নতুন অর্থবছরের বাজেট পাস, আজ থেকে কার্যকর

সংসদ রিপোর্টার

নতুন অর্থবছরের বাজেট পাস, আজ থেকে কার্যকর
ফাইল ছবি

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট গতকাল মঙ্গলবার পাস হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর উত্থাপিত নির্দিষ্টকরণ বিল-২০২৬ পাসের মধ্য দিয়ে বাজেট পাসের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। নতুন অর্থবছরের শুরুর দিন আজ ১ জুলাই থেকে এ বাজেট কার্যকর হচ্ছে। এর আগে গতকালই রাষ্ট্রপতির সম্মতিসাপেক্ষে নির্দিষ্টকরণ আইন গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।

গত সোমবার রাতে শুরু হওয়া বাজেট পাসের প্রক্রিয়ায় মন্ত্রীরা তাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ব্যয় নির্বাহের যৌক্তিকতা তুলে ধরে মোট ৫৯টি মঞ্জুরি দাবি সংসদে উত্থাপন করেন। এ মঞ্জুরি দাবিগুলো সংসদে কণ্ঠভোটে নিষ্পত্তি হয়। পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদের বৈঠকে এ বাজেট কণ্ঠভোটে পাস হয়।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় সংসদে গত ১১ জুন ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ শীর্ষক ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি দেশের ৫৫তম এবং অর্থমন্ত্রী আমির খসরুর প্রথম বাজেট।

গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চেয়ে এবারের বাজেটের আকার বেড়েছে এক লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা (১৮.৭৩%)। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। অবশ্য সংশোধিত বাজেটে এটি কমে সাত লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়। বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংসদে উপস্থাপনের পর অধিবেশনজুড়ে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনা করেন সংসদ সদস্যরা। বিরোধী দলের সদস্যরা নতুন বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে সমালোচনা করেন। ১১ দিন আলোচনা শেষে সোমবার রাতে সংসদে অর্থ বিল-২০২৬ পাস হয়।

এছাড়া মঞ্জুরি দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে বিরোধী দলের ৪৩ সংসদ সদস্য এক হাজার ৩৪৩টি ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ৫৯টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মঞ্জুরি দাবির মধ্যে ৩৬টির ওপর আলোচনার সিদ্ধান্ত হলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।

গতকাল জোহরের নামাজের বিরতির পর ৩৩ নম্বর ছাঁটাই প্রস্তাব নিষ্পত্তির পর বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ফ্লোর নিয়ে সংসদের সময় বাঁচাতে প্যাকেজ আকারে ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো প্রত্যাহার করে নেন। শফিকুর রহমান বলেন, আমরা বিরোধী দলের পক্ষ থেকেই মূলত প্রস্তাবগুলো দিয়েছি। এটি একটি রেওয়াজ। রেওয়াজের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি এবং আলোচনা গ্রহণ হওয়ার সম্ভাবনা নেই, সে কারণে আমরা মূল্যবান সময় বাঁচাতে পারি কি না, আমাদের কোনো সুযোগ আছে কি না, ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো আমরা প্যাকেজ আকারে প্রত্যাহার করে নিলাম। তাহলে বোধ হয় কাজটা সহজ হয়।

এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ধন্যবাদ বিরোধীদলীয় নেতা। আমার মনে হয় ট্রেজারি বেঞ্চ আপনার এ প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। আমার মনে হয়, প্রস্তাবগুলো মন্ত্রী উত্থাপনের পর সরাসরি প্রস্তাবটি ভোটে দেওয়া হবে। ধন্যবাদ বিরোধীদলীয় নেতা, অনেক সময় বাঁচবে। পরের ২৫টি মঞ্জুরি দাবি সরাসরি ভোটে দেওয়া হয়।

এদিকে যেসব মঞ্জুরি দাবি নিয়ে আলোচনা হয়, সেখানে প্রতিটির ওপর সর্বোচ্চ পাঁচজন সদস্যকে আলোচনা করতে সুযোগ দেওয়া হয়। এসব দাবি কণ্ঠভোটে নাকচ হয়।

সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এবং অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদসহ সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নেন।

সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, বাজেটের ওপর মোট ৪৮ ঘণ্টা ৫৪ মিনিট আলোচনা হয়। এর মধ্যে সম্পূরক বাজেটের তিন ঘণ্টা তিন মিনিট এবং ৪৫ ঘণ্টা ৫১ মিনিট আলোচনা হয় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতাসহ ২৯১ সংসদ সদস্য বক্তব্য রাখেন। এর মধ্যে সরকারি দলের ২০০ জন এবং বিরোধী দলের ৯১ জন।

এবারের বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। বাজেট ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক উৎস থেকে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হবে। অভ্যন্তরীণ উৎসের বড় অংশই আসবে ব্যাংকিং খাত থেকে। বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) আগেই অনুমোদন দেওয়া হয়।

প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বর্তমানের চেয়ে ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। সোমবার বাজেট বক্তৃতার সময় দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবে তা আরো বাড়িয়ে চার লাখ টাকা করা হয়। আয়সীমা ২০২৭-২৮ অর্থবছরেও চার লাখ টাকা বলবৎ থাকবে। একইভাবে নারী, মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণদের করমুক্ত সীমাও পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হয়। ব্যক্তি আয়সীমা বৃদ্ধি ছাড়াও তিন ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব বাদ দেওয়া এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভিন্ন খাতে নতুন কর ও ভ্যাট ছাড়যুক্ত করাসহ ৬৪টি সংশোধনী যুক্ত করে সংসদে অর্থবিল পাস হয়।

বাজেট প্রস্তাবের সময় করের আওতা বাড়াতে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য সরবরাহের ওপর দশমিক ২ শতাংশ হারে অগ্রিম করারোপের কথা হলেও সমালোচনার মুখে এটি বাদ দিয়ে ফ্ল্যাট রেটে ভ্যাট আদায়ের কথা বলা হয়। প্রস্তাবে কাঁচাবাজার ও ক্ষুদ্র মুদি দোকান করের আওতাভুক্ত করা হলেও এটি বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত হয়।

প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা বাড়ানোর দাবি

এদিকে বাজেটের ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনাকালে বিরোধী দলের সদস্যরা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ বারবার বাড়ানোর নামে বাড়তি অর্থ ব্যয় ও অপচয় বন্ধের দাবির পাশাপাশি নতুন অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নে টাকার যথাযথ ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।

ছাঁটাই আলোচনায় অংশ নিয়ে পিরোজপুর-১ আসনের সদস্য মাসুদ সাঈদী বলেন, রাজস্ব প্রশাসনের নীতিমালায় কিছু দুর্বলতার কারণে আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছি না। করের আওতা বাড়ানোর নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে। সৎ করদাতা প্রশংসিত হওয়ার বদলে তারা বিভিন্নভাবে অডিটের নামে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

রংপুর-৪ আসনের সদস্য আখতার হোসেন বলেন, বাংলাদেশ বিভিন্নভাবে ঋণের জালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। সামনের দিনে বিদেশ থেকে যে ঋণ নিয়ে আসবে, ওই ঋণের শর্ত, পরিমাণ ও কোন দেশ থেকে আসছে, প্রতিটি বিষয় যেন সংসদের সামনে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়।

খুলনা-২ আসনের এমপি শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল বলেন, অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ হয় না। ফলে ব্যয় বেড়ে যায় এবং জনগণের অর্থের অপচয় হয়। কুষ্টিয়া-৩ আসনের মো. আমির হামজা প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় বাড়ানোর প্রবণতা বন্ধ এবং গুণগতমান নিশ্চিতের দাবি জানান।

রংপুর-১ আসনের এমপি রায়হান সিরাজী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে শক্তভাবে বলেছেন, যেকোনো মূল্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা তিনি বাস্তবায়ন করবেন। এজন্য আমি ছাঁটাইয়ের জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে প্রস্তাব করতে চাই, আগামী একনেক বৈঠকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা যেন পাস করা হয়।

সংসদ সদস্য আল ফারুক আব্দুল লতিফ বলেন, নিম্ন আদালত পৃথক করা হলেও পদোন্নতি ও বদলিতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকায় তা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। তিনি বিচারক সংকট, মামলাজট ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনা করেন।

পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান বলেন, দেশে ২৫ লাখের বেশি মামলা পেন্ডিং। বিভাগীয় শহরে হাইকোর্ট স্থাপন বা পেপারলেস জুডিশিয়ারি করার সুস্পষ্ট পরিকল্পনার অভাব রয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, বিচার বিভাগের বরাদ্দ জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ, যা বিটিভির বরাদ্দের চেয়ে কম। তিনি দেশে ৫০ লাখের বেশি মামলাজটের কথা উল্লেখ করে প্রবীণ ও শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র তুলে ধরেন।

ছাঁটাই প্রস্তাবের সমালোচনা করে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বিরোধীদলীয় সদস্যদের মধ্য থেকে দুই ধরনের দাবি এসেছে। একজন বলছেন বরাদ্দ বেশি হয়ে গেছে, তাই এক টাকা কমানো হোক। আরেকজন বলছেন বরাদ্দ অনেক কম হয়ে গেছে, তাই এক টাকা করা হোক। এক টাকা দিয়ে যদি আইন বিভাগ চালাতে বলা হয়, তাহলে তো বিচার বিভাগের দরকার নেই। এটা একটি পুলিশি রাষ্ট্র হয়ে যাক।

মঞ্জুরি দাবির প্রস্তাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, বাজেট এক টাকায় নামিয়ে আনলে বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো বন্ধ করে দিতে হবে এবং লাল-সবুজের পতাকা নামিয়ে ফেলতে হবে। প্রবাসীদের সেবা বন্ধ হয়ে যাবে এবং জাতিসংঘে চাঁদা দেওয়া সম্ভব হবে না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন