বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বিমান চলাচল চুক্তি আধুনিকায়ন ও পুনর্নির্ধারণের লক্ষে একটি চূড়ান্ত সমঝোতার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দুদেশের মধ্যে আকাশপথে যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণ, বাংলাদেশি বিমান সংস্থাগুলোর ল্যান্ডিং ও টেক-অফের সময়সূচি (স্লট) সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন এবং হজ ও ওমরাহ যাত্রীদের ভ্রমণ মসৃণ করতে এই বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ সিভিল অ্যাভিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, চুক্তির বিষয় চূড়ান্ত করতে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নিতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আজ সোমবার সৌদি আরব সফরে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত নানা প্রযুক্তিগত সমস্যা এবং শিডিউল বিপর্যয় এড়াতে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এভিয়েশন খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিবছর হজের সময় ফ্লাইট ভোগান্তিতে ভোগে বাংলাদেশ। হজ মৌসুম এলেই বাংলাদেশি বিমান সংস্থাগুলোকে সৌদি আরবের বিমানবন্দরে অবতরণ ও উড্ডয়নের অনুমতি (স্লট) পাওয়ার জন্য বেগ পেতে হয়। শেষ মুহূর্তে স্লট বরাদ্দ পাওয়া, অনাকাঙ্ক্ষিত সময়ে ল্যান্ডিং অনুমোদন দেওয়া কিংবা আকস্মিক শিডিউল পরিবর্তনের কারণে অসংখ্য হজযাত্রীকে বিমানবন্দরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। বহু ক্ষেত্রে ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বের মতো অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে। এর প্রভাব পড়ে আশকোনা হজ ক্যাম্প থেকে শুরু করে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত। এয়ারলাইন্সগুলোকেও দিতে হয় বিপুল পরিমাণ আর্থিক খেসারত। এ অবস্থায় দুদেশের এয়ার অ্যাগ্রিমেন্ট চুক্তি হালনাগাদ করা এবং স্থায়ী স্লট সমাধান করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে দুই দেশের বিভিন্ন এয়ারলাইন্স মিলিয়ে সপ্তাহে সর্বমোট ৪৯টি ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। তবে সৌদি আরবে অবস্থানরত প্রায় অর্ধেকের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি, বছরজুড়ে চলা ওমরাহ যাত্রী এবং হজ মৌসুমের অতিরিক্ত যাত্রীর চাহিদা বিবেচনায় এই সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। চাহিদার তুলনায় টিকিট বা সিট কম থাকায় প্রতিবছর ঢাকা-সৌদি রুটে উড়োজাহাজের টিকিটের দাম আকাশচুম্বী হয়ে যায়, যার সরাসরি শিকার হন সাধারণ প্রবাসী কর্মীরা।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সপ্তাহে সর্বমোট ৮৪টি ফ্লাইট পরিচালনার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হবে। অর্থাৎ বর্তমানের ৪৯টি ফ্লাইটের সঙ্গে আরও অতিরিক্ত ৩৫টি সাপ্তাহিক ফ্লাইট যুক্ত করার জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। এটা বাস্তবায়িত হলে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে রিয়াদ, জেদ্দা, দাম্মাম ও মদিনা রুটে ফ্লাইট পরিচালনা বাড়বে, যা টিকিট সংকট কাটাতে এবং টিকিটের মূল্য স্বাভাবিক রাখতে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে।
সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এবং ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স দীর্ঘদিন ধরে তাদের পছন্দনীয় ও ব্যবসায়িকভাবে সুবিধাজনক সময়ে ল্যান্ডিং ও টেক-অফের অনুমতি পাচ্ছিল না। অনেক সময় মধ্যরাত বা অপ্রতুল সময়ে স্লট দেওয়ায় যাত্রীদের যেমন যাতায়াতে সমস্যা হতো, তেমনি দেশীয় উড্ডয়ন সংস্থাগুলোর পরিচালন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যেত। ভবিষ্যতে যেন বাংলাদেশি কোনো এয়ারলাইন্সকে এরকম অসম ও অসংগত স্লট বণ্টনের মুখে পড়তে না হয়, তা নিশ্চিত করতে এবার প্রতিনিধি দলে ভুক্তভোগী উড্ডয়ন সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের যুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিনিধি দলটির সফরকালে কেবল মন্ত্রণালয়ের টেবিলে প্রশাসনিক আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বৈঠক। সৌদি আরবের বিমানবন্দরে সরাসরি যে কর্তৃপক্ষ ল্যান্ডিং ও টেক-অফের স্লট নির্ধারণ করে থাকে, সেই সৌদি স্লট ম্যানেজমেন্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশি টিমকে মুখোমুখি টেবিলে বসিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
সেখানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের প্রতিনিধিরা সরাসরি তুলে ধরবেন তারা সৌদি বিমানবন্দরে কী ধরনের অপারেশনাল বাধা বা স্লট জটিলতার মুখে পড়েন। কেন ফ্লাইট চলাচলে দেরি হয়, কিংবা কোনো সময়ে স্লট পেলে হজ ও সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব তা বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা বলেন, বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে আকাশপথের যে যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে, তা দুই দেশের অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্ববহ। নতুন সমঝোতা স্মারক বা দ্বিপক্ষীয় বিমান চলাচল চুক্তি সই হলে তা কেবল বিমান সংস্থাসমূহের বাণিজ্যিক সুযোগই বাড়াবে না, বরং বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ শ্রমবাজারে কর্মরত প্রবাসীদের যাতায়াত অনেক সহজ ও সাশ্রয়ী করবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


