দীর্ঘ ২০ মাস লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী নাটকীয়ভাবে আটক হয়েছেন নিজ বাসা থেকেই। মঙ্গলবার ভোররাত সাড়ে ৪টার দিকে তিনি ডিবি পুলিশের হাতে আটক হন বলে জানানো হয়েছে। ছাত্রজনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে সংসদ ভবন এলাকায় নিজের সরকারি বাসভবন থেকে বেরিয়ে যান তিনি।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, তিনি এতদিন সরকারের তীক্ষ্ণ নজরদারিতে ছিলেন। অনেকটা নজরবন্দি ছিলেন। তবে সঙ্গে স্বামী-সন্তানও ছিলেন।
চব্বিশের ৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের পর লাখো মানুষ সংসদ ভবনের দিকে অগ্রসর হতে দেখে জীবন বাঁচাতে সংসদ এলাকার নিজ বাসভবন থেকে আত্মগোপনে যান শিরীন শারমিন। যাওয়ার সময় স্পিকারের জন্য বরাদ্দ গাড়ি ব্যবহার করেননি তিনি। সংসদ সচিবালয়ের পরিবহন পুল থেকে গাড়ি পাঠানো হলেও তিনি ওই গাড়ি ব্যবহার করেননি। পলায়নের সময় শিরীনের সঙ্গে ছিলেন স্বামী ও কনিষ্ঠ সন্তান। তবে সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে তিনি কোথায় গিয়েছিলেন, তা এখনো রহস্যঘেরা। অজ্ঞাত স্থানে থাকা অবস্থায়ই সরকার পতনের ২৭ দিনের মাথায় ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর স্পিকার পদ থেকে তিনি পদত্যাগ করেছেন বলে অন্তর্বর্তী সরকার জানিয়েছিল। রাষ্ট্রপতির কার্যলয় থেকে গেজেটও প্রকাশিত হয়েছিল এ বিষয়ে। যদিও কোনো স্বাধীন সূত্র থেকে তা তখন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন কি না। গুঞ্জন ছিল, তিনি ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং সেখানে সেনা হেফাজতে থেকে পদত্যাগ করেছেন।
সংবিধান অনুযায়ী নতুন সংসদ গঠিত হলে বিগত সংসদের স্পিকার নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান এবং প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। কিন্তু স্পিকার শিরীনের নিরুদ্দেশ থাকা, তার কথিত পদত্যাগ এবং ডেপুটি স্পিকারের জেলে থাকার প্রেক্ষাপটে চলমান বর্তমান ত্রয়োদশ সংসদ সদস্যদের শপথ পড়িয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং প্রথম অধিবেশনে সদস্যদের মধ্য থেকে সিনিয়র সদস্য হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সভাপতিত্ব করেন।
একটি সূত্র দাবি করেছে, আত্মগোপনে থাকাবস্থায় ফ্যাসিস্ট সরকারের তিন ভুয়া পার্লামেন্টের স্পিকার শিরীন শারমিন ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর ই-পাসপোর্ট পেতে আবেদন করেন। দেশত্যাগের উদ্দেশ্যেই তিনি সবুজ পাসপোর্ট সংগ্রহ করছিলেন বলে তখন চাউর হয়। একই বছরের ১০ অক্টোবরে অজ্ঞাত স্থান থেকে তিনি পাসপোর্টের জন্যে আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিশ দিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
শিরীন শারমিন চৌধুরী ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত ও ভুয়া নির্বাচনে রংপুর-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। নিজেকে ঐতিহ্যবাহী রজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকারী এবং অনেকটা সুশীল শ্রেণির হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করলেও শেখ হাসিনার সব অপকর্ম, বিশেষ করে নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করে একদলীয় সংসদ গঠনের সহযোগী ছিলেন। শেখ হাসিনা নিজের শ্বশুরবাড়ির এলাকার আসনটি তাকে উপহার দিয়ে এমপি বানান।
শেখ হাসিনার সঙ্গে গভীর ঘনিষ্ঠতার কারণে পতনের পর শিরীন শারমিনও রোষানল থেকে বাঁচার জন্যে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সহিংসতার ঘটনায় শিরীন শারমিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রয়েছে। রংপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে স্বর্ণশ্রমিক মুসলিম উদ্দিন (৩৮) নিহত হওয়ার ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট শিরীন শারমিন চৌধুরী, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়। মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি আমলি আদালতে মামলাটি করেছেন রংপুর শহরের পূর্ব গণেশপুর এলাকার নিহত মুসলিম উদ্দিনের স্ত্রী দিলরুবা আক্তার (৩২)। হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন টিপু মুনশি।
শিরীন শারমিন ফ্যাসিবাদী শাসক শেখ হাসিনার খুবই আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত। ২০০৯ সালে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হিসেবে জাতীয় সংসদে আসেন তিনি। মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে ২০১৩ সালে ৩০ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম নারী স্পিকার নির্বাচিত হন তিনি। এরপর ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ছেড়ে দেওয়া রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসন থেকে উপনির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সংসদে আসেন শিরীন শারমিন।
একাদশ সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনা তার শ্বশুরবাড়ির এলাকা পীরগঞ্জের আসনটি নোয়াখালীর মেয়ে শিরীনকে ছেড়ে দেন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনেও এ আসনে শিরীন শারমিনকে প্রার্থী করে আওয়ামী লীগ।
এতদিন জানা গিয়েছিল, ক্যান্টনমেন্টে বিশেষ ব্যবস্থায় থাকার পর একপর্যায় রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকায় সরকারের বিশেষ নজরদারিতে আত্মগোপনে আছেন তিনি।
স্বামী ফার্মাসিউটিক্যাল কনসালট্যান্ট সৈয়দ ইশতিয়াক হোসাইন এবং ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড কলেজের আইবি কোর্সে অধ্যয়নরত ছোট ছেলে সৈয়দ ইবতেশাম রফিক হোসাইন তার সঙ্গে ছিলেন বলেও জানা যায়। দুই সন্তানের মা ড. শিরীন শারমিনের বড় মেয়ে লামিসা শিরীন হোসাইন যুক্তরাষ্ট্রে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট পদে চাকরি করছেন। বড় মেয়ে ছাড়া বাকি সবাই এক ছাদের নিচে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারিতেই বেশ ভালো ছিলেন বলেই জানা গেছে। তবে নিজের যে বাসা থেকে তিনি আজ গ্রেপ্তার হয়েছেন, সে বাসায়ই এতদিন ছিলেন কি না, সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর অজ্ঞাত স্থান থেকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান শিরিন শারমিন। ওই দিনই তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে দেওয়া গেজেটে বলা হয়, ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৪(২)(২) অনুচ্ছেদ অনুসারে রাষ্ট্রপতির কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্পিকারের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। তার পদত্যাগপত্রটি রাষ্ট্রপতি আজ গ্রহণ করেছেন এবং আজই তা কার্যকর হয়েছে।’ সংবিধানের ৭৪ (২) অনুচ্ছেদে বলা আছে, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদ কখন শূন্য হয়।
আত্মগোপনে থেকে ই-পাসপোর্ট সংগ্রহ নিয়েও রহস্য এবং প্রশ্ন দেখা দেয়। ই-পাসপোর্ট আবেদনের নিয়মে বলা আছে, সবকিছু ঘরে বসে করতে পারলেও নির্ধারিত তারিখে অসুস্থ এবং যারা শারীরিকভাবে অক্ষম, তারা ছাড়া আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিশ দিতে আবেদনকারীকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট অফিসে যেতে হবে। অভিযোগ রয়েছে, অদৃশ্য মহলের ইশারায় ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর বেলায় এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে।
গ্রেপ্তারের পর শিরীন শারমিন চৌধুরীকে রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে থাকা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তাকে রংপুরের আদালতে হাজির করতে হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

