সংসদ বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি দুই ধাপে নিতে হয় নির্বাচন কমিশনকে (ইসি)। তফসিল ঘোষণার আগে ও পরে। তফসিলের আগে ৭০ ধরণের নির্বাচনী সামগ্রী কেনা, ভোটার তালিকা হালনাগাদকরণ, সংসদীয় আসনের সীমানা বিন্যাস, নির্বাচনের বাজেট অনুমোদন ও নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন সম্পন্ন করা হয়।
তফসিলের পর ভোটার সংখ্যানুপাতে ভোটকেন্দ্র ও ভোটকক্ষ স্থাপন, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষকদের তালিকা প্রস্তুত, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার প্যানেল প্রস্তুতিকরণ, প্রার্থীর আসনওয়ারী তালিকানুযায়ী মনোনয়নপত্র ফরম ছাপা ও ব্যালট মুদ্রুণ।
এসব কাজের মধ্যে প্রধানটি নির্বাচনের সামগ্রী কেনার কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা এবং ক্রয়ের সময়সীমা নির্ধারণ। এই ক্রয় প্রক্রিয়া অভ্যন্তরীণ উৎস এবং বর্হিবিশ্ব থেকে সংগ্রহ করতে হয়। ফলে যেকোন নির্বাচনের প্রথমটি কর্মকৌশল চূড়ান্ত হলে ধরে নেয়া হয় নির্বাচনী ট্রেনের যাত্রা শুরু হয়েছে।
ইতিমধ্যে এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধিন কমিশন মূল কর্মযজ্ঞের বড় কাজটি চূড়ান্ত করে বাস্তবায়নের পথে নেমে পড়েছে। সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে শূন্য হওয়া স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের প্রস্তুতিও চলবে সমানতালে বলে নথির তথ্যে পাওয়া গেছে। এই প্রস্তুতির বাইরে রাখা হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদকে।
সংসদ সংক্রান্ত যে প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে সেখানে নির্বাচনে ব্যবহ্নত নির্বাচনী উপকরণ কিনতে সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯৮দিন অর্থাৎ আগামী বছরের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় সাত মাস। এসব মালামাল কেনায় ব্যয় সংকোচনের নীতি অনুসরণের জন্য কমিশনের পক্ষ থেকে ক্রয় সংক্রান্ত কমিটি বা শাখাকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে ভিন্ন উদ্দেশ্য না থাকলে কমিশন আগামী বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এয়োদশ সংসদ নির্বাচন করতে সক্ষম, এমনটাই জানালের ইসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা । নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ আমার দেশকে জানান, নির্বাচনী সামগ্রী কেনা নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। কোন প্রক্রিয়ায় কেনা হবে সেটার কর্মপরিকল্পনা নেয়া হবে।
আর নির্বাচনী বাজেট নির্ধারণের কাজও চলছে। সচিবের কক্ষে উপস্থিত থাকা অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ বলেন, নির্বাচনী ট্রেন যাত্রা শুরু করেছে। ধাপে ধাপে সামনে এগিয়ে নেয়ার মাধ্যমে এয়োদশ সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে।
আমার দেশ পত্রিকার অনুসন্ধানে জানা গেছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১২ ধরণের নির্বাচনী দ্রব্যাদি ক্রয়ে ব্যয় হয়েছিল ২৫ কোটি ৬২ লাখ ১৩ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা। এবার ওই সামগ্রী কিনতে দেড় কোটি টাকা কমে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ২৪ কোটি ৯লাখ ৭৬ হাজার ৮৩০ টাকা। এ হিসাব ধরলে গত নির্বাচন থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে ধারণা পাওয়া গেছে।
তবে, দুইটি দ্রব্যের দাম অবিশ্বাস্যভাবে কমলেও বাকি দশটির দাম বেড়েছে। ইসির কর্মকর্তারা বলেন, নির্বাচনে ব্যালট বাক্স ও এর ঢাকনা ক্ষতিগ্রস্ত কম হওয়ায় এই খাতে ব্যয় কমলেও সার্বিক ব্যয় বাড়ছে। এই পণ্যের মধ্যে স্প্যাম্প প্যাড ও অমোচনীয় কালির কলম বিদেশ থেকে আমাদানি করতে হয়। বাকিগুলো দেশীয় উৎস থেকে সংগ্রহ করে থাকে কমিশন।
১২ ধরণের দ্রব্যাদির মধ্যে চটের ব্যাগ গত নির্বাচনে মূল্য ছিল ১ কোটি ৮০ হাজার ৯০ টাকা এবার ৫০ লাখ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৫১ লাখ ৮০ হাজার ১২৭ টাকা। একই ভাবে হেসিয়ান ব্যাগে ৯ লাখ বেড়ে ৫৩ লাখ ২২ হাজার ৪৭১ টাকা, হেসিয়ান ব্যাগ ছোট সাড়ে ছয় লাখ বেড়ে ৩১ লাখ ৬২ হাজার ৬২৬ টাকা, মার্কিং সিলে সাড়ে ২৫ লাখ বেড়ে ১ কোটি ১৪ লাখ ৮৩ হাজার ৬৭০ টাকা।
অফিসিয়াল সীলে ৩২ লাখ বেড়ে ১ কোটি ৪৯ লাখ ৯৭ হাজার ৪৪৪টাকা, ব্রাশ সীলে ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা বেড়ে ২৯ লাখ ৩৬ হাজার ১৯১ টাকা, লাল গালায় ৫২ লাখ টাকা বেড়ে ২ কোটি ২৮ লাখ ৯৬ হাজার ৫’শ টাকা, স্প্যাম্প প্যাডে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৭০ হাজার বেড়ে ৬ কোটি ১৬ লাখ ৫৫ হাজার টাকা, অমোচনীয় কালির কলম ১ কোটি ৬ লাখ ৮০ হাজার বেড়ে ৭ কোটি ৩০ লাখ ৮৭ হাজার ৩০০ টাকা।
স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের লক ৪৬ লাখ ৯ হাজার বেড়ে ১ কোটি ৭৬ লাখ ৫ হাজার ৫’শ টাকা, ব্যালট বাক্স দ¦াদশ সংসদে ব্যয় হয়েছিল ৫ কোটি ২০ লাখ এবার তা সাড়ে ৪ কোটি টাকা কমে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৭১ লাখ টাকা এবং ব্যালট বাক্সেও ঢাকনা গত নির্বাচনে ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয় হলেও এবার কমে দাড়িয়েছে ৫৫ লাখ টাকা । স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ও এর ঢাকনা মাত্র ১০ হাজার নতুন কেনা লাগছে এ কারণে ব্যয় কমেছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা।
তথ্যমতে, তিনশ সংসদীয় আসনের বিপরীতে প্রায় ৭০ ধরণের নির্বাচনী দ্রব্যদি কেনার প্রয়োজন হয় ইসির। এর মধ্যে লাল গালা প্রতিটি কেন্দ্রে ১ প্যাকেট হিসেবে ৪৮ হাজার প্যাকেট; পরবর্তী উপনির্বাচনসহ অন্যান্যের জন্য অতিরিক্ত ১০ শতাংশ ধরে অর্থাৎ ৫২ হাজার ৮০০। আর আগামী নির্বাচনের জন্য লাল গালা লাগবে ৫৫ হাজার এবং এর জন্য প্যাকেট কিনতে হবে ১১ হাজার কেজি।
একই ভাবে স্প্যাম্প প্যাড ৪ লাখ ৪০ হাজার, অমোচনীয় কালির কলম ৪ লাখ ৪০ হাজার, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের লক ২০ শতাংশসহ ২৩ লাখ।
ব্যালট বাক্স ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৩০০টি, ব্যালট বাক্সের ঢাকনা ৩ লাখ ৪৩ হাজার, চটের ব্যাগ শুধু ব্যালট পেপার পরিবহনের জন্য দ্বাদশ সংসদের জন্য কেনা হয় ৪২ হাজার এবার ৪৬ হাজার, হেসিয়ান ব্যাগ প্রতিটি কেন্দ্রের জন্য ৬৯ হাজার ৩০০, হেসিয়ান ছোট ব্যাগ ৫২ হাজার ৮০০, মার্কিং সিল ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৬০০, অফিসিয়াল সিল ৩ লাখ ৭৭ হাজার, ব্রাশ সিল ৫২ হাজার ৮০০।
এদিকে, দ্বাদশ সংসদের কেনা মালের মধ্যে ব্যবহার উপযোগী রূয়েছে চটের ব্যাগ ১৫ হাজার, হেসিয়ান ব্যাগ ৯ হাজার, হেসিয়ান ছোট ব্যাগ ৬ হাজার, মার্কিং সিল ৬০ হাজার, অফিসিয়াল সিল ৯৬ হাজার, ব্রাশ সিল ১১ হাজার, লাল গালা ১৫ হাজার, স্প্যাম্প প্যাড ২৮ হাজার ২৯০টিঁ, অমোচনীয় কালির কলম ৯৫ হাজারটি ও স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের লক ৬ লাখ ৮০হাজার।
ভোটকেন্দ্র ও ভোটকক্ষ
দ্বাদশ সংসদে কেন্দ্রে ছিল ৪২,১৮০টি সম্ভাব্য এ সংখ্যা ৪৮ হাজার এবং কক্ষ ছিল ২, ৬৩, ২৩৯ হাজার এবার ২, ৯৫, ০০০। নির্বাচনী দ্রব্যাদি কেনার সম্ভাব্য সময়সীমা ৭ মাস অর্থাৎ দলিল প্রস্তুত ও অনুমোদন ৩০দিন, দরপত্র আহবান ও উন্মুক্তকরণ ২৮দিন, দরপত্র মূল্যায়ন ২৮দিন, দরপত্র অনুমোদন ৭দিন, এনওএ প্রদান ৭দিন, চুক্তি সম্পাদনা ২৮দিন, দরপত্র প্রস্তুত থেকে চুক্তি সম্পাদনা পর্যন্ত মোট সম্ভাব্য সময় ১২৮দিন, পণ্য পরিবহন ৭০দিন। নির্বাচনী দ্রব্যাদি ক্রয়ের জন্য সর্বমোট সময় নির্ধারণ করেছে ইসি ১৯৮দিন।
ইসির সংশ্লিস্টরা জানিয়েছেন, এ উপলক্ষ্যে গত বৃহস্পতিবার কমিশন নির্বাচনের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সভা করেন। সভায় দ্বাদশ নির্বাচনে কেনা সামগ্রীর তুলনামূলক পরিমাণ ও মূল্য নিয়ে আলোচনা হয় এবং নির্বাচনের শাখা থেকে কমিশনকে অবহিত করা হয়।
কমিশনকে জানানো হয়, পুরাতন নির্বাচনী দ্রব্যাদি দিয়ে এয়োদশ সংসদ নির্বাচন করা সম্ভব নয়। ফলে নতুন করে দ্রব্যাদি কেনার সিদ্ধান্ত হয়। এর মাধ্যমে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিভাবে যাত্রা শুরু হয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধিন পাঁচ সদস্যের কমিশনের।
কমিশন সূত্র বলছে, এই প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রবেশ করায় এয়োদশ জাতীয় সংসদ নিবাচনে পুরোপুরি মনোনিবেশ ঘটলো নিবাচন কমিশনের (ইসি)। এর আগে ভোটার তালিকা কাযক্রম শুরুর মাধ্যমে সংসদ নিবাচনের কর্মযজ্ঞে প্রবেশ করার প্রথম ধাপ ছিল।
নির্বাচনের প্রস্তুতি বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রি. জে. (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লা আমার দেশকে বলেন, নির্বাচনী দ্রব্যদি ক্রয় ও ভোটার তালিকা নিয়ে যে সভাটি হয়েছে ওই সভাটি ছিলো সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির সভা। সেখানে লজিস্টিক সার্পোটসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। নির্বাচনের প্রস্তুতিটি ইসির অভ্যন্তরীণ ইস্যু; তাই আপনাকে বিস্তারিত জানাতে পারছি না।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ আমার দেশকে বলেন, সংসদ নির্বাচনের নির্বাচনী সামগ্রী খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিগত নির্বাচনের কেনা দ্রবাদি এই নির্বাচনে ব্যবহার করা সম্ভব হবে না বলে কর্মকর্তারা আমাদের জানিয়েছেন। আমরা বলেছি, প্রয়োজন অনুযায়ী নির্বাচনী সামগ্রী কেনার জন্য। এই কাজে যাতে বাড়তি একটি টাকাও খরচ না হয় সেটির দিকে বিশেষ নজর রাখতে নির্দেশনা দিয়েছি। সব কিছুর মূলে ব্যয় সংকোচন নীতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছি, যোগ করেন সাবেক জেলা জজ এই নির্বাচন কমিশনার।
উল্লেখ্য আগামী এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছে কমিশন।
এদিকে, সংসদ নির্বাচনের কার্যক্রমকে শেষ করতে নির্বাচন কমিশনার মো আনোয়ারুল ইসলাম সরকারকে সভাপতি করে ৭ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির কর্মবণ্টনের মধ্যে সীমানা পুননির্ধারণ, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন, জাতীয় এবং স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি ও তদারকি এবং উপকারভোগী পর্যায়ে আলোচনা বিষয়ক এই কমিটি গঠন করা হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

