ্গে আপস করেন। দেশের যেকোনো স্থানে জনপ্রশাসনের যেকোনো পদে দায়িত্ব পালনের জন্য নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখাই চূড়ান্ত পেশাদারিত্বের পরিচায়ক। সবার মনে রাখা জরুরি, একটি সরকার যেমন চিরস্থায়ী নয়, জনপ্রশাসনের কোনো পদও কারও জন্য চিরস্থায়ী নয়।
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক অবস্থান প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেন, ‘যেকোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সমর্থন থাকা আমি ব্যক্তিগতভাবে দোষের মনে করি না। তবে যেকোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থনের প্রতিফলন ঘটতে হবে ব্যালট বাক্সে, সরকারি অফিসে নয়।’
এ সময় বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রশাসনিক দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে এবং তা প্রশাসনের মাধ্যমেই করা হচ্ছে। কারণ, জনগণ ভোট দিয়ে এই সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে এবং নির্বাচনী ইশতেহারের পক্ষে রায় দিয়েছে। ফলে এই ইশতেহার এখন জনগণের দলিল। সরকারের এই এজেন্ডা বাস্তবায়নে প্রশাসনিক কাজগুলো কর্মকর্তাদের আন্তরিকতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হবে।
প্রশাসনে দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে সরকারি সেবা আরও সহজ ও নাগরিকবান্ধব করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তারেক রহমান আশা প্রকাশ করেন, নবীন কর্মকর্তারা এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন। সবশেষে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পরিবেশ-প্রতিবেশের সুরক্ষা এবং ঘরবাড়ি ও অফিস-আদালত পরিচ্ছন্ন রাখার দিকেও বিশেষ নজর দেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


