কাশ্মীর নিয়ে ঢাকায় ভারত-পাকিস্তান মুখোমুখি

কূটনৈতিক রিপোর্টার

কাশ্মীর নিয়ে ঢাকায় ভারত-পাকিস্তান মুখোমুখি

কাশ্মীর নিয়ে আবারও মুখোমুখি ভারত-পাকিস্তান। ঘটনাটি অবশ্য ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে ঘটেনি। ঘটেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় এক সেমিনারে। সোমবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) আয়োজিত ‘রিবিল্ডিং ট্রাস্ট, রিনিউইং রিজিওনাল ইন্টিগ্রেশন: পাথওয়েজ ফর রিভাইটালাইজিং সার্ক’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করছিলেন বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর বে অব বেঙ্গল স্টাডিজের উপদেষ্টা এবং সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়া স্টাডিজের বিশিষ্ট ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার একটি মানচিত্র দেখান। তখন হঠাৎ সেমিনারে উপস্থিত ভারতীয় হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব (রাজনৈতিক ও তথ্য) পূজা কুমারী ঝা প্রতিবাদ শুরু করেন।

পূজা কুমারী বলেন, এখানে ভারতের যে মানচিত্র দেখানো হয়েছে, তা সঠিক নয়। জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই উপস্থাপিত মানচিত্রটি সঠিক নয় বলে আমি মনে করি।

বিজ্ঞাপন

এ সময় রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিম বলেন, মানচিত্রটি শুধু উপস্থাপনার সুবিধার্থে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এটি প্রকৃত সীমারেখা নির্দেশ করে না। এ সময় পূজা কুমারী ঝা বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি স্যার। জম্মু ও কাশ্মীরকে আমরা ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখি। এখানে সেটি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাই বিষয়টি উল্লেখ করতে চেয়েছি।’

এ সময় তারিক এ করিম পূজা কুমারীর উদ্দেশে বলেন, ‘আপনার পরিচয় কী?’ জবাবে পূজা কুমারী বলেন, আমার নাম পূজা কুমারী ঝা। আমি ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব। এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে রীতিমতো চুপসে যান রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিম। তিনি বলেন, ‘আপনার উপস্থাপিত বিষয়টি নথিভুক্ত করা হলো।’ এর পরপরই সেমিনারে উপস্থিত পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার মোহাম্মদ ওয়াসিফ তারিক করিমের উদ্দেশে বলেন, ‘এই ইস্যুতে আমাদের বক্তব্য রয়েছে।’ কিন্তু তারিক করিম তাকে কথা বলার কোনো সুযোগ না দিয়ে বলেন, সেমিনার শেষে বিষয়টি নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। তবে সেমিনার শেষে এ নিয়ে আর কোনো আলোচনা হয়নি।

এই ঘটনার কিছুক্ষণ পরে সেমিনার শেষ হওয়ার আগেই সেখান থেকে চলে যান পূজা কুমারী ঝা। সেমিনার শেষে বিষয়টি নিয়ে পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, আজকের সেমিনারে যা ঘটেছে তা আপনারা দেখেছেন। তাদের মানসিকতার পরিচয়ও পেয়েছেন। তিনি বলেন, ভারতের সংকীর্ণ মানসিকতার কারণে সার্কসহ আঞ্চলিক কোনো প্রতিষ্ঠানই কার্যকর হচ্ছে না। তাদের এই সংকীর্ণ মানসিকতা এই অঞ্চলের উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে প্রধান অন্তরায়।

উল্লেখ্য, ভারত-পাকিস্তান বিরোধের মূলে রয়েছে কাশ্মীর ইস্যু। দুই দেশই কাশ্মীরকে তাদের ভূমি বলে দাবি করে। যদিও কাশ্মীর এখন দুই ভাগে বিভক্ত। একটি অংশ ভারত শাসন করছে, যা জম্মু কাশ্মীর নামে পরিচিত। বাকি অংশ রয়েছে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে, যা আজাদ কাশ্মীর নামে পরিচিত। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীর নিয়ে ১৯৪৭, ১৯৬৫ ও ১৯৯৯ সালে মোট তিনটি বড় যুদ্ধ হয়েছে। এছাড়া ১৯৮৪ সালের পর থেকে সিয়াচেন হিমবাহ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বেশ কয়েকটি খণ্ড যুদ্ধ হয়েছে।

কাশ্মীর ইস্যুতে সোমবার সেমিনারের ঘটনা নিয়ে সেখানে উপস্থিত লোকজনের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়। কেউ কেউ বলেন, ভারতীয় কূটনীতিক তার আপত্তির কথা জানাতেই পারেন। তার উচিত ছিল, তারিক এ করিমের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর বিষয়টি উপস্থাপন করা। কিন্তু তিনি সেটা না করে বক্তব্য চলাকালে যেভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। অনেকে আবার তারিক এ করিমকে দিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের বিষয়েও তাদের আপত্তির কথা জানান। তারা বলেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনার ঘনিষ্ঠ ও সুবিধাভোগী এই কূটনীতিক বিআইআইএসএসের সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সুযোগ কীভাবে পায়।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনা প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় তারিক এ করিমকে চুক্তিভিত্তিতে ভারতে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেন। বিতর্কিত এই কূটনীতিক ২০১০ সালে শেখ হাসিনার দিল্লি সফর উপলক্ষে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে যে পুস্তিকা বের করা হয়েছিল, সেখানে দেওয়া তার বাণী শেষ করেছিলেন- ‘জয় হিন্দ’ বলে। এটা নিয়ে তখন ব্যাপক সমালোচনা হয়।

এএস

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন